লাল কলম
গল্প শফিক মুন্সি মে ২০২৬
ইনায়ার কাছে সবচেয়ে পছন্দের দিন শুক্রবার। কারণ পুরো সপ্তায় এই একটা দিনেই বাবাকে সব সময় বাসায় পাওয়া যায়। দ্বিতীয় কারণ, এই দিন বিকেলে নিয়মিত বাবা-মা’র সঙ্গে ঘুরতে বের হতে পারে সে। কিন্তু আজ শুক্রবার হলেও সকাল থেকেই ভীষণ রকম মন খারাপ তার। গতকাল স্কুলে গিয়ে সে প্রিয় লাল কলমটা হারিয়ে ফেলেছে। স্কুল ছুটি হবার পরও তার বান্ধবী মুমুর সাথে পুরো ক্লাসরুম তন্নতন্ন করে খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। গত বছর ক্লাস থ্রির ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করায় ইনায়াকে তার ছোট মামা সুন্দর কলমটি উপহার দেয়। কলমটি সচরাচর ব্যবহার না করলেও সব সময়ই ব্যাগের ভেতরে রেখে দেয় সে। এত প্রিয় জিনিসটি হারিয়ে মোটেই ভালো লাগছে না তার। কিন্তু কলমটি হারানোই মন খারাপের মূল কারণ নয়। মুমুর সন্দেহ, কলমটি তাদের আরেক বান্ধবী মনীষা নিয়েছে। মনীষা হচ্ছে ইনায়াদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। ইনায়া সেকেন্ড। সবাই দুজনকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও নিজেদের মধ্যে খুব ভাব তাদের। এমনকি প্রতিদিন তারা দুজন একই বেঞ্চে বসার চেষ্টা করে। সেই মনীষা কিনা ইনায়ার এত প্রিয় কলমটি চুরি করতে পারে! এটা ভেবে আরও বেশি খারাপ লাগছে তার। সকালের নাশতার জন্য বসেও কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না ইনায়ার। খাবার নিয়ে বসে আছে।
“কী ব্যাপার মামনি, কিছু খাচ্ছ না কেন? রাত থেকে দেখছি তুমি চুপচাপ। স্কুলে কারো সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?” বলল বাবা।
ভাবনায় ছেদ পড়ল ইনায়ার। “ছোট মামার দেওয়া লাল কলমটা গতকাল হারিয়ে গেছে, বাবা। মনীষা সেটা নিয়ে গেছে। তুমি তো জানো, ওটা কত প্রিয় কলম ছিল আমার।” কোনো রকমে কান্না আটকে বলল ইনায়া।
মেয়ের ছলছল চোখ দৃষ্টি এড়াল না রেজওয়ানের।
“মনীষা যদি নিয়ে থাকে তাহলে ওর কাছে কলমটা ফেরত চাইলেই তো পারো।”
“ও কি স্বীকার করবে যে কলমটা ওই নিয়েছে? আমার কাছেও তো কোনো প্রমাণ নেই।”
“তাহলে তুমি বুঝলে কীভাবে যে কলমটা মনীষাই নিয়েছে?” কিছুটা অবাক হয়েই মেয়েকে প্রশ্ন করলেন রেজওয়ান।
“আমাকে মুমু বলেছে। ওর সন্দেহ কলমটা মনীষাই নিয়েছে। কলমটা দেখানোর পর খুব পছন্দও করেছিল মনীষা। কিন্তু দেখো বাবা, আমার এত পছন্দের কলমটা আমার প্রিয় বান্ধবীটাই চুরি করল। আমাকে সব সময়ই মুমু বারণ করত ওর সঙ্গে মিশতে।” কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না ইনায়া। হাত দিয়ে নিজের গাল নিজেই মুছল সে। মেয়ের এমন অবস্থা খানিক ভাবনায় ফেলল রেজওয়ানকে। ইনায়ার সামনে থাকা প্লেট নিজের দিকে টেনে নিলেন তিনি। তারপর সেখান থেকে একটু খাবার নিয়ে মেয়ের মুখে তুলে দিলেন। দ্বিতীয়বার আরেকটু খাবার হাতে নিয়ে ইনায়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বলা শুরু করলেন, “ধরো তুমি কাল কলমটি খুঁজে পেলে এবং জানতে পারলে কলমটি মনীষা চুরি করেনি, তখন কি করবে?”
বাবার কথা শুনে খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেল ইনায়া। মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে পুনরায় হাতে থাকা খাবারের টুকরো তুলে দিলেন ওর মুখে। “আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, না জেনে তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা রেখো না, এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ! তোমার বা মুমুর কাছে যেহেতু কোনো প্রমাণ নেই, তাই মনীষা চুরি করেছে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। মনীষা যদি জানতে পারে তোমরা এমন ভাবছ, তখন কত কষ্ট পাবে সে বলো তো?”
ইনায়া না কোনো উত্তর দিতে পারল না।
বাবাই সমাধান বাতলে দিলেন। বললেন, “আজ বিকেলে আমি আর তুমি বাইরে যাব। তোমার মামা যেমন কলম তোমাকে দিয়েছে, সেরকম কলম খুঁজে বের করব। একই কলম মুমু আর মনীষার জন্যও কিনব। তুমি কাল ওদের উপহার দেবে।”
বাবার কথায় খুশি হয়ে গেল ইনায়া। “সত্যি বাবা! তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা। কিন্তু ওদের কেন দেবো?”
“আমাদের নবী (সা) মানুষকে বিভিন্নভাবে উপহার দিতেন। কেউ যদি তোমার কাছ থেকে কিছু পায় তখন সে খুশি হয়। আর মানুষকে খুশি করলে আল্লাহ খুশি হন।
“ঠিক আছে বাবা।” ইনায়া খুশিমনে উত্তর দিলো।
পরদিন স্কুল ছুটির পর মনীষা এবং মুমু দুজনকেই অবিকল সেই লাল কলমের মতো দুটো কলম উপহার দিলো ইনায়া। মনীষা কলমটি পেয়ে খুবই খুশি হলো। ইনায়াকে জড়িয়ে পর্যন্ত ধরল। তবে মুমু বেশ চুপচাপ থাকল কিছুক্ষণ। মনীষা ওদের কাছ থেকে বিদায় নেবার পর মুমু কথা বলা শুরু করল, “ইনায়া তুমি আমাকে মাফ করে দাও।”
মুমুর এমন আচরণে বেশ অবাক হয়েই ইনায়া প্রশ্ন করল, “কেন? হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন, মুমু?”
“আমি ভুল করেছি। আসলে তোমার কলমটি আমিই নিয়েছি। আমি লোভে পড়ে নিয়েছি। কিন্তু তোমাকে কলমটি ফিরিয়ে দিতে চাই। তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। তুমি আমাকে মাফ করে দাও ইনায়া।’’
মুমুর কথা শুনে ইনায়া যতটা না অবাক হয়েছিল তার চেয়ে বেশি এখন সে খুশি হলো। মনে মনে একটু খারাপ লাগছিল এটা ভেবে যে মনীষার প্রতি কতটাই না ভুল ধারণা রেখেছিল। তবে সে মুমুকেও ক্ষমা করে দিলো। কারণ বাবা বলেছেন, মানুষমাত্রই ভুল করে। কিন্তু কখনো কেউ যদি ভুল করার পর ক্ষমা চায়, তবে তাকে মাফ করে দিতে হয়। ক্ষমাকারীকে আল্লাহ অনেক পছন্দ করেন।
আরও পড়ুন...