গণঅভ্যুত্থানের ১ বছর প্রয়োজন স্বপ্নের শাহজাদাদের সীসাঢালা প্রাচীর
জুলাই-নিবন্ধ হারুন ইবনে শাহাদাত আগস্ট ২০২৫
দুনিয়া কাঁপানো ৩৬ দিন। হ্যাঁ সত্যি, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ৩৬ দিন গোটা দুনিয়ার চোখে ছিল বাংলাদেশের দিকে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের ঢেউয়ে কেঁপে উঠেছিল গোটা দুনিয়া। সারা দুনিয়ার মানুষ দেখেছে একদল নিরস্ত্র মানুষ কীভাবে সাহসে বুক বেঁধে হাসিনার অনুগত নিরাপত্তা বাহিনী ও পেটুয়া ক্যাডার বাহিনীর বুলেট-বোমা উপেক্ষা করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।
বিস্ময়ের কারণ, এ বিস্ময়কর আন্দোলন শুরু করেছিল একদল তরুণ-কিশোর-শিশু শিক্ষার্থী। তাদের নেতৃত্বেই পরে দলে দলে রাজপথে নেমেছে নারী, পুরুষ, নবীন, প্রবীণ সর্বস্তরের মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাস এবং ইসলামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখ যায়, মানবতার অনেক বড়ো বড়ো দুশমনের পতন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছোটদের মাধ্যমে ঘটিয়ে তাদের দর্প চূর্ণ করেছেন।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসন বিশ্লেষণ করলে অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি ছিলেন চরম ফ্যাসিস্ট আয়রন লেডি। তার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুলে অনেক সাহসী সাবেক মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক দলের নেতা, আলেম ও ওলামা নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শাহাদাতের পিয়ালায় চুমুক দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে চলে গেছেন। তিন তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর সন্তান আরাফাত রহমান কোকো ইন্তেকাল করেছেন, তারেক রহমান দেশ ত্যাগ করে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফাঁসির মঞ্চে শাহাদাতকে আলিঙ্গন করেছেন, সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (সাবেক এমপি), আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক লেখক সম্পাদক মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহসভাপতি আবদুল কাদের মোল্লা, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, দিগন্ত মিডিয়া হাউজসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানে কয়েক লাখ তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী দেশপ্রেমিক শিল্পোদ্যোক্তা মীর কাসেম আলী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। কারাগারে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ইন্তেকাল করেছেন বিশ^বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, জননেতা সাবেক এমপি মাওলানা আবদুস সুবহান, সাবেক মন্ত্রী মাওলানা একেএম ইউসুফসহ শত শত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। আয়না করে বন্দি হয়ে মৃত্যুর প্রহরের প্রতীক্ষার করে হাসিনার পতনের পর মুক্তি পেয়ে সুনীল আকাশ দেখার সুযোগ পেয়েছেন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, মেজর, কর্নেল, ব্যারিস্টার, সাংবাদিকসহ নানান পেশার ভিন্নমতের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সাহসী মানুষেরা।
এমন এক দানবীয় ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে রাজপথে আগুনঝরা স্লোগানে বজ্রমুষ্টি হাতে নেমেছিল তরুণ-কিশোর শিক্ষার্থী। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল সাধারণ জনগণ। ছাত্র-জনতা নিরস্ত্র হাতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রাম করে ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। পৃথিবীর ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লিখেছে এ গৌরবময় মহাকাব্য। সত্যি এ ঘটনার মাঝে লুকিয়ে আছে মানবজাতির জন্য এক শিক্ষণীয় দর্শন।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে প্রায় ২ হাজার মানুষ শাহাদাত বরণ করেছেন, এ তালিকায় আছে শিশু ১৩৫ ও ১১ জন নারী। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ, শাহাদাত বরণকারীদের ৭২ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের মধ্যে। এ বিপ্লবে ৫০০ জন অন্ধ এবং ২০ হাজার জন আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই কিশোর ও তরুণ। ‘রাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব : জুলাই-আগস্ট ২০২৪ প্রেক্ষাপট’ গবেষণা প্রতিবেদনে সূত্রে প্রকাশ, জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১৬৮ জন পথশিশু নিহত হয়েছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলি বা ছররা গুলির কারণে গুরুতর চোখের আঘাতের জন্য ৫০৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্তত ৬০ জন শিশু ছিল। তাদের মধ্যে একজন ৯ বছর বয়সি পথশিশু চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। আটকের ফলে শিশুরা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। কারওয়ান বাজারে ৪৩ জন পথশিশুকে কোনো আইনি সহায়তা ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল। তারা মুক্তির পর তাদের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে। ব্র্যাকের এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, অস্থিরতার সময় ঢাকার ৬২ শতাংশ পথশিশু আশ্রয়স্থল হারিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অভিভাবকহীন শিশুদের সংখ্যা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে ইউনিসেফ। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, আন্দোলন চলাকালে পথশিশুরা চরম সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হয়েছিল। ৭২ শতাংশ শিশু সহিংসতার ফলে আক্রমণের শিকার হয়েছে, কেউ সরাসরি আঘাত পেয়েছে, আবার কেউ নির্মম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৪৮ শতাংশ পথশিশু সরাসরি আহত হয়েছে। এর মধ্যে মাথায় আঘাত, ছররা গুলির আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৩ শতাংশ শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত ২৬ শতাংশ শিশু শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও বন্ধু বা পরিচিতদের মারধর ও আটক হতে দেখেছে। তারা এখনো ট্রমার মধ্যে।
বিপ্লবের ফলে আহত, অভিভাবকহারা ও ট্রমাগ্রস্ত শিশু-কিশোর এবং শাহাদাত বরণকারী শিশু-কিশোরদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র, সরকার, বিভিন্ন শিশু-কিশোর, ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়িত্ব।
তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, শুধু উল্লেখিত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে জাতীয় ঐক্য এবং ৩৬ জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সমাজের প্রতিটি সচেতন ফ্যাসিস্টবিরোধী মানুষের দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো। বিশেষ করে, শিশু-কিশোররা জুলাই-আগস্টে যেমন ঐক্যের সীসাঢালা প্রাচীর গড়ে তুলে বিপ্লবের আগুন সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল। চিরদিন সেই চেতনার মশাল জ¦ালিয়ে রাখতে হবে। আহত বন্ধুদের পাশে দাঁড়াতে হবে ভালোবাসা ভরা বুকে। সন্তানহারা শহীদ পরিবারগুলোর সন্তানের অভাব পূরণে তাদের মা-বাবার খোঁজ নিতে হবে। বিশেষ করে তোমাদের যাদের বন্ধু, সহপাঠী শাহাদাত বরণ করেছে, তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। সন্তানহারা মা-বাবা যেন তোমাদের মাঝে দেখতে পায় তাদের সন্তানের ভালোবাসা ভরা মুখ, ঠিক তেমনি শ্রদ্ধাভরা হৃদয়ে তাদের পাশে তোমাদের থাকবে হবে। তাদের সুখের দিনে এবং দুঃখের দিনে তোমরাই হবে তাদের স্বপ্নের শাহজাদা। তোমরাই হবে তাদের শূন্য বুকের সান্ত¡না। ভালোবাসার অদৃশ্য প্রাচীরের এ বন্ধন যত শক্ত হবে, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্যাসিস্ট প্রতিপক্ষ তত দুর্বল হবে। সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি তত দ্রুত বিশে^র মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
আরও পড়ুন...