তরুণ লেখকদের হাওড়বিলাস
ভ্রমণ সীমান্ত আকরাম নভেম্বর ২০২৫
দিনটি ছিল শনিবার। ঘড়ির কাঁটা ১২ টা ছুঁইছুঁই। সকালে পাঁচগাঁও ঘুরতে গিয়েছিলাম। সময়টা ক্ষেপণ হয়েছে ওদিকে। এদিকে ট্যুরিস্ট বোট-এর মালিক সমীরণ দাদা বারবার ফোন দিয়ে যাচ্ছে। কলমাকান্দার কাচারি ঘাট। উপজেলার পূর্বপাশেই এ ঘাটের অবস্থান। গিয়ে দেখি, বোট আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ। একে একে সবাই বোটে উঠলাম। গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওড়। সৌন্দর্যের এক অনন্য জলাভূমি এই হাওড় পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান। প্রাকৃতিক বন, পরিযায়ী ও দেশি পাখির নিরাপদ আবাসস্থলও এ হাওড়। ভরা বর্ষায় হাওড়ের রূপ উপচে পড়ে। স্বচ্ছ জলে জলকেলি, রাতে জল-জোছনার মায়াবী খেলায় তনু-মন দুটোই জুড়িয়ে যায়। হাওড়, পাহাড়, নদী ও লেকের অপার সৌন্দর্য একসঙ্গে ধরা দেয় সুনামগঞ্জে।
কলমাকান্দা থেকে গুনাই নদীর বুক চিরে ভটভট শব্দ তুলে বোট এগিয়ে চলছে হাওড়ের পানে। কিছুটা সময় পর দেখা মিলল মধ্যনগর বাজারের। এটি সুনামগঞ্জের একটি উপজেলা। চারিদিকে পানিতে টইটম্বুর। এখান থেকেই আমরা দুইদিনের সদাই করে নিলাম। হাওড়ের মাছ, হাওড়ের হাঁস, কাঁচা সবজি, মসলাপাতি ইত্যাদি নিয়ে এবার ছুটে চললাম হাওড়ের উদ্দেশে।
টাঙ্গুয়ার হাওড়
নদীর দু’ধারের দৃশ্যপট মনকাড়া। নদী থেকে হাওড়ে প্রবেশ করলাম আমরা। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওড়ের অবস্থান। এ হাওড়ের আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য খাল ও নালা বর্ষায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বর্ষা ও শুকনা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওড়ের দুই রূপ চোখে পড়ে। বর্ষায় দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। এ জলরাশির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে হিজল ও করচগাছের বাগান। নীল আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি। বিকেলের রোদে মেঘের ছায়া পড়ে নীল হয়ে ওঠে হাওড়ের পানি। কখনো আকাশের মতো নীল, কখনো আয়নার মতো স্বচ্ছ-এমন স্নিগ্ধ রঙে রাঙানো পানিতে টইটুম্বর হাওড়াঞ্চল। পুরো এলাকাকে ছবির মতো মনে হয়।প্রতি মৌসুমে যেমন হাওড় সাজে ভিন্ন রূপে, ঠিক তেমনই প্রতি বেলাতেও এর সাজ একেক রকম। ভোরবেলা হাওড় থাকে সুনসান এবং স্নিগ্ধ। আর সূর্য ডোবার সময়ে ঢেকে যায় সোনালি রঙের চাদরে। রাতের ঝকঝকে আকাশে মিটমিট করে তারার মেলা। সৌন্দর্যের এ আমেজে মেতে ওঠেন পর্যটকরা।
টাঙ্গুয়ার হাওড়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো-এটি ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। গাছ, মাছ, পাখি আর প্রাকৃতিক জীব-বৈচিত্র্যের আধার এ হাওড় পর্যটকদের কাছে সবসময় জনপ্রিয়। টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ভ্রমণের জন্য বর্ষাকালকে আদর্শ সময় ধরা হলেও অনেকেই অতিথি পাখি দেখার জন্য শীতকালেও হাওড়ে ঘুরতে যান।
প্রায় দেড় ঘণ্টা নৌ জার্নি শেষে পৌঁছলাম ওয়াচ টাওয়ারে। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের প্রাণকেন্দ্র এ ওয়াচ টাওয়ার। পর্যটকদের প্রথম ও প্রধান গন্তব্য এটি। বিলাশবহুল বোটগুলো ২০০ মিটার দূরে নোঙর করতে হয়। ভ্রমণ পিয়াসিরা ছোট ছোট নৌকা নিয়ে হিজল ও করাচ বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওয়াহিদ জামান, ওয়াহিদ আল হাসান, ওয়াহেদুজ্জামান আহমেদ, খন্দকার নূর হোসাইন, ওয়াস কুরুনী, ঢালী আর নাদেরসহ আমরা ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পাখির চোখে পুরো হাওড় অবলোকন করে নিলাম। নিচে ছবি তুলতে দেখা যায় মুজাহিদ আর আরিফকে। ফারাবী ভাই আর রাসেল পানিতে সাঁতার কাটতে লাগল। এ যেন আনন্দের বাঁধভাঙা উল্লাস। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে গোসল, ডুব-সাঁতার ও গাছের ডালে উঠে লাফালাফি করে সবাই আনন্দ উপভোগ করলাম। আমাদের আনন্দে বাড়তি যোগ হলো, সবাই প্রায় আধা কিলোমিটার লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কেটে কেটে বোটে পৌঁছুলাম। অনেকে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লেও লাইফ জ্যাকেট থাকায় কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। সবাই ফ্রেশ হয়ে বোটে উঠি। বোট ছুটে চলল পরবর্তী গন্তব্য টেকেরঘাটের দিকে। এরমধ্যে বাবুর্চি দুপুরের রান্নার কাজ শেষ করলেন। সবাই মুসাফির হওয়ায় জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করে নিলাম। বোটেই দুপুরের খাবারের আয়োজন। হাওড়ের রুই মাছ, ডাল, ভর্তা, সবজি সব মিলিয়ে তৃপ্তি করে খেলাম।
নিলাদ্রী লেক
সোনালি রঙে ছেয়ে গেছে পশ্চিমাকাশ। সূর্যের সাথে পানির রঙের মিতালি। এ এক মোহনীয় আবেশ। হাওড়ের উত্তরপাড়ে অবস্থিত টেকেরঘাটের দিকে বোট এগিয়ে চলছে। এখানেই সবাই রাত্রিযাপন করে। সন্ধ্যা হলে শত শত বোট এখানে এসে ভিড় জমায়। রাতের টেকেরঘাট খুবই জমজমাট হয়ে ওঠে। কোনো কোনো বোটের ছাদে গানের আসর বসতে দেখা যায়। আমরা সবাই নেমে পাশেই অবস্থিত নিলাদ্রী লেকের দিকে এগিয়ে চললাম। অপর পাশে মেঘালয় রাজ্যের সুবিশাল পাহাড়। পাশের বাজারে অবস্থিত মসজিদে নামাজ আদায় করে আবারও চলে আসি নিলাদ্রী লেকে। লেকের পাশে ছোট ছোট টিলার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা স্থানটিকে বাংলার কাশ্মীরও বলা হয়ে থাকে। নিলাদ্রী লেক মূলত এক রহস্যময় সৌন্দর্যবাহী নীল জলরাশি, যা আমাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। এখানকার পানির রং যেন সুনীল পাথরের মতো ঘন নীল। পাহাড় ঘেরা এ লেক অনেক পর্যটকের জন্য মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।টেকেরঘাটে ৩২৭ একর ভূমির ওপর জরিপ চালায় বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ। ১৯৬০ সালে চুনাপাথরের সন্ধান পায় তারা। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৬ সাল থেকে খনিজ প্রকল্পটি চালু করা হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে প্রকল্পটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তারপর সেখানে পানি জমে এ লেকের সৃষ্টি হয়। শহীদ সিরাজ লেক নাম থাকলেও বর্তমানে এটিকে সবাই নিলাদ্রী লেক নামেই জানে। এখানেই বসল আমাদের গান-কবিতার আসর। জমজমাট এ আসর ঘণ্টাখানেক চলল। কবি-শিল্পীদের আসর মানেই জমজমাট। তারপর বোটে ফিরে আসলাম আমরা। এরপর আমাদের বোট ঘাট থেকে কিছুটা দূরে এনে নোঙর করল। রাতের খাবার তালিকায় হাঁস ছিল অনন্য তৃপ্তিদায়ক। মজা করে সবাই খেলাম। তারপর আবার বসল গান-কবিতা-আড্ডার আসর। ঘণ্টাখানেক পর সবাই যার যার মতো করে রাতের বিশ্রামে গেলাম। হাওড়ের মাঝে ভাসমান নৌকায় হালকা ঢেউয়ের দোলা। ফিরফিরে বাতাসে চোখ বুজে এলো নিমিষেই।
লাকমাছড়া জলপ্রপাত
মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভাঙতেই দূর থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি কানে বাজল। সবাই ফজরের নামাজ আদায় করে নিলাম। আজকের প্রথম গন্তব্য লাকমাছড়া। টেকেরঘাটের দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান। পায়ে হেঁটে ২০/২৫ মিনিটের রাস্তা। সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের কোলে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নে এ লাকমা গ্রাম। এ গ্রামের মধ্যভাগেই রূপের পশরা সাজিয়েছে লাকমাছড়া। পুরো এলাকাটাই যেন পাথর। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়ার পানি পাথরের গা বেয়ে ঝিরিঝিরি শব্দে ছুটে চলছে হাওড়ের লক্ষ্যপানে। এখান থেকে মেঘালয় পাহাড় এতোটাই কাছে যে, হাত বাড়িয়ে পাহাড় ছোঁয়ার ইচ্ছে জাগে।মেঘালয় পর্বতমালার ভাঁজে ভাঁজে সবুজের আস্তরণ। সবুজ পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে এসেছে সরু ঝরনা। হিমশীতল স্বচ্ছ জলরাশি নিজ সুরে কলকল করছে। একদিকে এমন মনলোভা লাকমা, আরেক দিকে হাওড়ের বিশালতা। এ যেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। প্রকৃতির এমন মনোহর সৌন্দর্য দেখে মনে পড়ে গেল আবদুল হালিম চৌধুরী’র গান-
“ঐ পাহাড় আর গাছ-গাছালি নীল ঝরনার গান
জানি গো প্রভু, জানি যে শুধু সকলই তোমার দান।”
লাকমাছড়ার শীতল পানি এবং আশপাশের সবুজ বনাঞ্চল ভ্রমণকারীদের প্রশান্তি এনে দেয়। কিছুটা সময় সবাই ছবি তোলা আর ভিডিওগ্রাফিতে ব্যস্ত ছিলাম। ফিরে এসে নিলাদ্রী লেকে সবাই গোসল করতে নেমে পড়লাম। তখন শৈশবের দুরন্তপনার কথা মনে পড়ল। গোসল সেরে বোটে ফিরলাম। সকালবেলার আয়োজন খিচুড়িভোজ। ক্ষুধার মাত্রা বেশি থাকায় খিচুড়িভোজ বেশ উপভোগ্য ছিল।
শিমুল বাগান
এবারের গন্তব্য শিমুল বাগান, বারিক টিলা ও জাদুকাটা নদী। আমরা ১২ জনের টিম ৬টি মোটর বাইক যোগে রওয়ানা হলাম। প্রথমে পৌঁছলাম টেকেরঘাট থেকে ৪/৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত শিমুল বাগানে। এ শিমুল বাগান তাহিরপুর উপজেলার জাদুকাটা নদীর নিকটবর্তী মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত। প্রায় ১০০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা এ বাগানে প্রায় ৩ হাজার শিমুল গাছ রয়েছে। ২০০৩ সালের দিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন এ বাগান শুরু করেন। বর্ষাকালে শিমুল বাগানের সবুজের সমারোহ মনে ভালো লাগার শিহরণ ধরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। এর চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে স্বর্গীয় সবুজগালিচায় বুঝি আপনি হেঁটে চলেছেন।
বারিক টিলা ও জাদুকাটা নদী
শিমুল বাগান থেকে কিছু পথ এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে বারিক টিলার। একটি সবুজ পাহাড়ি টিলা যা ভারত সীমান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওপর থেকে জাদুকাটা নদীর প্রবাহ দেখা যায়-এটি পাহাড় থেকে নেমে আসা এক স্বচ্ছ জলধারা। নদীর পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের পাথর পর্যন্ত দেখা যায়। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে অনন্য সুন্দর এ জাদুকাটা নদী। হাওড় ভ্রমণের পাশাপাশি পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এ নদী। এ নদীর পানি যেমন টলটলে, তেমনই এর দুইপাশের দৃশ্যও অনন্য। জাদুকাটা নদী ধরেও চলে যাওয়া যায় ভারত সীমান্তবর্তী বারিক টিলায়। নদীর এক পাড়ে দেখা যায় সবুজ বৃক্ষরাজিময় বারিক টিলা ও অন্য দিকে খাসিয়া পাহাড়। জাদুকাটা নদীতে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির ধারা, নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড় একসাথে মিলেমিশে অপূর্ব এক ক্যানভাসের সৃষ্টি করেছে।
রাজাই ঝরনা
জাদুকাটা নদী থেকে ফেরার পথে রাজাই এবং চাঁনপুর গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে রাজাই ঝরনা। তাহিরপুর সীমান্তে ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের কালাপাহাড় থেকে এ ঝরনার উৎপত্তি। বর্ষায় নিজ রূপে ফিরে আসে। বৃষ্টি হলে ঝরনার পানি অঝোরে শোঁ শোঁ শব্দে ঝরে পরে। বিশাল বিশাল পাথরের ফাঁক গলে নেমে আসা প্রাকৃতিক এ ঝরনাটি অন্যরকম সৌন্দর্য্যরে দৃশ্যপটে ধরা দেয়। ঝরনার কাছে এগোতেই একটা শীতল আবহ অনুভব হয়। বিশাল বিশাল পাথরের গা জাপটে নিচে নেমে আসা পানির স্রােতে গা ভাসিয়ে দিতে মন চাইবে যে কারোর।সব মিলিয়ে এ ভ্রমণ ছিল আমাদের সবার স্মরণীয় একটি ভ্রমণ। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরা দেবে সুনামগঞ্জের এ ভ্রমণটি। স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে সফরময় জীবনের এ ভ্রমণাংশ।
আরও পড়ুন...