গাজা থেকে চিঠি
গল্প গাসসান কানাফানি জানুয়ারি ২০২৬
অনুবাদ : রিয়াজ মোরশেদ সায়েম
প্রিয় মোস্তফা,
তোমার চিঠি পেয়েছি। সেখানে তুমি লিখেছ, স্যাক্রামেন্টোতে আমার থাকার জন্য যা যা দরকার, সবই করে রেখেছ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকেও আমার ভর্তি-স্বীকৃতির সংবাদ এসেছে। সবকিছুর জন্যই তোমাকে ধন্যবাদ, বন্ধু।
কিন্তু তুমি নিশ্চয় অবাক হবে আমার নিচের কথাগুলো শুনে। আর ভুল বুঝো না। আমি একটুও দ্বিধা করছি না; বরং মনে হচ্ছে জীবনে কখনো এত স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারিনি। না, বন্ধু; আমি মন বদলেছি। তোমার বলা সেই ‘সবুজ মাঠ, পানির ফোয়ারা আর কোমল মুখের দেশে’ আর যাচ্ছি না। আমি এখানেই থাকব। এখানেই, চিরদিনের জন্য।
আমাদের একসাথে চলা আর হবে না, এ কথা ভেবে সত্যিই মন খারাপ লাগছে। আমি এখনো শুনতে পাচ্ছি, আমাদের দুজনের প্রতিশ্রুতি, “আমরা ধনী হব!” কিন্তু, বন্ধু, এখন আর কিছু করার নেই। আজও মনে পড়ছে, কায়রো বিমানবন্দরের হলঘরে দাঁড়িয়ে তোমার হাত চাপড়ে ধরা, আর সেই ইঞ্জিনের শব্দের দিকে তাকিয়ে থাকা। চারদিকে সবকিছু ঘুরছিল, সেই ভয়ংকর শব্দের তালে তালে। তুমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলে ঠিক আমার সামনে। তোমার গোলগাল মুখ আগের মতোই ছিল, শুধু চোখের কোণে কিছু ক্ষীণ ভাঁজ।
আমরা দুজনে শাজিয়া পাড়া থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি। একসঙ্গে হেঁটেছি। একসঙ্গে স্বপ্ন দেখেছি। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত পাশাপাশি থাকব। কিন্তু...“আর পনেরো মিনিট আছে বিমান ছাড়তে। এভাবে শূন্যে তাকিয়ে থেকো না। শোনো! আগামী বছর তুমি কুয়েতে যাবে, বেতন থেকে জমানো সঞ্চয়ে গাজা ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসবে। আমরা একসাথে শুরু করেছি, শেষটাও একসঙ্গে করতে হবে।”
তোমার দ্রুত নড়তে থাকা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কথাগুলো খুব দ্রুত বলছিলে তুমি। তুমি সব সময় এভাবেই বলতে। কোনো বিরাম নেই, থামা নেই। অথচ তোমার কথায় বুঝতাম, তোমার নিজেরও তেমন খুশি লাগছে না। মনে হচ্ছিল তুমি নিজেকে বোঝাতে পারছ না। আমারও বুকটা মোচড় দিচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো চিন্তা ছিল, কেন আমরা এই গাজা ছেড়ে পালাই না? কেন?
তোমার অবস্থা একটু ভালো হচ্ছিল। কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তোমাকে চাকরি দিয়েছিল। আমাকে দেয়নি। দারিদ্র্যের গর্তে পড়ে থাকা আমার কাছে তুমি ছোট ছোট টাকা পাঠাতে। ঋণ হিসেবে। কারণ তুমি চাইতে না আমি অপমানিত বোধ করি। তুমি জানতে, আমার স্বল্প বেতনে মা, বিধবা ভাবি আর তার চার সন্তানকে নিয়ে জীবনযাপন করা কতটা অসম্ভব।
“ভালো করে শোনো। প্রতিদিন লিখবে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় মিনিটে মিনিটে! প্লেন ছাড়ছে। বিদায়! না না, চিরবিদায় না, আবার দেখা না হওয়া পর্যন্ত বিদায়!” তোমার শেষ কথাগুলো। তারপর তুমি মুখ ঘুরিয়ে বিমানের দিকে তাকালে, যখন আবার আমার দিকে ফিরে চেয়েছিলে, তোমার চোখে আমি অশ্রু দেখেছিলাম।
কিছুদিন পর কুয়েত থেকে আমিও চাকরির চুক্তি পেলাম। সেখানে আমার জীবন কেমন কাটল, তা তোমাকে বারবার লিখেছি। আমার জীবন যেন এক ঘোলাটে শূন্যতা। একটি ঝিনুকের মতো, নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে আটকে থাকা, প্রতিটি দিন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যুদ্ধ। গরম, ঘোলাটে এবং প্রচণ্ড ক্লান্তিকর। শুধু মাসের শেষের অপেক্ষা।
সেই বছরই, মাঝামাঝি সময়ে ইহুদিরা সাবরা বাজারে বোমা ফেলল এবং গাজায় আগুন-গুলির বর্ষণ করল। হয়তো এতে আমার রুটিনে কিছু বদল আসতে পারত। কিন্তু তখন আমি গাজা ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাব বলে মনস্থির করে ফেলেছিলাম।
আমি গাজাকে ঘৃণা করতাম, গাজার মানুষকেও।
আমার কাছে সে শহর ছিল এক ব্যাধগ্রস্ত মানুষের আঁকা ব্যর্থ, ধূসর ছবি।
হ্যাঁ, তবে মাকে, ভাবিকে আর বাচ্চাদের জন্য কিছু টাকা পাঠাব। কিন্তু একসময় এ বাঁধনটাও ছিঁড়ে ফেলব। সাত বছরের পরাজয়ের গ্লানি থেকে দূরে, “সবুজ ক্যালিফোর্নিয়া”-তে গিয়ে। আমার প্রতি তাদের মায়া আমার নিজের ‘ডুবন্ত জীবনকে আর টেনে নিচে নামাবে না। আমাকে পালাতে হবে।
তুমি এসব অনুভূতি জানো, মুস্তাফা। কারণ তুমি এগুলো অনুভব করেছ। এই গাজার সঙ্গে কী অদ্ভুত এক বন্ধন ছিল, যা আমাদের পালানোর উদ্যমকে নিস্তেজ করে রাখত! কেন আমরা তা বিশ্লেষণ করিনি? কেন পরাজয়ের ক্ষত মুছে ফেলে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাইনি?
কেন?
জানি না।
জুনে দেশে ফিরলাম ছুটিতে। স্বপ্নের সেই যাত্রার আগে সব গুছিয়ে নিতে নিতে ভাবলাম, যাব সেই স্নিগ্ধ দুনিয়ায়। যেখানে জীবনের রং পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু ফেরত এসে দেখি, গাজা ঠিক আগের মতোই। আরও সংকীর্ণ। আরও দমবন্ধ। যেন মাংসের দোকানের পাশের কর্দমাক্ত বালুতীরে ফেলে দেওয়া পঁচা শামুকের খোলস।
সেই গাজা, তার সরু গলি, দারিদ্র্যের গন্ধ, পরাজয়ের গন্ধ, বেঁকে ওঠা বারান্দা, তবু মানুষকে টেনে আনে তার পরিবার, তার শেকড়, তার স্মৃতি।
কেন?
জানি না।
শুধু জানি, সেদিন সকালে আমি মায়ের কাছে গিয়েছিলাম।
ভাবি দরজার সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল, তার আহত মেয়ে নাদিয়া আমাকে দেখতে চায়। তুমি কি নাদিয়াকে চেনো মোস্তফা? আমার ভাইয়ের তেরো বছর বয়সি সুন্দরী মেয়ে।
সেই সন্ধ্যায় এক কেজি আপেল কিনে হাসপাতালে গেলাম। মনে হচ্ছিল মা আর ভাবি কিছু লুকোচ্ছে, যা তারা বলতে পারছে না। নাদিয়াকে আমি খুব ভালোবাসি। সেই অভ্যাসবশত ভালোবাসা, যা এই পরাজিত প্রজন্মের প্রতি জন্মায়!
হঠাৎ কী হয়েছিল? আমি জানি না। ঘরে ঢোকার সময় শান্ত ছিলাম। অসুস্থ শিশুর মধ্যে একধরনের পবিত্রতা থাকে। আর যদি সে শারীরিক নিগ্রহে আহত হয়, তবে আরও বেশি। নাদিয়া শুয়ে ছিল। মাথার ওপর চুল ছড়ানো। চোখে একধরনের নীরবতা, কালো পুতুলির গভীরে জমে থাকা একফোঁটা অশ্রু।
তার মুখ ছিল শান্ত, নিথর। তবু দেখতে যেন যন্ত্রণাদগ্ধ এক পবিত্র মুখ।
“নাদিয়া”।
আমি ডাকলাম? নাকি অন্য কেউ? জানি না।
কিন্তু সে চোখ তুলে তাকাতেই মনে হলো, আমি গরম চায়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া চিনির মতো গলে যাচ্ছি।
“চাচা! আপনি এখনই কুয়েত থেকে এলেন?”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। উঠে বসতে চাইল। আমি তার পিঠে হাত বুলিয়ে পাশে বসলাম।
“নাদিয়া, তোমার জন্য অনেক উপহার এনেছি। তুমি যখন সুস্থ হয়ে বাসায় যাবে, তখন দেবো। যে লাল প্যান্টটা চেয়েছিলে তুমি সেটা আমি এনেছি।”
মিথ্যে ছিল। কিন্তু সেই মিথ্যেতেই যেন সত্য জন্ম নিল।
নাদিয়া কেঁপে উঠল। নীরব হয়ে মাথা নিচু করল। তার অশ্রু পড়ল আমার হাতের ওপর।
“বলো না, নাদিয়া! লাল প্যান্টটা কি চাই না তোমার?”
সে মুখ তুলে তাকাল। কিছু বলতে চাইল। দাঁত চেপে এক অচেনা দূরত্ব থেকে আসা কণ্ঠে বলল-“চাচা”
সে সাদা চাদরটি তুলে দেখাল-ঊরুর ওপরের দিক থেকে তার পা কাটা।
“বন্ধু মোস্তফা, নাদিয়ার পা আমি কোনোদিন ভুলব না। ঊরুর একেবারে গোড়া থেকে কেটে নেওয়া সেই পা। না! তার মুখে স্থায়ীভাবে জমে যাওয়া গভীর শোকও আমি ভুলতে পারি না। যা তার মুখাবয়বে চিরদিনের মতো মিশে গেছে। হাসপাতাল থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলাম হাতে শক্ত করে চেপে ধরা সেই এক কেজি আপেল নিয়ে। নাদিয়াকে দেওয়ার জন্য সঙ্গে করে এনেছিলাম। প্রখর রোদ পুরো রাস্তার ওপর ছড়িয়ে দিয়েছিল রক্তের রং। আর গাজা তখন একেবারেই নতুন। মুস্তাফা! তুমি, আমি কখনো এটাকে এভাবে দেখিনি।
শাজিয়া কোয়ার্টারের শুরুতে পাথরগুলো যেভাবে স্তূপ করা ছিল, তারও যেন একটা অর্থ ছিল, যেন সেগুলো সেখানে রাখা হয়েছে শুধু সেই অর্থটি বোঝানোর জন্যই। এই গাজা, যেখানে আমরা ছিলাম, যেখানে অনেক শুভাকাক্সক্ষীর সঙ্গে সাত বছরের পরাজয় বয়ে বেড়িয়েছি, হঠাৎ যেন নতুন হয়ে উঠল সে গাজা। আমার মনে হচ্ছিল, এ তো কেবল শুরু। কেন জানি মনে হচ্ছিল, এই প্রধান সড়ক ধরে বাড়ি ফেরা মানে যেন সাফাদের দিকে একটি দীর্ঘ, দীর্ঘ পথের শুরু মাত্র। এই গাজার প্রতিটি জিনিসই দুঃখে ধুকপুক করছিল। কিন্তু তা কেবল কান্নার দুঃখ ছিল না। এর মধ্যে ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ; আরও গভীরভাবে ভাবলে, যেন কাটা পা পুনরুদ্ধারের এক আকাক্সক্ষা!
আমি গাজার রোদঝলমলে, চোখ-ঝলসানো রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। প্রতিবেশীরা আমাকে বলল, নাদিয়া তার ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের শরীরটা তাদের ওপর ফেলে দিয়েছিল, যখন আগুন আর বোমা বাড়িটিকে ছিন্নভিন্ন করছিল। নাদিয়ার পক্ষে নিজেকে বাঁচানো সম্ভব ছিল; সে দৌড়ে পালাতে পারত, তার পাটুকু অন্তত রক্ষা করতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি।
কেন?
না, বন্ধু, আমি স্যাক্রামেন্টোতে আসব না। আর এর কোনো আফসোসও নেই। না এবং আমি আমাদের শৈশবে শুরু করা সেই কাজও শেষ করব না। গাজা ছাড়ার সময় তোমার মধ্যে যে অস্পষ্ট অনুভূতিটা ছিল, সেই ক্ষুদ্র অনুভূতিটা তোমার ভেতরে এক দৈত্যের মতো বেড়ে উঠতে হবে। তাকে প্রসারিত হতে দাও; তাকে খুঁজে নাও, কারণ এখানেই, এই নোংরা পরাজয়ের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই তুমি নিজেকে আবিষ্কার করবে।
আমি তোমার কাছে আসব না। কিন্তু তুমি, তুমি ফিরে এসো! ফিরে এসো, নাদিয়ার ঊরু-জোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন সেই পা থেকে শিখে নিতে, জীবনের মানে কী, অস্তিত্বের মূল্য কত বড়ো!
ফিরে এসো, বন্ধু মোস্তফা! আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায় আছি।
পরিচিতি
লেটার ফ্রম গাজা হলো, গাসসান কানাফানির রচিতMen in The Sun and Other Palestinian Stories-এর একটি গল্প। যেটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় পরে সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। তার নির্মেদ, স্বচ্ছ গদ্যে কানাফানি পাঠককে দেখান ফিলিস্তিন ও তার পার্শ্ববর্তী মধ্যপ্রাচ্যের অপরাজনীতির দগদগে বাস্তবতা। যা খুবই নির্মম, গভীর মানবিক।
১৯৩৬ সালে উত্তর ফিলিস্তিনের আক্কায় জন্মগ্রহণ করেন গাসসান কানাফানি। তিনি ছিলেন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র এবং তাদের সাপ্তাহিক সাময়িকী আল-হাদাফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটক পৃথিবীর ষোলোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে বৈরুতে এক গাড়িবোমা বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন।
আরও পড়ুন...