জীবন গঠনে মাহে রমজান
বিশেষ রচনা এস. এম রুহুল আমীন ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রহমত, বরকত, নাজাত ও সওগাতের মাহে রমজান। ইসলাম পাঁচটি বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাঁচটি বুনিয়াদই আলাদা আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। তার মধ্যে রোজা আবার একটু স্পেশাল। রমজানকে এজন্য বলা হয় মুমিন জীবনের বসন্তকাল। এ মাসটি যেমন সম্মানিত, তেমনই বেশ তাৎপর্যময় এবং ফজিলতপূর্ণ। এ মাসের পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা হাদিসে কুদ্সিতে বলেন, “মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা ছাড়া, তা শুধুই আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেবো।” (বুখারি : ১৯০৪)
অসংখ্য নিয়ামত, বরকত, ও মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসকে অন্যান্য সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এ মাসেই মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয়েছে। এ মাসের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
রোজা কী?
আরবি শব্দ ‘সাওমুন’-এর বহুবচন হচ্ছে ‘সিয়াম’। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। আরবি সাওমের ফারসি শব্দ হচ্ছে রোজা। আভিধানিক অর্থে রোজা সাওমের সমার্থবোধক না হলেও পারিভাষিক অর্থে ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় সাওমের জায়গায় ‘রোজা’ শব্দটিই ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। শরিয়তের পরিভাষায় রোজা হচ্ছে, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, সকল প্রকার অন্যায় অপরাধ, মিথ্যা কথা, অনর্থক কথা-কাজ তথা আল্লাহর নিষেধ করা যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকা।
যুগে যুগে রোজা
রমজান ও রোজা ছিল যুগে যুগে সকল জাতির জন্য। আদি পিতা আদম (আ) থেকে নুহ (আ) পর্যন্ত প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখ রোজা পালনের বিধান ছিল। একে বলা হতো আইয়ামে ‘বিজ’, যা এখনো আমাদের জন্য সুন্নাত। মুসা (আ)-এর সময় মুসা (আ)-এর তুর পাহাড়ে অবস্থানের স্মৃতির স্মরণে চল্লিশ দিন সাওম পালনের নির্দেশ ছিল। দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসের দুই তারিখে সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মুসলিম উম্মাহ তথা উম্মাতে মুহাম্মাদির নারী-পুরুষের ওপর রমজানের এক মাস রোজা ফরজসংক্রান্ত কুরআনের বিধান নাজিল হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “রমজান মাস; যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, মানুষের হিদায়াত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী গাইডলাইন হিসেবে। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন রোজা পালন করে।” (সূরা আল বাকারা : ১৮৫)
সুতরাং বোঝা গেল আমাদের ওপরই কেবল রোজা ফরজ করা হয়নি; বরং পূর্ববর্তী সকল নবী, রাসূল ও তাদের অনুসারীদের ওপরও বিভিন্ন সংখ্যা ও নিয়মে রোজা ফরজ ছিল।
রোজার আসল উদ্দেশ্য
তোমরা অবশ্যই জানো, উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তেমনি আল্লাহ তায়ালাও উদ্দেশ্য ব্যতীত রোজা ফরজ করেননি। রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, সম্ভবত তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।” (সূরা আল বাকারাহ : ১৮৩)
রোজার ফজিলত ও মর্যাদা
কুরআন সুন্নাহ ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান পর্যালোচনা করলে ফুটে ওঠে রোজার বহুবিধও ফজিলত ও মর্যাদা। রোজা পালন করলে পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমজানের সাওম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়।” (বুখারি ও মুসলিম)
রোজা কিয়ামতের দিন সায়েমের জন্য সুপারিশ করবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “সাওম এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা পালনকারী রাইয়ান নামক স্পেশাল দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। নবী (সা) বলেন, “জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে, যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন শুধু রোজা পালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।” (বুখারি : ১৮৯৬)
এসো পরিকল্পনা করি
বন্ধুরা, আমাদের তো জানা আছে অ এড়ড়ফ চষধহ রং যধষভ ফড়হব ধহফ নৎরহমং ধ মড়ড়ফ ৎবংঁষঃ. তাহলে আর দেরি নয়, এবারের রোজা আমরা পালন করব পরিকল্পনামাফিক, অর্জন করব বেশি সাওয়াব। রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই এসো, আমরা সুন্দর একটি পরিকল্পনা করি।
প্রথমত, রমজানের আগে করব : রজব ও শাবান মাসে দোয়া পড়ব-আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রমাদান। ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতপূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে রমজান মাসে পৌঁছে দিন।’ শাবান মাসে রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রাখব। একনিষ্ঠ অন্তর ও বিশুদ্ধ নিয়তে রোজা রাখার প্রস্তুতি নেব।
দ্বিতীয়ত, রমজানের মধ্যে করব : মিথ্যা ও অশ্লীলতা পরিত্যাগ করব। অধীনস্থ ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব হালকা করে দেবো। বেশি বেশি সবর করব, কারণ এটি সবরের মাস। পরস্পর সহৃদয়তা ও সৌজন্যতা প্রদর্শন করব। রোজাদারকে ইফতার করাব। কুরআন ও হাদিসের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করব। অভাবগ্রস্তদের মধ্যে পোশাক বিতরণ করব। তারাবির নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করব। কিয়ামুল লাইল বা সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করব। ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন ও বিতরণ করব। তাওবা ও ইস্তিগফার করব। বেশি বেশি নফল ইবাদত করব। রমজানের শেষ দশ দিন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করে ইতিকাফ করব। লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করব। অতিরিক্ত কথা বন্ধ এবং ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হব না। বেশি বেশি দান-সাদাকা করব। সাধারণত রমজান মাসে ইবাদত-বন্দেগিও সৎকর্মের জন্য আমলকারীকে দশগুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত প্রতিদান দেওয়া হয়। তবে রোজার প্রতিদান বিনা হিসেবে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “মানবসন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু সিয়াম ছাড়া। কেননা সিয়াম শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেবো।” (বুখারি : ১৯০৪)
রমজানে আমরা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি বিশেষ অনুগ্রহ যে, রোজা পালনে যে সকল অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে, তার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায়ের বিধান দিয়েছেন। সাথে সাথে দরিদ্র অসহায় ও অনাহারক্লিষ্ট মানুষেরা যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে সে উদ্দেশ্য পূরণ করাই ‘সাদাকাতুল ফিতরের’ লক্ষ্য।
“রাসূল (সা) ঈদের সালাত পড়ার পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।” (বুখারি : ১৫০৯)
তৃতীয়ত, রমজানের পরে করব : সবাইকে নিয়ে ঈদ পালন করব। আমরা সকলেই জানি, বাংলা অভিধানে ঈদ অর্থ খুশি, আনন্দ, উৎসব এবং উল্লাস ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, আসলে খুশি কার জন্য? যে রমজানে তার সব গুনাহ মাফ করে নিতে পেরেছে। রমজান পর আমরা শাওয়ালের রোজা রাখব। রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখল সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।” (মুসলিম : ১১৬৪)
রাসূল (সা) আরও বলেন, “রমজানের রোজা দশ মাস রোজা রাখার সমান, আর শাওয়ালের ৬ রোজা দুই মাস রোজা রাখার সমান। এটাই রোজার সুন্নাত। অর্থাৎ রমজানের ৩০ রোজা এবং ৬ রোজা রাখা।” (আহমাদ : ২২৪১২)
রোজায় অর্জিত দৈনন্দিন অভ্যাস, স্বভাব সর্বোপরি চারিত্রিক পরিবর্তন অব্যাহত রাখব।
রোজা ত্যাগকারীর শাস্তি
রোজ রাখলে যেমন অনেক সাওয়াব, না রাখলেও রয়েছে ভীষণ শাস্তি। কেউ যদি আলসেমি করে রোজা পালন না করে, তাহলে তার জন্য আখিরাতে রয়েছে ভয়াল ও কঠিন শাস্তি।
কাজেই এসো বন্ধুরা, রোজা আর ছেড়ে দেওয়া নয়। তালিম তারবিয়াতের মাধ্যমে আত্মগঠনের মাসকে সত্যিকারের ট্রেনিং হিসেবে গ্রহণ করি। সুন্দর পরিকল্পনার আলোকে নতুন জীবনের আদর্শ কর্মসূচির মাধ্যমে অর্জন করি প্রত্যাশিত তাকওয়া। অতীত জীবনের সব গুনাহ মাফ করিয়ে নিই মহামহিম রবের কাছ থেকে। কিয়ামতের দিন কুরআন ও রোজাকে সুপারিশকারী বানিয়ে, কুরআন সুন্নাহর চেতনাকে ধারণ করে রোজার শিক্ষা নিয়ে পথ চলি জীবনভর। আর প্রবেশ করি জান্নাতের স্পেশাল দরজা রাইয়ান দিয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসে। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। হ
আরও পড়ুন...