লাল টকটকে জুলাই

জুলাই-নিবন্ধ কামরুল আলম আগস্ট ২০২৫

‘মাগো আমায় দাও পরিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সাজ

বন্ধুরা যে চেয়ে আছে আমার পানে আজ।’

বিখ্যাত গীতিকার ড. আ জ ম ওবায়দুল্লাহর লেখা গানের কলির মতোই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে আবদার করল তাহমিদ। গীতিকার ওবায়দুল্লাহ গানটি লিখেছিলেন ফিলিস্তিনের শিশুদের নিয়ে। সময়ের পরিবর্তনে বাংলাদেশের মাটিতেও যে এমন অমানবিক ঘটনা ঘটবে তা হয়তো গানটির গীতিকারো কখনোই কল্পনা করেননি। তাহমিদ ওর মায়ের কাছাকাছি গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলল, আম্মু, ও আম্মু!

কী রে কী হয়েছে? কিছু বলবি?

হ্যাঁ আম্মু! আমাকে অনুমতি দাও।

অনুমতি? কীসের অনুমতি?

মিছিলে যাব, আম্মু। আমাকে অনুমতি দাও।

না! খবরদার! এমন কথা মুখেও আনবি না। দেখিসনি কীভাবে পুলিশের গুলিতে নিহত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা!

দেখছি তো মা। আমার বন্ধুরাও তো ওখানে আছে। 

থাকুক। আমি তোকে যেতে দেবো না, বাবা! 

তাহমিদকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন মা। 

নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার ছেলে তাহমিদ। নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণির ছাত্র। তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়ো তাহমিদ। কদিন থেকে সারা দেশে চলছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলন। সারা দেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই আছে। সরকার আন্দোলন ঠেকাতে ঘনঘন দীর্ঘমেয়াদি কারফিউ জারি করছে। সারা দেশে একধরনের যুদ্ধাবস্থাই বিরাজ করছে। ছাত্রদের এ আন্দোলনটি ২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে শুরু হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে সরকার এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। তাহমিদের মা জানেন, এ আন্দোলনে যারা সরাসরি অংশ নিচ্ছে, তাদের অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে। অনেকে আহত হয়ে ফিরে আসছে। কেউবা চিরতরে পঙ্গুত্বকে বরণ করছে। এমন এক আন্দোলনে তাহমিদকে কীভাবে পাঠাবেন তিনি!

ওহ আম্মু! তুমি আমাকে কোথাও যেতে দাও না। ঘরে বসিয়ে রাখতে চাও।

চুপ কর বাবা, তুই চুপ কর। আমি তোকে হারাতে পারব না। 

তাহমিদের মায়ের মনে সন্তান হারানোর আশঙ্কা দানা বেঁধে উঠতে থাকে। আর উঠবেই-বা না কেন? এই তো গতকালই আবু সাঈদ নামে রংপুর ভার্সিটির এক ছাত্র পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল গুলি করার জন্য। কী আশ্চর্য! পুলিশ ছেলেটির বুকে গুলি করতে করতে ঘটনাস্থলেই হত্যা করে। এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আজ আবার ছাত্ররা সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ কর্মসূচির সমর্থনেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছে। প্রতিদিন অনেক লাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবুও থামছে না আন্দোলন। 

মায়ের অনুমতি না পেয়ে তাহমিদ বাবার কাছে গেল। আব্বু আমাকে অনুমতি দাও! আমি মিছিলে যাব। সরাসরি আবদার করল সে। 

ছেলের কথায় দুটি চোখ ছলছল করে উঠল বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার। তাহমিদ তার আদরের বড়ো ছেলে। মাত্র চৌদ্দ পেরিয়ে পনেরোতে পা রেখেছে ছেলেটি। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে সারাক্ষণ। আজ দেশের এই পরিস্থিতিতে মিছিলে যাওয়ার অনুমতি চাচ্ছে সে! সকাল থেকে তাহমিদদের বাসার মাত্র ৫০০ গজ দূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নরসিংদী শহরের জেলখানার মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে। তাহমিদের আবদার শুনে অনেকক্ষণ ভাবলেন বাবা। তারপর চোখ মুছলেন। বললেন, চল বাবা, আমিও যাব তোর সাথে!

বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার হাত ধরেই আন্দোলনে যোগ দেয় তাহমিদ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে স্লোগান ধরে সে। ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা।’ ‘এক দুই-তিন চার, খুনি হাসিনা স্বৈরাচার।’ ‘খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনি তোদের রক্ষা নাই।’ অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে বাবা আন্দোলনের এ দৃশ্য দেখে গর্ববোধ করেন। দেশের জন্য, শিক্ষার্থীদের জন্য ছেলেটা স্লোগান ধরেছে তার। গর্বে বুকটা ভরে যায় রফিকুল ইসলামের। 

একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া শুরু হয়। রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এদিক-ওদিক ইতিউতি তাকান। তার পুত্রধন তাহমিদও যে সংঘর্ষের মাঝখানে আছে। কীভাবে ফেরাবেন ওকে? যদি গুলি লেগে যায়! পুলিশ অনবরত এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে মিছিলের ওপর। হঠাৎ পুলিশের ছোঁড়া একটি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাহমিদের বুক। ঘটনাস্থলেই মারা যায় সে। 

তাহমিদের বাবা কোনোমতে ছেলের লাশের দিকে দৌড়াতে থাকেন। কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাহমিদের লাশ স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। রফিকুল ইসলাম আশা করেছিলেন হয়তো ছেলে এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু না, তাহমিদ তো গুলি বুকে বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথেই জান্নাতের পাখি হয়ে গেছে! 

এদিকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা তাহমিদের লাশ নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ নরসিংদীর রাজপথে মিছিল শুরু করে। এ সময় শহীদ মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামের মূল ফটকের শহীদ মিনারের সামনে আন্দোলনকারীরা স্বৈরাচারবিরোধী সেøাগান দিতে থাকে। পুলিশ তখন আবারও অনবরত গুলি চালাতে শুরু করে। তারা এমনকি তাহমিদের লাশের ওপরও গুলি চালায়।

নিজের ছেলের লাশের ওপর গুলি ছুঁড়তে দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষার্থে লাশ ফেলে রেখে নিকটবর্তী মসজিদে ঢুকে পড়ে। তারা তাহমিদের বাবাকেও টেনে নিয়ে যায় মসজিদে। তাহমিদের বাবা নিজের ছেলের লাশ রাস্তায় ফেলে আশ্রয় নিয়েছেন মসজিদে! আহা কী কষ্ট! কী অমানবিক ঘটনা!

রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া নিজের অজান্তেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তার কলিজা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। বুক ফেটে আর্তনাদ বের হতে চাচ্ছে। তিনি ঢোক গিলতে পারছেন না। অন্তর থেকে আল্লাহর নিকট দোয়া করতে লাগলেন তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে থেকেই।

হে আল্লাহ! দয়াময় প্রভু আমার। তুমি তো দয়ার সাগর। আমার তাহমিদ চলে গেছে তোমার সান্নিধ্যে। আমি বিশ^াস করি তাহমিদকে তুমি জান্নাতের বাগানে নিয়ে গেছ। রাস্তায় যেটা রেখে এসেছি মাবুদ সে তো ওর লাশমাত্র। লাশের ওপরেও গুলি করেছে হায়েনারা! ইয়া রাব্বি! আমার ছেলের লাশ নিয়ে ঘরে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করে দাও প্রভু। আমাদের সাহায্য করো মাবুদ। এই দেশটাকে তুমি রক্ষা করো। জালিম, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট ডাইনি-খুনি হাসিনার তুমি পতন ঘটাও প্রভু। পতন ঘটাও এ যুগের এই ফেরাউনের। 

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে তাহমিদের লাশ নিয়ে ঘরে ফেরেন বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। নিজের ছেলেকে লাশ হয়ে ফিরতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাহমিদের মা। একটু আগেও ছেলেকে তিনি বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, যাসনে বাবা! আহা নাছোড়বান্দা ছেলে আমার। ছেলের লাশের ওপর মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। 

তাহমিদের ছোটো বোন লিনাত ভূঁইয়াও ‘ভাইয়া’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহমিদের লাশের ওপর। একটু আগেও দুই ভাই-বোন মিলে বিছানায় শুয়ে মোবাইল ফোনে খেলছিল। ভাইটা মিছিলে গেল মাত্র, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলো লাশ হয়ে। এ-ও কি মেনে নেওয়া যায়? 

কিছুক্ষণ পরেই তাহমিদের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো তার স্কুলে। সেখানে জানাজার নামাজ হলো। এরপর চিনিশপুর ঈদগাহের মাঠে আবারও জানাজা হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ জানাজায় শরিক হলেন। সবার অন্তর থেকে একটা দোয়া বের হচ্ছিল, এই জালিম-খুনি সরকারের পতন ঘটাও মাবুদ, পতন ঘটাও। মজলুমের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। মাত্র ১৮ দিন পর ৩৬ জুলাই স্বৈরাচার-জালিমের পতন ঘটল। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে গেল বাংলাদেশের লেডি ফেরাউন শেখ হাসিনা। নতুন এক ইতিহাস তৈরি হলো। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেছিল আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হবে না। তাইতো আগস্টের এক তারিখকে তারা ঘোষণা করে ৩২শে জুলাই। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্টের নাম হলো ৩৬শে জুলাই! হাজারও শহীদের তাজা রক্তে লাল টকটকে জুলাই।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ