প্লাস্টিক দূষণ রোধে সামুদ্রিক রোবট
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পৃথিবীর প্রায় সত্তর শতাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থান করছে সাগর-মহাসাগর। মানুষের জীবনবৈচিত্র্যের সাথে অনেকাংশে জড়িত বিশাল সাগর। কিন্তু এই বিশাল এলাকা প্রতিনিয়ত এক শঙ্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে ‘বিপদ’। কেননা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দূষিত হচ্ছে পৃথিবীর সাগর-মহাসাগরগুলো। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন প্লাস্টিক আবর্জনা স্থল, নদী এবং উপকূলীয় শহরগুলো থেকে সমুদ্রে প্রবেশ করছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বের মহাসাগরে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য ভাসছে। প্রতি বছর প্রায় ৮০ লক্ষ টন প্লাস্টিক বিশ্বের সমুদ্রে প্রবেশ করে বলে অনুমান করা হয়, যা প্রতি মিনিটে একটি আবর্জনাবাহী ট্রাক সমুদ্রে ফেলার সমান। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে। কেননা এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ভেঙে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। যার ফলে এগুলো সামুদ্রিক প্রাণীদের শরীরে প্রবেশ করে। বলা হচ্ছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মাছের শরীরে প্রবেশ করছে এসব প্লাস্টিক। এই সংকট সামুদ্রিক জীবন, বাস্তুতন্ত্র এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ, কিন্তু প্রযুক্তি স্মার্ট সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছে। রোবোটিক্স এবং এআই দ্বারা চালিত সমুদ্র-পরিষ্কারকারী রোবটের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সমুদ্রের প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে কাজ করছে। বিভিন্ন উন্নত দেশে সমুদ্রের বর্জ্য অপসারণে ইতোমধ্যে এসব রোবটের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকায় বর্তমানে নদী-খাল কিংবা সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু রোবট। যারা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে কাজ করছে। চলো, তেমনই দুটি উদ্ভাবনী রোবট সম্পর্কে জেনে আসি।
ওয়েস্টশার্ক
এটা হলো, ভাসমান প্লাস্টিক খাদক। সমুদ্রে প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াই করা দুর্দান্ত প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম এই ওয়েস্টশার্ক। সমুদ্রের প্লাস্টিক বর্জ্য গিলে খাওয়ার জন্য বানানো হয়েছে এই রোবট শার্ক কিংবা হাঙর। নেদারল্যান্ডভিত্তিক একটি কোম্পানি এই রোবট তৈরি করেছে। রানমেরিন টেকনোলোজি নামে ডাচ কোম্পানির তৈরি ওয়েস্টশার্ক মূলত স্বায়ত্তশাসিত রোবট। রোবটটি দেখতে ছোট ও অনেকটা হাঙর আকৃতির। বড়সড় ড্রোন আকৃতিরও বলা যায়। হাঙরের মতো এই রোবট পানিতে ভেসে ভেসে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হওয়ার আগে প্লাস্টিক গিলে ফেলে এই রোবট। ওয়েস্টশার্ক নিজে নিজে কিংবা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে কাজ করে। একটি ওয়েস্টশার্ক প্রতিদিন ৫০০ কেজি প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে পারে। যা ২১,০০০ প্লাস্টিক বোতলের সমান। এই রোবটের মধ্যে একধরনের ‘চোয়াল’ আছে। যা পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য শনাক্ত করতে পারে। আবর্জনা সংগ্রহের পাশাপাশি, এই রোবট ক্যামেরা ও সেন্সরের সাহায্যে পানির নমুনা ও জলজ পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
ওয়েস্টশার্ক একবার চার্জ দিলে প্রায় আট ঘণ্টা চলতে পারে। দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এই রোবট জিপিএস পয়েন্ট দিয়ে সজ্জিত, যাতে কঠিন এলাকাও যেতে পারে। রোবটটি অগভীর জল এবং সরু চ্যানেলগুলিতে চলাচল করতে পারে এবং পানিতে ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্য, প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল এবং অন্যান্য আবর্জনা সংগ্রহ করতে পারে। বর্তমানে নদীতে ও খালে এর ব্যবহার হচ্ছে। কেননা নদী ও খাল থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে প্রবেশ করে। ওয়েস্টশার্ক ইতোমধ্যেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় শহরে নদী, খাল বা বন্দর পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে দুবাই, রটারডাম, প্যারিস, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর।
ক্লিয়ারবট
ক্লিয়ারবট নামে একটি স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক বর্জ্য পরিষ্কার করার রোবট বানিয়েছে হংকং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা কিছু উদ্যোক্তা। ক্লিয়ারবট মূলত ব্যাটারিচালিত স্বায়ত্তশাসিত রোবট। যা দেখতে একটি ছোট বোটের মতো। আকারে অনেকটা ওয়েস্টশার্কের মতোই। সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ বর্জ্য, ভাসমান আবর্জনা এবং ভাসমান তেলের স্তর সরাতে এই রোবট ডিজাইন করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলা এই রোবট আবর্জনা, তেল এবং আগাছা পরিষ্কার করার সবচেয়ে সস্তা উপায়। ক্লিয়ারবট এক দিনে ১৫ লিটার পর্যন্ত তেল এবং ২০০ কেজি মতো ভাসমান আবর্জনা সংগ্রহ করতে পারে। আবার পানিতে কচুরিপানা সরাতেও এই রোবট ব্যবহার করা যায়। একবারে ১ টন কচুরিপানা অপসারণ করতে পারে। এমনকি পানির নিচে ভূখণ্ডের গভীরতাও মাপতে পারে ক্লিয়ারবট। প্রতি কিলোমিটার সমুদ্র পাড়ি দিতে এই রোবট এক সেন্টের কম খরচ বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে। এই রোবট দেখতে ছোট রিমোট কন্ট্রোল বোটের মতো। তবে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে এআই ভিশন ক্যামেরা। তা ছাড়া রোবটটির ব্যাটারি চার্জ হবে সোলার প্যানেলে। বোটে থাকা ক্যামেরা আবর্জনা শনাক্ত করতে পারে। রোবটটি প্রায় ৬৪ ধরনের পানির আবর্জনা শনাক্ত করতে পারে এবং আবর্জনার বিভিন্ন ডাটা সংগ্রহ করতে পারে। এই রোবট সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন আবর্জনা সংগ্রহ করে এবং তা ঝুড়িতে তোলে। এই কাজটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ঘটে থাকে। জনবল হ্রাস এবং কম খরচে এই সমুদ্র পরিষ্কার প্রযুক্তি অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় ৫ গুণ বেশি কাজ করতে পারে। বর্তমানে এই রোবটের বিভিন্ন ভার্সন বাজারে এনেছে উদ্ভাবকরা। একেক রোবটের কার্যকারিতা একেক রকমের।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত গুপ্তের উদ্ভাবন ক্লিয়ারবট ২০২২ সালে রোবোটিক যান স্টার্ট-আপ ক্যাপ্টেনস টেবিল প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। ২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায় সার্ফ দোকানের মালিকের সাথে সৈকতের আবর্জনা পরিষ্কার করতে গিয়ে তার মাথায় এই উদ্ভাবনী চিন্তা আসে। বর্তমানে ১০০ টির বেশি ক্লিয়ারবট সমুদ্র পরিষ্কার অভিযানে আছে। এই রোবটগুলোর দাম রাখা হয়েছে এক হাজার ডলারে মতো এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে কম ধারণার ব্যক্তিরাও এই রোবট চালাতে পারবে। বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্লিয়ারবট দল কাজ করছে।
আরও পড়ুন...