নেকড়ে
গল্প ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ জুন ২০২৬
বারান্দায় বসে সন্ধ্যার ঝড়ের হাওয়া উপভোগ করছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আল আমিন ও তার ১০ বছরের নাতি অয়ন। অয়ন বইতে তুর্কি বীরদের বীরত্বগাথা পড়ছিল। হঠাৎ সে বই বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল, দাদু, নেকড়ে তো বন্য পশু!
তুর্কিদের ইতিহাসে এই ‘ধূসর নেকড়ে’ বা ‘উলফ’ নিয়ে এত মাতামাতি কেন? দাদু চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে মুচকি হাসলেন। তিনি অয়নকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, শোনো দাদুভাই, তুর্কিদের কাছে নেকড়ে শুধু একটা পশু নয়, এটা তাদের অদম্য সাহসের প্রতীক। তাদের একটা পুরোনো গল্প আছে ‘আসিনা’র গল্প। একবার এক মহাবিপদে যখন তুর্কিরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল, তখন একটি ধূসর নেকড়ে তাদের পথ দেখিয়ে দুর্গম পাহাড় পার করে এক উর্বর উপত্যকায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই তারা আবার শক্তিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
অয়ন অবাক হয়ে শুনছিল। দাদু বলতে থাকলেন, নেকড়ের কিছু বিশেষ গুণ আছে, যা একজন মানুষের জন্য, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের মানুষের জন্য খুব জরুরি। দাদু অয়নের কাঁধে হাত রেখে বুঝিয়ে বললেন, নেকড়ের জীবনদর্শন থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
একতা ও শৃঙ্খলা : একটি নেকড়ে একাকী শিকার করতে পারে না, কিন্তু যখন তারা দলবদ্ধ হয়, তখন তারা সিংহের চেয়েও ভয়ংকর। তুর্কিরা এই ‘প্যাক মেন্টালিটি’ বা দলীয় শক্তিতে বিশ্বাসী। আমাদের দেশে আমরা অনেক সময় ছোট ছোট বিষয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করি। কিন্তু যদি আমরা নেকড়ের মতো একতাবদ্ধ হতে পারি, তবে কোনো অপশক্তিই আমাদের দমাতে পারবে না।
স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা : নেকড়ে কখনো সার্কাসে খেলা দেখায় না। তারা বনের অন্য পশুর চেয়েও বেশি নিজের স্বাধীনতার মূল্য দেয়। দাদু বললেন, অয়ন, মনে রেখো, তুর্কিরা বলে নেকড়ে ক্ষুধায় মরবে তবু কারো গোলামি করবে না। এই আত্মমর্যাদাবোধই নেকড়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বিপদে পথপ্রদর্শক হওয়া : নেকড়ে যখন দলকে নিয়ে চলে, তখন সবচেয়ে অভিজ্ঞ নেকড়েটি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। তুর্কিরা বিশ্বাস করে, জাতির যখন সংকট আসে, তখন একজনকে নেকড়ের মতো নির্ভীক হয়ে পথ দেখাতে হয়।
অয়ন চিন্তিত মুখে বলল, দাদু, তাহলে কি আমাদেরও নেকড়ের মতো হতে হবে?
দাদু হাসলেন, অবশ্যই! তবে নেকড়ের হিংস্রতা নয়, নিতে হবে তার লড়াকু মানসিকতা। বাংলাদেশ এখন উন্নতির পথে হাঁটছে। আমাদের চারদিকে অনেক বাধা। তুর্কিদের নেকড়ের গল্প আমাদের শেখায়-কখনো হার না মানা। শত বিপদেও তুর্কিরা যেমন টিকে ছিল, আমাদেরও ধৈর্য ধরতে হবে।
পরিবার ও দেশকে ভালোবাসা : নেকড়ে যেমন নিজের দলের জন্য জীবন দিতে পারে, আমাদেরও দেশপ্রেম থাকতে হবে।
শৃঙ্খলার অভাব দূর করা : নেকড়েরা যেভাবে নেতার আদেশ মেনে চলে, আমাদেরও আইন ও শৃঙ্খলা মানতে হবে। দাদু অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মনে রেখো দাদুভাই, নেকড়ে বনের রাজা সিংহ নয়, কিন্তু সে কখনো খাঁচায় বন্দি থাকে না। আমাদের দেশের প্রতিটি কিশোর যদি নেকড়ের মতো সাহসী আর একতাবদ্ধ হয়, তবেই এই দেশ হবে প্রকৃত সোনার বাংলা। অয়ন জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, দূরে কোথাও একদল সাহসী নেকড়ে যেন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার নিজের মনের ভেতরটাও যেন সাহসে ভরে উঠছে।
আরও পড়ুন...