জুলাই বিপ্লব : শহর থেকে গ্রাম
জুলাই-নিবন্ধ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারি জুলাই ২০২৬
জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন হচ্ছে বাংলাদেশে একটি গণঅভ্যুত্থান যা ২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দুই হাজার প্রাণ কুরবানি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।
এই আন্দোলন রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামের অজপাড়াগাঁ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল, প্রসারিত ছিল মেঠো পথের বাঁকে বাঁকে। আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মফস্সল জেলা শহর সাতক্ষীরা।
২০২৪ সালে সাতক্ষীরায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় অমলিন। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের বাধা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ১৩ জুলাই থেকে আন্দোলন সংগঠিত করে এবং ১৫-১৬ জুলাই থেকে তীব্র রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে পুলিশ গুলি ও লাঠিপেটা করলেও শিক্ষার্থীরা সাহস নিয়ে রাজপথ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
আন্দোলনের মূল ঘটনাপ্রবাহ
২০২৪ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও সরকারদলীয় সংগঠনের হামলার ফলে আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা এবং ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুতে আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রামে। ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরাতেও।
সাতক্ষীরার ছাত্র-জনতা পালন করে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি।
কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শুরু হয় ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও লাঠিচার্জের মতো ঘটনা। এতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্টারনেট ও যোগাযোগ
সরা দেশের মতো সাতক্ষীরাতেও ইন্টারনেট ধীরগতির প্রভাব পড়ে। আন্দোলনের খবর আদান-প্রদানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে সময়। ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে। সাতক্ষীরার কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও নাট্যকর্মীদের কেউ কেউ প্রতিবাদী গান, কবিতা আবৃত্তি ও পথনাটকের মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করে। এতে আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক রূপও পায়।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও কর্মসূচিতে সমর্থন জানাতে দেখা যায়। কিছু এলাকায় দোকানপাট আংশিক বন্ধ রেখে সংহতি প্রকাশ করে তারা।
ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় সাতক্ষীরার পরিস্থিতি নিয়ে সীমান্ত এলাকাতেও আলোচনা তৈরি হয়। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সাতক্ষীরা আন্দোলনের নেতৃত্ব
জুলাই আন্দোলনে সাতক্ষীরায় কোনো একক সংগঠন পুরো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়নি; বরং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণ করে। স্থানীয়ভাবে যেসব সংগঠন ও গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বেশি দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে ছিল-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ শিক্ষার্থী সমাজ, বিভিন্ন বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত জোট, এ ছাড়া স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, যারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষক, অভিভাবক ও পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরাও সংহতি জানান এই আন্দোলনে।
তবে আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল-এটি অনেকাংশে বিকেন্দ্রীভূত ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাই সব কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব কাঠামো সব সময় প্রকাশ্যে ছিল না।
জুলাই আন্দোলনে সাতক্ষীরার শহীদ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাতক্ষীরার অন্যতম শহীদ হলেন আসিফ হাসান। তিনি নর্দান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আন্দোলনের মিছিল চলাকালীন শহীদ হন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আহত সহযোদ্ধাকে পানি খাওয়াতে টেনে তুলতে গিয়ে নিজেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন সাতক্ষীরার ছেলে আসিফ হাসান (২১)।
নর্দান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার আস্কারপুর গ্রামের ছেলে।
ঢাকা উত্তরার উত্তপ্ত সড়কে আন্দোলনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মোবাইলে আসিফ মাহমুদ বোনকে বলেছিলেন-আপা, আমি ঠিক আছি। পুলিশ শুধু ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছে। আমাদের এক ভাই গুলিবিদ্ধ, ওকে পানি খাওয়াতে যাচ্ছি। সেই ভাইকে আর পানি খাওয়ানো হয়নি আসিফের। পানি খাওয়ানোর জন্য আহত সহযোদ্ধাকে টেনে তুলতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হন আসিফ। কিছুক্ষণ পরে তাঁকে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শহীদ আসিফের বাবা মাহমুদ আলম ও তাঁর মা শিরীন সুলতানার হৃদয় ক্ষত হয়ে চোখে নেমে এসেছিল কান্নার শ্রাবণধারা।
তিনি সেদিন অস্ফুট স্বরে বলছিলেন-আমার আসিফকে আন্দোলনে পাঠিয়েছিলাম। সবাই ফিরেছে, ফিরেনি শুধু আমার পাগল আসিফ! আগের দিন রাতে ও আমাকে বলেছিল, মা, একটু ঘুম পাড়িয়ে দাও না! আমি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। কে জানত, এটাই হবে ওর শেষ ঘুম? সকালে আন্দোলনে গিয়ে আর ফিরে আসেনি আমার আসিফ।
আসিফের জমজ ভাই সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ছাত্র রাকিব হাসান বলেন, পুলিশের গুলিতে ভাই মারা গেছে প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। আমার ভাইয়ের অনুপস্থিতি বড়ই কষ্টদায়ক, বড়ই বেদনার। সে ছাড়া আমার পরিবার ভালো নেই। সবাই আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।
জুলাই ঐক্য সংসদ গঠন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাতক্ষীরার রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলেন। তাদের একই প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও ঐক্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সাতক্ষীরায় আত্মপ্রকাশ করে নতুন অরাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন ‘৩৬ জুলাই ঐক্য সংসদ’।
৪ আগস্ট ২০২৪ বিকেল সাড়ে ৫টায় শহরের শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির ঘোষণা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএফএল গবেষক আব্দুর রহিম। সঞ্চালনা করেন সাবেক সাতক্ষীরা জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. নাজমুল হোসেন রনি। এতে সর্বসম্মতিক্রমে আব্দুর রহিমকে আহ্বায়ক এবং সাবেক সাতক্ষীরা জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব সোহাইল মাহাদিনকে সদস্য সচিব করে সেদিন ৩৬ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
৪ আগস্টের সাতক্ষীরা
৪ আগস্ট ২০২৪ (রবিবার) সাতক্ষীরার রাজপথে দখল নেয় ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা শহরের খুলনা রোড মোড় থেকে ছাত্র-জনতার এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে নিউ মার্কেট মোড় এলাকায় অবস্থান নেয়।
আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল সহকারে আবারও খুলনা রোড মোড়ে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।
বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে এ সময় তারা স্লোগান দেয়, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘এক দফা, এক দাবি, শেখ হাসিনা কবে যাবি’-এমনই নানা স্লোগানে প্রকম্পিত হয় সাতক্ষীরা শহর।
মিছিল ও সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে যুক্ত হন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
এ সময় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবসহ বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। এর আগে রাতভর চলে বাড়িতে বাড়িতে এবং বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। এতেও দমন করতে পারেনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
একপর্যায়ে খুলনা রোড মোড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এক দফা দাবিতে সারা বাংলাদেশের মতো সাতক্ষীরার রাজপথও তখন মিছিলে মিছিলে ছিল উত্তাল।
৫ আগস্টের সাতক্ষীরা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দিনটি ছিল সোমবার। এদিন সকাল থেকে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামে ছাত্র-জনতার ঢল। দুপুর আড়াইটা নাগাদ আন্দোলনরত অবস্থায় শিক্ষার্থীরা খবর পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশ ছেড়ে হেলিকপ্টার যোগে ভারতে পালিয়েছেন। এরপরই বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েন দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্যাতনের স্বীকার সাতক্ষীরায় থাকা হাজার হাজার মানুষ। মায়েরা সন্তানকে কোলে নিয়ে, অনেক বাবা সন্তানকে কাঁধে নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে সাতক্ষীরা সড়কে নেমে আসে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র সরগরম হয়ে ওঠে। পথে পথে বিতরণ করেন মিষ্টি। এ সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ পায়ে হেঁটে, সাইকেল, ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সাতক্ষীরা শহরের দিকে ছুটতে থাকে। মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো সাতক্ষীরা। অনেকেই বলেন, দেশ আবার নতুন করে স্বাধীন হয়েছে। এ এক নতুন উদ্দীপনা, নতুন স্বাধীনতা, নতুন বাংলাদেশ।
সেদিন শিক্ষার্থীরা বলেছিল-ভাষা আন্দোলন দেখিনি, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দেখেনি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, দেখলাম ২০২৪-এর উত্থান।
২০২৪ জুলাই বিপ্লবের গণঅভ্যুত্থান দেখে মনে করেছি দেশ আবার নতুন করে স্বাধীন হয়েছে। মানুষের মধ্যে তেমনই আনন্দ উল্লাস বিরাজ করেছে। সেদিনের সেই স্মরণীয় মুহূর্ত আজও হৃদয়ে অমলিন। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে কাল থেকে কালান্তরে।
চব্বিশের জুলাই তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এটি প্রমাণ করেছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনতা ঐক্যবদ্ধ হলে স্বৈরাচারী শাসনের পতন অবশ্যম্ভাবী।
আরও পড়ুন...