মরুভূমির শীতল জাদু

বিজ্ঞান আকাশ মাহমুদ জুলাই ২০২৬

প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে মানবসভ্যতায় অনেক বিস্ময়কর উদ্ভাবন হয়েছে। হাজার বছর আগে এক শীতল সভ্যতার সূচনা হয়েছিল ইরানে। কোনো জ্বালানি বা কৃত্রিম শক্তি ছাড়াই তারা মরুভূমির বুকে একদিকে যেমন মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা তৈরি করে বরফ জমিয়ে রাখত, অন্যদিকে ঘরকে রাখত বরফ শীতল। ইয়াকচাল এবং বাদগির এই দুটি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শীতল আবহাওয়া তৈরি করা হতো।

রেফ্রিজারেশন বা হিমায়ন পদ্ধতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ইরানে উদ্ভাবিত হয়েছিল। এটি প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠাণ্ডা রাখার প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তির সাহায্যে ছাদের ওপরে একটি টাওয়ারের মধ্য দিয়ে শীতল বায়ু ঘরের ভেতর প্রবাহিত করা হতো।

বাদগির বা উইন্ডক্যাচার হলো ইরানের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশন। আজ থেকে হাজার বছর আগে মরুভূমির তীব্র গরম থেকে বাঁচতে পারস্যের স্থপতিরা বিদ্যুৎহীন এই শীতলীকরণ ব্যবস্থা আবিষ্কার করেন।

স্থানীয় ভাষায় এর নাম ‘বাদগির’। ‘বাদগির’ শব্দের অর্থও বায়ুচক্র, বায়ুশালা বা বায়ুধরা। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বেশি কারিগরের দেখা মেলে ইয়াজদ শহরেই। উত্তপ্ত ও শুষ্ক ইরানি মালভূমির এ স্থানটি বসবাসযোগ্য হয়েছে কেবল এই বায়ুধরা প্রযুক্তির মাধ্যমে।

বাদগির তৈরি করার জন্য প্রথমে ঘরের ছাদের ওপরে উঁচু লম্বা মিনার তৈরি করা হয়। মিনারের ওপরের দিকে চারমুখে বা দুই মুখে খোলা জানালা থাকে। মিনারের ভেতর আড়াআড়ি মাটির বা কাঠের বিভাজক থাকে।

বাতাসের একটি বিশেষ ধর্ম রয়েছে। বাতাস যত উষ্ণ হবে তত হালকা হবে। ফলে খুব সহজেই ওপরের দিকে উঠে যায় উষ্ণ বাতাস। আর এ ধর্মকে কাজে লাগিয়েই বায়ুধরা প্রযুক্তি কাজ করে। 

মরুভূমির মাটির কাছাকাছি বাতাস গরম থাকলেও ওপরে বাতাস ঠাণ্ডা থাকে। মিনারটি ওপরের শীতল বাতাসকে ধরে সোজা নিচের ঘরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। একদিকে বাতাস ভেতরে ঢোকে, অন্যদিকে ঘরের গরম বাতাস ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

অনেক বাগদির ভূগর্ভস্থ পানির লাইনের সাথে যুক্ত থাকে। গরম বাতাস যখন মাটির নিচের ঠাণ্ডা পানির ওপর দিয়ে যায়, তখন তা দ্রুত শীতল হয়। এই প্রক্রিয়ায় ঘরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে প্রায় ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়।

বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বহুতল ভবন তৈরির সময় এই প্রাচীন ইরানি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাদগির বা প্রাকৃতিক এসি শীতকালে ঘর গরম রাখতে সাহায্য করত।

উদ্ভাবনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে বায়ুধরা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাতেমেহ জোমেহজাদেহ ও তার সহকর্মীরা উল্লেখ করেছেন, কাতার, বাহরাইন, মিসরের মালকাফ, পাকিস্তানের মুংসহ পৃথিবীর অনেক স্থানেই ইরানের এ বায়ুধরা প্রযুক্তি দেখা যায়।

এটি উপকারী হলেও এর ব্যবহার দিন দিন কমতে থাকে। এর পেছনে অনেক প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই টাওয়ার দিয়ে কীটপতঙ্গ প্রবেশ করে। এ ছাড়া মরুঝড় শুরু হলে মরুভূমির ধুলোবালি এসে জড়ো হয় এই টাওয়ারের টানেলে। ফলে বিষাক্ত কীটপতঙ্গের ভয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার কমে গিয়েছে। 

প্রাচীন সভ্যতার আর একটি বিস্ময়কর উদ্ভাবন ইয়াকচাল। মানুষ প্রাকৃতিকভাবে বরফ ও তুষার ব্যবহার করত খাবার ঠাণ্ডা রাখার জন্য। পারস্যে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ইয়াকচাল নামের একধরনের ঠাণ্ডা ঘরে মাটির নিচে বরফ সংরক্ষণ করা হতো। রোমানরা পর্বত থেকে বরফ এনে খাবার ও পানীয় ঠাণ্ডা রাখত বলে জানা যায়।

প্রাচীন মিসরীয়রাও রাতের বেলায় পানিকে বাষ্পীভূত করে শীতল করার কৌশল ব্যবহার করত। মধ্যযুগে বরফ সংরক্ষণের কৌশল আরও উন্নত হয়। ইউরোপে বরফঘর তৈরি করে গ্রীষ্মকালের জন্য বরফ সংরক্ষণ করা হতো। বরফ সংগ্রহ তখন একটি লাভজনক ব্যবসা ছিল। ভারত ও চীনেও মাটির নিচে বরফ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এই সময়ে লবণ ও বরফের মিশ্রণ ব্যবহার করে তাপমাত্রা কমানোর ধারণা বিকশিত হয়। 

ইয়াকচালকে বলা হয় বর্তমান রেফ্রিজারেটরের পূর্বপ্রজন্ম। রেফ্রিজারেটর আসার আগে ইয়াকচাল খাবার সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহৃত হতো। ইয়াকচালের মাটির ওপরের অংশটি দেখতে একটি বিশাল মৌচাক বা শঙ্কুর মতো। ভেতরের গরম তাপ ওপরের দিকে উঠে যেত এবং গম্বুজের একদম চূড়ায় থাকা ছিদ্র দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেত। এই প্যাসিভ কুলিং প্রক্রিয়ার কারণে ভেতরের পরিবেশ বাইরের চেয়ে সর্বদা ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি শীতল থাকত।

মাটির ওপরে গম্বুজ দেখা গেলেও, এর মূল জাদুটি ছিল মাটির নিচে। মাটির নিচে প্রায় ৫,০০০ কিউবিক মিটার আয়তনের বিশাল একটি কক্ষ বা খাদ খনন করা হতো। ভূগর্ভস্থ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম ও স্থিতিশীল থাকে বলে সেখানে রাখা বরফ ও খাবার দীর্ঘ ৯-১০ মাস পর্যন্ত গলে না গিয়ে ঠিক থাকত।

ইয়াকচালের দেওয়ালগুলো সাধারণ মাটির ছিল না। এগুলো তৈরি হতো বালি, কাদা, চুনের পাশাপাশি ডিমের সাদা অংশ, ছাগলের লোম এবং ছাইয়ের এক বিশেষ মিশ্রণ দিয়ে যাকে বলা হতো ‘সারুজ’। এই প্লাস্টারটি সম্পূর্ণ তাপ-নিরোধক এবং জল-নিরোধক ছিল। দেওয়ালগুলো গোড়ার দিকে প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত পুরু হতো, যা মরুভূমির ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র তাপপ্রবাহকে ভেতরে ঢুকতেই দিত না।

অনেক ইয়াকচালের সাথে লম্বা মিনার বা ‘বাদগির’ যুক্ত থাকত। এই মিনারগুলো মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সামান্য বাতাসকেও টেনে এনে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে ইয়াকচালের একদম নিচের অংশে পাঠিয়ে দিত। এটি ভেতরের বাতাসকে ক্রমাগত সঞ্চালিত করে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি রাখতে সাহায্য করত।

ইয়াকচালগুলো প্রাচীন পারস্যের ভূগর্ভস্থ পানির লাইনের সাথে যুক্ত থাকত। এই লাইন থেকে আসা পানি ইয়াকচালের পাশে থাকা অগভীর পুখুরে রাখা হতো এবং উঁচু দেওয়াল দিয়ে সূর্যকে আড়াল করে রাখা হতো। মরুভূমিতে শীতকালের রাতে তাপমাত্রা যখন মাইনাসে নেমে যেত, তখন এই পানি প্রাকৃতিকভাবেই জমে বরফ হয়ে যেত। সকাল হতেই সেই বরফ কেটে মূল কক্ষে এনে জমা করা হতো।

বর্তমানে বৈশি^ক উষ্ণায়নের যুগে প্রাচীন পারস্যের এই প্রযুক্তি দুটি আমাদের অনেক বিষয়ে সচেতন করে। আধুনিক সভ্যতার রেফ্রিজারেটর এবং এয়ার কন্ডিশন থেকে নির্গত সিএফসি বা গ্রিনহাউস গ্যাস যখন পৃথিবীর ওজোন স্তরকে ধ্বংস করছে, তখন ২৪০০ বছর আগের ‘ইয়াকচাল’ এবং ‘বাদগির’ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সাথে মিশে প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়ে কোনো ক্ষতি ছাড়াই জীবনধারণ করা যায়।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ