ঈদের খুশি
গল্প শরীফ আবদুল গোফরান মার্চ ২০২৬
ঘুম থেকে উঠেই চোখ কচলিয়ে কচলিয়ে কাঁদছে ইমন। আপু বুকে জড়িয়ে ধরে বলছেন,
: কাঁদছ কেন ইমু!
: আমাকে ভোর রাতে ডাকোনি কেন, আমি আজ রোজা রাখব কী করে?
: ও, এজন্য। ঠিক আছে, আজ রাতে ঠিকই ডাকব, কেমন। কালকে তুমি অবশ্যই রোজা রাখবে।
ইমনের খুব সখ ও একটা রোজা রাখবে। কিন্তু রাখবে কী করে। আম্মু যে রাখতে দেয় না। ভোর রাতে তাকে কেউ ডাকে না। সেহরি না খেলে কি এত ছোট মানুষ রোজা রাখতে পারে। রোজ বিকেলে মাঠে গেলে বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে,
: কিরে ইমন, রোজা রেখেছিস?
সে মাথা নেড়ে বলে, না।
মাঠে যে যার মতো রোজার হিসাব দেয়। আনন্দ করে হই-হুল্লোড় করে। ইমন মাঠের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে কেউ খেলায় নেয় না। ওর মন খারাপ। ও যে সবার মতো রোজা রাখেনি। খুব খারাপ লাগে। বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে। মাঝে মাঝে আম্মুর ওপর রাগ হয়। বিড় বিড় করে বলে,
: আম্মু যে কেমন, রোজা রাখতে দেয় না। অথচ সব বন্ধুরা রোজা রেখেছে।
বন্ধুরা কেমন যেন অন্য চোখে তাকায় ইমনের দিকে। শিপন তো সেদিন ভেংচি কেটে বলেই বসে,
: তোর মতো ছোঁচা হলে আর রোজা রাখতে হতো না।
ইমন বাড়ি ফিরে যায়। কারো সাথে কথা নেই। সারা বিকেল শুয়ে শুয়ে কেঁদেছে।
: ছি! ছি! আমি নাকি ছোঁচা! আমি তো রোজা রাখতে চাই, কিন্তু আম্মু যে রাখতে দেয় না।
রিতা আপু ঘরে ঢুকতেই আরও বেশি করে কেঁদে উঠল। আপুকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল,
: রিতা আপু আমি রোজা রাখব।
: হ্যাঁ রাখবেই তো। এখন বলত ভাইয়া, কী হয়েছে, তুমি কাঁদছ কেন?
: শিপনরা যে বলে আমি নাকি ছোঁচা। এজন্য রোজা রাখতে পারি না। ওরা আমার সাথে কথা বলে না। আমাকে খেলায় নেয় না।
: না ভাইয়া, তুমি ছোঁচা নও। তুমি ভালো। কালকে তুমি অবশ্যই রোজা রাখবে। সেহরির সময় তোমাকে আমিই ডেকে দেবো। কালকে আবার শিপনদের সাথে ঝগড়া করো না যেন।
: ঝগড়া করলে কী হয় আপু?
: ঝগড়া করলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়। পাপ হয়।
: ওরা গায়ের ওপর পড়ে ঝগড়া করলে আমি কী করব?
: না, তুমি বলবে আমি ঝগড়া করতে চাই না বন্ধু। আমি যে রোজাদার। তখন দেখবে ওরা সবাই তোমাকে আদর করবে।
উত্তেজনায় সেদিন অনেক রাত অবধি ঘুম হয়নি ইমনের। বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ-ওপাশ করেছে। সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে। মসজিদ থেকে সাইরেনের শব্দ আসছে। ইমন কারো ডাকার অপেক্ষা না করে উঠে পড়ল। সবার সাথে বসে সেহরি খেয়েছে।
আজ সারাদিন ইমনের রোজা। মুখটা ছোট হয়ে গেছে। আম্মু বারবার বলেছে, ইমন রোজা ভেঙে ফেলো। না, ও রোজা ভাঙবে না। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে মাঠের এক কোণে গিয়ে দাঁড়ায় ইমন। কেউ কিছু বললেই বকা দেবে। কিন্তু না, ইমনের মনে পড়ে গেল রিতা আপুর কথা। রিতা আপু বলেছে, রোজা তো রাখবি, কিন্তু জানিস, ঝগড়া করলে রোজা ভেঙে যায়।
আপু বলেছে, রোজা মানেই তো সংযম, বিরত থাকা। এ মাস হলো সাধনার মাস, ট্রেনিং নেওয়ার মাস। এ মাসেই তো সারা বছরের ভালো কাজ করার প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কারো সাথে কোনো কথা না বলে বাড়ি ফিরে এলো ইমন। আপুর সামনে পড়তেই, কিরে দুষ্টুর হাড্ডি কোথায় গেছিলি, চল চল পুকুর পাড়ে নতুন চাঁদ দেখতে যাই।
পুকুর পাড়ে হইচই। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এমনকি বড়রাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখছে। হঠাৎ চোখ পড়ল ইমনের, মেঘের কোলঘেঁষে একটা পাখি বারবার চক্কর দিচ্ছে। কিচ কিচ করে কি একটা পাখি ডাকে পেয়ারা গাছটায়। ইমন তাকিয়ে দেখে একটা শালিক। খয়েরি রঙের চমৎকার শালিক। একসময় নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘের ভেতর থেকে চিকন একটি বাঁকা চাঁদ উঁকি দিলো। চারদিকে শোরগোল। রিতা আপু আঙুল উঁচিয়ে ইমনকে বলল, ওই দেখো নতুন চাঁদ।
ইমনের খুশি যেন আর ধরে না। সাথে সাথে আজানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছে।
আগামীকাল ঈদ। চিন্তা মনে। কাল কী কী করবে আজই রুটিন ঠিক করতে হবে। কিন্তু চিন্তাটা শুধু আব্বুটার জন্য। আব্বু যে এখনো শহর থেকে ফেরেনি। আব্বুর কাছেই তো সব। নতুন জামা-কাপড় ছাড়া কি ঈদের পরিকল্পনা হয়। আব্বুই তো আনবে নতুন জামা-কাপড়। রিতা আপু বলেছে, এখন ঘুমিয়ে পড়ো, কাল আব্বুর সাথে ঈদের মাঠে যাবে। কিন্তু বন্ধুদের সাথে রাগ করলে চলবে না। সব ভুলে গিয়ে সবার সাথে কোলাকুলি করতে হবে, বুঝলে। ইমন মাথা নেড়ে সায় দেয়।
অনেক রাত। ইমনের চোখে ঘুম নেই। রাজ্যের চিন্তা মাথায়। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝিঁঝি পোকার ঝিঁঝি শব্দ কানে আসছে। গভীর রাত। দূর থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের ডাক। গাছ থেকে টিনের চালে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ার শব্দ। দাওয়ার ওপর শুয়ে থাকা রোগা কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে উঠল। সাথে আব্বুর কণ্ঠ।
: ইমন, রিতা উঠো। আমি এসেছি। এক ডাকে ঘরের সবাই ঘুম থেকে জেগে যায়। ইমন আব্বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
: আব্বু আমি আজ রোজা ছিলাম।
আব্বু ইমনের কপালে চুমু খেয়ে আদর করে বলেন,
: বেশ ভালো হয়েছে আব্বু, তুমি অনেক ভালো।
সকাল হয়েছে। আব্বুর সাথে গোসল সেরে ইমন নতুন জামা-কাপড় পড়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে কাজের বুয়ার ছেলে রতন। রতনকে দেখেই ইমন বলে,
: কিরে রতন, নতুন জামা পড়িসনি কেন?
: আমার যে নতুন জামা নেই।
ইমন তার গত বছরের ঈদের জামা কাপড়গুলো নিয়ে রতনকে পরিয়ে দিলো।
ইমন আব্বুর হাত ধরে ঈদের মাঠে এসেছে। শিপন, নাদিম সবার সাথে দেখা হলো। সবার সাথে কোলাকুলি করল ইমন।
: শোনো বন্ধু, রিতা আপু বলেছেন, ঈদের দিনে মনে রাগ রাখতে নেই। তাহলে আল্লাহ গুনা দেবেন। আজ সব ভুলে যাও, আমার সাথে রাগ করো না। আমিও তো তোমাদের মতো একটা রোজা রেখেছি।
ইমনের কথায় সবার মনের রাগ কেটে গেল। সব ঝগড়া ভুলে গিয়ে ঈদের খুশিতে ডুবে গেল সবাই।
আরও পড়ুন...