প্রাপ্তি

গল্প শাহীন সুলতানা অক্টোবর ২০২৫

বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে। রবিবার গণিত পরীক্ষা। কিন্তু মায়ের জ্বরটা এত বেশি যে, রোহান কিছুতেই মাকে একলা রেখে সময়মতো পরীক্ষার হলে উপস্থিত হতে পারল না। 

মায়ের শরীরে কম্পন হচ্ছে। চোখ দুটো লাল টকটকে। জ্ঞানহীন অবস্থা। দুটো লেপ আর ঘরের সমস্ত কাঁথা দিয়ে মাকে চেপে ধরে রাখল রোহান। সূরা ইয়াসিন পড়ে মায়ের চোখে-মুখে ফুঁ দিচ্ছে বারবার। সন্ধ্যায় বাজার থেকে ডাক্তারকে বলে মায়ের জন্য ওষুধ এনেছিল। কিন্তু সে ওষুধে জ্বর পড়েনি মমতাজ বেগমের। সারা রাত মাথায় পানি আর কপালে জলপট্টি দিয়ে দিয়েছে রোহান। 

রাতভর একটু পরপর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছে। 

পরদিন দুপুর ১২টা। স্কুলে ঢং-ঢং করে ঘণ্টা পড়ল দুটো। ঘণ্টা শুনে রোহানের বুকের মধ্যে ঝনাৎ করে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “হায় আল্লাহ! আমি কি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাটা দিতে পারব না? তুমি আমার ওপর দয়া করো মাবুদ! পরীক্ষার আরও এক ঘণ্টা বাকি আছে। তুমি মায়ের জ্বর কমিয়ে দাও।

রোহানের কান্না দেখে পাশের বাড়ির সুফিয়া খালা জিজ্ঞেস করল, কী হইছে রে রোহান? কান্দিস ক্যানে? তর মায়ের জ্বর কি কমছে?

-না খালা।

-তর না পরীক্ষা? 

-হ্যাঁ, কিন্তু মাকে এ অবস্থায় ফেলে রেখে পরীক্ষায় যাব ক্যামনে?

-ওরে আল্লাহ! কস কি? পানির ঘড়া আমার কাছে দে রে বাছা, আমি তর মা’র মাথায় পানি দিতাছি। তুই তাড়াতাড়ি পরীক্ষা দিবার যা! আমি বইতাছি; যা...যা... তাড়াতাড়ি যা!”

-রোহান মাকে সালাম করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

সেলিম স্যার প্রচণ্ড রাগী। রোহানকে দেখে ভীষণ তেঁতে উঠলেন-কী রে হতচ্ছাড়া? তোর এখন সময় হলো বুঝি পরীক্ষা দেওয়ার? এক ঘণ্টাও নাই! এই সময়ের মধ্যে কী পরীক্ষা দিবি শুনি?

-রোহান কাঁদতে কাঁদতে বলল, স্যার, আমার মা অনেক অসুস্থ। আমি ছাড়া মাকে আর কেউ দেখার নেই। মাকে একলা ফেলে আসতে পারিনি। এখন খালা আসছে তাই পরীক্ষায় এসেছি। আপনি দয়া করে আমাকে পরীক্ষায় বসতে দিন। 

-ঠিক আছে। সিটে গিয়ে বসো আর তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে যাও।

রোহান আলহামদুলিল্লাহ বলে মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানাল। ভাবল-অন্তত পাশ মার্কস থাকলেও ওপরের শ্রেণিতে প্রমোশন নিতে পারব।


২.

রোহানের বাবা ছিলেন রিকশাচালক। গত বছর জানুয়ারিতে একটি ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে জায়গায় প্রাণ হারান তিনি। তার প্রায় ছয় মাস পরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রোহানের ছোট বোন রীনাও মারা যায়। দুর্বিষহ হয়ে ওঠে জীবন। 

পরিবারের প্রধান মানুষটি বেঁচে না থাকায় মমতাজ বেগমকে বেছে নিতে হয়েছে জুটমিলের কাজ। তবে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ আর দুর্বলতার কারণে প্রায়ই অসুস্থ থাকেন তিনি। মা অসুস্থ থাকলে রোহান মাঠে কাজ করে। যা পায় তা দিয়ে মা-ছেলের সংসার চলে যায় কোনো রকমে।

তোরো-চৌদ্দ বছরের রোহান। কালো লিকলিকে চেহারা। চোখদুটো কোটরের মধ্যে। মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়ো। স্কুলে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই বুলিংয়ের শিকার হতে থাকে। একেকজন একেক নামে ডাকে, সহপাঠীরা হাসাহাসি করে। কখনো ছোট করে মজা নেয়।

রোহান কিছু মনে করে না। ভাবে-বন্ধুরা রসিকতা করছে, করুক। কিন্তু ইদানীং বুকের মধ্যে কোথায় যেন কষ্ট হয়। বন্ধুদের বলা কষ্টের কথাগুলো লতার মতো লকলকিয়ে বাড়ে। চোখের কোণে পানি চিকচিক করে রোহানের।

সবাই যখন হাসিঠাট্টায় মুখর হয় রোহান তখন কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ক্লাসের কোনায় বসে পড়া আত্মস্থ করে আর বাবার কথা ভাবে।

বাবা বেঁচে থাকতে রোহানকে ডাকত কালামানিক বলে। সকাল হলে বলত-‘কইরে আমার বাপধন-কালামানিক, আয়রে বাপ...আমার কাছে আয়। বইসা দুজন একসঙ্গে ভাত খাইয়া লই। সারাদিন তরে আর দেখতে পারুম না।’

আহা! বাবার মতন এমন করে আর কেউ ডাকে না রোহানকে। বাবার জন্য বুকের মধ্যে খচখচ করে।

রেজাল্টের আর মাত্র দুদিন বাকি। পরীক্ষার পর থেকে আর একদিনও রোহান স্কুলে যেতে পারেনি। মায়ের শরীরের অবস্থা একেবারেই ভালো না। ঘরে খাবার নেই। মায়ের ওষুধ নেই। 

রোহান তাই স্কুল বাদ দিয়ে আসগর চাচার ফসলের জমিতে কাজ নেয়। ঘাস বাছাই, পাট নিংড়ানো, ধোয়া, শুকানো কিংবা চারা লাগানোতেও রোহান আর দশজনের চেয়ে সেরা। নিয়মিত কাজ করলে কিছু বেশি মজুরি পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং দুবেলা দুমুঠো ভাতের বন্দোবস্ত করতে স্কুল বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রোহান। কারণ ক্ষুধার কাছে পৃথিবীর সব সত্য নির্মম হয়ে ওঠে। 

বুধবার দিন রেজাল্ট ঘোষণা হলো। সহপাঠীরা সবাই ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও উপস্থিত নেই রোহান। অথচ সম্মিলিত মেধা তালিকায় তার রোল নম্বর সবার আগে। গণিতে ষাট শতাংশ নম্বর পেয়েও সে-ই প্রথম স্থান অর্জন করেছে। আর সবচেয়ে বড়ো সুসংবাদ হলো-শিক্ষায় এআই ভিডিও নির্মাণ এবং কোডিংয়ে বিশেষ দক্ষতার স্বাক্ষর রাখার কারণে জেলাপ্রশাসন থেকে রোহানকে কম্পিউটার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

দ্রুত এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র এলাকায়। শিক্ষকরা রোহানের এমন সাফল্যে মহাখুশি। স্কুল থেকে মমতাজ বেগমের নামে পাঠানো হলো দাওয়াতপত্র।

অভিভাবক সমাবেশের অনুষ্ঠানে বলা হলো-পরবর্তী বছর থেকে রোহানের যাবতীয় খরচ বহন করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। আর তার মায়ের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করবে তাঁরা। মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো প্রকারেই যেন রোহানের লেখাপড়া বন্ধ না হয়। এমন ছেলে শুধু মা-বাবারই নয়; সমাজের গর্ব, গর্ব দেশের। 

সবার করতালিতে মুখরিত হলো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। সবাই রোহানের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মা মমতাজ বেগমের দু-চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দাশ্রু।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ