ফুলকলি

গল্প খাতুনে জান্নাত কণা ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রতিদিন ফুল কুড়াতে কুড়াতে অনেক কিছু দেখে তামজিদ। কখনো ভয় পেয়ে দূরে চলে যায়, কখনো আরও বেশি আনন্দিত হয়। সাপ ব্যাঙ খাওয়ার সময় যে শব্দ হয়, এই শব্দের সাথেও তামজিদ এভাবেই পরিচিত হয়েছে। ব্যাঙ তার শরীর ফুলাতে ফুলাতে তার স্বরে চিৎকার করতে থাকে। মাঝে মধ্যে সাপ তাই ব্যাঙকে উগলে দেয়। প্রজাপতি, ফড়িং, ফুলের ওপর মধু নিতে বসা মৌমাছি, রাতের জোনাকিদের সাথে খেলা করতে করতে গাছের সাথে, পাখির সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় তামজিদের।

গ্রামে বেড়াতে আসা ফুপাতো ভাই সাজিদ, মুগ্ধ হয়ে ফুল দেখে, নানা রকম পাখিদের মেলা দেখে, তামজিদের সাথে ফড়িং ধরতে ছুটে। তামজিদের জীবনযাপন, খেলাধুলা দারুণভাবে উপভোগ করে। মনে হয়, ভিডিও গেইম এই গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতার কাছে কোনো কিছুই না। কালোমেঘ গাছের ফুলে ফুলে অনেক মধু। মৌমাছি কেমন করে মধু সংগ্রহ করে, ফুল গাছের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে দেখেছে সাজিদ। অদ্ভুত এক শব্দ পেয়ে তামজিদকে জিজ্ঞেস করছিল, ‘কী ডাকে ওভাবে? কেমন ক্যাঁ ক্যাঁ শব্দ? কোনো পাখি কি এভাবে ডাকতে পারে?’

তামজিদ কান পেতে শুনে বলে, ‘এটা ব্যাঙের আওয়াজ। কোনো সাপ ব্যাঙ ধরেছে। এখানে আশেপাশেই সাপ আছে। চলো, ঘরে চলে যাই।’

‘আমি একটু দেখতে চাই। দেখাও না প্লিজ! দূর থেকে দেখব।’

‘ঠিক আছে। আমার সাথে এসো। কোনো শব্দ করো না।’

পা টিপে টিপে দুজনে মিলে ঝোপের কাছে গিয়ে উঁকি দেয়। কাঁটা মেহেদির ঝোঁপে একটা পাটকাঠির মতো সরু প্রায় এক হাত লম্বা একটা সাপ ঝুলে আছে। সাপের গায়ের রঙে সবুজ-হলুদ-বাদামি রঙের মিশেল। কাপড়ের ওপর ছোপ ছোপ প্রিন্ট করা থাকলে যেমন লাগে, ঠিক তেমন। মুখটা হাঁ করা। তাতে একটা ছোট্ট ব্যাঙের শরীর অর্ধেকটা ঢুকে আছে। ব্যাঙ তার শরীরটাকে যথাসাধ্য মোচড় দিয়ে বের করার চেষ্টা করছে। অনবরত গলা ফুলিয়ে শরীর বড় করতে করতে শব্দ করছে। এমন অবস্থায় অন্য কোনো প্রাণী চলে এলে সাপ অনেক সময় শিকার ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। সাজিদ এই দৃশ্য দেখে ভয়ে দুই পা পিছিয়ে এলো। তামজিদও। যদিও তামজেিদর কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়; তবুও সে সাপ দেখে ভয় পায়। বেশির ভাগ সাপই তো বিষাক্ত হয়। তাই সাবধান থাকাই ভালো। 

‘জানো সাজিদ, যখন এ রকম চনমনে রোদ ওঠে, তখনই সাপেরা বাইরে বেরিয়ে আসে। পথেঘাটে তাই দেখেশুনে চলতে হয়। নদীর পাড়ে মাটির গর্ত থেকে অর্ধেক শরীর বের করে একটা সাপ রোদ পোহাচ্ছিল। শরীরের রংটাও মাটির মতো। আমি পাশ দিয়ে হাঁটার সময় টুকরো হয়ে যাওয়া মোটা রশির মতো দেখতে সাপটার দিকে খেয়াল করি। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম এখানে এই টুকরো রশিটা কি সত্যিই রশি? মাথার দিকটা একটু মোটা কেন? উপুড় হয়ে দেখতে যেতেই স্যাঁৎ করে গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। তখন বুঝলাম ওটা একটা সাপ ছিল।’

‘কী সাংঘাতিক! ওটা তো বিষধর সাপও হতে পারে।’

‘তা তো পারেই। এখন তাই দেখেশুনে পা ফেলতে চেষ্টা করি।’

‘প্রকৃতির সাথে বসবাস করে তোমার শেখা হয়ে যাচ্ছে, কেমন করে সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। আমি এখন অনেক ফুলের নাম বলতে পারি। অনেক মাছের চেহারা দেখে বলতে পারি তাকে কী নামে ডাকতে হবে। গ্রামে এসে যা শিখেছি, বই পড়ে মনে হয় না এত ভালোভাবে শেখা হতো।’

হেসে ফেলল তামজিদ। ‘তোমরা শহরের স্কুলে যাওয়া-আসার পথেই যে সবকিছু শিখে ফেলো, আমরা তা জেনে নিতে অনেক সময় লেগে যায়, সাজিদ। কোনটা ওয়ান ওয়ে , কোনটা ফোর লেন, বাসাবাড়ির হোল্ডিং নম্বর খুঁজে নিতে পারা, এটিএম বুথ, পানির বুথ, সবকিছুর সাথে ছোটবেলা থেকেই তোমরা পরিচিত হয়ে যাও। আমাদের তো সেসব কিছু নেই। গাছপালা, ফল-ফুল আর পাখি থেকে শুরু করে প্রকৃতিতে যা কিছু আছে, তাই দেখে দেখে তাদের সাথেই আমরা বেড়ে উঠি। আজ তোমাকে নৌকা চালানো শেখাব। চলো।’

‘সত্যি বলছ? তুমি নৌকা চালাতে পারো?’

‘যেটুকু পারি, তাতে মোটামুটি কাজ চালানো যাবে। স্রােতের ভেতর হয়তো বৈঠা চালাতে পারব না। কিন্তু শান্ত নদীর পানিতে নৌকা চালিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি।’

পদ্মবীজ যে একটা মজার খাবার, এটা সাজিদের জানা ছিল না। গ্রামের একটা পুকুর থেকে তামজিদ তাকে পদ্ম তুলে দিয়েছে। বীজ কীভাবে খোসা ছাড়িয়ে খেতে হয়, শিখিয়ে দিয়েছে। শাপলা গাছের শেকড়ের সাথে যে শালুক হয়, এটা সাজিদ জানত না। কালো কালো কয়েকটা শালুক এনে তামজিদ সেদ্ধ করেছিল। খোসা ছাড়িয়ে খেতে খুব একটা খারাপ লাগেনি। ঢেপ খেতে ভারি মজা। শাপলার সাথে গোল গোল ঢেপ দেখে চটপট কয়েকটা তুলে এনেছিল ওরা। লাল আর কালো ঢেপের খুদে বীজগুলো তামজিদের বরাবরই পছন্দ। খেতে দারুণ লাগে। ওদের বাজারে তো ঢেপের খই পাওয়া যায়। খুব মজা লাগে খেতে। সাজিদ এসব কিছুর সাথে নতুন করে পরিচিত হতে থাকে। আর ভাবে, কত অজানা রে!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ