কূপের আত্মা
মূল : সাইয়েদ মোহাম্মদ আলী জামালযাদেহ
ভাষান্তর : মীম মিজানএকটি কূপ। তার পাশেই একটি ফাঁড়ি বা গার্ডঘর। কূপের মুখের পাশে একটি খাট পাতা আছে। ফাঁড়ির দেওয়ালে একটি পেরেকে কিছু পাকানো দড়ি ঝোলানো আছে। খাটটির পাশে একটি বালতি, কিছু পাথর, কূপের মুখ ঢাকার জন্য একটি ঢাকনা আর ঢের কাঠ-কুটা আর হাবিজাবি পড়ে আছে। কূপের ভেতর থেকে একটানা একজন মানুষের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
পাহারাদার সেই খাটে বসে আছে, নিজের খাবারের হাঁড়ি ও জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। মুখে থাকা একটুকরো খাবার সে ধীরে ধীরে চিবোচ্ছে। হঠাৎ কূপের ভেতর কান্না থেমে যায়। প্রহরী চিবোনো বন্ধ করে, ঘুরে কূপের দিকে তাকায়। ঠিক তখনই কূপের ভেতর থেকে আবার চিৎকার ভেসে আসে।
পাহারাদার ধীরে ধীরে আবার চিবাতে থাকে এবং কান পেতে শুনতে থাকে। চিৎকার আরও জোরালো হয়। পাহারাদার খাবার গিলে ফেলে। কূপের ভেতরের চিৎকার কর্কশ হয়ে ওঠে। প্রহরী উঠে দাঁড়ায়, রেগে গিয়ে কূপের মুখে আসে ও ঝুঁকে দেখে। চিৎকার থেমে যায়। এবার কূপের সেই কণ্ঠস্বর করুণ মিনতির সুরে বলে ওঠে-হুজুর, হুজুর, ও হুজুর! পাহারাদার কূপের পাশ থেকে কিছু পাথর ও মাটি কুড়িয়ে নিয়ে কূপের তলার দিকে ছুঁড়ে মারে। এবার কূপের তলা থেকে হুমকির সুরে একটি কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে হায়! হায়! হায়!
একজন পাহারাদার পুরুষ উঠে দাঁড়ায়, ঘড়ির দিকে তাকায় এবং নিজেকে গুছিয়ে নেয়। চারপাশে নজর রাখে। সে দ্বিতীয় পাহারাদারের অপেক্ষায় আছে। কূপের নিচ থেকে আওয়াজ আবার কাতর আর্তনাদে রূপ নেয়। আর্তনাদ থেমে যায়, আবার সংখ্যা ডাকার শব্দ শুরু হয়। পাহারাদার ফিরে আসে, সংখ্যা ডাকার শব্দ আরও জোরালো হয়। সে এগিয়ে গিয়ে কূপে তাকায়। কূপের নিচ থেকে অনুনয় ভরা কণ্ঠ ভেসে আসে-হুজুর, হুজুর ও হুজুর! পাহারাদার ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করে ওঠে-চুপ করো! এবং রাগান্বিতভাবে কূপের মুখের ঢাকনাটি ঘুরিয়ে দেয়। কূপের নিচ থেকে আওয়াজ এবার হুমকির মতো শোনায়। হায়! হায়! হায়!
কিছুক্ষণ পরে কূপের নিচ থেকে কিছু একটা বলে ওঠে। পাহারাদার কূপের ঢাকনার ওপর একটি পাথর রেখে দেয়। নিচ থেকে উঠে আসা আর্তনাদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় পাহারাদার এসে পৌঁছায়। প্রথম পাহারাদার, যার পিঠে ব্যাগ ছিলো, দ্রুত চলে যায়। দ্বিতীয় পাহারাদার তার ব্যাগ খাটের ওপর রাখে, টুপি খুলে রেডি হতে থাকে। কূপের নিচ থেকে এমন করুণ শব্দ আসে যে সে কূপের দিকে মনোযোগ দেয়। সে এগিয়ে যায়। কূপের ঢাকনার ওপরের পাথর সরিয়ে দেয় এবং ঢাকনা খুলে ফেলে। আওয়াজ থেমে যায়, তারপর আবার অনুনয় করে ডাকে-হুজুর, হুজুর ও হুজুর গো!
পাহারাদার ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করে ওঠে-হেই!
কণ্ঠস্বর আবার অনুনয় করে-হুজুর! ও হুজুর!
পাহারাদার উঠে দাঁড়ায় আর নিজের পোটলা খুলে একটি রুটির টুকরো বের করে কূপে ফেলে দেয়। অপেক্ষা করে। আওয়াজ থেমে যায়। সে ফিরে গিয়ে খাটে বসে পড়ে এবং খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
আবার আওয়াজ আসে, অনুনয় করে-হুজুর! হুজুর!
পাহারাদার ফিরে যায়, খাটের নিচ থেকে একটি ফ্লাস্ক বের করে, সেটিতে পানি ভরে ঢাকনা লাগিয়ে কূপের ধারে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে-এই নাও! এবং ফ্লাস্কটি কূপে ফেলে দেয়। আওয়াজ থেমে যায়। সে ফিরে এসে খাবার খেতে বসে।
কূপের নিচ থেকে আবারও আর্তনাদ আসে। পাহারাদার কূপের ধারে যায়। আওয়াজ আসে, অনুনয় করে-হুজুর! হুজুর!
সে চিৎকার করে-এই!
কূপের নিচ থেকে আওয়াজ: হুজুর! হুজুর! ও হুজুর! পাহারাদার উঠে দাঁড়ায়, কিছু একটা ভাবতে থাকে। সে ফিরে গিয়ে দড়ির ফাঁসটি দেখার জন্য যায়, আবার ঝুঁকে পড়ে কূপে চিৎকার করে-এই নাও! এই নাও! এই নাও!
নিচ থেকে আবার অনুনয় ভরা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে-হুজুর! হুজুর! ও হুজুর!
পাহারাদার এগিয়ে যায় এবং দ্বিধার সঙ্গে পেরেক থেকে দড়িটা খুলে আনে। সে ভাবে, চারপাশে তাকায়, তারপর দড়িটা কূপে ঝুলিয়ে দেয়। কূপের আওয়াজ ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে-খুশি হইছি, আশা পাচ্ছি এবং কৃতজ্ঞ-হুজুর! হুজুর! ও হুজুর!
পাহারাদার লোকটি দড়ি টেনে তুলতে শুরু করে। কষ্ট করে দড়িটা ওপরে তুলছে।
কূপের আওয়াজ ধীরে ধীরে বদলায়-খুশি হইছি, আশা পাচ্ছি, কিন্তু এখন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ ও হুমকিসূচক আওয়াজ আসে-হুজুর! হুজুর! হুজুর! হুজুর!
এক জোড়া বিশাল হাত কূপের মুখে ভেসে ওঠে। পাহারাদার দিশেহারা হয়ে আতঙ্কে কূপের দিকে তাকায়। হঠাৎ সে দড়িটা ছেড়ে দেয় এবং কোনো উপায় খুঁজে বের করতে চায়। এক দানব জোর করে নিজেকে কূপের মুখ দিয়ে টেনে তোলে। পাহারাদার দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়। দানবটি ঝুঁকে মাটি থেকে একটি লাঠি হাতে তুলে নেয় আর অট্টহাসি ছড়িয়ে পাহারাদারকে তাড়া করতে থাকে।
শিক্ষণীয় বিষয় : জালেম বা অত্যাচারী এবং অহংকারী ব্যক্তিরা কখনোই শুধরায় না। তাদের থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
লেখক পরিচিতি: ফারসি ছোটগল্পের জনক সাইয়েদ মোহাম্মদ আলী জামালযাদেহ(১৮৯২-১৯৯৭) ইরানের ইস্ফাহানে জন্মগ্রহণকারী একজন পরিশ্রমী লেখক। নোবেল পুরষ্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় নামভুক্ত হয়েছিলেন তিনি। দুইশত ত্রিশটি গ্রন্থের লেখক জামালযাদেহ একজন গবেষক, অনুবাদক, নাট্যকার, জীবনীকার, ভ্রামণিক ও ভাষা সংরক্ষণকারী। মাত্র ১২ বছর ইরানে কাটিয়েছিলেন তিনি। অতঃপর বৈরুত হয়ে, মিশর, লুসান, ফ্রান্স, বার্লিন শেষে জেনেভায় থিতু হন। সম্পাদনায় পোক্ত জামালযাদেহ ১৯২১ সনে ফারসি গদ্য সাহিত্যে ফারসি শেকার আস্ত বা ফারসিই চিনি গল্প লিখে ফারসি সাহিত্যের পাঠকদের ঠোঁট ও মননকে মিষ্টি করে দিয়েছেন। তাঁর হাতে প্রারম্ভ পেয়ে ছোটগল্প আজ বিশ্বমানে উত্তীর্ণ হয়েছে। কূপের আত্মা গল্পটি লেখকের রুহে চ’হ নামক গল্পের ভাষান্তর।
আরও পড়ুন...