মা, আমি যাচ্ছি
জুলাই-গল্প কামাল হোসাইন জুলাই ২০২৬
রাজধানী ঢাকার চানখাঁরপুলের সেই সকালটা অন্য সব দিনের মতো ছিল না। সেদিনও সকালে রোদ উঠেছিল, কিন্তু সূর্যের সেই আলোটা যেন ঠিকমতো চারদিকে ছড়াচ্ছিল না। ঝিমধরা শহরটা যেন নিজের ভেতরে এক অজানা খবর চেপে রেখে নিঃশব্দে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার অপেক্ষা করছিল। রাস্তায় কিছু মানুষের চলাফেরা ছিল ঠিকই, কিন্তু তা যে স্বাভাবিক ছিল, সেটা মোটেও বলা যাবে না। সবার চোখেই ছিল প্রশ্নের ঝলকানি, মুখে ছিল চাপা উত্তেজনা। ফিসফিসে কণ্ঠ।
গেন্ডারিয়ার একটি ছোট ঘর। সেখানকার একটা ঘরের টেবিলে রাখা ছিল একটা সাদা কাগজ।
কাগজে লেখা, ‘মা, আমি যাচ্ছি...’
এই কয়েকটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক কিশোরের সমস্ত দ্বিধা, ভালোবাসা, ভয় আর অদ্ভুত এক দৃঢ়তার ছাপ।
ছেলেটার নাম আনাস। পুরো নাম শাহরিয়ার খান আনাস। বয়স মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস। এই বয়সে ছেলেরা সাধারণত তার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। নতুন নতুন ভাবনার জগতে ভেসে বেড়ায়।
আনাসও তেমনি স্বপ্ন দেখত। তার সব সময়ের ইচ্ছে ছিল, সে বড় হয়ে একজন মস্তবড় ইঞ্জিনিয়ার হবে।
তাই তার অঙ্ক খাতার পাতায় প্রায়ই আঁকা থাকত ছোট ছোট নকশা-সেতু, বিল্ডিং, যন্ত্র আর অদ্ভুত সব কাঠামো। সে বিশ্বাস করত, একদিন সে এমন কিছু বানাবে, যেটা মানুষের কাজে লাগবে।
কিন্তু সেদিনের সেই সকালটা ছিল অন্যরকম। ঘরের সবাই তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
তখন আনাস নিঃশব্দে ঘুম না হওয়া রাত পার করে আড়মোড়া ছেড়ে বিছানায় উঠে বসে।
টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। একটা খাতা টেনে নেয়। সেই খাতারই একটা পৃষ্ঠা অতি যতেœ ছিঁড়ে নেয় সে।
লেখার কলমটা হাতে নিয়েও সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে।
আসলে কিছু কথা থাকে, যে কথাগুলো মুখে বলা যায় না। কেবল লেখা যায়।
আবার কিছু কথা এমনও আছে, যেগুলো লিখতে শুরু করলে মনে হয়-এর জন্য ভাষাটা যথেষ্ট নয়।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সে লিখতে শুরু করে-‘মা...’
এই একটি শব্দ লিখতেই তার হাত কেঁপে ওঠে। কেমন যেন নিঃসাড় হয়ে আসে হাত। থেমেও যায় কিছু সময়ের জন্য।
এই ‘মা’ শব্দের ভেতরেই যেন লুকিয়ে রয়েছে তার পুরো পৃথিবী। যেখানে মিষ্টি শাসন, ¯েœহ, ভয়, আশ্রয়-সবকিছু লুকোচুরি খেলে।
মা অন্য ঘরে ঘুমালেও মনের আয়নায় আনাসের মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। সেই ভেসে ওঠা মুখ তাকে কখনো বকা দিচ্ছেন, কখনো খেতে ডাকছেন, কখনো মাথায় হাত রেখে আদর করে বলছেন, ‘একজন ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবি বাবা। তুই সেই কাজ করবি, যে কাজে মানুষের উপকার হয়।’
কিন্তু আজ সে এমন একটা কাজে পা বাড়াতে যাচ্ছে, যেটা মায়ের কাছে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সামনাসামনি বলাও সম্ভব নয়।
তাই সে তার মনের অব্যক্ত কথা লিখে যেতে চায়। লিখতে শুরু করে।
এক লাইন, দুই লাইন...
ধীরে ধীরে তার মনের ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা কাগজে শব্দ হয়ে নেমে আসে তরতর করে।
‘আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না...’
‘সরি আব্বুজান...’
এই ছোট্ট ছোট্ট অথচ তীক্ষè শব্দগুলো লিখতে গিয়ে তার বুকের ভেতরটায় কাঁপন ধরে যায়।
কারণ, আনাস বুঝতে পারছে-সে বাবা-মায়ের অবাধ্য হতে যাচ্ছে।
তবুও সে থামে না। কারণ, তার ভেতরে আরেকটা কণ্ঠ জেগে উঠেছে-যে কণ্ঠ তাকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে মৃত মানুষের মতো বসে থাকতে দিচ্ছে না। সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। আর কেবলই ভর্ৎসনা করে চলেছে।
আর তাই চিঠির প্রতিটা লাইনে জমে ওঠে তার ভেতরের টানাপোড়েন। মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসা, আর সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তাকে তাড়িয়ে ফিরছে প্রতিনিয়ত। যদিও আছে নানারকম ভয়। তার পাশাপাশি দুর্বার সাহসও। ঘরের নিরাপত্তা আর বাইরের অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে নিয়তই।
চিঠির শেষের দিকে এসে আনাস লেখে-‘আমি যদি বেঁচে না ফিরি, তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো।’
এই লাইনটা লিখে সে খাতার পাতার দিকে অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তখন দুফোঁটা অশ্রু টুপ করে গড়িয়ে পড়েছিল কি না, কে জানে!
কষ্ট আর গর্ব-দুটিই সম্পূর্ণ আলাদা অনুভূতি। তবুও সে চায়-তার মা যেন শুধু হারানোর কষ্টে ডুবে না থাকেন। বরং পরের পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে যেন তিনি গর্ব করতে পারেন।
চিঠিটা টেবিলে একটা গ্লাস দিয়ে চাপিয়ে রেখে সে মায়ের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একবার পেছনে তাকায়। ঘরের দরজাটা সামান্য ফাঁক করে মায়ের ঘুমন্ত মুখটা একবার দেখে নেয়।
বাইরে পা ফেলার আগে এই ঘর, এই দেওয়াল, এই চেনা জীবন; সবকিছু যেন তাকে ডেকে বলছে-‘থেমে যাও আনাস। এত সাহস দেখিও না। সামনে তোমার অনেক বিপদ অপেক্ষা করছে।’
কিন্তু কেউ তাকে আটকায় না। আটকাতে পারে না। সে চুপচাপ বের হয়ে যায় তার প্রিয় ঘর থেকে। প্রিয় স্নেহময়ী মায়ের কাছ থেকে। প্রিয় বাবার কাছ থেকে।
বাইরের পৃথিবী তখন অন্যরকম। রাস্তায় প্রতিবাদী মানুষের ভিড় বাড়ছে। স্লোগান উঠছে এদিক-সেদিক। সকল অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তি পেতে সবাই মুখিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া বুঝি আর কোনো অপশন নেই। যেখানে বলা হয়-‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’-সেখানে আর কোনো পিছুটান থাকে না। সকল বাঁধন ছিন্নভিন্ন করে ছিঁড়ে ফেলতে মুক্তিকামী মানুষের ঢল নেমেছে ঢাকার রাস্তায়।
তার মতো ঘর থেকে বের হয়ে আসা মানুষের কারও চোখে আগুন, কারও কণ্ঠে তীব্রতা, কারও মুখে অদ্ভুত নীরবতার প্রলেপ লেপ্টে রয়েছে।
আনাস সেই ভিড়ের ভেতর মিশে যায়। এখন সে আর কেবল একজন ছাত্র না। সে একটা বৃহত্তর স্রােতের অংশ।
তবুও তার ভেতরে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয়-‘আমি কি ঠিক করছি?’
এই প্রশ্নের পাশাপাশি উত্তরটাও যেন তৈরি থাকে। বলে-‘এই অবস্থায় তুমি কেন চুপ করে বসে থাকবে?’
এই দুই কণ্ঠের টানাপোড়েন পাশ কাটিয়ে দৃপ্তপায়ে সে সামনে এগোতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে চানখাঁরপুলের কাছে এলে মানুষের ভিড় আরও বেড়ে যায়। চারদিক থেকে লোক আসছে। চারপাশে চাপা উত্তেজনা। নানান কথার গুনগুনানি। মানুষের কণ্ঠে তীব্রতার আগুন। চোখে অস্থিরতার ছাপ। পায়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
চারপাশে ভয়। আতঙ্ক। তবু কারোই পিছু হটবার যেন উপায় নেই। সামনে এগিয়ে যাওয়াই যেন অমোঘ নিয়ম হয়ে গেছে আজকের জন্য।
হঠাৎ...
একটা তীব্র শব্দ।
তারপর আরেকটা।
চারপাশের সকল ছন্দ যেন মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মানুষ দিগি¦দিকশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করে। কেউ চিৎকার করছে, কেউ রাস্তায় পা হড়কে পড়ে যাচ্ছে। কেউ আহত বন্ধুকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও কিছু সময় যেন অতি ধীরলয়ে চলে। আনাসের বুকের ভেতরে চলা সময়ের ঘড়িটার টিকটিক শব্দটাও চলতে চলতে হঠাৎ করে থেমে যায়।
সে যেন তখন আর চানখাঁরপুলের পিচঢালা সেই রাস্তায় নেই। সে ফিরে যায় তার প্রিয় গেন্ডারিয়ার সেই ছোট্ট ঘরে। যেখানে রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে তার মা তাকে অনবরত ডেকে চলেছেন-‘আনাস খেতে আয় বাপ, দেরি করিস না বাছা আমার।’
মায়ের ডাকে আনাস উত্তর দিতে চায়-‘আসছি মা...’
কিন্তু শব্দটা তার কণ্ঠ থেকে আর বের হতে পারে না। দলা পাকিয়ে যায় গলার ভেতরেই। চোখের ভেতরে লাখো জোনাকির আলো হঠাৎ চিকচিক করে ওঠে।
আর বিকেলের আলোটা তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে।
আর গেন্ডারিয়ার সেই ছোট্ট ঘরে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা।
ঘরের দরজাটা আধখোলা। ভেতরে কেউ কোনো কথা বলছে না। টেবিলের ওপর ভাঁজ করে রাখা কাগজটার ওপর হঠাৎ চোখ পড়ে মায়ের।
মা ধীরে ধীরে সেটি হাতে তুলে নেন। ভাঁজ করা কাগজটা খুলতে গিয়ে তার সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে।
কাগজটায় লেখা প্রথম শব্দ-‘মা...’
এই এক শব্দেই তার বুক ভেঙে যায়। তবু মা পড়তে থাকেন। চিঠির প্রতিটা লাইন যেন কাগজ থেকে উঠে এসে তার হৃদয়ের গভীরে বিদ্ধ হচ্ছে নীরব এক শেলের মতো।
‘আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না...’
‘সরি...’
‘আমি যদি বেঁচে না ফিরি...’
মায়ের চোখের পানি তার দৃষ্টিটাকে ঝাপসা করে দেয়।
তবুও মা চিঠিটা শেষ পর্যন্ত পড়েন। শেষ লাইনে এসে থামেন-‘কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো...’
চিঠি পড়া শেষ করে মা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। কিছুই বলতে পারেন না। বোবা হয়ে গেছেন তিনি। যেন কাঁদতেও ভুলে গেছেন।
কষ্ট আর গর্ব-এই দুই অনুভূতি কি একসঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে?
তারপর ধীরে ধীরে মা চিঠিটা তার বুকের কাছে টেনে নেন। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করেন-‘তুই তো শুধু আমার ছেলে না... তুই আমার ভেতরে রেখে যাওয়া এক টুকরো আলোর ফুলকি রে বাবা!’
এটুকু বলে এই প্রথম হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
একসময় শহরটা ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। রাস্তাঘাট আবার মানুষের পদভারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
আশপাশের দোকান খোলে। চারদিকের কোলাহলময় শব্দ ফিরে আসে। দিন গড়িয়ে রাত নামে।
কিন্তু কিছু গল্প থেকে যায় নীরবে-নিভৃতে।
আরও পড়ুন...