লুকানো রহস্য
গল্প জুবায়ের হুসাইন মার্চ ২০২৬
কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলটা। এই নিয়ে টানা তিন দিন তিনটা বল নিখোঁজ হলো। নিখোঁজ বলার কারণ-সবাই দেখছে বলটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পড়ছে, অথচ সাথে সাথে সেখানে গিয়ে আর পাওয়া যাচ্ছে না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে!
ছেলেদের মধ্যে একটা উত্তেজনার ভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিষয়টা নিয়ে।
কেউ কেউ তো ভয়ই পাচ্ছে!
আগে অন্য একটা মাঠে খেলত ওরা। কিন্তু ওখানকার জমি প্লট আকারে বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর ইতোমধ্যে কয়েকটা বাড়ির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। ফলে ওটা আর খেলার উপযুক্ত নেই। আর তা ছাড়া যারা ওই প্লটগুলো কিনেছে, তারাও চাইছে না ছেলেরা ওখানে খেলুক।
আভাসে ইঙ্গিতে সেটা বোঝাবার চেষ্টাও করেছে।
তাই এই মাঠটা বেছে নিয়েছে।
এটাকে ঠিক মাঠ বলা ঠিক হবে না। কারণ, মাঠের মাঝে এখানে-ওখানে কোথাও লম্বা গাছ বা কোথাও ভাঙা ইটের স্তূপ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় ভাঙা একটা একতলা বিল্ডিং আছে। বিল্ডিংটার তিন পাশে তিনটে ঝোপফালো বৃদ্ধ গাছ যেন ওটাকে ঘিরে রেখেছে। গাছের ডালপালাগুলো বিল্ডিংয়ের টিনের চালের ওপর একপ্রকার শুয়ে আছে বলা যায়। সে কারণে ডালের চাপে কোথাও কোথাও টিন নিচের দিকে দেবে গেছে বা ফুটো হয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে।
বিল্ডিংটা একসময় রাইস মিল হিসেবে ব্যবহার হতো। আশেপাশে অটো রাইস মিল গড়ে ওঠায় ম্যানুয়াল এই রাইস মিলটা টিকতে পারেনি। চকচকে সাদা ঝরঝরে চালের ভাত খাওয়ায় অভ্যস্ত মানুষ এখন আর ম্যানুয়াল রাইস মিলের ভাঙানো মোটা চাল খেতে চায় না। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মিলটা।
তবে একসময় এই মিলটা অত্র এলাকাসহ আশপাশের আরও চার-পাঁচটা গ্রামের কৃষকের উৎপাদিত ধানগুলো চাল বানানোর কাজে ব্যবহৃত হতো।
আহ্! কী সুন্দর দিনগুলো ছিল তখন!
দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা মাঝ পর্যায়ে এসেছিল। একশ একুশ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে তখন ইমরানের দল। সাত রানের ব্যবধানে পরপর তিনটি উইকেট হারিয়ে বেশ চাপে পড়ে যায় ইমরানের দল। ফলে বাধ্য হয়েই ব্যাটিংয়ে নামতে হয় দলনেতা ইমরানকে। ইমরান মূলত বোলিং করে থাকে। তবে মাঝে মাঝে ব্যাটিংও বেশ করে। চাপের মুহূর্তে দলের হাল ধরতে অভ্যস্ত ও। অন্য পাড়ার সাথে খেলতে গেলে এইসব মুহূর্তে তাকেই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়।
কিন্তু আজ ব্যাট হাতে নেমেও দলকে প্রায় হতাশ করল ইমরান। পরপর চারটি বল ডট খেলল।
আবির আউট হয়েছিল ওভারের প্রথম বলে। এরপর চারটি বল খেলল ইমরান।
ওভারের শেষ বলটি করতে এগিয়ে আসছে আবির।
প্রস্তুত ইমরান।
সজোরে ব্যাট হাঁকালো ও। বলটা শূন্যে ভেসে গিয়ে পড়ল দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ওই গাছপালার ভেতরে।
দৌড়ে বল আনতে গেল ফিল্ডার হুসাম।
আমগাছের ঝুলে পড়া ডাল বেয়ে উঠে গেল হুসাম। বলটা ঠিক ওই ওখানে পড়েছে। স্পষ্ট দেখেছে ও।
মাঠের মধ্যে ঝকঝকে পরিষ্কার আলো থাকলেও এখানটাতে আলো-অন্ধকারের একটা আবহ তৈরি হয়ে আছে। তাই সাহস করে বল কুড়াতে এলেও বুকের মধ্যে হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল ওর। ভেতরটায় কেমন একটা ভূতুড়ে পরিবেশ লক্ষ করল ও।
জং ধরা ভাঙা টিনের চালার ওপরে গাছের শুকনো ডালপাতা পড়ে জমে আছে কোথাও কোথাও। তেমনি একটা স্তূপের ওপর হুসামের পা পড়ল। পায়ের নিচে মচ্ মচ্ করে ভাঙল সেগুলো। অজান্তেই চমকে উঠল ও। বুকের ভেতরটায় আবারও ছ্যাঁত করে উঠল।
হুসামের বল নিয়ে ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে এবার এগিয়ে গেল আরমান। আরমান ফিল্ডিং দলের ক্যাপটেন।
নাহ, বলটা পাওয়া গেল না। আজ আর কোনো এক্সট্রা বলও আনেনি ওরা। চাঁদা ওঠেনি বলে কিনতে পারেনি।
একটু পর মাঠের একপাশে আসরের নামাজে দাঁড়াল সবাই। সময়মতো নামাজ আদায় করা ওরা ওদের ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে।
শীতের আমেজ শুরু হয়ে গেছে সবখানে। তাই আসরের নামাজও এগিয়ে এসেছে। এজন্য আসরের পর মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত বেশি সময় পাওয়া যায় না।
সিদ্ধান্ত হলো, আজ আর খেলবে না ওরা। সকাল সকাল বাড়ি ফিরবে। ফলে মায়ের বকা শুনতে হবে না।
সবাই চলে গেলেও ইমরান ও হুসাম রয়ে গেল। ওরা দেখতে চায় বলগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কী আছে ওই ভাঙা রাইস মিলের মধ্যে। কোনো রহস্য থাকলে আজই সেটা বের করতে হবে।
‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বলে ওরা এগিয়ে চলল বিল্ডিংটার দিকে। হুসাম জানে, যেকোনো ভালো কাজের শুরুতে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত। এই আমলের মাধ্যমে কাজে বরকত, রহমত ও নিরাপত্তা আসে এবং কাজ সুন্দরভাবে শেষ হয়।
ভূতুড়ে বাড়িটা যেন ওদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যেন অদৃশ্য থেকে কেউ ডেকে বলছে, ‘এসো, এসো সাহসী কিশোররা! আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কতদিন ধরে ডাকছি তোমাদের! কিন্তু আমার কাছে তো কেউ আসছ না। এসো বীরেরা! উদ্ঘাটন করো এই লুকানো রহস্যের।’
ইমরান ও হুসামের যে ভয় করছে না, তা কিন্তু নয়। ভেতরে ভেতরে ভয়ে চুপসে যাচ্ছে ওরা যতই নিকটে চলে যাচ্ছে।
ঝোঁপালো গাছপালার ওপর দিয়ে কিছু কি উড়ে গেল ডানা ঝাপটে? ওগুলোর রং কি সাদা? ভয় দেখাতে চাইছে ওদের? কোনো লুকানো রহস্য সত্যিই আছে ওখানে? নিজের মনেই উদয় হলো প্রশ্নগুলো হুসামের।
ইমরান আরও বেশি ভয় পাচ্ছে। ভূত-প্রেতে ওর দারুণ ভয়! ইচ্ছে করছে পেছন ফিরে এক দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু প্রাণের বন্ধুকে একা ফেলে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। আর তা ছাড়া ও-ও দেখতে চায় বলগুলো কোথায় হারিয়ে যায়! কী আছে ওই ভাঙা-পরিত্যক্ত রাইস মিলের মধ্যে। ওটা নিয়ে লোকেদের মুখে মুখে যে গল্পটা প্রচলিত আছে, সেটার একটা সমাধান হওয়াও প্রয়োজন। আর তাতে যদি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে, তাহলে তো বেশ ভালোই হয়।
বুড়ো আমগাছটার সমস্ত গায়ে ছ্যাতলা পড়ে শুকিয়ে আছে। কোথাও বা সবুজ পরগাছারা বাসা বেঁধেছে। ধ্যারা নামেই এলাকার লোকজন চেনে ওগুলোকে।
বিল্ডিংটা ঘুরে দক্ষিণ পাশে চলে এলো ওরা। এপাশ থেকে রাইস মিলের পলেস্তারা খসা ইটের গাঁথুনি দেখা যায়। যেন ময়লাপড়া লাল দাঁত বের করে ভীষণ কষ্টের হাসি হাসছে। নোংরা-ময়লা আর অবহেলায় পড়ে থাকা অবস্থা থেকে উদ্ধারের করুণ আর্তি জানাচ্ছে।
হুসাম শুনেছে-রাইস মিলের মালিক চেষ্টা করেছিলেন টিনের ছাউনি দেওয়া একতলা বিল্ডিংটা ভেঙে ফেলে নতুন করে কয়েকটা কামরার একটা ঘর তুলবেন। ছাত্রদের মেস হিসেবে ভাড়া দেবেন। কিন্তু কী এক রহস্যময় কারণে কাজ শুরু করেও বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপর থেকে এই এলাকায় তাকে আর দেখা যায়নি। সবাই বলে, তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন। রাইস মিল ভাঙতে গিয়ে তার সাথে এমন কিছু ঘটেছে যে, তিনি পাগল হয়ে গেছেন। গ্রামের জামতলায় ছনের ছাউনি দেওয়া মাটির দেয়ালের একটি বাড়িতে থাকতেন তিনি পরিবার নিয়ে। কিন্তু ওই ঘটনার পরদিন তাকে বা তার পরিবারের কাউকে আর এ তল্লাটে দেখা যায়নি।
সেই থেকে ওটা নিয়ে বিভিন্ন গল্প মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তাই দিনের বেলায়ও এর ধারেকাছে আসতে চায় না।
কেউ কেউ বলে, টিনের চালার নিচে ভূতেরা বাসা বেঁধেছে। আর সন্ধ্যার পর গাছের ডালে এবং টিনের ওপরে পেত্নীরা নাচানাচি করে। তাদের নাকি সুরের গানও শুনেছে অনেকে।
এ সবই লোকমুখে শোনা। কেউ স্বচক্ষে দেখেছে বা শুনেছে-এমন কাউকে পাওয়া যায় না। সবাই-ই কারো না কারোর মুখে শুনেছে।
ভেতরে ঢোকার দরোজাটা এ পাশেই। কাঠের তৈরি দরোজার পাল্লাটা হেলে পড়ে আছে একপাশে। তবে ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই। জঞ্জাল আর নানান আগাছায় ঢেকে গেছে মুখটা।
সাবধানে পা ফেলে দরোজার সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। খুঁজতে থাকল ভেতরে ঢোকার পথ। এ পথে যে ঢোকা যাবে না তা বুঝে ফেলেছে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল। দরোজার ঠিক ডান পাশেই দেয়াল ভেঙে গিয়ে একটা গোল পথ তৈরি হয়েছে। যদিও ওটার মুখও ঢেকে গেলে জঞ্জাল আর লতাপাতা গাছে।
‘এসো ইমরান।’ বলে আগে পা বাড়াল হুসাম।
‘সত্যিই ঢুকবে ভেতরে!’ ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল ইমরান।
এ পাশটায় এই মুহূর্তে বেশ অন্ধকার। যদিও সন্ধ্যা নামতে এখনও কিছু সময় বাকি আছে।
হুসাম কিন্তু বলতে চাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে কী যেন একটা ওর কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল। তার ডানার ঝাপটাও যেন লাগল কানের লতিতে। মৃদু বাতাসও ছুঁয়ে দিলো মাথার এ পাশটাতে।
দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। বোঝায় যাচ্ছে ইমরান ভয় পাচ্ছে। তাই ও-ও যদি ঘাবড়ে যায়, তাহলে অপারেশনটাই মাঠে মারা যাবে।
‘আমরা তো ভেতরে ঢুকব বলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি, তাই না!’ বলল হুসাম।
‘এদিকটায় বেশ অন্ধকার!’ ভয় কিছুটা কমলেও মনের কোনায় কোথায় যেন বাধা পাচ্ছে ইমরান। ‘একটা টর্চ থাকলে ভালো হতো।’
‘তা তুমি ঠিকই বলেছ।’ বলল হুসাম। ‘তবে আমরা এই মুহূর্তে টর্চ কোথায় পাবো? কাজেই ওটা ছাড়াই আমাদেরকে সামনে এগোতে হবে।’
অগত্যা কী আর করা! বন্ধুর পিছু পিছু নিজেও ভাঙা দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
হুসাম কোত্থেকে একটা শক্ত ডাল জোগাড় করে তা দিয়ে আগাছা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। পেছনে প্রবেশ করল ইমরানও।
ভেতরটা কেমন স্যাঁতসেঁতে! শুকনো পচা ডালপাতা আর নানান আবর্জনায় সয়লাব হয়ে আছে।
পচা একটা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে ভেতরে। প্রথমটায় দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল ওদের। কয়েকবার করে দম আটকে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়ায় অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো।
তারপরও অস্বস্তিকর একটা ভাব রয়েই গেল। তবে রহস্য উদ্ঘাটনের তীব্র আকাক্সক্ষা থাকায় সেটা বেশি প্রকাশিত হলো না।
‘আমরা আসলে কী খুঁজতে এসেছি এখানে?’ কথা বলতেও যেন ভয় পাচ্ছে, গলাটা একেবারে খাদে নামিয়ে জানতে চাইল ইমরান।
বন্ধুর দিকে তাকাল হুসাম। মুচকি একটা হাসি উপহার দিয়ে বলল, ‘যদিও আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া বলের খোঁজে এসেছি, তারপরও মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই পরিত্যক্ত রাইস মিলের মধ্যে লুকানো রহস্য সমাধান।’
‘তুমি তো একেবারে গোয়েন্দাদের ভাষায় কথা বলছ!’
‘আমরা তো এই মুহূর্তে গোয়েন্দাই, নাকি বলো?’
হাসল ইমরান। কিন্তু বেশি ফুটল না।
জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি মাকড়সার জাল আর ধুলোয় ঢাকা ভেতরটা। উত্তর-দক্ষিণ লম্বালম্বি ঘরের এখানে-ওখানে শেষ বিকেলের নরোম রোদ এসে পড়ছে টিনের ফুটো দিয়ে। তাতে আরও ভূতুড়ে করে তুলেছে। গা ছমছম তো করবেই!
ইমরান প্রায় হুসামের গাঘেঁষে রয়েছে। ওর গরম নিঃশ্বাস হুসামের ঘাড়ে উষ্ণ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে হুসামও ভয় পাচ্ছে, কিন্তু সেটা প্রকাশ হতে দিচ্ছে না। দুজনের অন্তত একজনকে তো স্বাভাবিক থাকতে হবে!
দুই জোড়া চোখ চারপাশটা ঘুরে দেখছে। অজানা কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।
দু-হাত দিয়ে ঝুল সরিয়ে সোজা এগোলো হুসাম। পায়ে পায়ে এগোলো ইমরান।
দ্রুত কাজ সারতে হবে। কারণ, একটু পর সন্ধ্যা নামলে সমস্ত ঘর তখন অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। আর অন্ধকারের ভেতরে রহস্য খোঁজা মানে না দেখে গর্তে পা ফেলার মতো।
ইমরানের পায়ের ওপর দিয়ে একটা ইঁদুর দৌড়ে পালাল। আরেকটু হলে হুসামকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই দিচ্ছিল। পরপর দুটো হার্টবিট মিস করল ওর হৃৎপিণ্ডটা।
এক জায়গায় মেঝের শান ওঠানো, সেখানে কিছু লতাগুল্ম জন্মেছে। অসাবধানে তাতে নাড়া লাগতেই ঝুরঝুর করে ভাঙা টিনের টুকরো আর ময়লা-আবর্জনা এসে পড়ল ছেলেদের গায়ে। হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে আরও বেশি জড়িয়ে ফেলল গায়ের পোশাকে। নোংরা লেগে কালচে রং ধারণ করল মুহূর্তে।
বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল ইমরান। এই মুহূর্তে হুসামের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে। ওর কারণেই এটা হলো!
অদ্ভুত একটা ডাক শুনে চমকে উঠল দুজনেই। নাম না জানা কোনো পাখির ডাক হবে হয়তো। পাখিটা আরও দুই তিনবার ডাকল। তবে প্রথমবারের মতো আর ভয় পেল না ওরা।
এক কোনায় স্তূপাকারে কিছু পড়ে থাকতে দেখা গেল। হাতের লাঠিটা দিয়ে নেড়েচেড়ে বুঝল, ওগুলো চাউলের কুড়া। তবে এখন ধূসর ছাইয়ের রং ধারণ করেছে। চাকা ঘোরানোর ফিতেও পড়ে আছে তার পাশে।
এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অন্যান্য যন্ত্রাংশগুলো।
উত্তর-পূর্ব কোনার পূর্ব পাশের দেয়ালে একটা কাঠের বাক্স দেখা গেল। বাড়িতে কবুতর পোষার জন্য যে খোপ বানানো হয়, তার চেয়ে কিছুটা বড় আকৃতির চারটি খোপ আছে বাক্সে। বাক্সের ঠিক ওপরের টিনের ফুটো দিয়ে পরপর দুটো কবুতর উড়ে এসে ঢুকে গেল একটা খোপে। কয়েকটা বাচ্চা কিচিরমিচির করে ডেকে উঠল। মা-বাবার মুখ থেকে আধার গ্রহণের জন্য শুরু হলো উল্লাসের উৎসব।
জিল্লুদের কবুতর এদিকে উড়ে এসে হারিয়ে যাবার রহস্য পরিষ্কার হলো এবার। হুসাম বিষয়টা বুঝিয়ে বলল ইমরানকে।
নির্মল একটা হাসি উপহার দিলো ইমরান। বোঝা যাচ্ছে, ভয় কেটে যাচ্ছে ওর মনের মধ্য থেকে।
খুশি হলো হুসাম।
রাইস মিলের ঠিক পশ্চিম কোনায় একটা হলার এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে জং ধরে কয়েক জায়গায় ভেঙেও গেছে। কী মনে করে ওটার দিকেই এগিয়ে গেল হুসাম।
চারপাশটা দুই চক্কর দিলো ও। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল। তীক্ষè দৃষ্টিতে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ওপর দিকে তাকিয়ে দেখল, ঠিক হলার বরাবর ওপরে টিনের চালা ইয়া বড় এক ফুটো তৈরি করেছে। ভাঙা টিনের অবশিষ্টটুকু নিচের দিকে ঝুলে আছে, বড় এক ফানেলের রূপ নিয়ে।
ওদিকে টানা প্রায় পঞ্চাশ সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল হুসাম। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘পেয়ে গেছি বোধ হয় লুকানো রহস্যের সমাধান!’ অস্ফুটে বলে ইমরানের পিঠে জোরে একটা চাপড় বসিয়ে দিলো।
‘আঁউ করে’ ব্যথায় ককিয়ে উঠল ইমরান।
বুঝতে পেরে মাফ চাইল হুসাম, ‘সরি ইমরান, অতিরিক্ত উত্তেজনায় একটু জোরে হয়ে গেছে।’
‘কিন্তু কোথায় তোমার লুকানো রহস্যের সমাধান?’ সেদিকে কান না দিয়ে জানতে চাইল ইমরান।
জবাবে ইমরানকে হলারের গাঘেঁষে দুই হাতের কনুই ও হাঁটুর উপর ভর দিয়ে ঘোড়া হতে বলল হুসাম।
ফ্যালফ্যাল করে হুসামের দিকে তাকিয়ে রইল ইমরান।
হুসাম বলল, ‘তুমি না লুকানো রহস্যের সমাধান দেখতে চাও? সেটা পরীক্ষা করার জন্যই তোমাকে ঘোড়া হতে বলছি।’
এবার আর সময় নষ্ট করল না ইমরান। হুসামের কথামতো হলারের গাঘেঁষে ঘোড়া হলো।
হুসাম পায়ের জুতো খুলে ঘোড়ায় উঠে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিল। ঠিক এই সময় হুড়মুড় করে কিছুর পতন ঘটল। হলারের ওপাশটা ভেঙে নিয়ে মেঝেই লুটিয়ে পড়ল মানুষের একটা দেহ।
‘মাগো!’ বলে গুঙিয়ে উঠল মানুষটা।
ভীষণভাবে ভয় পেয়ে গেলেও কে ওভাবে পড়ল তা দেখার জন্য ঘুরে গেল হুসাম ও ইমরান।
নাফিন তখন মেঝেতে লুটিয়ে পড়া অবস্থা থেকে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ওঠার চেষ্টা করছে আর গোঙাচ্ছে।
‘একি নাফিন, তুমি?’ প্রশ্নটা করল হুসাম।
ইমরান নাফিনকে উঠতে সহযোগিতা করল।
‘সবাই চলে গেলেও আমি তোমাদের ফলো করছিলাম।’ কাতরাতে কাতরাতেই বলল নাফিন। শার্টের একপাশ ছিঁড়ে গেছে ওর। ডান বাহুতে চামড়াও ছিঁড়ে গেছে খানিকটা। ‘আমি আড়ি পেতে শুনেছিলাম তোমরা এই বিল্ডিংয়ে ঢুকবে কিছু একটা করার জন্য। তখন থেকেই তোমাদের পিছনে লেগে ছিলাম। গাছ বেয়ে চালের ওপরে উঠতেই এই অবস্থা আমার!’ বাম পাটা টিপেটুপে দেখতে লাগল কোথাও আঘাত পেয়েছে কি না।
‘হুম!’ বলল হুসাম। ‘এখন বুঝলে তো আড়ি পেতে অন্যের কথা শোনার কী ফল হয়?’
‘সেজন্য আমি একশবার ক্ষমা চাইতে রাজি আছি।’ বলল নাফিন। ‘কিন্তু এখন আমি কী করব? আম্মু যদি আমার এই ছেঁড়া শার্ট দেখেন, তাহলে নির্ঘাত মেরে ফেলবেন!’ যেন ভেউ ভেউ করে এখনই কেঁদে ফেলবে।
হুসাম ওকে সান্ত¡না দিয়ে বলল, ‘আরে না নাফিন দোস্ত, তোমার মা তোমাকে কিছুই বলবেন না। আমি তোমার সাথে গিয়ে বুঝিয়ে বলব। দেখবে, সত্যিটা তিনি ঠিকই মেনে নেবেন।’
‘সত্যি যাবে তুমি আমার সাথে? আম্মুকে বকতে মানা করবে?’
হুসাম ওপর-নিচ মাথা নাড়ে, ‘সত্যিই যাব।’ হঠাৎ চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল ওর। নাফিনের পাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে লাল টেপ জড়ানো দুটো টেনিস বল! আরেকটা বল ভাঙা হলার থেকে গড়িয়ে পড়ে ঠিক ইমরানের সামনে গিয়ে থেমে গেল।
‘পেয়ে গেছি লুকানো রহস্যের উত্তর!’ অস্ফুটে বলে উঠল হুসাম।
‘কোথায়?’ প্রায় সমস্বরে জানতে চাইল ইমরান ও নাফিন।
জবাবে নিচু হয়ে একটা বল হাতে উঠিয়ে নিল হুসাম। ওদেরকে দেখাল।
কয়েক মুহূর্ত থ মেরে হুসামের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে ওদের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
‘আল্লাহু আকবার!’ অনুচ্চস্বরে তাকবির ধ্বনি দিয়ে উঠল ইমরান।
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল হুসাম।
‘এই তাহলে এই ভূতুড়ে বাড়ির রহস্য?’ প্রশ্নটা করে পালাক্রমে হুসাম ও ইমরানের মুখের দিকে তাকাতে লাগল নাফিন। কার কাছে জানতে চাইল তা নিজেও বুঝল না।
নাফিনের কাণ্ড দেখে বাকি দুজনও নিজেদেরকে সামলাতে পারল না। হেসে উঠল ওরা। ক্রমে সে হাসি সংক্রমিত হলো নাফিনের মুখেও।
‘ঝুপ’ করে ওদের ঠিক পাশেই আমগাছের শুকনো একটা ডাল ভেঙে পড়ল শুকনো পাতা আর নোংরা আবর্জনা নিয়ে। মেঝের ওপর পড়ে আরও কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল ডালটা। আরেকটু হলেই নাফিনের মাথার ওপর পড়ত।
এই মুহূর্তে ওদের তিনজনের হাতে তিনটি বল দেখা যাচ্ছে।
নিচ থেকে আরও একটি বল উঠিয়ে নিল হুসাম।
আরও পড়ুন...