অপূর্ণ ক্ষুধা

জুলাই-গল্প জুবায়ের হুসাইন আগস্ট ২০২৬

ইফাতের ক্ষিধে কিছুতেই মিটছে না।

এখানে ও যখন ইচ্ছে, যা ইচ্ছে খেতে পারছে। অনেক সুস্বাদু আর টাটকা সব খাবার।

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে ওর?

কিছুতেই বুঝতে পারে না ইফাত হাসান খন্দকার।

তবে একটা বিষয় ওর মনের কোণে খচখচ করছে।

ইফাত যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তখন মাকে যে কথাটা বলে বেরিয়েছিল, সেটার কারণেই কি তাহলে ওর এই ক্ষিধে?

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা যাত্রাবাড়ী। এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এবং দেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

পাকিস্তান আমলে এটি একটি নির্জন ও জলাভর্তি নিভৃত পল্লি ছিল। তবে তখন থেকেই চট্টগ্রাম এবং সিলেট থেকে ঢাকায় প্রবেশের জন্য এই এলাকাটি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার রয়েছে। আর বিশেষভাবে পরিচিত তার ঐতিহ্যবাহী ইস্পাত আসবাবপত্র শিল্পের জন্য।

যাত্রাবাড়ীতে রয়েছে বিআরটিসির বাস ডিপো। ঢাকার অন্যান্য ব্যস্ত এলাকার মতো এটিও অত্যন্ত কোলাহলপূর্ণ এবং প্রায়শই যানজটপ্রবণ এলাকা।

জুলাই তথা বর্ষা বিপ্লবের সময় পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যাত্রাবাড়ীর সড়ক-মহাসড়কগুলো। রাজধানীর এই যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজলা ও শনির আখড়া এলাকায় সতেরো জুলাই বুধবার রাত থেকে শুরু করে আঠারো জুলাই দিনব্যাপী পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছোঁড়ে। আন্দোলনকারীরাও পালটা মুহুর্মুহু ইটপাটকেল ছোঁড়ে। এতে পুলিশ, সাংবাদিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষসহ অন্তত অর্ধশত আহত হয়। এমনকি গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক নিহতের ঘটনাও ঘটে।

দিনব্যাপী দফায় দফায় সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার অর্থাৎ আঠারো জুলাই সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ শনির আখড়া ও কাজলা পাড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তখনও সেখানে উত্তাপ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় জ্বলছে আগুন। কাজলা সড়কসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কোনো যানবাহন চলছে না। আন্দোলনকারীরা কাউকেই যেতে দিচ্ছে না। এমনকি রিকশা পর্যন্ত চলাচল করতে পারছে না। তবে নির্বিঘেœই অ্যাম্বুলেন্স চলতে দেখা যায়।

সন্ধ্যার পর ওই এলাকাগুলো একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর থেমে থেমে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যেতে থাকে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও কাঠে আগুন ধরিয়ে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকে। শনির আখড়ার কাজলায় হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় বৃহস্পতিবারও আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের দায়িত্বশীলরা বরাবরের মতো দাবি করে বসে যে, বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা এসব নাশকতার জন্য দায়ী। কিন্তু ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। এই আন্দোলনের সময় সবাই এক হয়ে যায়। সাধারণ ছাত্র-জনতা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ আকার ধারণ করে যে, রাত এগারোটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

এর পরদিন মানে শুক্রবার, ক্যালেন্ডারের পাতায় উনিশে জুলাই সকালে ওই তিন এলাকার অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফের উত্তাপ বিরাজ করতে থাকে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দুপুরের পর বেশ কয়েক দফায় পুলিশের সংঘর্ষ হয়।

শুক্রবার বিকেল ও রাত একটা পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশের গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। কারফিউ চলাকালীনও ওই তিন এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

আন্দোলনকারীদেরকে স্থানীয়রা ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতা শুরু করেন।

আবুল কালাম একজন বেসরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে যাত্রাবাড়ীর অবস্থা কেমন ছিল, তা কোনোভাবেই বর্ণনা করা যাবে না। নিজ চোখে এত বেশি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখেছি যে, রীতিমতো নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সব উধাও হয়ে গেছে।’

যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকার এ. কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র ইফাত হাসান খন্দকার। ষোলো বছরের এক প্রতিবাদী কিশোর। 

ওর বাবা রবিউল আমিন খন্দকার পেশায় একজন ব্যাংকার ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি স্ট্রোকে মারা যান। এরপর থেকে ইফাতকে ঘিরেই মা কামরুন নাহারের স্বপ্নগুলো ডানা মেলতে থাকে। কারণ, তিন ভাইবোনের মধ্যে ওই একমাত্র পুত্র সন্তান। আর সব মায়েদের মতো ছেলের ওপরই নির্ভরতা নিয়ে ভবিষ্যতের সোনালি দিনের অপেক্ষা করছেন তিনি।

যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকার রসুলপুরের ভাড়া বাসায় ওদের চারজনের বসবাস। আন্দোলনের শুরু থেকেই ইফাত ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্ম ছিল। সুযোগ পেলেই আন্দোলনে যোগ দিতে থাকে।

উনিশ তারিখ সন্ধ্যায় আন্দোলন থেকে বাসায় ফেরার পর ইফাত তার মায়ের কাছে রাস্তার পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলে, ‘জানো মা, আজ আমারই সামনে দুটি ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে!’

আঁতকে ওঠেন কামরুন নাহার। বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখের কথা!’ এরপর প্রায় কেঁদে ফেলেন তিনি। হয়তো তখন তার চোখের সামনে ছেলের চেহারাটা ভেসে উঠছিল এবং ভাবছিলেন, ওই দুজন ছেলের মধ্যে একজন তারই আদরের ইফাত। তিনি কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে বলেন, ‘তুমি আমার আদরের সোনা বাচ্চা। তুমি আর বাইরে যেয়ো না বাপ! তুমি ছাড়া যে আমার কিছু নেই!’

কিন্তু তাতেও তিনি ইফাতকে আন্দোলনে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেননি।

যখন কিছুতেই ইফাত আন্দোলনে যাওয়া ছাড়ছে না, তখন মা কামরুন নাহার এক কাজ করতে লাগলেন-আদরের ধন ইফাত হাসান খন্দকার যখনই বাইরে যায়, তখনই তিনি আয়াতুল কুরসি পড়ে ওর মাথায় ফুঁ দিয়ে দিতেন। হয়তো মনে মনে সান্ত¡না খুঁজতেন, আল্লাহ পাক এর উসিলায় তার বুকের মানিককে রক্ষা করবেন। কোনো আপদ-বিপদ ওর ওপর পড়বে না।

শুক্রবার দিন। মায়ের মনটা আজ খুবই বিষণœ। বুকের কোণটায় যেন চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করতে থাকলেন, সারাক্ষণ। বুধবার ও বৃহস্পতিবার ছেলেকে আন্দোলনে যেতে দিলেও আজ আর যেতে দিতে চাইলেন না। ‘তুমি আর আন্দোলনে যেয়ো না বাজান! তুমি তো জানো যে তুমিই আমার একমাত্র অবলম্বন।’

ইফাত তখন দৃঢ়তার সাথে বলল, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে অনেক বাবা-মায়ের সন্তানই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আমাদেরও যেতে হবে মা। ঘরে বসে থাকলে আন্দোলন সফল হবে না।’ একটু থেমে আবারও বলল, ‘আমরা যদি সবাই ঘরে বসে থাকি, তাহলে আন্দোলন সফল হবে না; বরং দেশ অচল হয়ে পড়বে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ছাত্র এবং শিশুসহ অনেক লোককে হত্যা করছে।’

এবার আরও মুষড়ে পড়লেন মা। অন্তরটা তীব্রভাবে হা-হা করে উঠল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। বললেন, ‘না ইফাত, আজ তুমি কিছুতেই বাইরে যাবে না। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কোনোদিন আমি তোমাকে জড়াতে দিইনি। আজও যাবে না বাবা!’

তখনকার মতো বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রইল ইফাত। এই মুহূর্তে মায়ের মনে আঘাত দিতে চাইল না।

কিন্তু ওর মনটা ছটফট করতে থাকে। আন্দোলন ওকে তীব্রভাবে টানতে থাকে।

তখন দুপুর বারোটা বাজে। ইফাত পাঞ্জাবি পরে ঘর থেকে বের হয়। পাঞ্জাবি ওর প্রিয় পোশাক। স্কুলে পড়লেও নামাজ-কালামের দিকে ওর প্রবল ঝোঁক ছিল। নিয়মিত নামাজ আদায় করত। কুরআন তেলাওয়াত করত। ছোটদের বেশ ¯েœহ করত। আর বড়দের সম্মান দিয়ে চলত। একজন আদর্শ কিশোরের প্রায় সকল গুণই ওর মধ্যে ফুটে উঠছিল ক্রমান্বয়ে।

‘মা, আমি একটু নিচে যাচ্ছি। আশেপাশেই থাকব।’ বলল ইফাত।

মা আবারও ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। ফ্যালফ্যাল করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে কোনো কথা বলতে পারলেন না।

ইফাত পড়তে পারল মায়ের মুখের ভাষা। তাই উদ্বিগ্ন মাকে রাজি করাতে মায়ের কপালে দুবার চুম্বন করল। বলল, ‘তুমি আসলে আমাকে অনেক ভালোবাসো তো, তাই তোমার এমন মনে হচ্ছে। চিন্তা করো না মা, আমি খুব বেশি দূরে যাব না, আমি শিগগিরই ফিরে আসব। ফিরে এসে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাব, ইনশাআল্লাহ।’

কিন্তু ইফাত তার কথা রাখতে পারল না। মনের ভেতরে যে তার দারুণ ঝড়! মনে মনে উচ্চারণ করে-মনের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।

ইফাত খানিকক্ষণ রাস্তায় ঘোরাঘুরি করার পর কর্তব্য স্থির করে ফেলল। সেই অনুযায়ী এগিয়ে চলল যাত্রাবাড়ীর যেখানটায় ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ করছিল, সেখানে।

সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাবের নির্বিচার গুলির মুখেও রাজপথ না ছেড়ে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা একের পর এক শাহাদাতবরণ করতে থাকে। ইফাতের পাশেই কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে সড়কেই পড়ে যাচ্ছে। এমনই এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিল। তার আর্তনাদ কিশোর ইফাত খন্দকারের কানে যায়। তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে যায় ও।

ও এগিয়ে যেতেই ওর এক বন্ধু বলে ওঠে, ‘ইফাত, ওখানে যাইস না, গেলে কিন্তু রিস্ক আছে কলাম!’

কিন্তু ইফাত তখন নির্ভয়। আহতকে সহযোগিতা করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বলল, ‘লোকটার গুলি লাগছে। ওনারে বাঁচাইতে হইব।’

এরপর গুলিবিদ্ধ সহযোদ্ধাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর সালমান হাসপাতালে পৌঁছে দেয় ইফাত। আর এতেই পুলিশের টার্গেটে পরিণত হয় ও।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আবারও সমাবেশস্থলের দিকে আসছিল ও।

ও যখন হাসপাতাল থেকে বের হয়, ঠিক তখনই পূর্বেই টার্গেট নিয়ে থাকা পুলিশ খুব কাছ থেকে ইফাতকে গুলি করে।

আহ্! কী নির্মমভাবে ছেলেটার বুকে গুলি ছুঁড়ল পাষণ্ড পুলিশটা! ট্রিগারে আঙুলের চাপ দেওয়ার সময় হৃদয়ের কোণে কোথাও একটুও কাঁপল না! চোখের সামনে ভেসে উঠল না ওরই বয়সি নিজের সন্তানের চেহারা! এ কী জিঘাংসা তার! ওপরের হুকুম তামিল করতে গিয়ে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারল মানুষরূপী পুলিশটা?

ইফাত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। একটু পর ওর বন্ধুরা ওর রক্তাক্ত দেহটা তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেল।

কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পথেই ওর রুহটা দেহত্যাগ করল।

আচ্ছা, ভাবল ইফাত। পরপর যে দুইটা গুলি করল পুলিশ, সেই শব্দ কি ওর মায়ের কানে গেছে? বড় আপুটা তো আজ বাড়িতেই আছে। মা কি তাকে গুলির বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করেছেন? তিনি কি আপুকে বলেছেন যে ওই গুলি ওর গায়ে বিদ্ধ না হয়ে মায়ের বুকে আঘাত করেছে? তিনি কি ইফাতের খোঁজ করেছেন? জিজ্ঞেস করেছেন আপুকে, ‘আমার ইফাত কোথায়? সে এখনও ফেরে না কেন?’

ইফাতের রুহটা তখন বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ও দেখতে চাইছে মায়ের অবস্থা এখন কেমন? কী করছেন তিনি? ছেলের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন কি না দেখার বড় ইচ্ছে।

এবং ও দেখল, মা সত্যিই ভীষণ পেরেশান হয়ে আদরের ইফাতকে খোঁজ করছেন। ওর কথা ভেবে উ™£ান্তের মতো এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাচ্ছেন। আগের ভাড়া বাড়ির মালিক ফোনে বড় আপুকে বললেন, ‘ইফাতকে পুলিশ গুলি করেছে। তাকে সালমান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

বড় আপুর অন্তরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো। এখনই মাকে সবটা বলা ঠিক হবে না। এমনিতেই মায়ের মনের ভেতরে ভীষণ অস্থিরতা কাজ করছে। ‘মা, ইফাতের পায়ে সামান্য আঘাত লেগেছে। ওকে সালমান হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা চেপে গিয়ে এভাবেই মাকে বিষয়টা জানাল বড় আপু।

কামরুন নাহার অশ্রুরুদ্ধ হয়ে গেলেন। করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি আমাকে সত্য কথা বলছ না। আমার মন বলছে, আমার ইফাতের কঠিন বিপদ হয়েছে।’

কথা শেষ করতে পারেন না মা, এই সময়ই ইফাতের বন্ধুরা ইফাতের লাশটা হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসে।

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ইফাত-সুন্দর ঠোঁট ও চোখের সবুজ পাখিটা।

‘তোমার আম্মুটা সত্যিই অনেক দুখী।’ বলে ওঠে তাহমিদ।

ইফাতের হাতে তখন একথোকা কালো আঙুর। পরপর কয়েকটা মুখে পুড়ে খেয়ে ফেলল। কিন্তু ওর ক্ষুধা মিটছে না কিছুতেই। বলল, ‘কিন্তু দেখো তাহমিদ, আমি এই যে এত এত ভালো ভালো সুস্বাদু খাবার খাচ্ছি, আমার ক্ষুধা কিন্তু মিটছে না। কেন এমন হচ্ছে আমার বলতে পারো?’

একটু ভাবল তাহমিদ। একটু পর চোখজোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি তোমার ক্ষুধা না মেটার কারণ। তুমি তো বাসা থেকে বের হবার সময় বলেছিলে যে, কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরবে এবং তোমার মায়ের সাথে দুপুরের খাবার খাবে। কিন্তু তুমি তো আর বাসায় ফিরে যেতে পারোনি। আর দুপুরের খাবারটাও খাওয়া হয়নি একসঙ্গে। এ কারণেই তোমার মনে হচ্ছে তুমি যতই খাও না কেন, ক্ষিধে মিটছে না।’

এবার বুঝতে পারল ইফাত তার অপূর্ণ ক্ষুধার প্রকৃত কারণ।

মায়ের জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠল।

ওড়ার জন্য ডানাজোড়া একটু নাড়াল।

তা দেখে তাহমিদ প্রশ্ন করল, ‘কোথায় যাবে এখন?’

‘মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’ জবাবে বলল ইফাত।

‘আমারও মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’ তাহমিদের চোখজোড়াও ছলছল করে উঠল।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ