কুরবানির ঈদ অভিজ্ঞতা

স্মৃতিকথা ড. আব্দুস সাত্তার মে ২০২৬

মুসলিম সমাজে ঈদকে কেন্দ্র করে দুটো অনুষ্ঠান হয়। এর একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং অন্যটি ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহা হচ্ছে কুরবানির ঈদ। কোথাও কোথাও বকরা ঈদও বলা হয়।

১৯৬৬ সাল থেকে আমি ঢাকায়। ঢাকার কুরবানির কথা এলে বলা হয়, গ্রামের কুরবানিতে প্রাণ আছে, কিন্তু ঢাকা শহরের কুরবানিতে তেমন প্রাণ নেই। ঢাকার কুরবানি মনে হয় অনেকটা কৃত্রিম। কারণ, কুরবানি দিতে হয় তাই দেওয়া। তা ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুরবানি দেওয়ার যে উদ্দেশ্য সে উদ্দেশ্যও সঠিকভাবে পালন হয় বলে মনে হয় না। কারণ ঢাকায় যারা কুরবানি দেন তাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় বিধিবিধানের চেয়ে কে কতটা সম্পদশালী সেটা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা করেন। কিন্তু গ্রামের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। গ্রামের যারা কিছুটা সম্পদশালী, যারা নিজেরাই গরু, ছাগল লালন-পালন করেন তারা তাদের পালিত সেই গরু কিংবা ছাগল থেকেই একটি কুরবানি দেন। অর্থাৎ বছরের পর বছর লালন-পালন করা, মায়া-মমতায়-আদরে পেলে পুষে বড় করা প্রিয় গরু কিংবা ছাগল কুরবানি দিয়ে থাকেন তারা। অনেকে হাট থেকেও কেনেন।

ছোটবেলায় দেখতাম বাবা নিজেদের পালের গরু থেকে একটিকে বাছাই করে কুরবানি দিতেন। কুরবানির ঈদ কাছে আসলেই বাবা ঘোষণা দিতেন, অনেকগুলো গরুর মধ্যে কোনটাকে এবার কুরবানি দেবেন। এরপর আমরা চিনতাম কোনটাকে কুরবানি দেওয়া হবে। এরপর থেকেই ঐ গরুর প্রতি আমরা স্পেশাল যত্ন নিতাম। তার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়াতাম, পানি খাওয়াতাম। সব সময় ভিন্নভাবে সেটাকে দেখতাম, আদর করতাম। গলায় রঙিন কাগজের মালা ঝুলিয়ে দিতাম। ছোটবেলার সেই আনন্দ ছিল একেবারেই আলাদা। যার সঙ্গে এখনকার শহুরে কুরবানির কোনো মিলই খুঁজে পাই না।

গ্রামে মূল আনন্দটা ছিল ঈদের দিন। সেদিন খুব ভোরবেলা থেকেই চলত ঈদের মাঠে যাবার প্রস্তুতি। ঈদের মাঠটি আমাদের বাড়ির একবারেই সন্নিকটে। ফলে নামাজ শুরু হবার পূর্বেই বার কয়েক মাটে যাওয়া হয়ে যেত। একা নয়, যেতাম পাড়ার ছেলেদের সাথে দল বেঁধে। তা ছাড়া ঈদের মাঠে যে চট এবং কাপড় বিছানো হতো সেগুলো আমাদের বাড়িতেই সংরক্ষণ করা হতো। ফলে সেসকল চট এবং কাপড় বিছানোর সময়ও মাঠে থাকতাম। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কখন নামাজ শেষ হবে। কারণ নামাজের পরেই পশু কুরবানি। মনে হতো সেটাই আসল উৎসব।

নামাজের সময় হলে গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে নকশাওয়ালা কাগজের রঙিন গোল টুপি মাথায় দিয়ে বাবার সাথে মাটে যেতাম। মাঠে যাওয়ার পূর্বে খাবার পর্ব শেষ করতে হতো। সেদিন পাড়ার অনেকেই আসতেন, খেতেন এবং মাঠে যেতেন। নামাজ শেষে যার যার বাড়ি গিয়ে কুরবানির পশু নিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই হাজির হতেন। এটাই ছিল সবচেয়ে উপভোগ্য আনন্দের বিষয়। কারণ যারা পশু নিয়ে আসতেন তাদের সাথে আমার সমবয়সি ছেলেমেয়েদেরও নিয়ে আসতেন। ফলে সবার সাথে মিলেমিশে আনন্দ প্রকাশের সুযোগ হতো।

কুরবানির পশু জবাই করার বিষয়টিও ছিল আমাদের জন্য আর এক উপভোগ্য বিষয়। গরু জবাই করতে বেশ কয়েকজন লোকের প্রয়োজন হতো। তারা যখন গরুর পায়ে রশি দিয়ে বাঁধতেন তখন পর্যবেক্ষণ করতাম কীভাবে বাঁধতে হয়। তারপর কয়েকজন রশি ধরে টান দিলেই গরু মাটিতে পড়ে যেত। এরপর সবাই মিলে শক্ত করে ধরলে হুজুর জবাই করতেন। জবাই করার সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতো। লাল রক্তে ভিজে যেত মাটি। এভাবে গরু-ছাগল জবাই করা হলে শুরু হতো চামড়া ছাড়ানোর প্রক্রিয়া। দেখতাম প্রথমেই গলার খাদ্যনালি বের করে চিকন রশি দিয়ে বাঁধ দেওয়া হতো। কারণ সেই রগ দিয়ে যাতে পেটের বর্জ্য বের হতে না পারে। এরপর শুরু হতো চামড়া ছাড়ানোর কাজ। পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়া দেখতাম। কীভাবে চামড়া ছাড়াতে হয়, কীভাবে পা চারটা কেটে আলাদা করতে হয়, কীভাবে ভুঁড়ি পেট থেকে বের করতে হয় এবং গোশত টুকরো করতে হয়। উল্লেখ্য যে, আমি যখনকার কথা বলছি তখন আমাদের এলাকায় কেউই ভুঁড়ি খাওয়ার কথা জানতই না। ফলে সবাই পশুর ভুঁড়ি সেখানেই ফেলে রাখত।

কুরবানির দিন আর একটি উপভোগ্য বিষয় ছিল ভুঁড়ি নিয়ে কুকুর এবং শকুনের হুড়োহুড়ি। তখন কোথাও গরু জবাই হলে কিংবা মারা গেলে কী করে যে শকুনেরা জানতে পারত সেটা আমাদের ছোটদের কাছে বিস্ময়ের বিষয় ছিল। মুহূর্তেই অসংখ্য শকুন এসে হাজির হতো। ভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে অল্প সময়েই খেয়ে শেষ করে ফেলত। সেই ভুঁড়ি নিয়ে শকুনে-কুকুরে যেমন ধাওয়া পালটা ধাওয়া চলত, তেমনি আবার শকুনে-শকুনেও মারামারি লাগত। এক শকুন অন্য শকুনকে তাড়িয়ে নিজেই সব খেতে চাইত। এই হুড়োহুড়ি বেশ উপভোগ্য ছিল আমাদের জন্য।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি সে সময়, আর তা হচ্ছে যারা কুরবানি দিতেন তারা পশুর হাড়-হাড্ডি থেকে গোশত ছাড়িয়ে নিয়ে হাড্ডিগুলো ফেলে দিতেন। সেগুলো মজা করে কুকুরেরা খেত। গ্রামের মানুষেরা ভাবত ভুঁড়ি এবং হাড্ডি অখাদ্য। এজন্য বেশ কয়েকদিন পরে দেখতাম হাড় সংগ্রহকারীরা এসে সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। কিন্তু যখন ঢাকায় এলাম, তখন দেখলাম ঢাকার মানুষেরা কিছুই ফেলে না। ভুঁড়ি, হাড্ডি এমনকি খুরাসহ পা পর্যন্ত সবই খেয়ে ফেলে। শহরে শকুনও আসে না। গ্রামে কুরবানির পরও বেশ কয়েকদিন শকুনদের গাছে গাছে অবস্থান করতে দেখতাম।

গোশত তৈরি হলে কিছু অংশ (৩ ভাগের ১ ভাগ) গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে বাড়িতে নিয়ে রান্নার আয়োজন করা হতো। সে বেশ বড়সড় আয়োজন। কারণ আমাদের বাড়িতে প্রায় সব সময় ৫-৭ জন কাজের মানুষ (রাখাল, গাড়োয়ান) থাকত। সবার জন্যই রান্না করতে হতো। রান্না করতেন মা। রান্না শেষে মজা করে আনন্দের সঙ্গে সবাই মিলে খেতে বসতাম। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে কুরবানির গোশত দিয়ে ভাত খাওয়া, সেদিনের আনন্দই ছিল আলাদা। সে দিনগুলোর কুরবানির ঈদ আনন্দ এখন শুধুই স্মৃতি। শহরে সে দিনগুলোর সেই আনন্দের ছিটেফোঁটাও অনুভব করা যায় না। 

গ্রামে পশু ক্রয়, পশু বাড়িতে নিয়ে আসা, দিন কয়েক লালন-পালন করা, গোশত প্রস্তুত করা সবই করেন কুরবানিদাতারা। সে কুরবানির আনন্দই আলাদা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শহুরে কুরবানিদাতার সঙ্গে এ সবের কোনো সম্পর্কই থাকে না। সবই করে বাইরের লোক এবং কসাইরা। গ্রামের পশু কুরবানির সঙ্গে কুরবানিদাতা প্রত্যেকের আত্মার সম্পর্ক থাকে। অনেকে কুরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বহু পূর্ব থেকেই বাড়িতে পশু লালন-পালন করে থাকেন। সবাই মিলে সেই পশুর প্রতি অতিরিক্ত যত্নও নিয়ে থাকেন।

কুরবানির দিন ছোট ছোট ছেলেদের আনন্দের আর একটি দিক ছিল গরু-মহিষের ভুঁড়ির ওপর থাকা পাতলা পর্দা দিয়ে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে বাজানো। এই পর্দা পুরাতন ভাঙা হাঁড়ি-পাতিলের কান্দা বা গলার অংশের ওপরে টান টান করে লাগিয়ে এই বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়। এভাবে বানিয়ে শুকোনোর পর কাঠি দিয়ে আঘাত করলেই শব্দ উৎপন্ন হয়। এভাবে আমরা বেশ কয়েকদিন বানানো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ উপভোগ করতাম ছোটবেলায়। সেটাই ছিল প্রকৃত আনন্দ।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ