দুঃসাহসী দুই কিশোর
উপন্যাস এনায়েত রসুল জুন ২০২৬
(গত সংখ্যার পর)
ছয়.
স্টেশন থেকে বের হয়ে চিন্টু হাজারো মানুষ, অগণিত হকারের উচ্চ কণ্ঠের হাঁকডাক আর গাড়িঘোড়ার ভিড়ের মধ্যে এসে পড়ল। ওর মনে হলো সারাটা শহরের যানবাহন আর মানুষ যেন আজ কমলাপুর স্টেশনের সামনে এসে জড়ো হয়েছে।
যতই সমস্যা থাক, এত তাড়াতাড়ি আমাকে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। পিন্টুকে খুঁজে বের করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে-চিন্টু এ কথাগুলো ভাবল। তারপর মানুষজনের ভিড় ঠেলে নিজের ছোটখাটো শরীরটাকে এগিয়ে নিতে লাগল। এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর ভিড়ের ভেতর থেকে নিজেকে মুক্ত করে চিন্টু রাস্তায় এসে দাঁড়াল। এ রাস্তাতেও মানুষজন আছে, তবে তুলনামূলক কম।
চিন্টু একটা নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে সুস্থির হয়ে দাঁড়াল। প্রথমে লম্বা করে একটা শ্বাস নিল সে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, হে আল্লাহ! আমি তোমার সাহায্য চাই। আমি যেন আমার ভাইকে খুঁজে পাই।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা শেষ করে রাস্তার অপর পাশে তাকাতেই চিন্টুর বুকের ভেতর ধক্ করে উঠল। চিন্টু দেখল ঠিক পিন্টুর মতো চেহারার এক ছেলে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাত ধরে আছে রুক্ষ চেহারার এক ছেলে। ওদের সামনে রাখা আছে একটা স্যুটকেস। পিন্টুর মতো দেখতে যে ছেলেটি, সে বারবার চোখ মুছছে।
চিন্টু ভাবল, জুতা পলিশঅলা চাচামিয়া তাহলে ষন্ডা মার্কা এ ছেলেটির কথাই বলেছে। নিশ্চয় সে কোনো ছেলেধরা। মফস্বল শহরের সরল-সোজা পিন্টুকে পেয়ে তার আস্তানায় নিয়ে যেতে চাইছে। তবে আমি বেঁচে থাকতে এটা হতে দেবো না।
প্রবল উত্তেজনা আর আনন্দের এক মিশেল অনুভূতি চিন্টুকে অস্থির করে তুলল। চিন্টু নিজের করণীয় সম্পর্কে ভেবে চলল। ভাবল, আমি কি এখন চিৎকার করে পিন্টুকে বলব, ভাই আমি এসে গেছি। তোর আর ভয় নেই। নাকি আশেপাশে থাকা লোকজনকে ডেকে ঘটনাটা জানাব? সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলব, ওই দেখুন আমার ভাইকে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওকে উদ্ধার করে দিন-কী করা উচিত আমার?
চিন্টু এসব কথা ভাবল ঠিকই, কিন্তু ভেবে কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারল না। তার আগেই লাল রঙের একটা বাস এসে স্ট্যান্ডে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বড় ছেলেটি স্যুটকেস আর পিন্টুর মতো দেখতে ছেলেটিকে নিয়ে বাসে উঠে বসল।
এমন একটি উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে মুহূর্তের মধ্যে চিন্টু ওর করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল-এখন এদের দুজনকে ফলো করতে হবে। তারপর সুযোগ মতো ছেলেধরার হাত থেকে পিন্টুকে উদ্ধার করতে হবে।
বাসটা ততক্ষণে চলতে শুরু করেছিল ঠিকই, তবে জ্যামের কারণে স্পিড বাড়াতে পারছিল না। খুব ধীরগতিতে পিনপিন করে চলছিল। এ দৃশ্য দেখে চিন্টু আর এক সেকেন্ড দেরি করল না। দৌড়ে গিয়ে বাসটাতে উঠে পড়ল। বাসে খুব বেশি যাত্রী ছিল না। চিন্টু এদিক-ওদিক তাকাতেই ওর কাক্সিক্ষত দুজনকে দেখতে পেল। মাত্র দুই লাইন সামনে তিনজনার একটা সিটে পিন্টু আর ছেলেধরা বসে ছিল। ওদের ডান পাশে বসেছেন এক ভদ্রমহিলা।
ওদের পেছনে একটি সিট এখনো খালি রয়েছে। অন্য কোনো যাত্রী সেই সিটে বসার জন্য এখনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সম্ভবত এরা খুব কাছাকাছি কোনো স্টপেজে নামবে, তাই। এমন একটা সুযোগই চিন্টুর প্রয়োজন ছিল। চিন্টু আর দেরি না করে কয়েক যাত্রীর পাশ কাটিয়ে ঝটপট সেই সিটে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ ধরে একটানা ছোটাছুটি করে চিন্টু ক্লান্তি বোধ করছিল। সিটের ওপর সুস্থির হয়ে বসার পর সে প্রথমে লম্বা করে একটা শ্বাস টেনে নিল। তারপর আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মনে মনে বলল, দয়াময় আল্লাহ! তুমি আমাকে এভাবেই সাহায্য করো, আমি যেন আমার অসহায় ভাইটিকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারি।
মাত্র কয়েক ইঞ্চি সামনে পিন্টু আর ছেলেধরা বসে আছে। ওদের দেখে পিন্টুর সঙ্গে কথা বলার জন্য চিন্টুর মন ছটফট করতে লাগল। চিন্টু ভাবল, পিন্টুর সঙ্গে কথা বলা দরকার। আর একেবারেই যদি কথা বলা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত পিন্টুকে এ কথা জানিয়ে দেওয়া দরকার যে, চিন্টুও এই বাসে উঠেছে। তাই সে যেন ভয় না পায়। সুযোগ পেলেই চিন্টু পিন্টুকে উদ্ধার করবে।
চিন্টু বোকা ছেলে নয়। তাই অমন ইচ্ছে হবার সঙ্গে সঙ্গে ওর এ কথাও মনে পড়ল, পিন্টুর পাশেই ছেলেধরা বসে আছে। তাই পিন্টুর সঙ্গে কথা বললে ছেলেধরা সতর্ক হয়ে যাবে। তখন পিন্টুকে উদ্ধার করার কাজ কঠিন হয়ে পড়বে। তাই যা করার তা করতে হবে আরও ভেবেচিন্তে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে যে আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না, এ সময় চিন্টু আরেকবার তার প্রমাণ পেল। কিছুক্ষণ চলার পর এক স্টপেজে এসে বাস থামল। পিন্টুর ডান পাশে যে মহিলা বসে ছিলেন, তিনি সেই স্টপেজে নেমে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে চিন্টু নিজের সিট ছেড়ে মহিলার সিটে গিয়ে বসল। তারপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য খুব সাবধানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম পিন্টু?
পিন্টু বিস্ময়ভরা চোখে চিন্টুর দিকে তাকাল। চিন্টুকে সে চেনে বলে মনে হলো না। তবু চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো যে চিন্টুর ধারণা ঠিক-ওর নাম পিন্টু।
চিন্টু জিজ্ঞেস করল, এ ছেলেটা তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
পিন্টু এ প্রশ্নের জবাবে কিছু একটা বলার জন্য চিন্টুর দিকে ঝুঁকতেই ওর পাশে বসে থাকা ছেলেধরা ওদের দিকে ফিরে তাকাল। অমনি তার চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে বলল, এখানেও দুষ্টুমি? কী বলছিলে ওকে?
: কিছু না তো!
: কিছু না তো বললেই হলো! আমি নিজ চোখে দেখেছি তুমি ওর সাথে কথা বলতে চাইছ। এত কথার দরকার নেই। তুমি আমার ওপাশে এসে বসো।
এ কথা বলে ছেলেধরা জানালার পাশের সিটে পিন্টুকে বসিয়ে সে চিন্টুর পাশে এসে বসল। শুধু তাই নয়, কিছুক্ষণ পর যখন বাসটা নতুন এক স্টপেজে থামল, সে তখন পিন্টুকে নিয়ে আরও দু সারি সামনে চলে গেল। বড়ো ছেলেটির আচরণে চিন্টুর শুধু রাগই হলো না, সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞও হলো। মনে মনে বলল, যতই দূরে গিয়ে বসো, আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না। সারাক্ষণ আমি তোমাকে চোখে চোখে রাখব। আর ইনশাআল্লাহ আমার ভাইকে আমি উদ্ধারও করব।
চিন্টু শুধু এ কথা বললই না, কাজেও নেমে পড়ল। পেছনে বসে থেকেই সে পিন্টু আর ছেলেধরার ওপর নজর রাখতে লাগল। চিন্টু ভাবল, আপাতত আমার আর কিছু করার নেই। আমার আসল কাজ শুরু হবে ওরা বাস থেকে নামার পর। আমি ওদের পেছন পেছন যাব আর সুযোগ বুঝে আমার ভাইকে ছাড়িয়ে নেব।
সাত.
অনেকগুলো স্টপেজে থেমে, যাত্রীদের ওঠানামা করিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বাসটা রামপুরা নামের এক স্টপেজে এসে থামল। বাসের ভেতর তখনও যে যাত্রীরা ছিল তাদের কয়েকজন সেখানে নেমে গেল-সেসব যাত্রীর সাথে মিশে পিন্টুকে নিয়ে ছেলেধরাটিও সেখানে নামল। সুতরাং চিন্টুকেও তাড়াহুড়ো করে নামতে হলো।
তবে চিন্টু নেমে আসার আগেই পিন্টুকে নিয়ে ছেলেধরা রাস্তার অপর পাশে চলে গিয়েছিল। আর রেগে রেগে পিন্টুকে কী যেন বলছিল। অবশ্য পিন্টুও রেগে রেগে তার প্রত্যেকটি কথার জবাব দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, ওদের মধ্যে কী নিয়ে কথা হচ্ছে, কে কী জবাব দিচ্ছে, এ পাশ থেকে তা শোনা যাচ্ছে না।
কথা বলতে বলতে ছেলেধরাটি পিন্টুর হাত থেকে ওর স্যুটকেসটা নিজের হাতে নিল। তা দেখে চিন্টু ভাবল, হ্যাঁ, আমি যা ভেবেছি তাই সত্যি-আমার ভাইটি ছেলেধরার হাতে পড়েছে। বদমাশটা এখন ওর স্যুটকেসটাকে নিজ দখলে নিয়েছে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে পিন্টুর স্যুটকেসটা দামি আর সুন্দর। একবার তাকালে যে কারোরই ওটা ভালো লাগবে।
চিন্টু ভাবল, পিন্টু যে ছেলেধরার হাতে পড়েছে, এ কথা তো এখন চাঁদ-সূর্যের মতো সত্য। কিন্তু আমি এখন কী করব? আমি যদি চিৎকার করে লোকজন ডেকে এনে ছেলেধরাটাকে ধরিয়ে দিই, তাহলে ওর দলের লোকেরা এসে নয়-ছয় বুঝিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নেবে। সাধারণত এমনই ঘটে বদমাশদের বেলা। কিন্তু তা হতে দেওয়া যাবে না। আগে আরও প্রমাণ সংগ্রহ করব, তারপর বদমাশটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবো।
চিন্টু দেখতে পেল পিন্টু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর ছেলেধরা রিকশাঅলার সঙ্গে কথা বলছে। তার মানে সে রিকশায় তুলে পিন্টুকে তার আস্তানায় নিয়ে যেতে চাইছে। সমস্যা নেই, চিন্টুও রিকশা নিয়ে ওদের পেছন পেছন যাবে। পিন্টুকে উদ্ধার করার আগপর্যন্ত ছেলেধরার পেছনে সে চুম্বকের মতো লেগে থাকবে। চিন্টু এত কিছু ভেবে রাখলেও ছেলেধরা কিন্তু রিকশায় উঠল না। সে পিন্টুর কাছে ফিরে এসে আবার রেগে রেগে কী যেন বলে চলল।
রাস্তার এ পাশে দাঁড়িয়ে অপর পাশের কথা শোনার উপায় ছিল না। চিন্টু তাই বুদ্ধি করে ওপাশে গিয়ে যতটা সম্ভব ওদের পাশঘেঁষে দাঁড়াল। আর অন্যমনস্কতার ভান করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ওদের কথাবার্তা শুনতে চেষ্টা করল। তাতে অবশ্য ভালো ফলও পাওয়া গেল। চিন্টু শুনতে পেল ছেলেধরা বলছে, তুমি এত জেদ দেখালে তো চলবে না! কোনো রিকশাঅলা গলির ভেতরে যেতে চাইছে না। মাত্র অল্প একটু পথ, আমাদের হেঁটেই যেতে হবে। এসো আমার সঙ্গে। এ কথা বলে ছেলেধরা পিন্টুর হাত ধরল। পিন্টু হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করল কিন্তু হাত ছাড়াতে পারল না; বরং পিন্টুকে জোরাজুরি করতে দেখে ছেলেধরাটি আরও শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরল। তারপর বলল, এখনো তোমার মাথা থেকে পালিয়ে যাবার চিন্তা দূর হয়নি? কিন্তু তুমি তো জানো, যতবার পালাবে ততবার আমি তোমাকে ধরে আনব। একেবারে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে আসব। তাই যা বলছি মনোযোগ দিয়ে শোনো, ভালো ছেলের মতো আমার বাধ্য হয়ে থাকো।
পিন্টু হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, তুমি এক গুন্ডা। তুমি যখন-তখন আমাকে মারধর করো। না ঝন্টু, আমি তোমার সঙ্গে যাব না। আমাকে আমার পথে যেতে দাও। পিন্টু ঝন্টু নামটি বলায় চিন্টু বুঝতে পারল ওটা ছেলেধরার নাম।
সেই ঝন্টু বলল, তুমি ভালো করেই জানো তোমার এ অনুরোধ আমি রাখতে পারব না। তুমি কোথাও চলে গেলে তার জন্য আমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে। আর তুমি বলছ আমি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি। কিন্তু এ কথাও তো সত্য, কারো কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেতে হলে তার সঙ্গেও মিলেমিশে থাকতে হয়। কিন্তু তুমি তো বানরের চেয়েও চঞ্চল। আর অসহ্য রকম মুখরা। কথায় কথায় তর্ক করো। যাহোক, এখন আমার সঙ্গে চলো। আমার কথা মেনে চললে তোমাকে আমি কিচ্ছু বলব না। এবার ঝন্টু কথাগুলো খুব নরম সুরে বলল।
তবে তার পরপরই পিন্টুকে টেনে-হিঁচড়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। চিন্টুও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ওদের অনুসরণ করে চলল। আর এ গলি সে গলি পেরিয়ে ওরা এক দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাড়ির গেট বন্ধ ছিল। ঝন্টু নামের বদরাগী ছেলেটি একটা খোপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে গেট খুলে পিন্টুকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল।
আধুনিক ডিজাইনের সুন্দর বাড়িটার দিকে তাকিয়ে চিন্টু অবাক হলো। কারণ বিভিন্ন ডিটেকটিভ বই আর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিতে চিন্টু পড়েছে, সাধারণত যে এলাকা দিয়ে মানুষজন চলাচল করে না, যে জায়গাটি লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছে, তেমন জায়গা বেছে নিয়ে ছেলেধরারা তাদের আস্তানা গড়ে তোলে। সেগুলো হয় কোনো দুর্গম জঙ্গুলে জায়গা নয়তো অন্ধকার গুহা। কোনো কোনো পরিত্যক্ত ভাঙা দালানেও ওরা আস্তানা গড়ে। কিন্তু ঝন্টু তো পিন্টুকে নিয়ে ঝলমলে এক নতুন বাড়িতে ঢুকে গেল-ব্যাপার কী? আজকাল ছেলেধরারাও আধুনিক হয়ে গেছে নাকি? আসল ঘটনা যে কি, তা শুধু বাড়ির ভেতর যেতে পারলেই বোঝা যাবে।
একটা বিষয়ে চিন্টু নিশ্চিত ছিল, এ বাড়িতে কোনো দারোয়ান নেই। দারোয়ান থাকলে ঝন্টু তাকে ডেকে এনে গেট খোলাত। দারোয়ান নেই বলেই সে নিজের হাতে গেট খুলেছে। দারোয়ান না থাকাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে, বাড়িতে ঢোকার কাজটা চিন্টুর জন্য সহজ হয়েছে।
পিন্টুকে নিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় ঝন্টু খুবই উত্তেজিত ছিল। তাই গেটের পাল্লা দুটো লাগিয়ে যাবার কথা তার মনে আসেনি। পাল্লা দুটো মুখে মুখে মিশে না থেকে সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। সেই ফাঁক দিয়ে অতি সাবধানে চিন্টু ভেতরে ঢুকে পড়ল।
চারপাশে বাগান দিয়ে ঘিরে মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে বাড়িটা। ধবধবে সাদা তার রং। সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে চিন্টু মুগ্ধ হলো। ওর মনে হলো সবুজ দিঘির মাঝে যেন শ্বেতপদ্ম ফুটে আছে। বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া একটা পথ বাড়িটার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। সেই পথ দিয়ে এগিয়ে চিন্টু নিচতলার জানালাগুলোর কাচের ওপর চোখ রেখে চিন্টু পিন্টুকে খুঁজে চলল।
চিন্টু দেখল, এ পর্যন্ত যে কয়টি ঘর ওর দেখা হয়েছে, প্রতিটি ঘরই অত্যন্ত সুন্দর আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। কিন্তু ঘরগুলোর কোথাও পিন্টু বা ঝন্টুু নামের সেই ছেলেটি নেই। ঝন্টুুর কোনো সাঙ্গপাঙ্গোকেও দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি সবাই দোতলায় রয়েছে? তাই যদি হয় তাহলে তো পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হবে।
পশ্চিম পাশে আরও তিনটি ঘর রয়েছে যেগুলো এখনো দেখা হয়নি। চিন্টু এবার সেই ঘরগুলো দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নিল।
প্রথম ঘরটিতে শুধু কয়েকটি বইয়ের আলমারি আর দুটি চেয়ারসহ চিন্টু একটি টেবিল দেখতে পেল। এবার তার পরের ঘরটির জানালার কাচে চোখ ছুঁইয়ে ভিতরে তাকাল, অমনি ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। চিন্টু দেখল ঝন্টুু আর পিন্টু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ঝন্টুু হাত নাড়িয়ে চোখ পাকিয়ে কি যেন বলছে আর পিন্টু অসহায়ের মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আগের মতো মুখে মুখে তর্ক করছে না। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে মনের দিক থেকে কমজুরি হয়ে পড়েছে।
পিন্টুর কাঁদো কাঁদো অসহায় চেহারার দিকে তাকিয়ে চিন্টুর বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল। কিন্তু চিন্টু এ কথাও জানে, এখানে দাঁড়িয়ে কান্না করার মতো সময় ওর হাতে নেই। এখন থেকে প্রতিটি সেকেন্ড ওকে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে।
এক মুহূর্তের জন্য চিন্টু কাচের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, সে আবার কাচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে ঘরের ভেতর তাকাল। এবার সম্পূর্ণ নতুন এক দৃশ্য ওর চোখে পড়ল। চিন্টু দেখল, পিন্টু একটা সোফায় বসে আছে। সে আনমনে হাতের আঙুল ফুটিয়ে চলেছে আর টেবিলের ওপর থেকে একটা তালা তুলে নিয়ে ঝন্টুু ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এ বাড়ি থেকে কাউকে বাইরে যেতে হলে এই বাগানের ভেতর দিয়েই তাকে যেতে হবে। কারণ এ ছাড়া বের হওয়ার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। ঝন্টু নামের পাজি ছেলেটাকেও এ পথেই আসতে হবে। তখন চিন্টু তার চোখে পড়ে যাবে। ভাগ্য দোষে যদি অমন ঘটনা ঘটে, তবে ওদের দুজনারই ক্ষতি হবে। তাই চিন্টুকে আরও সাবধান হতে হবে। এ কথা ভেবে চিন্টু দ্রুত চারদিকে তাকাল। তারপর ছুটে গিয়ে একটা ঝোপের নিচে বসে পড়ল। সেখান থেকে বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পথটাকে দেখা গেলেও ঝোপের নিচে কেউ আছে কি না, তা দেখা যাবে না। তাই সেদিকে তাকিয়ে চিন্টুর বুকের ভেতর থেকে স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো।
ঝোপের নিচে চিন্টুর আধা মিনিট কেটেছে কি কাটেনি, সে দেখতে পেল আঙুলে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে মেন গেট দিয়ে ঝন্টু বেরিয়ে যাচ্ছে।
আট.
এখন আর ঝন্টু এ বাড়িতে নেই। সে চিন্টুর চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তবু চিন্টু আরও কিছুটা সময় সেই ঝোপের নিচে বসে রইল। তারপর মনের ভেতর থেকে যখন সায় পেল আপাতত ঝন্টুর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, তখন সে ঝোপের নিচ থেকে বের হয়ে আবার সেই জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
পিন্টু তখন সোফায় বসে অন্যমনস্কভাবে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল। পিন্টু এখনো সেই ঘরেই আছে দেখে চিন্টু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সে এবার চাপাস্বরে ডাকল-পিন্টু। এ্যাই পিন্টু, জানালা খোলো। তোমার সঙ্গে কথা বলব। তাড়াতাড়ি করো ভাই! জানালার সমুদ্র-নীল রঙের কাচ খুব মোটা ছিল। আর চিন্টুও প্রায় ফিসফিস করে কথা বলছিল। তাই চিন্টুর ফিসফিসে কণ্ঠ পিন্টু শুনতে পেল না। অথচ চিৎকার করে ডাকাডাকি করারও উপায় নেই। ঝন্টু বাড়িতে নেই সত্যি, কিন্তু কাছাকাছি তো থাকতে পারে। এ কথা ভেবে চিন্টু আর পিন্টুকে ডাকার ঝুঁকি নিল না। সে আঙুলের ডগা দিয়ে কাচের ওপর টুকটুক শব্দ করল। মাত্র দুবার শব্দ করতেই পিন্টু জানালার দিকে তাকাল। চিন্টু এবার হাতের ইশারা করে ওকে জানালা খোলার জন্য বলল।
চিন্টু জানালা খোলার জন্য ইশারা করলেও পিন্টু যে তা বুঝতে পারবে, পিন্টুর ওপর চিন্টুর এতটা ভরসা ছিল না। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে পিন্টু জানালার ফ্রেমটাকে একপাশে সরিয়ে দিলো। আর চিন্টুকে দেখতে পেয়ে বিস্ময়ে ভেঙে পড়ে বলল, তুমি!
: হ্যাঁ, আমি। অবাক হয়েছ?
: খুউব অবাক হয়েছি। বাসে দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে, সেই তুমি এখানেও এসেছ! অবাক হব না? পিন্টুর কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ল।
: আসব না কেন! তোমার জন্য আমি কত বড় ঝুঁকি নিতে পারি, তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না।
: কল্পনা করার দরকার নেই। সত্যিই তুমি আমার জন্য ভাবছ। এসো হ্যান্ডসেক করি। গ্রিলহীন জানালার ভেতর দিয়ে পিন্টু হাত বাড়িয়ে দিলো-চিন্টু সেই হাতে হাত রাখল। ওভাবে কয়েক সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পর পিন্টুর হাত ছেড়ে দিয়ে চিন্টু বলল, এবার আসল কথা শোনো।
: বলো।
: আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছি।
: তাই?
: অবশ্যই তাই। এটা তো আমার কর্তব্য। ভাই ভাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, এটাই তো নিয়ম। তাই কথা দিচ্ছি, যেকোনো বিপদ জয় করে আমি তোমাকে নিয়ে পালাব।
: রিয়েলি? সত্যিই তুমি আমার জন্য যেকোনো বিপদ মাথায় তুলে নেবে?
: অবশ্যই নেব।
অকৃত্রিম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিন্টু পিন্টুকে আশ্বাস দিলো। তবে ওর আশ্বাসে ভরা কথা শুনেও পিন্টুর চেহারায় এবার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। পিন্টু বলল, উদ্ধার করতে হলে তো আমাকে এ ঘর থেকে বের করতে হবে। কিন্তু বের করবে কেমন করে? ঝন্টুটা তো দরজায় তালা লাগিয়ে গেছে।
চিন্টু বলল, হ্যাঁ, এটা একটা সমস্যা। তবে সব সমস্যারই সমাধান আছে। ভেবে দেখি, এ সমস্যার হাত থেকে বাঁচার কোনো পথ পাই কি না।
কোনো কিছু ভাবার সময় আকাশের অসীমতার দিকে তাকানো চিন্টুর অভ্যাস। এ মুহূর্তেও চিন্টু তাই করল, মেঘমুক্ত নির্মল আকাশের দিকে তাকাল। আর পাঁচ সেকেন্ড পরেই প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, ইউরেকা! তোমাকে এখান থেকে বের করে আনার পথ পেয়েছি।
: এত তাড়াতাড়ি? তুমি তো জিনিয়াস হে!
: আল্লাহ সহায় ছিলেন তাই আমি ঝটপট একটা পথ পেয়ে গেছি।
চিন্টু মোনাজাত করার ভঙ্গিতে দু-হাত তুলে পিন্টুকে বলল।
ওর কথা শুনে পিন্টু বলল, বলো বলো, তোমার পথের কথা বলো। কৌতূহলে ফেটে পড়ল পিন্টু।
ওর অবাক হওয়ার ধরন দেখে চিন্টু মিষ্টি করে হাসল। তারপর বলল, এখন মনে হচ্ছে তোমাকে এ ঘর থেকে বের করে আনার মতো সহজ কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই। তুমি তো জানো তোমাদের জানালায় কোনো গ্রিল নেই। মশা আটকানোর যে নেট থাকে, তেমন কোনো নেটও নেই। এই না থাকাটাকেই আমরা কাজে লাগাব। এত মন খারাপ থাকা সত্ত্বেও পিন্টু হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল-বাহ্! কি কাজের বুদ্ধি তোমার! খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ এই সহজ কথাটা আমার মনেই আসেনি। না ভাই, মানতেই হবে তুমি এক জিনিয়াস।
চিন্টু বলল, প্রশংসা করার জন্য ধন্যবাদ। এবার জানালা দিয়ে বেরিয়ে এসো। তারপর ঝন্টুর নাগালের বাইরে চলে যাব।
: কেমন করে যাব? অসহায় কণ্ঠে পিন্টু জিজ্ঞেস করল।
আর পিন্টুর কাছ থেকে এমন একটা প্রশ্ন শুনে চিন্টুর মন বিরক্তিতে ছেয়ে গেল। চিন্টু বলল, কেমন করে ঝন্টুুর নাগালের বাইরে নিয়ে যাব সে কথাও তোমাকে খুলে বলতে হবে!
বেশ বলছি, প্রথম আমাকে ফলো করে দৌড়াবে। তারপর মেন রোডে গিয়ে আমি যে বাস বা ক্যাবে উঠব, তুমিও সেটাতে উঠবে। চলতে চলতে আমরা বাসায় পৌঁছে যাব। ব্যাস, সমস্যা শেষ।
চিন্টুর কথা শুনে পিন্টুর চোখে-মুখে আনন্দ ছলকে উঠল। পিন্টু বলল, বিশ্বাস করো, এখানে আমার আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না। এক্ষুনি আমি বের হয়ে আসছি।
পিন্টু সত্যি সত্যিই আর সময় নষ্ট করল না, জানালার ওপর উঠে লাফ দিয়ে বাগানে নেমে এলো। তারপর চিন্টুকে জড়িয়ে ধরে বলল, বের হয়েছি। এবার যেখানে ইচ্ছে আমাকে নিয়ে চলো।
চিন্টু বলল, নেওয়ার জায়গা তো একটাই-আমাদের বাড়ি। সেখানে গিয়ে দুই ভাই একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব আর মজা করে খেলব। তুমি বাইরে গিয়ে চারদিকের অবস্থাটা একটু দেখে এসো। আমি বাগানের কল থেকে পানি খেয়ে আসি। ভীষণ পিপাসা পেয়েছে।
নয়.
ঝন্টু আসলে দূরে কোথাও যায়নি। সে পাড়ার দোকান থেকে মশা মারার এরোসল কিনতে গিয়েছিল। ওটা নিয়ে ফিরে আসার সময় ঝন্টু এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের মুখোমুখি হলো। সে দেখতে পেল, পিন্টু বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। তবে এখনো নাগালের বাইরে যায়নি। একটা দেওয়ালের আড়াল থেকে সে গলির ভেতর উঁকিঝুঁকি মারছে।
পিন্টু বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে দেখে ঝন্টু শুধু অবাকই হলো না, ওর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সে তার করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ডও দেরি করল না। তবে রে... বলে একটা হুংকার দিয়ে রেগে যাওয়া ষাঁড়ের মতো পিন্টুর দিকে ছুটে গেল।
প্রায় পনেরো মিনিট আগে ঝন্টু বাড়ি থেকে বের হয়েছে। সে যে এখনও কাছাকাছিই রয়েছে, সে কথা পিন্টু ভাবতেও পারেনি। তাই আচমকা যখন ঝন্টু তবে রে বলে চেঁচিয়ে উঠল, পিন্টু তখন চমকে উঠে সামনে তাকাল আর ঝন্টুকে দেখতে পেল-দেখল, ওকে ধরার জন্য ঝন্টু দৌড়ে আসছে।
ঝন্টুকে দৌড়ে আসতে দেখে বুকের ভেতর কেঁপে উঠলেও পিন্টু এক মুহূর্তও দেরি করল না। জীবন বাজি রেখে সেও দৌড়ে চলল। কিন্তু দৌড়ালে কি হবে, পিন্টু তো ঝন্টুুর মতো দৌড়বিদ ছিল না, তাই প্রতি পদক্ষেপে সে পিছিয়ে পড়তে লাগল আর একসময় ধরাও পড়ে গেল।
পিন্টু বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে বলে ঝন্টুর মেজাজ তো আগেই বিগড়ে ছিল, ওকে ধরার জন্য অনেকটা পথ দৌড়াতে হয়েছে বলে সেই মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। সে প্রথমেই পিন্টুর গালে ঠাস ঠাস করে দুটি থাপড় বসাল। তারপর চুল ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলল, তোর এত সাহস বেড়েছে? এত করে সাবধান করে দেওয়ার পরও তুই পালিয়ে যাচ্ছিলিস? এখন তো দেখছি তুই আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বি।
গালে হাত বোলাতে বোলাতে পিন্টু বলল, তুমি তো আগে থেকেই পাগল হয়ে আছ। তাইতো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করো। এখন তুই তুই করে কথা বলছ। আমার এসব ভালো লাগে না।
ঝন্টু বলল, সব সময় তোমার পেছনে লেগে থাকতে আমারও ভালো লাগে না। কিন্তু তুমিই আমাকে তোমার পেছনে লেগে থাকতে বাধ্য করো।
: কেমন করে বাধ্য করি, বলো? কাঁদো কাঁদো হয়ে পিন্টু জিজ্ঞেস করল।
ওর প্রশ্নের জবাবে ঝন্টু বলল, কেমন করে বাধ্য করো তা তুমি বোঝো না? একটু সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতে চাও। কিন্তু তুমি তো জানো, আমি তা হতে দিতে পারি না। তুমি পালিয়ে গেলে আমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।
: তুমি যতই নিজের সাফাই গাও, আমি ওসব শুনব না। যেমন করেই হোক আমি কোথাও চলে যাব। কান্নাভেজা কণ্ঠে পিন্টু কথাগুলো বলল।
সেই সরল-সোজা কথা শুনে ঝন্টুর রাগ আরও বেড়ে গেল। ঝন্টু সাঁড়াশির মতো শক্ত করে পিন্টুর হাত চেপে ধরে বলল, ভালোই করেছ মনের কথা খুলে বলে। তোমাকে বাগে রাখতে আমার সুবিধা হবে। এসো আমার সঙ্গে, তারপর দেখো তোমার পায়ে কেমন করে শিকল পরাই।
চারপাশের অবস্থা দেখে আসার জন্য চিন্টু পিন্টুকে বাইরে পাঠিয়েছিল। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পরও পিন্টু যখন ফিরে এলো না চিন্টু তখন চিন্তিত হলো। ওর মনে হলো, পিন্টুকে তো একটা সামান্য কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল-শুধু উঁকি মেরে দেখে আসবে ছেলেধরাটা আশেপাশে রয়েছে কি না। সে কাজ তো চোখের পলকেই হয়ে যাবার কথা। কিন্তু পিন্টু ফিরে আসছে না। মফস্বলের সরল-সোজা ছেলে, কোনো ঝামেলায় পড়েনি তো? আসলে ওকে একা পাঠানো ঠিক হয়নি। আহা বেচারা...এসব ভেবে চিন্টুর নিজের ওপর রাগ হলো আর সে পিন্টুর খোঁজে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হলো। তবে এগোতে পারল না। তার আগেই ঝন্টু আর পিন্টুর ওপর ওর চোখ পড়ল-ওরা বাড়ির দিকে আসছে।
এখন কি করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নিতে চিন্টুর এক সেকেন্ড লাগল। চিন্টু আর পা বাড়াল না-এক দৌড়ে বাগানে ফিরে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। সেই গাছটা এমন জায়গায় ছিল যেখান থেকে বাড়ির ওপর নজর রাখা ওর জন্য খুব সহজ হলো। গাছের আড়াল থেকে চিন্টু স্পষ্ট দেখল, পিন্টুকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে ঝন্টু নিজ হাতে মেন গেট বন্ধ করল। (চলবে)
আরও পড়ুন...