প্রয়োজনীয় বন্ধু

সাইন্স ফিকশন খন্দকার সিয়াম মাসুদ নভেম্বর ২০২৫

সাল ২০৮০। মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষ বিজ্ঞান ব্যবহার করে একবিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সমস্যা সফলভাবে মোকাবিলা করে ফেলেছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, রোগের বিস্তার ইত্যাদির মতো প্রধান সমস্যাগুলির সমাধান মানুষ ইতোমধ্যে করে ফেলেছে। কিন্তু একটা প্রধান সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। আর তা হচ্ছে দারিদ্র্য। দারিদ্র্য ক্ষুধা সৃষ্টি করে এবং অনেক দেশে ক্ষুধার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে। আমরা কি পারব ক্ষুধামুক্ত একটি পৃথিবী কল্পনা করতে? মানুষ কি পারবে এই সমস্যার সমাধান করতে?

আহমেদ রিপোর্টটি পড়ে পত্রিকাটি ভাঁজ করে রাখলেন। এই সমস্যার সমাধান কী হতে পারে? সে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলেন। পৃথিবীতে ক্ষুধা না থাকলে মানুষ অনেক শান্তিতে থাকতে পারবে। ক্ষুধা সহ্য করতে হবে না, অনুভব করতে হবে না এই তীব্র যন্ত্রণা। তা ছাড়া কষ্ট করে অর্থ উপার্জনও আর করতে হবে না। পুরোপুরিই জীবনকে উপভোগ করতে পারবে। আহমেদের মনে পড়ল, এখন তার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে। তার বয়স এখন ৫০ বছর। তিনি একজন বিজ্ঞানী। রসায়নে অবদানের জন্য একবার নোবেল জিতেছেন। তবুও নিজেই ওষুধ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

আহমদ এগিয়ে গিয়ে একটা বড়ি হাতে নিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে নিলেন। গ্লাসটা হাতে নিয়ে ওষুধ খেতে যাচ্ছিলেন কিন্তু হঠাৎ থেমে গেলেন। তার মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি এসেছে। এমন একটি ওষুধ কি তৈরি করা যেতে পারে যা আমাদের ক্ষুধা দূর করবে? এটি খেলে আর ক্ষুধা লাগবে না? এটি একটি বড়ো বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হতে পারে, আহমেদ গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলেন

“হ্যাঁ, আমি এই ওষুধটি তৈরি করব। এটিই মানুষকে ক্ষুধামুক্ত করার একমাত্র উপায়। আমি এমন একটি শক্তিশালী ওষুধ তৈরি করব, যা বছরে একবার খেলেই হবে এবং এতে সমস্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকবে।” তিনি একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেন এবং তার মুখে স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

আহমেদ একসময় অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। তিন বছর আগে তার স্ত্রী মারা গেছে। আহমেদ এখন তার ছোট ভাইয়ের সাথে থাকেন। তার ভাই খালিদ একজন প্রকৌশলী। খুব পরিশ্রমী একজন মানুষ। সারাদিন পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করে। সে অর্থ উপার্জন করে যেন সে তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার কিনতে পারে।

আহমেদ ভাবেন, আমি যদি ওষুধ তৈরি করতে পারি ছোট ভাইয়ের জীবন অনেকটাই সহজ হবে হয়তো। আহমেদ ওষুধের কাজ শুরু করে দিলেন। গবেষণা করা শুরু করলেন। আহমেদের বাড়িতে একটি ছোট রসায়ন ল্যাব আছে। নিজের ল্যাবেই ওষুধ তৈরির জন্য দিনরাত কাজ করতে লাগলেন। প্রায় এক বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর তার ফলও পেলেন। অবশেষে তিনি ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি সহজলভ্য রাসায়নিক উপাদান থেকে এই ওষুধটি তৈরি করেছেন, যেন এটির দাম সস্তা হয় এবং এতে এটি সবার কাছে সাশ্রয়ী হয়। আহমেদ প্রথমে একটি গরুর শরীরে তার ওষুধটা পরীক্ষা করেন। কিন্তু এটা কাজ করে না। তারপরে তিনি আবার তার ওষুধের ওপর কাজ শুরু করেন এবং ফর্মুলাটি কিছুটা পরিবর্তন করেন। তিনি আবার গরুর ওপর তার পরিবর্তিত ওষুধটা পরীক্ষা করেন। এবার ঠিকই কাজ করে। গরুটি ১ সপ্তাহ ধরে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। তার সামনে খাবার থাকা সত্ত্বেও সে খাবার মুখেই নিচ্ছে না। তারপর তিনি একটি বিড়ালের ওপর পরীক্ষা করেন। এটি বিড়ালের ওপরও ঠিকমতো কাজ করে। তা ছাড়া তিনি লক্ষ করে দেখলেন, ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এটি ২ মাস পর্যন্ত কাজ করেছে। এরপর বিড়াল আর গরুটি আবার খাবার খেতে শুরু করেছে।

আহমেদ এখন নিজের ওপর এই ওষুধটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করেন। তিনি এখন তার ওষুধের ওপর অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আহমেদ নিজেই ওষুধটা খেয়ে নেন। এরপর সারাদিন তার ক্ষুধা লাগে না। পরের দিনও একই পথে চলে। নিজের ওষুধের জাদু দেখে আহমদ অবাক হয়ে যান এবং একই সাথে বেশ বিস্মিত বোধ করেন।

আহমেদ তৈরিকৃত ওষুধটির নাম দেন ‘হাইড্রোনিরকোনিয়াম’। এরপর তিনি তার ওষুধটি বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ করেন। বিভিন্ন দেশে মানুষের ওপর এই ওষুধের পরীক্ষা শুরু হয়। এবং তাদের সবগুলোই সফল হয়। এটি সফলভাবে ক্ষুধা দূর করতে সক্ষম হয় এবং এর একটিও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি। মিডিয়া এই ওষুধটিকে ‘প্রয়োজনীয় বিস্ময়’ বলে নিউজ করে। আরও কিছু সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই ওষুধটি কারখানায় ব্যাপকভাবে তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়।

আহমেদ তার ফর্মুলা বিনা মূল্যে প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেন। তিনি বিশ্বে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে যান।

কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় এই ওষুধের বিরুদ্ধে তাদের আওয়াজ তোলে। তারা দাবি করেছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে ধ্বংস করবে এবং শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার সব অগ্রগতিকে বন্ধ করে দেবে। আহমদ তাদের কথায় বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করে না। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ তৈরি করতে শুরু করে দেয়। কিছু দিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধ সরবরাহ শুরু হয়ে যায়। এর দাম ছিল খুবই সস্তা এবং এমনকি বেশির ভাগ দেশেই এটি বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছিল। ওষুধটি ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সবচেয়ে দরিদ্র দেশেও এই ওষুধটি পৌঁছে যায়। এই ওষুধ তৈরি ও এর অবিশ^াস্য অসফলতার জন্য আহমেদ সে বছর দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। আহমেদ অনেক তৃপ্তি বোধ করেন। অবশেষে তিনি ক্ষুধার কারণে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে পেরেছেন।

কিন্তু, যত দিন যেতে থাকল পৃথিবীটা একটু ভিন্ন মোড় নিতে শুরু করল। মানুষ এখন তাদের সব কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ তারা আর ক্ষুধার্ত নেই। সুতরাং, খাবার কিনতে তাদের আর অর্থ উপার্জন করতে হবে না। তারা সারাদিন ঘুমাতে থাকে এবং সারাক্ষণ তাদের ঘরে বসে থাকে। এমনকি তার পরিশ্রমী ভাই খালিদও অলস হয়ে পড়েছে। এখন টাকার কোনো মূল্য নেই। এটা একটা কাগজের টুকরো ছাড়া আর কিছুই না। সব বড়ো ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ দিনদিন আরও অলস হয়ে যাচ্ছে। থমকে গেছে বিশ্বের সব খেলাধুলা। বড়ো ও ব্যস্ততম শহর ও অফিসগুলো ভূতের শহরে পরিণত হতে লাগল।

পৃথিবী থমকে গেছে। ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত পৃথিবী হঠাৎ করে স্থির, অলস মানুষের আবাসস্থল হয়ে উঠেছে। অনেকেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করেন। সারা বিশ্বে তার ওষুধের প্রভাব দেখে আহমদ অবাক হয়ে যায়। ওষুধ তৈরির সময় তিনি যে জগৎ কল্পনা করেছিলেন, তা মোটেও এমন ছিল না। ধীরে ধীরে তার ভুল বুঝতে পারেন। এভাবে চলতে থাকলে একদিন মানুষ নিজেই তাদের ধ্বংস বয়ে আনবে। এর শেষ পরিণতি মোটেও ভালো হবে না। আজকে পৃথিবীর এই পরিণতি মানব প্রকৃতির কারণে। আমাদের প্রকৃতির নিয়ম ভাঙা উচিত নয়। মানুষ কাজ করে কারণ তাদের খেতে হবে। ক্ষুধা নিবারণ করতেই মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়। আর মানুষ কাজ করে বলেই আজ মানবসভ্যতার এতটা অগ্রগতি হয়েছে। এটাই জীবনের চক্র। তবে আজ তার কারণেই পৃথিবী থমকে গেছে। আহমেদ তার ভুল বুঝতে পরল।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষুধা একটি প্রয়োজনীয় বন্ধু। এরপর তিনি আরেকটি ওষুধ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন, যা একবার সেবন করলে মানুষ আবার ক্ষুধার্ত হতে শুরু করবে। তবে এটার প্রতিক্রিয়া শুরু হবে ওষুধ গ্রহণ করার কয়েক মাস পর থেকে যেন সবাই এটা গ্রহণ করে। আর আগের ওষুধ আবার সেবন করলেও কোনো কাজে আসবে না। তারা ক্ষুধার্তই থাকবে। এক বছর কাজ করার পর আহমেদ এই ওষুধ তৈরি করেন। তিনি একটি ঘোষণা ছড়িয়ে দেন-এটি আগের ওষুধের থেকেও বহুগুণে উন্নত একটা ওষুধ। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আহমেদকে বিশ্বাস করেছিল। তাই তারা বিনা পরীক্ষায় এই ওষুধ তৈরি করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিলো। সবাই খেতে শুরু করল সেই ওষুধ। তবে সেই ওষুধ খাওয়ার কিছু মাস অতিবাহিত হওয়ার পরে, মানুষ শীঘ্রই বুঝতে পারল যে তারা আবার ক্ষুধার্ত হতে শুরু করেছে। তবে তাদের কিছু করার ছিল না। প্রায় সব মানুষ ইতোমধ্যে এটা সেবন করে ফেলেছে। আহমেদ জানতেন, এই মিথ্যা বলার জন্য তাকে ধরা হবে এবং শাস্তি প্রদান করা হবে। তাই তিনি তার সমস্ত গবেষণাপত্র এবং সূত্র পুড়িয়ে ফেলেন। তার বাড়ির ল্যাব ধ্বংস করে দেন। এরপর একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পালিয়ে যান। এমন এক জায়গায় চলে যান, যেখানে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। শীঘ্রই পৃথিবী আগের মতো সক্রিয় ও প্রাণবন্ত হতে শুরু করে। খাবার কেনার জন্য অর্থ উপার্জনের করা প্রয়োজন। তাই মানুষ আবার তাদের কাজ করতে শুরু করে দেয়। সমস্ত অফিস এবং ব্যাংক পুনরায় খোলা শুরু করে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবী আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ