গোল নিয়ে গোলমাল

খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ জুলাই ২০২৬

চলছে গোলের উৎসব। 

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই গোল নিয়ে উত্তেজনা, গোল নিয়ে হই-হুল্লোড়। ফুটবল গোলের খেলা, এখানে সফল হতে হলে গোল করতেই হবে। কেউ একের পর এক গোল করে চলে যাচ্ছে পরবর্তী রাউন্ডে, আবার কেউ গোল করতে না পারার কারণে দুঃখ নিয়ে ফিরছে দেশে। গোল নিয়ে ফুটবল বিশ^কাপে রয়েছে নানা ঘটনাবহুল ইতিহাস। তেমন কিছু ইতিহাসের কথা জানাব এই লেখায়।


গোলের জন্য ফুটবলারকে খুন

ভুলবশত আত্মঘাতী গোল করে ফেললে সেই ফুটবলারের দুঃখের শেষ থাকে না। কে চায় নিজের জালে বল জড়াতে? কিন্তু মুহূর্তের ভুলে সেটা কখনো কখনো হয়ে যায়। সেজন্য ফুটবলারকে কখনো সতীর্থদের সমালোচনা শুনতে হয়, কোচের বকা খেতে হয়। আর সমর্থকদের নিন্দা তো আছেই; কিন্তু আত্মঘাতী গোলের জন্য এক ফুটবলারকে খুন করার কলঙ্কজনক ইতিহাসও রয়েছে।

ঘটনাটি ১৯৯৪ বিশ্বকাপের। সেবার লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া ছিল ফেবারিটের তালিকায়; কিন্তু প্রথম ম্যাচেই তারা রোমানিয়ার কাছে হেরে যায়। দ্বিতীয় ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ‘ডু অর ডাই’ সমীকরণ। হারলেই বিদায়। একটি ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে বল পাঠিয়ে দেন দলের সেরা ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। সেই ম্যাচে হেরে বিশ^কাপ থেকে বিদায় নেয় কলম্বিয়া। অথচ এসকোবারকে তখন ধরা হতো কলম্বিয়ার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে, যাকে ফাঁকি দিয়ে বল বের করা অসম্ভব।

সেই ঘটনার পর কলম্বিয়ানদের কাছে হিরো থেকে ভিলেনে পরিণত হন এসকোবার। পরিবার এসকোবরকে তখনই দেশে না ফিরতে সতর্ক করেছিল। যদিও তার বিশ্বাস ছিল কলম্বিয়াবাসী তার এই ভুল মনে রাখবে না। দেশে ফেরার মাত্র ১০ দিন পর, ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই মেডেলিন শহরের একটি নাইট ক্লাবের বাইরে এসকোবারকে খুব কাছ থেকে পরপর ৬টি গুলি করা হয়। খুনি প্রতিটি গুলি করার সময় গোও-ও-ওল! বলে চিৎকার করছিল। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন প্রতিভাবান এই ডিফেন্ডার।

গ্রেফতারের পর খুনি স্বীকার করেন যে, ওই গোলের কারণেই খুনটি করেছেন। ধারণা করা হয়, বিশ^কাপ নিয়ে বড় অঙ্কের জুয়ায় হেরে যাওয়ায় ক্ষোভ থেকে খুন করা হয় এসকোবারকে।


হাত দিয়ে করা গোল

ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঘা তখনও শুকায়নি আর্জেন্টাইনদের মন থেকে। তার মাঝেই ১৯৮৬ বিশ^কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগের দিন সতীর্থদের ডেকে ম্যারাডোনা বললেন, ফুটবলই হতে পারে আমাদের প্রতিশোধের হাতিয়ার। বললেন বটে, তবে কারো অপেক্ষায় না থেকে যা করার করলেন নিজেই। ম্যাচের ৫১ মিনিটে আলোচিত-সমালোচিত একটি গোল করেন তিনি।

মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে তিন জন ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে ডি-বক্সের মাথায় পৌঁছে যান ম্যারাডোনা। সামনে দুজন ডিফেন্ডার এসে পড়ায় বক্সের ডান প্রান্তে এক সতীর্থকে পাস দিয়ে নিজে জটলার ভেতরে ঢুকে যান। আরেক ইংলিশ ডিফেন্ডার বলটি ক্লিয়ার করতে চাইলে সেটি লাফিয়ে ওঠে ছোট ডি-বক্সের সীমানা বরাবর। মুহূর্তের মধ্যে বলের কাছে পৌঁছে যান ম্যারাডোনা। ইংলিশ গোলরক্ষকও অনেকটা এগিয়ে এসে লাফিয়ে ওঠেন বলটি ধরতে, একই সময় ম্যারাডোনও লাফিয়ে ওঠেন হেড করতে। গোলরক্ষক বল ধরার আগেই ম্যারাডোনার টাচে সেটি চলে যায় জালে।

ইংলিশ গোলরক্ষকসহ একাধিক খেলোয়াড় আপত্তি জানালেও রেফারি গোলের বাঁশি বাজান। পরবর্তীতে ভিডিও বিশ্লেষণে ধরা পড়ে যে, ম্যারাডোনা আসলে হাত দিয়ে বলটি জালে পাঠিয়েছেন; কিন্তু রেফারি বা লাইন্সম্যানেরা সেটি বুঝতে পারেননি। আসলে ম্যারাডোনার লাফিয়ে ওঠার ভঙ্গি ছিল হেড করার মতোই, যে কারণে বিষয়টি ধরা পড়েনি।

পরবর্তীতে হাত দিয়ে গোল করার বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ম্যারাডোনা হাসি দিয়ে বলেন, ওটা ছিল ঈশ^রের হাত। যে কারণে গোলটি ফুটবল ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড গোল’ নামে পরিচিত।


শতাব্দীর সেরা গোল

একই ম্যাচে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের মাত্র চার মিনিট পরই আরেকটি গোল করেন ম্যারাডোনা, যা বিংশ শতাব্দীর সেরা গোলের স্বীকৃতি পায়। একক প্রচেষ্টায় এমন গোল আর দেখা যায়নি। ম্যারাডোনা একাই মাঠে কতটা কী করতে পারেন সেটি যেন দেখিয়ে দেন সারা দুনিয়াকে।

ফুটবল ইতিহাসেই সেরা গোলগুলোর একটি হয়ে আছে সেটি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দৌড়ে যাওয়ার পথে ৫ ফুটবলারকে ছয় বার এবং শেষমেশ গোলরক্ষককেও কাটিয়ে বলটি ঠেলে দেন জালে। এই গোলে ফুটবল বিশ^ এতটাই মুগ্ধ হয় যে, হাত দিয়ে গোল করার কষ্ট ভুলে যায় তারা। ২০০২ সালে সারা বিশে^র ফুটবল দর্শকদের ভোটে এই গোলটি শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। 

ম্যারাডোনার ওই দুই গোলের সুবাদে আর্জেন্টিনা সেদিন ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে। সেবার ম্যারাডোনার হাতেই ওঠে বিশ^কাপ। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে কাপ জেতে আর্জেন্টিনা।


দ্রুততম গোল

ফুটবল ম্যাচ শুরু হওয়ার পর গোলের জন্য কত অপেক্ষা! একটি গোলের জন্য দর্শকরা চেয়ে থাকেন প্রিয় ফুটবলারের পায়ের দিকে। ২০০২ বিশ^কাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তুরস্কের স্ট্রাইকার হাকান সুকার যে কাণ্ড করেছিলেন সেটি সবাইকে বিস্মিত করেছে। ম্যাচ শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় তিনি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। দর্শকদের অনেকে তখন পর্যন্ত নিজের সিটেও বসতে পারেননি। খেলোয়াড়দের অনেকেও বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটল! স্কোর বোর্ডে উঠে গেল ১-০।

সেটি ছিল সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই দলের মধ্যে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। রেফারির বাঁশি শুনে দক্ষিণ কোরিয়া বল পাস করে নিজেদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া শুরু করে; সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের পায়ে গেলে তিনি ঠিকভাবে সামলাতে পারেননি। এরই মধ্যে দুজন তুর্কি ফরোয়ার্ড দৌড়ে কাছে গেলে তিনি বলের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেন। তুর্কি দলনেতা হাকান সুকার বল পেয়ে জালে শট নেন। এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম গোলের রেকর্ড।

বিশ^কাপে দ্রুততম গোলের তালিকায় এরপরে আছে ১৯৬২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে চেকোস্লোভাকিয়ার ভাকলাভ মাসেকের ১৫তম সেকেন্ডে করা গোলটি। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার আরনেস্ট লেন জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের ২৫ সেকেন্ডে করেছিলেন গোল। ১৯৮২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ব্রায়ান রবসন গোল করেন ম্যাচের ২৮ সেকেন্ডের সময়।


এক ম্যাচেই এত গোল!

ফুটবল বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল হওয়ার রেকর্ডটি ১৯৫৪ আসরের। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হয় সুইজারল্যান্ড। সেই ম্যাচে দুই দল মিলে মোট গোল করেছে ১২টি।

ম্যাচের ১৬তম মিনিটে প্রথম গোল করে এগিয়ে যায় সুইজারল্যান্ড। পরের তিন মিনিটে পরপর আরও দুটি গোল করে তারা (১৭ ও ১৯)। ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০। এরপর যেন হুঁশ ফেরে অস্ট্রিয়ার। এত তাড়াতাড়ি তিন গোল খেয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে না পড়ে পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে অস্ট্রিয়া। তুমুল আক্রমণে ২৫, ২৬ ও ২৭তম মিনিটে পরপর তিনটি গোল করে তারা ম্যাচে ফেরে দারুণভাবে। স্কোর লাইন দাঁড়ায় ৩-৩।

জমে ওঠে লড়াই। এরপর ৩২ ও ৩৪ মিনিটে পরপর আরও দুটি গোল করে এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া (৫-৩)। ৩৯ মিনিটে একটি গোল করে ব্যবধান কমায় সুইজারল্যান্ড। ৫-৪ অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল।

বিরতির পর ৫৩ মিনিটে অস্ট্রিয়ার আরেকটি গোলের জবাবে ৬০ মিনিটে গোল করে সুইসরা (৬-৫)। তবে তারা আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে শেষ গোলটি করে দুই গোলের লিড পায় অস্ট্রিয়া। শেষ পর্যন্ত ৭-৫ গোলে ম্যাচটি জিতে যায় তারা। টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচে অস্ট্রিয়ার থিওডোর ওয়াগনার ও সুইসদের পক্ষে সেপ হুজি হ্যাটট্রিক করেন।


৩৫ পাসের গোল

২০২২ সালের কাতার বিশ^কাপে ইরানকে ৬-২ গোলের ব্যবধানে হারানোর ম্যাচে জ্যাক গ্রিলিশের করা গোলটির আগে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে বল দেওয়া-নেওয়া করেছিলেন একটানা ৩৫ বার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলের আগে সর্বোচ্চ পাসের এটিই রেকর্ড। ইংল্যান্ডের প্রতিটি খেলোয়াড় এমনকি গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও এই বিল্ডআপে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার বল গিয়েছে জুড বিলিংহামের পায়ে। তিনি দিয়েছেন ৯টি পাস। এভাবে নিজেদের সীমানা থেকে আক্রমণ রচনা করে ৩৬তম শটে ইরানের জালে বল পাঠান গ্রিলিশ।

একই বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা একটি গোল করেছে ২৭ পাসের পর। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজের করা সেই গোলটি স্থান পেয়েছে এই রেকর্ডের তালিকায় দুই নম্বরে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বাদে আর্জেন্টিনার বাকি ১০ জন খেলোয়াড়েরই অবদান ছিল এই গোলে।

এর আগের রেকর্ডটিও ছিল আর্জেন্টিনার। ২০০৬ বিশ^কাপের গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় ম্যাচে সার্বিয়া-মন্টেনিগ্রোর বিপক্ষে এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোর সেই গোলটি ছিল ২৫ পাসের।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ