লাল জুলাইয়ের ছিন্ন পাতা
জুলাই-নিবন্ধ এস এম ফরহাদ আগস্ট ২০২৫
সুপ্রিয় বন্ধুরা, জুলাইয়ের বর্ষপূর্তিতে জুলাইয়ের অনেক গল্পই শুনছ নিশ্চয়। বড়োদের থেকে শোনা গা শিউরে ওঠা ঘটনা কিংবা তোমাদের নিজের দেখা ঘটনাগুলিই তোমাদের স্মৃতিতে হয়তো বেশ উজ্জ্বল। আজ তোমাদের শোনাব কীভাবে জুলাই এলো, তার গল্প। না না, ঠিক গল্প নয়, সত্য ঘটনাই। তবে সত্য ঘটনাও কখনো কখনো গল্পকে হার মানায়। জুলাই ছিল আমাদের জীবনের গল্পে এ রকমই একটি অধ্যায়, যা চিরতরে পালটে দিয়েছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে, আমাদের মুক্ত করেছে ভয়ংকর এক দানবের ছোঁবল থেকে। জুলাইয়ের গল্প আসলে অনেক বড়ো। আজ হয়তো তোমাদের পুরো গল্প শোনাতে পারব না। জুলাই নামক গল্পের বইটির কয়েকটি ছেঁড়া পাতা তুলে ধরছি তোমাদের জন্য। চলো তাহলে, শুরু করি।
গল্পের শুরু
জুলাইয়ের গল্পের শুরু কিন্তু ২৪-এর জুলাইতে হয়নি। বরং শুরু হয়েছে অনেক আগে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোসহ সারা দেশে দানবের ভয়ংকর কালো ছায়া পড়তে শুরু করেছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভয়ের রাজত্ব শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে। বিরোধী মতাদর্শের শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসত অবর্ণনীয় নির্যাতন। বলাবাহুল্য, হল ছাড়তে বাধ্য করা হতো তাদের। এভাবে গত পনেরো বছরে কত শিক্ষার্থীর বৈধ অধিকার হলের সিট যে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা গুনতে গেলে শেষ হবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত ও হলছাড়া হয়েছে বিগত পনেরো বছরে।
ক্যাম্পাসের সাধারণ ছাত্রদের কষ্ট লাঘব এবং কেড়ে নেওয়া অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টায় আমরা সব সময়ই বিভিন্নভাবে কাজ করেছি। পাশাপাশি এ রকম শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্যও আমরা ছিলাম সব সময়ই উন্মুখ। এ কারণে ক্যাম্পাসে যখনই সাধারণ ছাত্ররা, কিংবা ছাত্রদের কোনো সংগঠন কোনো আন্দোলন করেছে, কিংবা অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমেছে, তখন আমরা সব সময়ই বিভিন্নভাবে আন্দোলনে সাহায্য করে এসেছি। যেমন : ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের টীমের তৎকালীন বড়ো ভাই মোহাম্মদ শরফুদ্দীন, আলী আহসান জোনায়েদরা আন্দোলনের সম্মুখের নেতা নুরুল হক নুর, হাসান আল মামুনদের সাথে সমন্বয় করে আন্দোলনের পলিসি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে কাজ করেছেন।
জুলাইয়ের গল্প
ফিরে আসি জুলাইয়ের গল্পে। ২০১৮ সালে ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা কোটা বাতিল করলেও চব্বিশে এসে আবারও কোটা বহাল করার অপচেষ্টা চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ৫ জুন আদালত কোটা পুনর্বহাল করে। ৫ জুনেই নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, মাহফুজ আলম আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। ক্যাম্পাসের অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্টদের সাথেও আমরা যোগাযোগ করি। সিদ্ধান্ত হয়, আমরা সবাই জাতীয় স্বার্থে একসাথে কাজ করব। আমরা একসাথে আন্দোলন শুরু করি। আমাদের সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের নাম দেওয়া হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এ সময় আমাদের টীমের সাদিক কায়েম ভাই মাহফুজ আলমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আর আমি মাঠপর্যায়ে সমন্বয় করতাম। আমাদের পক্ষে মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ ও লজিস্টিকস সরবরাহ করতেন জায়েদুল হক।
ক্যাম্পাসে শুরুর দিকের বড়ো আয়োজন হিসেবে ২ জুলাই, ২০২৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা বিশাল মিছিলের আয়োজন করি। আমরা মিছিলের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ইনফর্মার রাখি এবং আমি পুরোটা সময় আখতার হোসেনের সাথে কানেক্টেড থেকে আপডেট দিতে থাকি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই র্যালি এগিয়ে যায়।
এরপর আদালতের এক অযাচিত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুলাই, ২০২৪ থেকে শুরু হয় বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি। এ সময় সাধারণত সকালে কর্মসূচি দেওয়া হতো। রোদের তীব্র তাপে আন্দোলনকারীদের বেশ কষ্ট হতো। আমি নাহিদ ইসলামকে পরামর্শ দিই কর্মসূচি বিকেলে নেওয়ার ব্যাপারে। এরপর আন্দোলন বিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় জায়েদের নেতৃত্বে একটি টীম শিক্ষার্থীদের মাঝে লজিস্টিক সাপোর্টগুলো বণ্টন করতেন। আমরাও মাঠে থাকতাম, শিক্ষার্থীদের মনোবল জোগাতাম।
১১ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের হামলায় অনেক শিক্ষার্থী আহত হলে আমরা সবাই মিলে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নিই।
স্মারকলিপি প্রদান
এ সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটি সুসংহত পরিকল্পনা করে ধাপে ধাপে আগানো। এ সময় আমাদের টীমের সাবেক বড়ো ভাইদের নিয়ে আমরা মিটিং করে এক সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করি। এ পরিকল্পনায় সফট ও হার্ড, দুই ধরনের কর্মসূচিই রাখা হয়। ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় মাহফুজ আলমের সাথে আমার কথা হয়। এ সময় আমি স্মারকলিপি প্রদানের প্রস্তাব দিই। সেদিন রাত ১২টার সময় মাহফুজ আলম আমাকে কল দিয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি জানান। স্মারকলিপির খসড়া তৈরির দায়িত্ব পড়ে আমার কাঁধে। মুসাদ্দেককে কল দিয়ে খসড়া তৈরি করতে বলি। সে দ্রুত একটি খসড়া করে দেয়। পরে মাহফুজ আলমের পরামর্শে কিছু সম্পাদনা করে রাত ৩টার দিকে সারা দেশের টীমের ভাইদের কাছে স্মারকলিপির কপি পৌঁছে দিই এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনা শেয়ার করি। পাশাপাশি সকল আন্দোলনকারীর নিকট পৌঁছানোর জন্য আমাদের দেওয়া ড্রাইভ লিংক অনলাইনে প্রচার করা হয়। সব কাজ শেষ করে ফজর পড়ে ঘুমাতে যাই।
১৪ তারিখ শিক্ষার্থীরা একটি বিশাল মিছিল নিয়ে দফায় দফায় পুলিশি বাধা পেরিয়ে বঙ্গভবনে যায়। শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি দিয়ে আসে এবং দাবি মানতে নির্ধারিত সময় বেঁধে দেয়। একইভাবে সারা দেশের সকল জেলায় শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পৌঁছায়।
ঐতিহাসিক এক রাতের গল্প
১৪ তারিখ সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বানচাল করতে চাওয়া শেখ হাসিনার দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দেয় শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান। শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গাত্মক এক স্লোগানেই ভেঙে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা শাহবাগী ট্যাগিং-ফ্রেমিংয়ের রাজনীতি।
এদিন সন্ধ্যায় নাহিদ আমাকে ফোন দিয়ে কর্মসূচির ব্যাপারে পরামর্শ চান। আমি ভেবেচিন্তে রাত ১১টায় মিছিলের ঘোষণা দিতে বলি। তবে আন্দোলনের কোনো পরিচিত মুখকে দিয়ে ঘোষণা দিতে নিষেধ করি। আন্দোলনকে নিরেট সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণআন্দোলনে রূপ দিতে চেষ্টা করি আমরা। এবি জুবায়ের, মুসাদ্দেক কিছু স্লোগান প্রস্তুত করে দেয়। তবে পুরো মিছিলে সেদিন পরিকল্পিতভাবে স্লোগান চলেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য যথারীতি আমরা বিভিন্ন পয়েন্টে ইনফর্মার রেখেছিলাম এবং আখতার হোসেনের সাথে সার্বক্ষণিক কানেক্টেড ছিলাম। এ সময় ঢাকা মহানগর শাখার মাধ্যমে খবর পাই-ছাত্রলীগ ও যুবলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার জন্য শাহবাগে জড়ো হচ্ছে। আমি আখতার হোসেনকে দ্রুত স্থান পরিবর্তনের জন্য বলি, সাথে জনশক্তিদেরও জানাই। মিছিল স্থানান্তরিত হয় ভিসি চত্বরে। এ সময় খবর পাই শাহবাগ, নিউমার্কেট, কাঁটাবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ উপস্থিত হয়েছে। সংঘাত এড়ানোর জন্য নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনকে সমাবেশ শেষ করে দিতে বলি। বিক্ষুব্ধ কেউ কেউ থেকে যেতে চাইলেও অধিকাংশ আন্দোলনকারীরাই নির্দেশনা মোতাবেক যথারীতি ফিরে যায়।
মুজো টীম ও হামলার ডকুমেন্টেশন
১৫ জুলাই, ২০২৪ দুপুরে শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করে। ছাত্রলীগও একই স্থানে সমাবেশ ডাকে। আমরা বুঝতে পারছিলাম, তারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করবে। এজন্য আমরা সাংবাদিকদের একটি টীম প্রস্তুত রাখি, যে-কোনো ঘটনার ডকুমেন্ট রাখার জন্য। এ টীমের নাম দেওয়া হয় মুজো টীম; গড়নরষব-এর গড় এবং ঔড়ঁৎহধষরংঃ-এর ঔড়।
এদিন দুপুরে বিজয় একাত্তর হলের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম হামলা চালায় ছাত্রলীগ। অনেকেই আহত হয়। আসিফ মাহমুদের সাথে ফোনে কথা হয়, তাকে দ্রুত হলপাড়ায় আসতে বলি। সে জানায়, তারা রওনা দিয়েছে, এখন রোকেয়া হলের সামনে। হলপাড়ায় হামলার কথা শুনে রাজুতে থাকা শিক্ষার্থীরা এদিকে আসতে গেলে তাদের ওপরও ছাত্রলীগ হামলা চালায়। আমরা ভেবেছিলাম, অন্তত নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হবে না। কিন্তু আমাদের বোনদের ওপরও ওরা নির্মম হামলা চালায়। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে আহত শিক্ষার্থীদের ওপরও ওরা হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যুক্ত হয় কালো একটি অধ্যায়।
মুজো টীম যথেষ্ট সাহসিকতার সাথে সবগুলো ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। সন্ধ্যার দিকে আমাদের টীমের মিডিয়া বিভাগ, মুজো টীম এবং আমরা ফুটেজগুলো নিয়ে বসি। আরাফাত হোসাইন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে আমাদের আইটি টীম ফটোকার্ড তৈরি শুরু করে। খুব দ্রুতই অনলাইনে ছড়িয়ে যায় ছবি ও ভিডিওগুলো। আমাদের পাশাপাশি অনেকেরই ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। ঘৃণ্য এ আক্রমণ দেখে মানুষ স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
অপরাধীদের চিহ্নিত করার পর আমরা ক্যাম্পাসে সামগ্রিকভাবে তাদেরকে বয়কট করার উদ্যোগ নিই। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেয়, তারা কোনো অপরাধীর সাথে ক্লাসে বা পরীক্ষায় বসবে না। মূলত এ উদ্যোগেই ছাত্রলীগ ব্যাকফুটে চলে যায়। ছাত্রলীগ থেকে নেতাকর্মীরা গণহারে পদত্যাগ শুরু করে।
এক আলোকিত ভোর
ছাত্রলীগের বর্বর হামলার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ সময় সিবগাতুল্লাহ ভাই ঢাকার শাখাগুলোর দায়িত্বশীলদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে শিক্ষার্থীদের ভয় কাটানোর লক্ষ্যে প্রতিরোধ মিছিলের সিদ্ধান্ত হয়। সাথে সাথে জানানো হয় নাহিদ ইসলামকে। এরপর সন্ধ্যায় আসিফ মাহমুদ ও আমাদের মহানগরের জনশক্তিরা একুশে হল থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত মিছিল করেন। যদিও আমাদের সব জনশক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনোবল ধরে রাখতে তাদের এ কর্মসূচি দারুণ ভূমিকা রেখেছিল।
১৬ জুলাই মাহাদী ভাই আমাকে জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা কীভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ছাত্রলীগমুক্ত করেছে। আমি বেশ উদ্বুদ্ধ হই। ভাবি, ঢাবিতে আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ।
এদিন সন্ধ্যায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই, যে-কোনো মূল্যে আজকেই ছাত্রদের হলগুলোও ছাত্রলীগমুক্ত করতে হবে। কিন্তু হলপাড়ার হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী তুলনামূলক বেশি থাকায় রিস্কও বেশি ছিল। আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। এজন্য আমরা প্রতি হলে কো-অর্ডিনেটর ঘোষণা করি, যারা হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিটি ফ্লোরভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করবেন এবং সকল শিক্ষার্থীকে মোবিলাইজ করবেন।
আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা শুরু করি। এদিন শহীদ মিনারে সমাবেশে হামলা হলে প্রতিরোধের জন্য আমরা কয়েক হাজার জিআই পাইপ, স্ট্যাম্প ও লাঠি কিনে রেখেছিলাম। এ লাঠিগুলো হলের শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এদিকে রাতেই বোনদের হলগুলো একে একে ছাত্রলীগমুক্ত হতে থাকে। কিন্তু ছাত্রদের হলগুলোতে তখনও আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। শুধু জহরুল হক হল ছাত্রলীগমুক্ত হয়। কিন্তু হলপাড়ার সাধারণ শিক্ষার্থীদের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে না পারায় কাজ শুরু করা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে শোনা যায়, একাত্তর হলে ছাত্রলীগ মাইক্রোবাসে করে পিস্তল ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এসে রেখেছে।
ফজরের পর জিয়া হল থেকে মেফতাহুল মারুফ জানাল-তারা প্রস্তুত। দ্রুত মুজিব হল, একাত্তর হল, জসীমউদ্দিন হলের কো-অর্ডিনেটরদের জানানো হলো, যেন একসাথে সবগুলো হলে অভিযান শুরু করা যায়। অভিযান শুরু হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীরা একযোগে মাঠে নামল। তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের হাত থেকে হলগুলো স্বাধীন করা সম্ভব হলো। হলপাড়ার বাইরে এফ আর হল মুক্ত করতে একটু বেশিই কষ্ট হয়েছিল, তবে সবশেষে মুক্ত করা সম্ভব হয়।
বিক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ নেতাদের বিলাসবহুল রুমগুলোতে। রুমগুলোতে কমবেশি ভাঙচুর করা হয়, অস্ত্রও উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়। আর একাত্তর হলে মাইক্রোবাসে করে আসা পিস্তলের খবর? ওটা তো আসলে গুজব ছড়ানো হয়েছিল ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয় পায়নি, আলহামদুলিল্লাহ।
হল থেকে ছাত্রলীগ পালাতে বাধ্য হওয়ার মাধ্যমেই মূলত সরকারের ভিত নড়ে ওঠে। পতন তখন ছিল শুধু সময় এবং আওয়ামী লীগের পাপের ভার পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষামাত্র।
শুধু জাবি কিংবা ঢাবিতেই নয়, বাকি ক্যাম্পাসগুলোতেও এর ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগ খেদানো কর্মসূচি বেশ উৎসবের সাথেই পালিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত শক্তির সামনে ছাত্রলীগ দাঁড়াতেই পারেনি।
গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল
১৬ জুলাই, ২০২৪ আবু সাঈদসহ ছয়জনের মৃত্যুর খবর আসার পর সাদিক কায়েম ভাইসহ আমরা বসে ১৭ তারিখের কর্মসূচির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিই, আমরা জানাজা পড়ব এবং কফিন মিছিল করব। কিন্তু শহীদ পরিবারগুলোকে প্রশাসন প্রচণ্ড হুমকির ওপর রাখায় আমরা কারো লাশ আনতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। এজন্য গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী কফিন রাখার সিদ্ধান্ত নিই।
মাহফুজ আলম সন্ধ্যায় কল দিয়ে আমাদের পরিকল্পনা জানতে চান। আমরা জানাজার কথা বললে তারা নিজেরা আলোচনা করে এরপর সম্মতি দেন, বাকি সমন্বয়কদেরকেও রাজি করান। নাহিদ ইসলাম জায়েদকে ফোন দিয়ে সাতটি কফিনের ব্যবস্থা করতে বলেন। কফিন কিনে দেওয়ার ব্যাপারে আমাদেরকে সাহায্য করেন দেলোয়ার ভাই এবং শাহ মাহফুজ ভাই। উনারা কফিন কিনে চরম বাধা পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। জানাজার পর কফিন মিছিল রাজু ভাস্কর্যের দিকে গেলে আইএমএলের সামনে পুলিশ হামলা করে। আহত হয় অনেক শিক্ষার্থী।
৯ দফা যেভাবে হলো
১৬ তারিখ ৬ জন শহীদ হওয়ার পর আমরা চিন্তা করি, এত রক্ত ঝরার পর আন্দোলন এখন শুধু কোটায় সীমাবদ্ধ নেই। আমাদেরকে এমন কিছু দাবি করতে হবে, যেন সরকারের ভিত নড়ে ওঠে। ইতোমধ্যেই অনলাইনে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু দাবিদাওয়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমতাবস্থায় সাদিক কায়েম ভাই আমাদের ঢাবি টীমের সাবেক ভাইদের গ্রুপে পরামর্শ আহ্বান করেন। বেশ কিছু দফা আমাদের হাতে আসে। টীমের অন্য সদস্যদের গ্রুপ থেকেও কিছু দফা হাতে আসে। দাবিগুলো দেখে মির্জা গালিব ভাই বলেন, ‘বিক্ষিপ্ত দাবি না দিয়ে দফাগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন তা মানতে গেলে হাসিনার ফ্যাসিবাদী কাঠামোতে ভাঙন ধরে।’
সবগুলো দাবি একসাথে করে মোট ১১টি দফা খসড়া তৈরি করা হয়। ইতোমধ্যে সাদিক কায়েম ভাই আসিফ মাহমুদকেও কয়েকটি দফা পাঠিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে বলেন।
১৯ জুলাই, ২০২৪ দুপুরে সাদিক কায়েম ভাই আমাকে ফোন দিয়ে মাহাদী ভাইয়ের অফিসে গিয়ে দফাগুলোকে প্রেস রিলিজ আকারে সাজাতে বলেন। তখন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার ফোনে যেহেতু টীমের অনেক তথ্য ছিল, তাই নিরাপত্তার জন্য ফোন বাসায় রেখে বাইক নিয়ে ভাইয়ের অফিসে যাই। দফাগুলো লিখতে শুরু করি, এমন সময় নিচে হইচই। ভবনের সামনে সংঘর্ষ হচ্ছে। বাইক পুড়িয়ে দিতে পারে, এ আশঙ্কায় লেখা রেখে এক দৌড়ে নিচে আসি। বাইক গ্যারেজে রেখে আবার দৌড়ে ১২ তলায় উঠে লিখতে বসি। কিন্তু লেখার মাঝে হঠাৎ করেই এ ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করায় সবগুলো দফা আর স্মরণে আনতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করে ৯টি দফা মনে এলো, বাকি দুইটি বেমালুম ভুলে গেলাম। পরে এ নয়টি দফাকেই ঘষামাজা করে চূড়ান্ত করা হলো।
ইন্টারনেট না থাকায় তখন সমন্বয়কদের কারো সাথেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। সাদিক ভাই বললেন, আবদুল কাদেরকে রিচ করতে। তাকে ফোনে পেলে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। আরও বলি, আমরা তোমার নামেই দাবিগুলো পাঠাতে চাই। সে ফোনে সবগুলো দফা নোট নেয়। তাকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় পুলিশ যেন ট্র্যাক করতে না পারে, তার কৌশলও শিখিয়ে দিই। এ ৯ দফার মাধ্যমেই সরকার পতনের ঘণ্টা বেজে ওঠে।
৯ দফার প্রেস রিলিজ তৈরির পর প্রিন্ট দেবো, এমন সময় অফিসের বিদ্যুৎ চলে যায়। পেনড্রাইভে ফাইল নিয়ে ঢাবি শাখার একটা বাসায় এসে প্রিন্ট দেওয়া শুরু করি। কিন্তু মুসিবত, দুই কপি প্রিন্ট দেওয়ার পরই প্রিন্টারের কালি শেষ হয়ে যায়। এরপর সিবগাতুল্লাহ, সাদিক কায়েম এবং মুসাদ্দেক ভাই দুইটি বাইক নিয়ে বাংলামোটর গিয়ে প্রিন্ট করিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে পৌঁছে দেন।
৯ দফা ঘোষণার পর সেদিন সন্ধ্যায় অপরিচিত একটি নম্বর থেকে নাহিদ ইসলাম আমাকে ফোন দেন। বলেন, ভাই, ৯ দফা তো ঘোষণা করে দিলেন। আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারবেন তো? আমি বলি, ইনশাআল্লাহ। আপনারা যদি গ্রেফতারও হন, একটু শক্ত থাকবেন। পরে জানতে পারি, সেদিন রাতেই নাহিদ ইসলামকে গুম করা হয়েছিল।
ভিডিওবার্তা ও ৩৫টি পেনড্রাইভের গল্প
৯ দফা মিডিয়া হাউসে পৌঁছানোর পর থেকেই ডিজিএফআই, এনএসআই বেশ ঝামেলা শুরু করে। এমনকি ৯ দফা আসলেই আবদুল কাদের ঘোষণা করেছে কি না, এটা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলে। এমন অবস্থায় ৯ দফা নিয়ে আবদুল কাদেরের ভিডিওবার্তা অতীব জরুরি হয়ে পড়ে। তাকে ফোন করে প্রতিটি দফা আলাদা আলাদা করে ভিডিও ধারণ করে রাখতে বলা হয়।
ভিডিও সংগ্রহ করার জন্য সিবগাতুল্লাহ ভাই নারায়ণগঞ্জের অমিতকে পাঠান কাজলাতে। অমিত আবদুল কাদেরের ভিডিও মেমোরি কার্ডে নিয়ে প্রচণ্ড ঝুঁকি মাথায় করেই বাংলামোটরে চলে আসেন। ভিডিও হাতে পাওয়ার পর মাহাদী ভাই ৩৫টি পেনড্রাইভ কিনে আনেন। পেনড্রাইভে ভিডিওগুলো কপি করে মিডিয়া হাউজগুলোতে পৌঁছে দেন।
৯ দফা ঘোষণার পর সরকার সেগুলোকে কাটছাঁট করে এমন কিছু শব্দ যুক্ত করে ৮ দফা বানিয়ে প্রচার শুরু করে, যা মেনে নেওয়া সরকারের জন্য সহজ। মূলত সরকার চেয়েছিল বানোয়াট ৮ দফা মেনে নিয়ে জনগণকে ধোঁকা দিতে।
এর মধ্যে মাহাদী ভাই তার সাংবাদিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে এএফপির অফিসে অবস্থানরত প্রথম আলোর এক সাংবাদিকের কাছে ৯ দফা পৌঁছে দেন। সেই সাংবাদিক থেকে ৯ দফার কপি পাওয়ার পর এফএপির সাংবাদিক শফিকুল আলম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ও তাঁর স্ত্রী এবং তাদের কিছু সাহসী সাংবাদিক সহকর্মী মিলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ৯ দফা পৌঁছে দেন এবং ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। এভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ৯ দফা, ব্যর্থ হয় সরকারের বানোয়াট ৮ দফা।
সংখ্যার খেলা
আন্দোলনের একপর্যায়ে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার তিনজন সমন্বয়ককে সরকার গুম করে এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ, সার্জিস আলম ও হাসিবকে সরকার জিম্মি করে রাখে। আমাদের নতুন নতুন কর্মসূচিগুলো যেন পত্রিকায় পাঠাতে না পারি এজন্য সরকারি বাহিনী মিডিয়া হাউজগুলো পাহারা দেওয়া শুরু করে। আঁটতে থাকে নতুন নতুন ষড়যন্ত্র। একপর্যায়ে আমরা আশঙ্কা করছিলাম, এ ছয়জনের কাউকে প্রশাসন মিডিয়ার সামনে হাজির করে আমাদের কর্মসূচির বিপরীতে দাঁড় করাতে পারে। তখন পত্রিকাগুলোরও আমাদের দেওয়া কর্মসূচিগুলোর ব্যাপারে আর কিছু বলার থাকবে না। তাই আমরাও দিলাম পালটা কৌশল। আমরা তখন ৬৫ জন সমন্বয়কের মধ্যে গুম থাকা তিনজন এবং জিম্মি থাকা তিনজন-এ ছয়জনকে বাদ দিয়েই বিবৃতির শিরোনামে লিখলাম ‘৫৯ সমন্বয়কের সমন্বিত বিবৃতি’ ।
পরদিন ঘটল এক মজার ঘটনা। জাতীয় পত্রিকাগুলো ছাপাল ‘৫৯ সমন্বয়কের বিবৃতি’। সরকার মনে করল ৫৯ সমন্বয়ক একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিবৃতি পাঠিয়েছে। সরকারি বাহিনী হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকল ৫৯ সমন্বয়ক কোথায় একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাস্তবে আমাদের টীমই প্রেস রিলিজ তৈরি করত। এর সাথে আসলে ৫৯ জনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে ৫৯ সমন্বয়কের নামে বিবৃতি দেওয়ায় সরকারও বিভ্রান্ত হয়, আবার আন্দোলনের একতাও ঠিক থাকে। কেউই জানত না, বিবৃতিগুলো কারা লিখছে, কোথা থেকে দেওয়া হচ্ছে কিংবা এর পেছনে কারা আছে।
এদিকে আবদুল কাদেরকে গোয়েন্দাবাহিনী জঙ্গি হিসেবে প্রচার শুরু করে। বাধ্য হয়ে আমাদের বিকল্প খুঁজে নিতে হয়। মুজিব হলের আবদুর রব নাসিমের মাধ্যমে তার বন্ধু আবদুল হান্নান মাসউদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি। এদিকে হান্নান মাসউদ সংবাদ সম্মেলনে বলে যে, সরকার আবদুল কাদেরকে গুম করে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে আবদুল কাদের আমাদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ জায়গাতেই ছিল, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় হান্নান মাসউদ তা জানত না। যাই হোক, এরপর থেকে আমরা হান্নান মাসউদের কথার সাথে সমন্বয় করে ৫৯ সমন্বয়কের বদলে ৫৮ সমন্বয়কের নামে বিবৃতি প্রচার শুরু করি, যেন কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পায়।
কঠিন সময়ে অন্য কৌশল
আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে আমরা লক্ষ করলাম-পুলিশি চাপে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীরা সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন প্রত্যাহার করছে। আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘটনাগুলো মিডিয়া বেশ ফলাও করেই প্রচার করছিল। এর ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় কয়েকজন সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। আমরা আশঙ্কা করছিলাম, এর ফলে জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে আন্দোলনবিমুখ হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা সারা দেশে সক্রিয় থাকা আন্দোলনকারীদের নিয়ে দেশব্যাপী নতুন কমিটির চিন্তা করি। কমিটি ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলন বানচালের ষড়যন্ত্র ঠেকিয়ে মাঠের নিয়ন্ত্রণ পোক্ত করা, কাউকে পদ দেওয়া নয়।
পরিকল্পনামাফিক সেফ হোমে থাকা সমন্বয়কদের নিকট থেকে পূর্ব থেকেই সংযুক্তদের তালিকা এবং আমিরুল ইসলামের থেকে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকা আন্দোলনকারীদের তালিকা নিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করি। দুটি তালিকার সংমিশ্রণে কয়েক দিনের মধ্যেই সারা দেশের প্রতিটি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসসমূহে সমন্বয়ক কমিটি তৈরি করি। তালিকাগুলোর পিডিএফ সমন্বয়ক ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা নিয়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতাম।
এভাবেই হেরে যায় আন্দোলন প্রত্যাহারের নাটক। ফলে আন্দোলন আবারও চাঙা হয়ে ওঠে, প্রাণ ফিরে পায় নতুনভাবে।
লাল জুলাইয়ের লাল রং
জনরোষে পড়ে সরকার শহীদদের জন্য রাষ্ট্রীয় শোক পালনের অংশ হিসেবে কালো পতাকা উত্তোলনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকারের কর্মসূচিকে জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। ২৯ জুলাই, ২০২৪ সন্ধ্যায় সাদিক কায়েম, মহিউদ্দিন খান ও আমি একসাথে বসে পরামর্শ করি, সরকারের কর্মসূচির বিপরীতে আমাদেরও কিছু কর্মসূচি দেওয়া দরকার। সাদিক কায়েম ভাই বলেন, ছাত্রদল যেমন কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করার কথা বলছে, আমরাও এ রকম কিছু করতে পারি কি না? আমি বলি, কালো না, বরং লাল রং ব্যবহার করতে হবে। যুক্তি হিসেবে বলি, শেখ হাসিনা যে মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে, সে রক্তের রং লাল। এজন্য আমরা লাল কাপড় চোখে ও মুখে বেঁধে প্রতিবাদ করতে পারি। সাদিক ভাই আমার পরামর্শ গ্রহণ করেন। মহিউদ্দিন কিছু হ্যাশট্যাগ ঠিক করেন। হ্যাশট্যাগসহ বিবৃতি প্রস্তুত করে সমন্বয়কদের পাঠানো হলে তারাও একমত হয়। এভাবে কালোর বিরুদ্ধে লাল রংকে ছড়ানো হয়। আমাদের এ কর্মসূচিটি সচেতন সকলেই ভালোভাবে গ্রহণ করেন। ৩০ জুলাই, ২০২৪ সোশ্যাল মিডিয়ায় লাল রং ছড়িয়ে পড়ে। বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও প্রোফাইল লাল করা শুরু করেন। দেশ দুই ভাগ হয়ে যায়, একদিকে গুটিকয়েক আওয়ামী সরকারের দালাল কালোর পক্ষে, অন্যদিকে আপামর জনতা এবং সচেতন নাগরিকবৃন্দ লালের পক্ষে।
এরপর শুরু হয় আরেক গল্প। ৩১ জুলাই, ২০২৪ পেরিয়ে গেলেও জুলাই শেষ না হয়ে ৩২, ৩৩ হয়ে জুলাই চলতে থাকা, মার্চ ফর জাস্টিস ও রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ পালিত হওয়া, ৯ দফার ১ দফাতে পরিবর্তন হওয়া, ৩৬শে জুলাই গণভবন বিজয় ও হাসিনার দিল্লি পালিয়ে যাওয়া, সে এক বিশাল গল্প। সে গল্প আজ না বলি।
প্রিয় বন্ধুরা, জুলাই শুধু আমাদের আন্দোলন ছিল না কিংবা জুলাই শুধু ছাত্রদের মাধ্যমেই সফল হয়নি। বরং জুলাই হয়ে উঠেছিল প্রতিটি মানুষের, দেশের আপামর জনসাধারণের। জুলাইতে ছাত্রদের বিশাল অবদান আছে সত্য, কিন্তু রিকশাচালক, মসজিদের খতিব, শিক্ষক, গৃহিণী, প্রবাসীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া জুলাই কখনোই সফল হতো না। আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তোমরা যারা শিশু-কিশোর, তোমাদের। শিশুশহীদদের রক্তাক্ত লাশ জনতার হৃদয়ে যে রক্ত ঝরিয়েছিল, তারই প্রভাব আমরা দেখেছি জনতার রাস্তায় নেমে আসার মাধ্যমে। তোমরাও হয়তো তোমাদের আব্বু-আম্মুকে নিয়ে এসেছিলে আন্দোলনে। তোমরা যারা বিভিন্নভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলে, হয়ে উঠেছিলে জুলাইয়ের প্রেরণার উৎস, তোমাদের জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা। জুলাইতে যেমন তোমরা দেশকে রক্ষা করেছ, তোমাদের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে জুলাইয়ের প্রেরণা বুকে ধারণ করে দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাবে সব সময়।
আজ তো শুধু আমার গল্পই বললাম। জুলাই নিয়ে তোমারও তো গল্প আছে নিশ্চয়, তাই না? তোমার গল্পটি কবে শোনাবে, বন্ধু?
লেখক : অন্যতম সংগঠক, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন...