গোধূলির তপ্ত তারুণ্য

গল্প নাসীমুল বারী জানুয়ারি ২০২৬

রাতভর ক্যাম্পাসে স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল। ‘চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার। আমি কে তুমি কে রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ খুবই চমকানো স্লোগান। ছড়িয়ে পড়েছে শহরে, দেশে; এমনকি নেট দুনিয়ার বদৌলতে বিশ্বেও।

ফেসবুক লাইভে স্লোগান দেখে থমকে যান নাজিব মাহমুদ। স্তম্ভিত নাজিব সোফায় বসে লাইভ মিছিল দেখেই চলেছেন। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নাজিব ভাবছেন, এমন স্লোগান কেন? ভাবছেন, আরও ভাবছেন নিজে নিজেই। এ সময়ের জেন-জি প্রজন্মের সন্তানেরা নিজেদের রাজাকার বলছে কেন?

আবার মনোযোগ দিয়ে শোনেন স্লোগান। আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার। সাথে সাথেই জবাবমূলক পালটা স্লোগান, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।

ও...!

একটু স্বস্তি নিয়ে ফোনটা সাইডে রাখেন। বুঝলেন এ সময়ের স্বৈরাচার মানে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ওদের রাজাকার বলেছে। আবার শোনার চেষ্টা করলেন প্রথম স্লোগানটা-চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার। এতক্ষণের স্লোগান বিশ্লেষণ করে আনমনে বলে ওঠেন, তাইতো! ওরা অধিকার চাওয়াতে রাজাকার হয়ে গেল? এ কেমন বিচার! কেমন অমানবিকতা এই জেন-জি প্রজন্মের প্রতি? এ তারুণ্যের প্রতি? নাহ, স্লোগানগুলো নিজেদের রাজাকার বানানোর কোনো ইতিবাচকস্বরূপ নয়; বরং আরও তীব্র নেতিবাচকতা। আরও তীব্র ঘৃণা।

ওরা তো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি। ওরা করেছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন। নিজেদের সাম্যময় অধিকার আদায়ের আন্দোলন। স্বাধীনতার এ তিপ্পান্ন বছর বয়সেও দেশ থেকে বৈষম্য দূর হয়নি। সামাজিক বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়নি। নানা সময়, নানা সরকার, নানাভাবে এসেছে-কেউই এসব বৈষম্য দূর করেনি। নানা বিধি-রীতি আইনত কোটার সাথে সাথে দলীয় কোটা, অনৈতিক আর্থিক কোটা দেশে বৈষম্যের এক মহাযজ্ঞ চলছে তিপ্পান্ন বছর ধরে।

স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন এ দেশে বৈষম্য কিন্তু দূর হলো না! অধিকার রক্ষিত হলো না। সদ্য স্বাধীন দেশে বছরখানেকের স্বল্প সময় পরে অনুষ্ঠিত তিয়াত্তরের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে জাতি ভোট দেবার অধিকারই হারিয়ে ফেলে। হারিয়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও তাদের ছাত্র সংসদে ভোট দেবার অধিকার। দলীয় সিন্ডিকেট চাকুরি-ব্যবসায় সবকিছুতে অঘোষিত দলীয় কোটার এক মহাবৈষম্য তৈরি করে দেশময়। আরও কিছু পরে পত্রপত্রিকা রাজনীতি সব বন্ধ করে দিয়ে গলা চেপে ধরে একনায়কতন্ত্র। এ বৈষম্যের কোনো সংজ্ঞা হয় না। স্বাধীন বাংলাদেশে এ যে আরও বড়ো পরাধীনতা।

সে থেকেই জনগণ রাষ্ট্রীয় সামাজিক অধিকারহীন এক বৈষম্য নিয়ে এগিয়ে চলতে থাকে। কত দল এলো। সরকার চালাল; কিন্তু বৈষম্য আর অধিকার বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়নি জাতি। দেশটা স্বাধীন করেও জাতি স্বজাতি স্বৈরাচারের কবলে পড়ল। স্বাধীনতার চেতনার আড়ালে স্বজাতি ফ্যাসিস্টের কবলে পড়ল। এরা কারা? তা চিহ্নিত করতে করতেই লেগে গেল তিপ্পান্ন বছর।

তিপ্পান্ন বছরে পরে এসে আজ এ প্রজন্ম, জেন-জি প্রজন্ম একাত্তরের মতোই গর্জে ওঠে নতুন করে। অধিকার আদায় আর বৈষম্য দূরীকরণের রাজপথে লড়াই করতে গিয়ে ওরাই আজ হয়ে গেল রাজাকার! কেন অপঘাত ওদের প্রতি?

এটা তো এক অস্বাভাবিকতা। নাজিব মাহমুদের রক্তও ফুটতে থাকে স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের এই অপমান চাপিয়ে দেওয়া কথায়। তার সন্তান তো এ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আছে। তবে কি তার সন্তানও রাজাকার!

প্রচণ্ড মেজাজ নিয়ে উঠে এসে খোঁজে তার ছোটো সন্তান কবিরকে। নেই রুমে। ডাকে স্ত্রী হেনাকে-এই...

-বলো।

-কবির কোথায়?

-ও তো ইউনিভার্সিটিতে গেছে, মিছিল আছে বলল।

-মিছিলে গেছে! একদম ঠিক কাজটি করেছে।

হেনা একটু চমকে বলে, মানে!

-মানে তো সহজ। পারফেক্ট একটা মিছিলে গেছে ও। এমন মিছিলেই যাওয়া দরকার। ওদের আমাদের সবার।

-আমাদের! আমাদের কেন?

-ওদেরকে যদি রাজাকার বলা হয়, তবে আমরা কী? অধিকারহীন এ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদেরও গর্জে উঠতে হবে। বৈষম্য দূর করতে আমাদেরও ওদের সমর্থন দিতে হবে। সহযোগিতা করতে হবে।

-তাহলে তুমি রাজনীতি করবে?

স্ত্রী হেনার এমন কথায় তীব্র ঘৃণা নিয়ে বলেন, তিপ্পান্ন বছর হলো আমরা বৈষম্যহীন অধিকারহারা হয়ে ভবঘুরের মতো আছি এদেশে।

হঠাৎ হেনা ওর ফোনটা সামনে এগিয়ে ধরে বলে, দেখো দেখো ইউটিউবে!

হ্যাঁ, ইউটিউবেই দেখা যাচ্ছে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এমন মিছিল। একই স্লোগান। তীব্র প্রতিবাদী স্লোগান। তীব্র ঘৃণার স্লোগান।

নাজিব মাহমুদের শরীরটা যেন কেঁপে ওঠে। কাঁপা শরীর নিয়েই কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে, আ...মি..., আমি এখনই যাব ওই মিছিলে। ওই অধিকার শুধু আমার সন্তানদেরই নয়, জাতির সন্তানদেরই নয়; এটা আমারও অধিকার। তোমারও অধিকার। আর এমন অধিকার মানেই কি রাজাকার?

আজ ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতির বরাবরে দাবিনামা দিয়েছিল। এ দাবিনামায় জাতীয় সংসদ ডেকে যথার্থ ও যৌক্তিক কোটা সংস্কারের জন্য চব্বিশ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিল। বিকেলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে চরম ঔদ্ধত্য দেখায়! এ তো বড়ো এক অপমানের কথা! হেসে হেসেই এমন কথা বলে ফেলে। স্বাধীন দেশে এমন কথা তো মানা যায় না। এমন কথা তো সহ্য করা যায় না।

নাজিব মাহমুদের রক্তও টগবগিয়ে ফুটছে এখন। জীবনের এ গোধূলি বেলাতেও তারুণ্যে টগবগ। বাসা থেকে বের হতে দরজা খোলেন। হেনা সাথে সাথে কাছে এসে বলে, সত্যি তুমি যাচ্ছ?

-হ্যাঁ। সরকারের এমন অপমানে আমার রক্তে যদি গরম তৈরি হয়, তবে তারুণ্যের রক্ত তো টগবগিয়ে ফুটতে থাকবে। আমি যাব, আমি তরুণদের হয়েই লড়াই করব।

অধিকার আদায় মানেই যদি রাজনীতি হয়, বৈষম্য দূর করা মানেই যদি রাজনীতি হয়; তবে আমি সে রাজনীতির বাহক। আর এ রাজনীতি গড়ে তুলতে আমাদের মতো অভিভাবকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আপামর জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই তারুণ্য আরও সাহস-হিম্মত পাবে, ভরসা পাবে। এগিয়ে যাবে সুন্দর আগামীর দিকে শাশ্বত সুন্দরের রাজনীতি গড়তে।

কথাগুলো বলে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। এখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যের মিছিলে তাকেও যোগ দিতে হবে।

দরজায় দাঁড়িয়ে হেনা বলে, আমার সন্তান স্বামী কাঁটায় ভরা শাশ্বত সুন্দরের দিকে যাচ্ছে। আমি...আমিও যাব।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ