মোরা বড়ো হতে চাই
ক্যারিয়ার গাইডলাইন ড. আহসান হাবীব ইমরোজ মে ২০২৫
সুপ্রিয় কিশোর-তরুণ বন্ধুরা! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। ঈদ মুবারক। কি খুব অবাক হলে, এ কেমন কথা; প্রায় এক মাস পরে ঈদের শুভেচ্ছা?
কিন্তু আমার কী দোষ, ‘Better late than never’ বাক্যাংশটি বিখ্যাত ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার ১৩৮৬ সালে ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’-এ প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। সুতরাং এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করা যায় নাকি?
ছোট মামা, বড়ো মামা ও পৃথিবীর বয়স কত?
আচ্ছা এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে যাচ্ছি; সবাইতো আমাদের রেখে মজা করে ঈদের ছুটিতে দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি বেড়িয়ে এলে, তাহলে এবার বলো দিকিন, তোমার দাদা-দাদু বা নানা-নানুর বয়স কত? ৭০, ৮০, ৯০ বা ১০০। ওরে বাপরে! অনেক তাই না?
আচ্ছা এবার একটি কুইজ ধরছি। বলো তো, যে চাঁদ দেখে রোজা রাখলে ঈদ করলে সেই চাঁদ ছোট মামার বয়স কত? গুগল না ঘেঁটে বলো ঝটপট। কি পারলে না? আচ্ছা আমিই বলছি, নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৪৫১ কোটি বছর আগে চাঁদের বিকাশ শুরু হয়েছে।
কারও জন্মের পরপরই বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্মনিবন্ধন নেওয়া এখন বাধ্যতামূলক। এই সনদ দেখেই ছেলে-বুড়ো সবার বয়স সঠিকভাবে জানা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, পৃথিবীর কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই। তাই এর সঠিক বয়স কত, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের অনেক তপস্যা করতে হয়েছে।
১৭ শতকে ইউরোপের এক খ্রিস্টান পণ্ডিত আর্চবিশপ জেমস উশার বাইবেল ঘেঁটে দাবি করেন, পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালের ২৩ অক্টোবর, শনিবার। এক্বেবারে সব কাটায় কাটায় তারিখ, বার সবই আছে শুধু সময়টা বলেননি। এভাবে পৃথিবীর জন্মতারিখ নির্ধারণ করে তিনি বেশ সমালোচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীরা তাঁর এই পাগলাটে দাবি মেনে নেননি।
উন্নত প্রযুক্তির সহযোগিতায় মার্কিন বিজ্ঞানী ক্ল্যারি প্যাটারসন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করেন, পৃথিবী, চাঁদ ও উল্কা একই সৌরজাগতিক উপাদান দিয়ে প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর আগে গঠিত। তারমানে পৃথিবী আর চাঁদের জন্ম কাছাকাছি সময়েই। (সূত্র : বিবিসি ফোকাস, স্পেস ডট কম)
আর ওই যে বড়ো মামা তেজি সূর্যটা সামান্য একটু বয়সে বেশি ৪৬০ কোটি বছর; মানে খেলার মাঠের গ্রুপলিডার আরকি।
আর সৃষ্টির সূচনা বলা হয় যে বিগব্যাঙ-এর মাধ্যমে তার বয়স? শুনলে ফিট হয়ে যাবে নাতো? তাহলে বলছি, ধারণা করা হয় বিগব্যাঙ শুরু ১,৩৮০ কোটি বছর আগে।
আবার ফিরছি প্রিয় পৃথিবীতে, তোমাদের অনেকের হয়তো একটি নিক নেইম আর আরেকটি বংশীয় পদবি আছে। তাতেই দেখবে অনেকের গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। অথচ আমাদের আবাসগ্রহ এ পৃথিবী; তোমরা অবাক হবে যে, বাংলায় এ গ্রহের আরো ১০টি চমৎকার নাম আছে, যেমন : ভূমণ্ডল, ধরণি, ধরিত্রী, অবনি, ক্ষিতি, বসুমতি, বসুন্ধরা, জগৎ, মহী, মেদেনী। ইংরেজিতে এটি আরথ বলা হয় আর অবাক কাণ্ড এর আরবি হচ্ছে আরদ।
একটি সাগরের গল্প
এবার এক সাগরের কথা বলি। তোমরা নিশ্চয় সাত সাগর তেরো নদীর গল্প শুনেছো। আসলে পৃথিবীতে মহাসাগর, সাগর আর উপসাগর মিলে আছে প্রায় ৫০টি। আজ যে সাগরের গল্প বলছি, তার নাম ভূমধ্যসাগর (Mediterranean Sea)। এটি প্রায় ৫৯ লক্ষ বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মাঝখানে একটি আন্তঃমহাদেশীয় সাগর।
মেসোপটেমীয়, মিশরীয়, কেনানীয়, ফিনিশিয়ান, হিব্রু, গ্রীক, রোমান, বাইজেন্টাইন, ইসলামীধারার সালতানের উৎপত্তি ও বিকাশ বুঝতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও এর অববাহিকার সংস্কৃতি এবং মানুষের ইতিহাস জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহু শতাব্দী ধরে রোমান সা¤্রাজ্য এরপর হাজার বছর ওমাইয়া, ফাতেমিয় ও ওসমানী ধারার মুসলিম শাসন সব শেষে পাশ্চাত্য এই ভূমধ্যসাগরে তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। এক কথায় বলা যায়, ভূমধ্যসাগরের দখল যার; সমগ্র পৃথিবী তার।
ভূমধ্যসাগরের চাবি
এ সাগরটি জিব্রাল্টার প্রণালির মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত। তাই জিব্রাল্টার প্রণালি ভূমধ্যসাগরের মূল চাবিকাঠি। এটি সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত জলপথগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি জাহাজ।
এই প্রণালিটি কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ৩০০ বছর যাবৎ জিব্রাল্টারের ওপর ব্রিটিশ কর্তৃত্ব উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়াতে তাদের প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ভূমধ্যসাগর ও জিব্রাল্টার নৌযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
বিজয় আর রক্ত-লাশের সাগর
ভূমধ্যসাগর ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ২৫টি দেশ এবং এ অঞ্চলের ৪৬,০০০ কিলোমিটার উপকূলরেখা স্পর্শ করেছে। এর আয়তন প্রায় ২৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার যা বৈশ্বিক মহাসাগরের পৃষ্ঠতলের মাত্র ০.৭%। ভূ-মধ্যসাগরের গড় গভীরতা প্রায় ১,৫০০ মিটার। কিন্তু মহাসাগরের তুলনায় স্বল্পতম ও অগভীর এ সাগরে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর নানা সভ্যতা, সা¤্রাজ্য ও দেশের বিজয়, পরাজয়, করুণ কান্না ও রক্ত-লাশ।
এক. জিব্রাল্টার : ইউরোপে মুসলিম বিজয়ের সিংহদ্বার
জিব্রাল্টার নামটি আরবি ‘জাবাল আল তারিক’ (তারিকের পাহাড়)-এর স্পেনীয় রূপ। তোমাদের মনে প্রশ্ন হতেই পারে কীভাবে উন্নত ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার নাম হলো আরবিতে। সে এক লোমহর্ষক বিবরণ।
তৎকালীন স্পেনের অভিজাতেরা তাদের মেয়েদের রাজদরবারে পাঠাতেন যাতে তারা রাজকীয় আইনকানুন শিক্ষা নিতে পারে। দুর্গ অধিপতি জুলিয়ানও তার মেয়ে ফ্লোরিন্ডাকে রডারিকের দরবারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্লোরিন্ডাকে পাষণ্ড রডারিক পাশবিক নির্যাতন করে। এমতাবস্থায় অসহায় পিতা জুলিয়ান আফ্রিকার মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইরের কাছে অশ্রুসজল চোখে মেয়ের দুর্দশা বর্ণনা ও সাহায্য প্রার্থনা করেন। মুসা তদীয় সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে চারটি যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে স্পেন অভিযানে পাঠালেন। তারিক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যে পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন, তাই আজ জাবালুত তারিক বা জিব্রাল্টার নামে অভিহিত।
তিনি তীরে ভিড়েই সব জাহাজে আগুন ধরিয়ে মুজাহিদদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমাদের সামনে দুটি পথ; একটি যুদ্ধে জয়লাভ করা আর অপরটি হলো মৃত্যুবরণ করা; পালাবার কোনো পথ নেই।’
তারিকের সাথে ছিল সাকুল্যে ৭ হাজার সৈন্য। অন্যদিকে রডারিকের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। অর্থাৎ একজনের মোকাবিলায় প্রতিপক্ষের ভূমিতেই প্রায় ১৪ জন।
পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসের ভয়ংকর এক অসম যুদ্ধ! ৭১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জুলাই উভয়পক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। তারিকের তেজস্বী নেতৃত্ব আর মুসলিম বাহিনীর প্রবল তেজের মুখে খ্রিস্টান বাহিনী শেষমেষ পশ্চাদপসরণ করলো। হাজার হাজার সৈন্য মারা গেল। রডারিক উপায়ান্তর না দেখে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায়শ্চিত্ত করলো তার পাপের।
সেনাপতি মুসা তাঁর নিজ সন্তান আবদুল আজিজকে স্পেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। স্পেনের রাজধানী নির্বাচিত হলো সেভিল। প্রকৃতপক্ষে এই সময় হতে ইউরোপে রেনেসাঁসের সূত্রপাত হয়। শুধু স্পেনে নয়, ফ্রান্স ও ইউরোপের কেন্দ্রভূমিতে এই নবজাগরণের ঢেউ প্রবাহিত হয়।
তৃতীয় আবদুর রহমানের সময়ে কর্ডোভার লোকসংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। নগরটি একই সঙ্গে ছিল ব্যুরোক্রেটিক, সংস্কৃতমনা, শিক্ষাপ্রসারী এবং বাণিজ্যসফল। শহরতলিসহ কর্ডোভার আয়তন ছিল ৫১ বর্গমাইল। রাজপ্রাসাদ অবস্থিত ছিল দুই বর্গমাইল জায়গা জুড়ে। আটটি শহর এবং তিন হাজারেরও বেশি ছোট ছোট শহর কর্ডোভার অধীনে ছিল।
শহরে রাস্তার ধারে সরকারি বাতি জ্বলতো। এর সাড়ে নয়শত বছর পরে লন্ডনে প্রথম ট্র্যাফিক আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা হয়। কর্ডোভার সুরম্য অট্টালিকা, বিলাসবহুল বাগান, পণ্যে ভরা বাজার সবকিছুই আধুনিক সভ্যজগতের হিংসার বস্তু। আবদুর রহমানের স্থাপিত রাজধানী কর্ডোভা নগরী অচিরেই ইউরোপের মুকুটে পরিণত হয়।
এর বিশালত্ব ও সৌন্দর্যের সুনাম, শত শত মার্বেল নির্মিত বাড়িঘর, তিনটি উপশহর, সূর্যের নিচে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জনতার ভিড়-সবকিছুই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল। উমাইয়ারা কর্ডোভাকে বানিয়েছিল পাশ্চাত্যের সব কলা ও বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থল।
স্ট্যানলি লেনপুলের ভাষায়- কর্ডোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একে ইউরোপীয় কৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। ইউরোপের সকল অংশের ছাত্ররা ওই শিক্ষকদের অধীনে পড়তে আসত।
অথচ ১৪৯২ সালে মুসলিমদের পরাজয়ের পর খ্রিস্টানরা কর্ডোভার মসজিদগুলোকে গির্জা, মানমন্দিরগুলোকে গির্জার ঘণ্টাঘর বানায় এবং রাজপ্রাসাদগুলোকে ধুলার সাথে মিশিয়ে দেয়। লাইব্রেরির লাখ লাখ বইপুস্তকে আগুন দেয়। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষহেতু মুসলিম কীর্তির সব কিছুই ধ্বংস করে ফেলে। পরিণামে আজ কর্ডোভা অজানা, অখ্যাত ও অনুন্নত একটি শহরমাত্র।
আর ১৪৯২ থেকে স্পেনের পরাজিত মুসলিমদের স্বধর্মত্যাগে বাধ্য করা হয়। তাদের সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে ঘেটোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়। একটি পর্যায়ে ১৬০৯ সাল থেকে এই ৫ থেকে ৭ লক্ষ অসহায় মুসলিমকে শিশু-নারী-পরিবারসহ সাধারণ নৌকা যোগে উত্তর আফ্রিকার দিকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যাদের অনেকেই পথিমধ্যেই নির্মম মৃত্যুর শিকার হন।
তবু ইউরোপীয় পণ্ডিতরা স্বীকার করেন-মুসলিমরা ইউরোপের কর্দমাক্ত ভূমিতে সভ্যতা ও উন্নয়নের যে বীজ বপণ করেছিল, তা-ই ইউরোপে গ্রীক-রোমানদের সেক্যুলার চিন্তার সাথে মিশেল হয়ে রেনেসাঁস আকারে সমগ্র দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। নানা পরিবর্তনের পরেও পাশ্চাত্যে আজো সে ধারাই অব্যাহত আছে।
দুই. বসনিয়া : সভ্যতাগর্বী ইউরোপের দগদগে ঘা
ভূমধ্যসাগরের তীরে ইউরোপের বসনিয়ার যুদ্ধ ছিল বিগত নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত একটি বড়ো জাতিগত নিধনের ট্র্যাজেডি। এ যুদ্ধে নিহতদের বেশিরভাগই ছিল মুসলমান। মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিল সার্বরা। এই যুদ্ধে গণহত্যা এমনকি শিশু-কন্যাদের ধর্ষণ ও শিশুদের হত্যা করাকে যুদ্ধ জয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিল বর্বর সার্বরা। এভাবে পাশ্চাত্য ও জাতিসংঘের নিস্ক্রীয় ভূমিকায় লক্ষাধিক মুুসলিম জাতিগত নিধনের শিকারে পরিণত হন।
তিন. ভূমধ্যসাগর একটা মৃত্যুর কারখানা
২০১৩ সালে মাল্টার রাষ্ট্রপতি নৌকাডুবির ফলে অভিবাসীদের মৃত্যুর কারণে ভূমধ্যসাগরকে একটা কবরস্থান বলেছিলেন। ইউরোপীয় সংসদের সভাপতি মার্টিন শুলজ ইউরোপের অভিবাসননীতিকে দায়ী করে বলেছিলেন, ‘ইউরোপ ভূমধ্যসাগরকে একটি কবরস্থানে রূপান্তরিত করেছে।”
আজারবাইজানের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘এটা এমন এক কবরখানা... যেখানে মানুষ মৃত্যুবরণ করে।’
২০১৫ সালে মূলত সিরিয়া যুদ্ধের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করার পর থেকে ইইউ দিশাহারা হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের রুটে ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে ১১ শতাংশ বেশি অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে।
ভূমধ্যসাগর ক্রমশই হতে চলেছে সলিলসমাধির সাগর। ২০২৩ এর ১৪ জুন গভীর রাতে গ্রিসের উপকূলে ডুবেছে প্রায় সাড়ে ৭০০ শরণার্থী বোঝাই একটি জাহাজ। উদ্ধার করা গেছে মাত্র ১০৪ জনকে। সাগরে সলিলসমাধি ঘটেছে পাঁচ শতাধিক মানুষের।
জাতিসংঘের অভিবাসীবিষয়ক সংস্থা আইওএম জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। ইইউ এ সকল ঘটনার জন্য মানব পাচারকারীদের দায়ী করছে। কিন্তু শরণার্থীরা কেন স্বদেশ ছেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিচ্ছেন, সেই উত্তর তারা খুঁজছে না। ওই দেশগুলোর সমাজ, অর্থনীতি, যুদ্ধাবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট যে তাদের কারণেই সৃষ্ট এটি তারা বলছে না। সেই ১৫০০ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই ইউরোপীয়রা নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্রপথের পথিক হয়েছিলেন। বণিকের বেশে প্রবেশ করে অপরের ভূখণ্ডের মালিক হয়েছিলেন। এই বণিকেরা পৃথিবীর সকল প্রান্তে ব্যবসা করেছেন আর অঢেল মুনাফার পাহাড় গড়েছেন এমনকি লুণ্ঠনও করেছেন। আজ প্রায় ৫০০ বছর পর ঘটনাটি বিপরীত, পৃথিবীর দারিদ্র্য, নিপীড়িত, যুদ্ধ-দাঙ্গাপীড়িত অভাবী অর্ধাহারে থাকা মানুষেরা স্বাবলম্বী মহাদেশের মানুষের কাছে একটু স্বপ্ন দেখতে চাইছেন, একটু আশ্রয় খুঁজছেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন, সেই আশ্রয়ের সলিলসমাধি ঘটছে ইউরোপের সর্বদক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের লোনাজলে।
চার . গাজা : বিশ্বমানবতার কবরস্থান
গাজা ভূমধ্যসাগর বরাবর ১৪০ বর্গমাইল (৩৬৩ বর্গ কিমি) এলাকা নিয়ে অবস্থিত। এর দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর এবং পূর্ব ও উত্তরে ইসরায়েল রয়েছে। গাজা হলো দুটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে ছোট অংশ। (অন্যটি হচ্ছে পশ্চিম তীর)
গাজার সাথে বাংলাদেশের অদ্ভুত মিল আছে। যেমন বাংলাদেশের আড়াইদিক ঘিরে আছে ভারত। সামান্য কিছুটা মায়ানমার আর দক্ষিণে সাগর। গাজার অবস্থাও তাই। তবে গাজা (Ġazzah) আয়তনে আমাদের বর্তমান ঢাকা মহানগরীর (Dhaka=Dacca, উচ্চারণটাও কাছাকাছি) কাছাকাছি (৩০৬ বর্গ কিমি)।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে বর্তমান পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ১৯ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৫০,৩৯৯ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখন আর কোনো বসতি-স্থাপনা আস্ত নেই। তবুও বোমা মারছে বর্বর ইসরাইল আর অসহায়, আশ্রয়হীন মানুষ খরকুটোর মতো আকাশে উড়ছে।
আমি যখন লেখাটা শেষ করছি তখন, গাজা থেকে ফেসবুকে সালেহ আল জাফরীর শেষ চিঠিটি নেট দুনিয়ায় ভাসছিল। সবাইকে কাদাচ্ছিল তাঁর শেষ আকুতি,
“রা।ফা।হ আর নেই। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে রা।ফা।হ।
অল্প সময়ের মধ্যে গাজাও নিঃশব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে দুনিয়ার মানচিত্র থেকে।
একটি একটি করে আলো নিভে যাচ্ছে, একটি একটি করে নিঃশ্বাস থেমে যাচ্ছে।
আমরা বাঁচার আর্তনাদ পাঠালেও পৃথিবী কানে নেয়নি।
“আপনারা আমাদের কেবল জান্নাতে খুঁজে পাবেন।
বিদায়! হে ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর উম্মত...”
প্রশ্নের কষাঘাত আমাদের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে, কেন অসহায়দের প্রতি, মুসলিমদের প্রতি এ অবর্ণনীয় নির্যাতন? কেন জাতিগত নিধন?
এর থেকে পরিত্রাণের কি কোনোই পথ নেই? এ উত্তর জানতে চোখ রাখতে হবে ‘শতাব্দী আজ ডাকছে তোমায়’-পরবর্তী লেখায়। হ
আগামী পর্বে থাকবে-
ভূমধ্যসাগর বাংলাদেশি তরুণদের লাশে ভরপুর
কোন যোগ্যতায় সেরা কোম্পানির শীর্ষে ভারতীয় তারুণ্য?
সফ্ট স্কিল কাকে বলে? কেন তা জরুরি?
আমরা আল্লাহর খলিফা কিন্তু সর্বত্র দুর্বল কেন?
আরও পড়ুন...