জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান
প্রবন্ধ নিবন্ধ আলী ওসমান শেফায়েত জুলাই ২০২৬
বন্ধুরা, তোমরা কি জানো পৃথিবীর প্রথম নির্ভুল মানচিত্র কে এঁকেছিলেন? কিংবা বর্তমানের রোবটিক্সের যুগে দাঁড়িয়ে বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কারক কে ছিলেন? গুটিবসন্তের প্রতিষেধক, স্ট্যাটিস্টিকস বা পরিসংখ্যানের ভিত্তি, আলোকবিজ্ঞান, রসায়ন, বীজগণিত কিংবা ত্রিকোণমিতির জনক আসলে কারা? এমনকি আমাদের অতি পরিচিত ফাউন্টেন পেন, উইন্ডমিল, পিন হোল ক্যামেরা, প্যারাসুট কিংবা শ্যাম্পু-এসবের উদ্ভাবকও ছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা অনেকেই আজ তাদের নাম জানি না।
বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম বিশ্ব পিছিয়ে থাকায় আমাদের অনেক কিশোর-বন্ধুর মনে হীনম্মন্যতা কাজ করে। চারদিকে তাকালে তারা শুধু অমুসলিম বিজ্ঞানীদের নামই শুনতে পায়। গ্যালিলিও, নিউটন কিংবা গ্রাহাম বেলের গল্প পাঠ্যবইয়ে পড়লেও জাবির ইবনে হাইয়ান, আল-খাওয়ারিজমি বা ইবনে সিনাদের বীরত্বগাথা আমাদের অজানাই থেকে যায়। কেন এমন হলো? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র।
নাম বদলের এক অদ্ভুত চক্রান্ত
ইসলামের স্বর্ণযুগ (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকিত সময়। তখন বাগদাদ থেকে কর্ডোভা-সবখানেই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের জয়জয়কার। ঐতিহাসিক জ্যাকের ভাষায়, “ইসলাম তার শ্রেষ্ঠতর সভ্যতার জোরে বিশ্বে পাঁচশত বছর আধিপত্য করেছে।”
পরবর্তীতে পশ্চিমা দুনিয়া এই ইতিহাসকে আড়াল করতে এক অদ্ভুত পথ বেছে নেয়। তারা মুসলিম বিজ্ঞানীদের অমর গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করার সময় তাদের নামগুলোও বিকৃত করে ফেলে। ইবনে সিনার নাম দেওয়া হলো ‘আভিসিনা’ (Avicenna), বীজগণিতের জনক আল-খাওয়ারিজমি হয়ে গেলেন ‘অ্যালগোরিদম’ (Algorism), আর শ্রেষ্ঠ মানচিত্রকর আল-ইদ্রিসের নাম দেওয়া হলো ‘দ্রেসেস’ (Dresses)। এমনকি জাবির ইবনে হাইয়ানের অস্তিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে ‘জিবার’ নামে এক কাল্পনিক ইউরোপীয় বিজ্ঞানীর গল্পও প্রচার করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই-ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন ভাবতেও না পারে এসব মহান উদ্ভাবকরা আসলে মুসলিম ছিলেন।
বিভিন্ন শাখায় মুসলিমদের রাজত্ব
১. চিকিৎসা ও ঔষধশাস্ত্র: চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্র বলা হয় ইবনে সিনাকে। তাঁর লেখা ‘কানুন ফিত তিব্ব’ ৫০০ বছর ধরে ইউরোপের মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রধান পাঠ্যবই ছিল। আল-রাজি সর্বপ্রথম গুটিবসন্ত শনাক্ত করেন। চোখের চিকিৎসায় আলী আল মাওসুলির অবদান আজও বিশ্ব স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, আধুনিক হাসপাতালের ধারণা কিন্তু মুসলমানদেরই দেওয়া। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে মালিকের সময়েই প্রথম স্থায়ী হাসপাতাল তৈরি হয়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বিনামূল্যে সুচিকিৎসা পেত।
২. রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা: রসায়নশাস্ত্রের জনক বলা হয় জাবির ইবনে হাইয়ানকে। তিনি প্রথম এসিড, গন্ধক ও বিভিন্ন যৌগিক সূত্র আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের ‘অপটিকস’ বা আলোকবিজ্ঞানের গবেষণা বর্তমান আধুনিক ক্যামেরার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। তিনিই প্রথম পিন-হোল ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন।
৩. গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা: শূন্য (Zero) এবং সংখ্যাবাচক চিহ্নের সঠিক ব্যবহার প্রথম শিখিয়েছেন আল-খাওয়ারিজমি। তাঁর হাত ধরেই এসেছে বীজগণিত (Algebra)। জ্যোতির্বিদ্যায় আল-বাত্তানি ও ওমর খৈয়ামের অবদান অনস্বীকার্য। উমর খৈয়াম প্রথম সঠিক বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন। আল-ফারাবি সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝেও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র তৈরি করেছিলেন।
৪. উদ্ভাবনী প্রযুক্তি: তোমরা জানলে অবাক হবে, প্রথম উড্ডয়ন যন্ত্র বা প্যারাসুটের প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। আল-জাজারি তৈরি করেছিলেন প্রথম স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিন ও ঘড়ি। এমনকি আজকের দিনে যে সাবান বা শ্যাম্পু আমরা ব্যবহার করি, তার মূলে ছিলেন আরবের রসায়নবিদরা।
আমাদের করণীয় কী?
বন্ধুরা, আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন ইউরোপ ছিল ঘোর অন্ধকারে। কিন্তু আজ আমাদের উদাসীনতা আর ভুল শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আমরা নিজেদের শেকড় ভুলে গিয়েছি। আমাদের উচিত আবারও সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পড়া এবং চর্চা করা।
তোমরা যখন ইবনে সিনা, আল-বেরুনি কিংবা আল-ফারাবিদের জীবন সম্পর্কে জানবে, তখন তোমাদের ভেতরের হীনম্মন্যতা দূর হবে, এই মহান বিজ্ঞানীরাই হবে তোমাদের আসল আইডল। এসো, আমরা আবারও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ফিরে যাই এবং নতুন এক সোনালি পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখি।
আরও পড়ুন...