কেমন হবে সিক্স জি নেটওয়ার্ক

আইটি কর্নার টি এইচ মাহির মে ২০২৬

প্রযুক্তির স্রােতে বিশ্ব এখন ফাইভ জি নেটওয়ার্কের স্বাদ নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক। একসময় মোবাইল নেটওয়ার্ক শুধু কথা বলার জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন তা ইন্টারনেট, ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। ক্রমেই তা সম্প্রসারণ হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ফাইভ জি নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের গতি দেখে আমরা মুগ্ধ। বিজ্ঞানীরা ও গবেষকরা বলছেন সিক্স জি নেটওয়ার্কও আসছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যেই সিক্স জি নেটওয়ার্ক চালু হবে, যা ফাইভ জি নেটওয়ার্কের চেয়ে কয়েক হাজারগুণ শক্তিশালী হবে। 

সিক্স জি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানার আগে আমাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের জেনারেশন কিংবা বিবর্তন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ১৯৮০-এর দশকে চালু হওয়া ওয়ান জি নেটওয়ার্ক ছিল অ্যানালগ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে। যেখানে শুধু ভয়েস কল করা যেত। ১৯৯০-এর দশকে চালু হওয়া টু জি নেটওয়ার্কে যুক্ত হয় এসএমএস বা টেক্সট ম্যাসেজ সুবিধা। তারপর ২০০০ সালের দিকে আসা থ্রি জি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ হয়। ভিডিও কল সম্ভব করে তোলে। তারপর আসে ফোর জি। যার মাধ্যমে এইচডি ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিংসহ বিভিন্ন অ্যাপ সহজে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে ফাইভ জি প্রযুক্তি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ গিগাবিট পর্যন্ত গতি দিতে পারে এবং স্মার্ট সিটি, ইন্টারনেট অব থিংস ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ির মতো প্রযুক্তিকে সমর্থন করছে। যদিও ফাইভ জি নেটওয়ার্ক সবখানে চালু হয়নি। 

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন শীঘ্রই আসবে সিক্স জি নেটওয়ার্ক, যা ফাইভ জির চেয়ে অনেক শক্তিশালী হবে। গবেষকদের মতে, সিক্স জি নেটওয়ার্কের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ টেরাবিট পর্যন্ত হতে পারে, যা ফাইভ জির তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ দ্রুত। একই সঙ্গে এর ল্যাটেন্সিও হবে অত্যন্ত কম, প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই ডেটা আদান-প্রদান সম্ভব হবে। ফলে এমন অনেক প্রযুক্তি বাস্তবে রূপ নিতে পারবে, যা এখনো কল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।

ল্যাটেন্সি হলো নেটওয়ার্কে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ডেটা পৌঁছাতে যে সময়ের বিলম্ব বা দেরি হয় তা পরিমাপ করা। অর্থাৎ ল্যাটেন্সি যত কম হয় নেটওয়ার্ক তত গতিশীল হয়। আগেই বলেছি, সিক্স জি ১ টেরাবিট পর্যন্ত সেকেন্ডে ডাটা স্থানান্তর করতে পারে। এই তথ্য দিয়েছিলেন ২০২২ সালে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক মাহিয়ার শিরভানিমোগাদ্দাম। তবে ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিজ্ঞানীরা একটি ছোট পূর্ণ-স্পেকট্রাম সিক্স জি চিপ তৈরি করেছেন, যা প্রতি সেকেন্ডে ১০০ গিগাবিট গতিতে ডেটা স্থানান্তর করতে সক্ষম। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ফাইভ জি নেটওয়ার্কগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০০ মেগাবিট ডাউনলোড গতি দিত তাই সিক্স জির ১০০ জিবিপিএস গতিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা এটিকে ফাইভ জির চেয়ে প্রায় ১০ হাজার গুণ দ্রুততর করে তুলবে। একটা ছোট্ট উদাহরণে বোঝা যেতে পারে কেমন হবে সিক্স জি নেটওয়ার্কের গতি। একটি ৩ জিবি ভিডিও ফাইল ডাউনলোড করতে থ্রি জি নেটওয়ার্কে সময় লাগত ২ ঘণ্টা। আবার একই ফাইল ডাউনলোড করতে ফোর জি নেটওয়ার্কে সময় লাগবে ২০ মিনিট। ফাইভ জি নেটওয়ার্কে সেই সময় হয়ে যাবে মাত্র ২ মিনিট। কিন্তু সিক্স জি নেটওয়ার্কে যদি ১ টেরাবিট গতি অর্জন সম্ভব হয় তবে ৩ জিবির ভিডিও ফাইলটি ডাউনলোড করতে ১ সেকেন্ডেরও কম সময় লাগবে। 

বর্তমানে সিক্স জি এখনো পরীক্ষামূলক ও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রযুক্তির সঠিক কার্যপ্রণালি এখনও জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ে কাজ করছে। তবে ধারণক্ষমতা বাড়াতে, ল্যাটেন্সি কমাতে এবং স্পেকট্রাম শেয়ারিং উন্নত করতে এটি ডিস্ট্রিবিউটেড রেডিও অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক (জঅঘ) এবং টেরাহার্টজ (ঞঐু) স্পেকট্রামের আরও বেশি ব্যবহার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই টেরাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ খুব দ্রুত গতিতে বিপুল পরিমাণ ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম। তবে এর একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, এই তরঙ্গ সহজে বাধা অতিক্রম করতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তা ছাড়া সিক্স জি নেটওয়ার্কগুলো সম্ভবত একটি মেশ নেটওয়ার্কিং মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে, যা নেটওয়ার্কের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবে।

কোথায় কোথায় এত উচ্চগতির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হবে তাও গবেষণার বিষয়। বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক কভারেজ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সিক্স জি নেটওয়ার্কে মহাকাশ, আকাশ এবং ভূমির সমন্বয়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে। এতে স্যাটেলাইট, ড্রোন এবং স্থলভিত্তিক টাওয়ার একসঙ্গে কাজ করবে। ফলে পৃথিবীর দূরবর্তী অঞ্চল, সমুদ্র এমনকি মহাকাশেও ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া সম্ভব হবে। সিক্স জি প্রযুক্তি চালু হলে এর ব্যবহারও হবে অত্যন্ত বিস্তৃত। উদাহরণস্বরূপ ভবিষ্যতে হোলোগ্রাফিক যোগাযোগ সম্ভব হতে পারে, যেখানে মানুষ ত্রিমাত্রিক আকারে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে দূর থেকে অপারেশন করা আরও সহজ হবে। স্মার্ট সিটি আরও উন্নত হবে যেখানে ট্র্যাফিক, বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন সেবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এ ছাড়াও স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রোবট এবং শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হবে। শিল্পকারখানায় বিভিন্ন কাজে সিক্স জির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আসতে পারে। যেমন : যেকোনো হুমকি শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, বায়ুর গুণমান পরিমাপ, গ্যাস ও বিষাক্ততা শনাক্তকরণের মতো কাজগুলো আরও দ্রুততর হতে পারে। 

যাহোক, এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এটি নিয়ে কাজ করছে। সিক্স জি সর্বক্ষেত্রে কেমন প্রভাব ফেলবে তা সময়ই বলে দেবে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ