আমাদের জুলাই বিপ্লব

জুলাই-নিবন্ধ হাসনাতুল ইসলাম ফাইয়াজ আগস্ট ২০২৫

জুলাই। শব্দটা আগে স্রেফ একটা মাসের নাম থাকলেও এখন একটা দীপ্তিময় আবেগের নাম। যেন শব্দটার চারপাশ জুড়ে আছে একই সাথে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মতো উত্থান-পতনের সব স্মৃতি। জুলাই আমাদের মনে এই স্পিরিট সঞ্চার করে যে, আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্যের কারণে মাত্র ৩৬ দিনেই একটি জুলুমবাজ শক্তি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

জুলাই বিপ্লব ছিল ৩৬ দিনের। আর আমি ফাইয়াজের জন্য ছিল প্রধানত ২০ দিনের। এই ২০ দিনের ১৩ দিনই কাটিয়েছিলাম কারাগারের বিভীষিকাময় ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

আমাদের তখন এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছিল এবং সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। ১৬ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখতে পাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের উদ্যোগে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ৬ জন শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন। নিউজফিডে শহীদ আবু সাঈদ ভাইয়ের অন স্পট শাহাদাতের ভিডিওটি দেখে গায়ে কাঁটা দিয়েছে। এরপরে অনেকক্ষণ কান্না করেছিলাম। স্বাভাবিক কোনো মানুষের পক্ষে সে দৃশ্য সহ্য করা কঠিন ছিল।

কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলে তখন অনেক কথা চলছিল। আবু সাঈদ ভাইয়ের ঘটনার পর আমরা বন্ধুরা, এলাকার ভাইয়েরা মিলে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার চিন্তা-ভাবনা করি। পরিকল্পনা করি আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করার। পরিকল্পনামাফিক পানি দিয়ে, খাবার দিয়ে, ফার্স্ট এইড দিয়ে আমরা রাজপথে লড়াইরত ভাই-বোনদের সাপোর্ট দিতে থাকি। আমাদের শিক্ষকবৃন্দ, স্থানীয় বড়ো ভাইয়া, মুরুব্বিরা কখনো ফ্রিতে পানি কিনে দিয়ে, কখনো দোকানদার বিস্কিটের টাকা কম রেখে, কখনোবা টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কিনে দিয়ে সাপোর্ট দিয়েছিলেন তখন। 

আমরা যেখানে যুক্ত হয়েছিলাম সেখানে দেখেছিলাম এ আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তারা সব বাধাকে তুচ্ছ হিসেবে নিচ্ছিল। শক্ত মানসিকতা নিয়ে ছিল। দুপুরের প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও তাদের স্লোগান বন্ধ হতো না, ঘর্মাক্ত শরীর নিয়েও ক্লান্ত হতো না, টিয়ারশেলেও পিছপা হতো না।

এই প্রতিবাদী আন্দোলনে যখন যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল অঞ্চলের রাজপথে সবার সহযোগিতার জন্য অবস্থান করতাম, তখন দিন যেত ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে। কিছুক্ষণ পরপরেই আহত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হতো, যাদের অবস্থা থাকত বেগতিক। কারো অবস্থা অনেক খারাপ। এমন রক্তাক্ত মুমূর্ষু অবস্থায় কাউকে কখনো এর আগে আমার দেখা হয়নি। হঠাৎ করে দেখলাম সামনে একজন মারা গেছে। নিথর শরীরটা রাস্তায় পড়ে আছে। তাঁর শার্ট নিয়ে একজন সবাইকে দেখাচ্ছিল তার শার্টের মাঝখানে বুলেটের ছিদ্র হয়ে আছে এবং রক্তের দাগ। আমার কাছে অবাস্তব লাগছিল বিষয়গুলো। কিন্তু রাস্তা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারতাম না, ভাইদের ফেলে আসার কথা চিন্তা করতে পারতাম না।

এরপর দেখা গেল সেদিন পুরো যাত্রাবাড়ী স্পটে আরও অনেক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং ১০-১২ জনের মতো শহীদ হয়েছিল। তবু টানা আন্দোলনে যুক্ত থেকেছিলাম আমরা। আর এই সময়ে আমাদের ভাইদের ওপর আকাশ-পাতাল সব দিক থেকে হামলা অব্যাহত রেখেছিল হায়েনারা। হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করেছে, গ্রেনেড মেরেছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে সকল তথ্য আমাদের কাছ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আমরা সে মুহূর্তে জানতেও পারিনি সারা দেশে কী পরিমাণ হতাহত হচ্ছিল। যেখানে আমাদের একটা স্পটেই এতজন মারা গেল আমাদের সামনেই সেখানে বাকি অঞ্চলের কথা ভাবাও যাচ্ছিল না। তাও আমরা বিচলিত হইনি, দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে থেকেছিলাম।

তাদের হত্যাযজ্ঞের পরিমাণ বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কারফিউসহ এলাকায় এলাকায় ব্লক রেইড চলায় আন্দোলনে কন্টিনিউ করতে পারিনি দুই দিন।

সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন আন্দোলনে যাই। একদিন স্থানীয় দোসরদের চোখে পড়ে গেলাম। তারা স্থানীয়ভাবে একটা তালিকা করে সেখানে আমার নামও উল্লেখ করেছিল। আন্দোলনের উত্তপ্ত সময়ে আমরা ফ্রেন্ড সার্কেলসহ ওই স্পটের বড়ো ভাইদের পানি ও খাবার বিতরণ করতাম। আমাদের তারা আন্দোলনের সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তারা ধারণা করত আমরা তার চেয়েও বড়ো কিছু করছি। পাশাপাশি আন্দোলন চলাকালীন আমি প্রায়শই স্লোগান দিয়ে সবাইকে উজ্জীবিত করতাম এটাও তাদের পছন্দ হয়নি। এ সকল কারণ বিবেচনায় আমি তাদের টার্গেট হই বলে ধারণা করি।

তাদের তালিকায় আমার নাম থাকায় ২৪ জুলাই, ২০২৪ রাতে পুলিশ আমাকে বাসায় এসে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তারা আমাকে রায়েরবাগে নিয়ে গিয়ে আমার ফোন দিয়ে বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকবৃন্দ এবং আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা রাশেদ ভাই, মাসরুর ভাই এবং আসিফ ভাইকে ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু আমি তাতে সাড়া দিইনি। এতে তারা চরম ক্ষিপ্ত হয়।

আমাকে থানায় নিয়ে টর্চার শুরু করে। রাত ১২টা তখন, আমাকে একটা মামলার মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার জন্য তারা জোর করে, যেখানে তারা কয়েকজনকে উপস্থিত করবে এবং আমাকে বলতে হবে যে, হ্যাঁ, এরা অমুক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। আমি যখন বলি যে, ‘আমি যা করিনি, যা দেখিনি, সেই সাক্ষ্য কেন দেবো?’ তখনই আমার ওপর নির্যাতন করা হয়। আমাকে উলটো করে ঝুলিয়ে পায়ের তালুতে ক্রমাগত লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। ধীরে ধীরে আমার কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত প্রত্যেকটা জায়গায় তারা সজোরে আঘাত করতে থাকে। আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ছিলাম তাদের নির্যাতনে, অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল তবুও তারা আমাকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি করাতে পারেনি।

হতবাক হই একটা ব্যাপারে, আমাকে টর্চার করার সময় এমন একজনকে দেখতে পাই, যাকে আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী ভেবে পানি দিয়েছিলাম। বুঝতে পারি সে ছিল মূলত ইনফরমার। 

আমার ওপর ভোররাত পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের শেষ পর্যায়ে আমাকে একটা সেলে নিয়ে রাখে তারা। এর কিছুক্ষণ পরেই আজানের শব্দ শুনি। বুঝতে পারি রাতভর আমাকে তারা টর্চার করেছে। আল্লাহর শুকরিয়া তারা আমাকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াতে পারেনি। প্রতিটা সেকেন্ডে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি। 

এত কিছুর পরেও তারা আমাকে পুলিশ হত্যার মামলা দেয়। আধমরা অবস্থায় থানার হাজতে রাখে, সেখানে দেখি আমি ছাড়াও আরও অনেক আন্দোলনকারী গ্রেফতার হয়েছে। তাদের আরও মারাত্মকভাবে টর্চার করেছিল। 

এরপর এখানে দুদিন অনিশ্চয়তায় থাকি। পরিবারের আশায় থাকি কিন্তু তারা আমাকে পরিবার বিচ্ছিন্ন রাখে, পরে শুনতে পাই তারা আমার লোকেশনই পরিবারকে জানায়নি, ধোঁয়াশায় রেখেছে। 

দুদিন পর তারা আমাকে ডিবিতে প্রেরণ করে। ডিবিতে ভিন্ন রকম এক রুমে রাখা হয়। এ রকম তিনটি রুমে প্রায় ১২৭ জন মানুষ একসাথে ছিল, যাদের বেশির ভাগই ছিল আন্দোলনকারী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও সেখানে ছিল। ডিবিতে এসে দেখলাম সবাই দোয়া করছে যেন জেল-হাজতে যেতে পারে। পরে বুঝলাম, এখানে এনে বেশির ভাগ মানুষকেই গুম করে ফেলা হয়।

ডিবিতে আমাকে দেখে আমার কলেজের মিজানুর রহমান ভাই এগিয়ে আসেন। আমার ঘটনা শোনেন। তার সাথে আগে পরিচয় ছিল না। আমার অবস্থা দেখে মিজানুর ভাই সান্ত¡না দেন এবং আমাকে হেল্প করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মিজানুর ভাইয়ের নিজেরই পায়ের আঙুল সব ভেঙে দিয়েছিল নির্যাতন করে।

ডিবিতে দুদিন রেখে আমাকে কোর্টে উপস্থিত করলে সাত দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। আমার তখন নির্যাতনের ধকল পার হয়ে রিমান্ড দেওয়ার ব্যাপারেও অনুভূতিতে ভালোভাবে কাজ করছিল না। তবে সাহস রাখার চেষ্টা করছিলাম শুধু আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রেখে। আমাকে ডিবিতে নিলেও কোনো টর্চার করেনি সে রাতে।

পরদিন শুনি মানুষের প্রতিবাদের মুখে আমার রিমান্ড বাতিল করেছে এবং গাজীপুরে কিশোর সংশোধনাগারে প্রেরণ করার আদেশ এসেছে। কিশোর সংশোধনাগারের পরের পুরোটা সময় ছিল ভিন্ন রকম, প্রতিটা মুহূর্ত আমি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতাম, কথা বলার চেষ্টা করতাম, দোয়া করতাম। এভাবে হঠাৎ একদিন এলো ভিন্ন সূর্যোদয়, যে সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় ছিল সারা দেশ।

আমাকে প্রথমদিকে জেলের সেলে প্রবেশ করানোর সময় এক আনসার সদস্য বলছিল, ‘কী দরকার ছিল এই আন্দোলন করে? শুধু শুধু তোমার জীবনটা শেষ করে দিলা। এখন তো তোমার জীবন পুরাটাই শেষ।’ আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলাম সেদিন। আমি কারাগারে সেইদিন রাতে আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, আমার সাথে আল্লাহর কথোপকথন হচ্ছে! আমার মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি যেন বয়ে গিয়েছিল সেদিন।

আরেকটা অলৌকিক বিষয় ছিল আমি আমার বোনের সাথে ৩ আগস্ট, ২০২৪ কথা বলার সময় বলেছিলাম, ‘আমি ৬ তারিখ বের হব কারাগার থেকে, ইনশাআল্লাহ।’ কিন্তু কোন আশ^াসে আমি এ কথা বলেছিলাম এখনও খুঁজে বের করতে পারিনি। তারপর ৫ আগস্ট, ২০২৪ মানুষের বিস্ফোরিত জোয়ারে বাংলাদেশ ২য় স্বাধীনতা লাভ করেছে। যে স্বাধীনতাটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের ফল। দুপুরে কারাগারের ভেতরের আন্দোলনকারী সবাই মিলে উল্লাস করলাম। সুবহানাল্লাহ। এসব কিছু দেখলাম আর আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টচিত্তে শুকরিয়া আদায় করলাম। কারাগারের ভেতর থেকেই দেখলাম, রাস্তায় লাখো মানুষের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর পরের দিন আমি সেখান থেকে মুক্ত হলাম।

অনেকেই বিভিন্ন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। কেউ চেয়েছিল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, কেউ অংশগ্রহণ করেছিল প্রতিবাদস্বরূপ, আর কেউবা অংশগ্রহণ করেছিল ফ্যাসিবাদী কাঠামো ধ্বংস করে নতুন কাঠামো উপহার দেওয়ার জন্য।

এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি আমার অংশগ্রহণ করার সবচেয়ে বড়ো কারণ ছিল আম্মুর একটি কথা, যা আম্মু সব সময় আমাদের বলতেন, এখনও বলেন-‘কোনো অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে দেখার পরেও যদি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ না করি, তাহলে আল্লাহর কাছে এর জন্য কঠিন জবাবদিহি করতে হবে এবং কিয়ামতের ময়দানে সে মজলুম ভাইয়েরা আমাদের এর জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করবেন।’

জুলাইয়ের শুরুর সেই ৬ জন শহীদ থেকে যে সংখ্যা পরবর্তীতে ২০০০ অতিক্রম করেছে, সেসকল শহীদ ভাই-বোনদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনা করি আল্লাহর কাছে। একই সাথে দোয়া করি আমাদের আহত ভাই-বোনদের জন্য, যেন আল্লাহ তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন।

আমরা যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, সেই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করবই ইনশাআল্লাহ। প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যমণ্ডিত এদেশের স্বপ্নবাজ তারুণ্য দেশপ্রেম ও সততা দিয়ে এই জন্মভূমিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। এবং আমাদের মনে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে, কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি এই বাংলাদেশে আর ফ্যাসিজম কায়েম করতে পারবে না, এদেশের মানুষ হার মানে না, কারণ-

‘পিছু হটা আমাদের অভিধানে নেই 

আমাদের অভিধানে পরাজয় নেই!

দুঃখ শোক ক্লান্তির হতাশাও নেই

আমাদের অভিধানে পরাজয় নেই!’

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ