দুঃসাহসী দুই কিশোর
উপন্যাস এনায়েত রসুল এপ্রিল ২০২৬
চিন্টু এক চটপটে ছেলে। বিস্ময়কর সাহস, অকল্পনীয় মেধা আর তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী সে। খেলাধুলাতেও দুর্দান্ত। বন্ধুদের বিপদে-আপদে সব সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কারো সঙ্গে একেবারেই ঝগড়া-মারামারি করে না। এসব কারণে নিশ্চিন্তে বলা যায়, চিন্টু এক ভালো ছেলে।
ঢাকা শহরের শেষপ্রান্তে উত্তরখান নামে শান্ত সুনিবিড় সুন্দর একটি এলাকা রয়েছে। সেই উত্তরখানের বালুর মাঠে চিন্টুদের বাড়ি। সেই বাড়িতে বাবা আর মায়ের সঙ্গে চিন্টু থাকে। বাড়িতে চিন্টুর সমবয়সি কেউ না থাকলেও পাড়া জুড়ে চিন্টুর অনেক বন্ধু রয়েছে। স্কুলে রয়েছে একঝাঁক ক্লাসমেট। সবার সঙ্গে ওর ভালো সম্পর্ক। সবাই ওকে বন্ধু ভাবে। তবে চিন্টু বলে-আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু পিন্টু।
এই পিন্টু হলো চিন্টুর ছোট মামার ছেলে। চুয়াডাঙার ফুলছড়ি নামে এক গ্রাম আছে, সেখানে ওদের বাড়ি। দুজন দুজনার সমবয়সি আর অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো-অন্তরঙ্গ বন্ধু হলেও ওদের কারো সঙ্গে কারো আজও দেখা হয়নি। কারণ, নানা কারণে চিন্টুর কখনো মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া হয়নি-তেমন পিন্টুরও কখনো উত্তরখানে আসা হয়নি। মুখোমুখি দেখা না হলেও দুই ভাইয়ের মধ্যে চিঠি আর ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ল্যান্ডফোনে কথা বলে দু ভাই যতটুকু না আনন্দ পায়, তার চেয়ে বেশি পায় চিঠি লেখালিখি করে। এ নিয়ে চিন্টুর মা মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করেন। মিটিমিটি হেসে তিনি চিন্টুকে বলেন, আজকাল তো কেউ পার্সোনাল চিঠিপত্র লেখেই না। তোরা দুজন লেখালিখি করে ডাক বিভাগকে বাঁচিয়ে রেখেছিস।
গত সপ্তাহে চিন্টুর নামে পিন্টুর কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছে। সেই চিঠিতে পিন্টু লিখেছে:
চিন্টু! সুপ্রিয় ভাই আমার, কেমন আছ ভাই? আল্লাহ তোমাকে ভালো রেখেছেন আশা করি। আল্লাহর দয়ায় আমি ভালো আছি। আমাদের জীবনের দুটি অবিশ্বাস্য ঘটনা কি জানো? প্রথমটা হলো-আমরা দুজন মামাতো-ফুপাতো ভাই আর বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কারো সঙ্গে কারো আজও দেখা হয়নি! আর তার চেয়েও অবিশ্বাস্য কাণ্ড, আমি তোমার ছবি পর্যন্ত দেখিনি-তুমিও আমার ছবি দেখোনি! এই ইন্টারনেটের যুগে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটে চলেছে-এ কথা শুনে আমার স্কুলের বন্ধুরা হেসে লুটোপুটি খায় আর আমি লজ্জায় মরে যাই। এরচেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে?
ভাই, তোমাকে দেখার জন্য আমার মন ছটফট করছে। কিন্তু স্কুলের স্যারদের নিয়ে হয়েছে এক সমস্যা। তারা ছোটদের মনের কথা বুঝতে চান না। দিনের পর দিন শুধু স্কুল খোলা রাখেন আর আমাদের স্কুলে যেতেই হয়। স্কুলে যেতে যেতে পুরোনো বছর শেষ হয়ে নতুন বছর শুরু হয়। নতুন ক্লাসে উঠে আবার স্কুলে যেতে হয়। এ কারণে আমি ঢাকা আসতে পারি না আর তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয় না। তোমারও তো ঠিক একই সমস্যা, তাই না?
এবার সমস্যা মিটে গেছে। গত পরশু সাইক্লোন এসে আমাদের স্কুল ভেঙে দিয়েছে। নতুন করে স্কুলঘর বানাতে হবে। তাই এক মাসের জন্য স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সুযোগে আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য আব্বুকে রাজি করিয়েছি। তিনি বলেছেন খুব তাড়াতাড়ি আমাকে ঢাকা পাঠাবেন। তবে কবে পাঠাবেন, সে কথা পরে ফোনে জানাব।
চিন্টু! আব্বু ট্রেনে বসিয়ে দিলে কমলাপুর স্টেশনে এসে নামতে পারব। কিন্তু সেখান থেকে তোমাকেই আমার দায়িত্ব নিতে হবে। আমার জন্য একটু কষ্ট যে তুমি হাসি মুখেই করবে, সে আমি জানি। আজ আর নয়। ফুপা আর ফুপিকে আমার সালাম জানিও। আর বোলো, আমি ঢাকা এসে তাদের অবাক করে দেবো। ভালো থেকো ভাই। ইনশাআল্লাহ আমাদের দেখা হবে।
শুভ কামনায় তোমার ভাই, তোমার প্রিয় বন্ধু পিন্টু।
চিঠি পাওয়ার পর থেকে চিন্টু শুধু বারবার মাকে জিজ্ঞেস করছে-মাম্মী! পিন্টু কি ফোন করেছে? চিঠিতে লিখেছে ফোন করে সব জানাবে। আমি তো স্কুলে ছিলাম। পিন্টু কি ফোন করে কিছু জানিয়েছে? চিন্টুর প্রশ্নের জবাবে মাও বারবার একই কথা বলে যাচ্ছেন, জানিস তো তোর মামাবাড়িতে ফোন নেই।
পিন্টুকে ফোন করতে হয় নিজাম ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে। তাই চাইলেই ফোন করতে পারে না। ফোন করবে যখন বলেছে তখন সময় সুযোগ পেলে অবশ্যই ফোন করবে। এত অস্থির হচ্ছিস কেন!
বহু প্রত্যাশিত সেই ফোন এলো আজ বিকেলে। তবে পিন্টু নয়, ফোন করেছেন পিন্টুর বাবা। তিনি জানিয়েছেন, সোমবার সকালে চুয়াডাঙা স্টেশন থেকে পিন্টুকে ট্রেনে তুলে দেবেন। সেই ট্রেন কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছোবে বিকেল তিনটা সাতাশ মিনিটে। কেউ যেন স্টেশনে গিয়ে ওকে নিয়ে আসে।
দুই.
আজ সোমবার। সারা শহর কুয়াশায় ছেয়ে আছে। হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে উত্তরে বাতাস। কিন্তু সেসব পরোয়া না করে চিন্টু কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠল। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে কাজে নেমে পড়ল। না, পড়ালেখার কাজ নয়-ঘর সাজানোর কাজ। চিন্টুর ঘরের দেওয়ালে ডানে-বাঁয়ে কাৎ হয়ে থাকা কয়েকটি ছবি ছিল, সেগুলো সোজা করে সাজাল সে। তারপর বইয়ের তাক আর পড়ার টেবিল গোছানোর কাজে হাত লাগাল। চোখের পলকে বইখাতা থরে থরে সাজানো হয়ে গেল। ওয়াক্স দিয়ে পলিশ করে জুতা দুটোকে ঝকঝকে করে তুলল। গ্লাস ক্লিনার স্প্রে করে জানালার কাচগুলো মুছল। এমনকি সিলিং আর এদিক-ওদিক যত ঝুলঝাড় জমে ছিল, সেগুলোও পরিষ্কার করল। সব শেষে বিছানার চাদরটাকে এমন টানটান করে বিছাল যে, সেই চাদরের দিকে তাকিয়ে মা চমকে উঠলেন। তিনি জানেন আজ চিন্টু নিজের ঘর নিজেই গুছিয়ে নিচ্ছে। তবু জিজ্ঞেস করলেন, এসব তুই করেছিস?
চিন্টু বলল, আমি ছাড়া আর কে করবে, বলো? কেন মাম্মী, ভালো হয়নি?
চোখে-মুখে খুশির ঝলক ছড়িয়ে মা বললেন, ভালো হয়নি আবার! খু-উ-ব ভালো হয়েছে। কী সুন্দর করে গুছিয়েছিস তুই! আমি তো মুগ্ধ হয়ে গেছি।
: তাই? এত সুন্দর গুছিয়েছি আমি?
: হ্যাঁ, বাবা। সব সময় এমন করেই সবকিছু গোছগাছ করে রাখবি। তা দেখে সবাই তোর প্রশংসা করবে। বলবে, চিন্টু খুব ভালো ছেলে। কী সুন্দর করে ঘর গুছিয়ে রাখে। বইপত্র সাজিয়ে রাখে। শুনে তোর ভালো লাগবে।
মায়ের কথা শুনে চিন্টু বলল, আমি কিন্তু কারো প্রশংসা শোনার জন্য এসব করিনি মাম্মী। আমি এসব করেছি পিন্টুর জন্য।
: তাই?
: হ্যাঁ, মাম্মী। আমি ঠিক করেছি আমার এ ঘর পিন্টুকে দেবো। এখানে পিন্টু ঘুমাবে আর আমি অন্য ঘরে ঘুমাব। তুমি আমার সঙ্গে এসো।
চিন্টু মায়ের হাত ধরল। মা বললেন, তোর সঙ্গে আমি কোথায় যাব? রান্নাঘরে আমার কত কাজ পড়ে রয়েছে!
চিন্টু বলল, বেশি দূরে নয় মাম্মী, পাশের ঘরে। সেখানেই আমি শোব। তুমি একটু দেখে যাও মা।
নিজের সাজানো গোছানো ঘরটি পিন্টুর জন্য রেখে মাকে নিয়ে চিন্টু দু-ঘর পেরিয়ে ছোট একটি ঘরে গেল। এ ঘরটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। নিয়মিত ঝাড়পোছ করা হয় না। তাই ধুলোবালিতে একাকার হয়ে থাকে। আজও ঘর ধুলার সমুদ্রে ডুবে আছে। সেসব দেখিয়ে মা বললেন, এ ঘরে তুই থাকবি কেমন করে? যা অবস্থা হয়ে আছে ঘরটার!
চিন্টু বলল, এ নিয়ে তুমি ভেব না। পিন্টুকে আনতে যাওয়ার আগে আমি সব ঠিক করে নেব। ফ্যান আছে, লাইট আছে, টেবিল আছে, দুটো জানালা আছে। শুধু নেই একটা খাট। শোবার জন্য খাট আনতে হবে। আমাদের এক্সট্রা খাট আছে না?
মা বললেন, খাট তো আছে। কিন্তু কেমন অবস্থায় আছে, সে হলো কথা। আয় আমার সঙ্গে। দেখে আসি খাটের কী অবস্থা।
মা চিন্টুকে নিয়ে স্টোররুমে গেলেন। সেখানে একটা খাট আছে। তবে সেই খাটের ওপর রাজ্যের সব অকেজো জিনিস রাখা হয়েছে। মা নিজ হাতে সেসব নামিয়ে রাখলেন। তারপর তিনি আর চিন্টু ধরাধরি করে খাটটাকে পাশের ঘরে নিয়ে এলেন।
চিন্টুরা যে এলাকায় থাকে সেখান থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের দূরত্ব কম করে হলেও পঁচিশ কিলোমিটার। যেতে হবে বাসে চড়ে। আর তাতে প্রচুর সময় লাগবে। মা তাই দুপুর দুটোর সময় চিন্টুকে বললেন, তুই ঝটপট তৈরি হয়ে স্টেশনে চলে যা। বাসে চড়ে যাবি। ট্রাফিক জ্যাম ডিঙিয়ে সেই বাস যে কখন তোকে কমলাপুর পৌঁছে দেবে, তা আল্লাহই জানেন।
: ঠিক বলেছ মাম্মী। বাসগুলো এতটাই ঢিমেতালে চলে আর ওদেরকে এত জ্যাম মাড়িয়ে পিলপিল করে যেতে হয় যে, মনে হয় বাস থেকে নেমে দৌড়ে দৌড়ে যেখানে যাওয়ার সেখানে চলে যাই। ধৈর্য থাকে না মা।
মায়ের কথায় সমর্থন জানাল চিন্টু। ওর কথা শুনে মা বললেন, সেই জন্যই এক ঘণ্টা আগে তোকে রওনা দিতে বলছি। তুই তো আজও পিন্টুকে দেখিসনি-পিন্টুও তোকে দেখেনি। তাহলে তোরা দুজন দুজনকে চিনবি কেমন করে?
মায়ের প্রশ্নটা লুফে নিয়ে চিন্টু বলল, ওহ্ মাম্মী, দারুণ একটা পয়েন্ট সামনে এনেছ। এটা একটা বিরাট সমস্যা-পিন্টুকে আমি চিনব কেমন করে? প্লিজ, একটা বুদ্ধি বের করো।
মা বললেন, বছর চারেক আগে পিন্টু একটা ছবি পাঠিয়েছিল। কিন্তু ওটা ওর একক ছবি নয়। এমন ছবি কি কোনো কাজে আসবে?
: কাজে আসবে কিনা তা তো জানি না। কিন্তু আমি তো তোমার কথাই বুঝতে পারছি না!
: কোন কথা?
: এই যে বললে ওটা পিন্টুর একক ছবি নয়। এ কথাটা বুঝতে পারছি না।
চোখে মুখে প্রশ্ন ছড়িয়ে চিন্টু মায়ের দিকে তাকাল। মা বললেন, বুঝতে পারছিস না কেন! এক ক্লাসমেটের জন্মদিনে কেক কাটার মুহূর্তে তোলা গ্রুপ ছবি ওটা। সেই ছবিতে একঝাঁক ছেলেমেয়ের মাঝে পিন্টুও আছে। তবে অনেকের ভিড়ে ওর চেহারাটা ফুটে ওঠেনি। সেটা এনে দিচ্ছি, মনোযোগ দিয়ে দেখে সঙ্গে নিয়ে যা। তাহলে ওকে চিনে নিতে তোর সুবিধা হবে।
মা কতগুলো বই ঘেঁটে তার ভেতর থেকে একটা ছবি বের করে চিন্টুর হাতে দিলেন। সেই ছবিটা উলটেপালটে দেখে নিয়ে চিন্টু বলল, ছবি দেখে গেলাম। পিন্টুকে খুঁজে পেতে আর সমস্যা হবে না। একটা জিনিস খেয়াল করেছ মাম্মী, বয়সে সমান হলেও পিন্টু আমার চেয়ে লম্বায় একটু ছোট। তবে বেশি না, এক ইঞ্চির মতো।
মা মুচকি হেসে বললেন, এ কথাটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারিস না। এত ছেলেমেয়ের মাঝে কারো উচ্চতা আলাদা করে বোঝা যায় না।
আরও একবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে চিন্টু বলল, বোঝার মতো চোখ থাকলে ঠিকই বোঝা যায়। সে চোখ তোমার ছেলের আছে। তো, এবার ছবিটা রাখো।
মা বললেন, রাখব কেন? সঙ্গে নিয়ে যাবি না? নিয়ে গেলে পিন্টুকে খুঁজে পেতে সুবিধা হবে।
চিন্টু বলল, নিজের ভাইকে চিনে বের করার জন্য ছবির দরকার হবে না। ওকে আমি ঠিকই বের করে নেব।
মা বললেন, বুঝলাম, নিজের ভাইকে চেনার জন্য ছবির দরকার হবে না। তবুও ছবিটা নিয়ে যা। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা।
: বলো।
: তুই তো মনে হয় পিন্টুর পুরো নামও জানিস না। জানিস ওর আসল নাম কী?
: না মা, আসল নাম তো জানি না। কিন্তু আসল নাম জেনে কী করব?
চিন্টুর কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেল। মা বললেন, কখন কোন দরকারে লেগে যায় তার কোনো ঠিক আছে? ওর নাম মনোয়ার হোসেন। ওই মনোয়ার থেকেই তোর সঙ্গে মিলিয়ে ওর ডাকনাম রেখেছি পিন্টু-আর চয়ন চৌধুরী থেকে তোর নাম চিন্টু। সুন্দর হয়েছে না নাম দুটো?
: হ্যাঁ, সুন্দর হয়েছে। আমাদের নাম শুনলে সবাই বুঝবে আমরা দুই ভাই। তো মাম্মী, এবার আমি যাই।
: আরে বাবা যাবি তো! যাওয়ার আগে কাজের কথা শুনে যা। এমন হতে পারে স্টেশনের ভিড়ের ভেতর তুই পিন্টুকে খুঁজে পাচ্ছিস না। তখন নাম ধরে ডেকে ডেকে খুঁজে নিবি। দরকার হলে স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো নাম অ্যানাউন্স করার ব্যবস্থা করবি। আর ছবিটাও নিয়ে যা, তোর ভালোর জন্যই বলছি।
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চিন্টু মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা দাও। ছবি নিচ্ছি আর আমি যাচ্ছি। পিন্টুর ছবি আমার বুকপকেটে রইল। পিন্টুকে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না ইনশাআল্লাহ।
তিন.
চিন্টুদের বাড়ি থেকে বাসস্টপেজ প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। সেই পথটুকু সবাইকে রিকশায় চড়ে নয়তো হেঁটে হেঁটে যেতে হয়। চিন্টু রিকশায় এসে কমলাপুরগামী একটা বাসে উঠে বসল। ওর পরেও কয়েকজন যাত্রী বাসে উঠল। তারপর স্টপেজ ছেড়ে বাসটি চলতে শুরু করল। এখন চিন্টুর শুধু একটাই কাজ, এ বাসটা কত কম সময়ের ভেতর ওকে কমলাপুর পৌঁছে দেবে, সেই অপেক্ষায় থাকা।
চিন্টু অবশ্য বাসটার চেয়েও দ্রুত গতিতে নানা কথা ভেবে চলল। যেমন চিন্টু ভাবল, এ শহরে স্টেডিয়াম আছে, শিশুপার্ক আছে, জাতীয় জাদুঘর আছে, শহীদ মিনার আছে, নভো থিয়েটার আছে, লেক আর থিম পার্ক আছে-সে সব দেখিয়ে সে পিন্টুকে তাক লাগিয়ে দেবে। আচ্ছা, পিন্টু কি ক্রিকেট খেলতে পারে? সম্ভবত পারে না। আর পিন্টু যদি দৌড় প্রতিযোগিতায় নামতে চায়, তাহলে চিন্টুর অবস্থাটা কেমন হবে? চিন্টু কি পিন্টুর সঙ্গে দৌড় দিতে গিয়ে হেরে যাবে? হয়তো চিন্টু হেরেই যাবে। কারণ একটু দৌড়োতে গেলেই চিন্টুর হাঁপ ধরে যায়।
আর হেরে গেলেই বা ক্ষতি কি! তবুও যে মামাতো ভাইটির সঙ্গে দেখা হবে। দুজন মন খুলে গল্প করবে, সারাটা শহর ঘুরে বেড়াবে-সেটাও তো কম কথা নয়। অনেকটা সময় ধরে চিন্টু শুধু পিন্টুর কথা ভেবে চলল-পিন্টুকে নিয়ে কী কী করবে, কোন কোন বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে আর কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবে, সেসব কথা। সে অবসরে বাসটা অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছিল। এমন গতিতে ছুটে চলতে পারলে হয়তো আর পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ মিনিটের মধ্যেই ওটা কমলাপুরের কাছাকাছি পৌঁছে যেত। কিন্তু নতুন বাজার নামে এক জায়গায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল-ঘাবড়ে যাওয়ার মতো একটা হার্ড ব্রেক কষে ড্রাইভার বাসটাকে থামিয়ে দিলো। ফলে সিটে বসে থাকা যাত্রীরা ঝাঁকুনি খেল। সামনের সিটের ব্যাক রেস্টের সঙ্গে ঘষা খেয়ে থুতনিতে ব্যথা পেল আর দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা এ-ওর গায়ের ওপর ঢলে পড়ে ড্রাইভারকে বকাঝকা দিতে লাগল। ব্যাপারটা কী তা দেখার জন্য জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চিন্টু দেখতে পেল পথের দুপাশ থেকে হই হই করতে করতে লোকজন বাসের দিকে ছুটে আসছে। হেলপার, কন্ডাক্টর আর ড্রাইভারও বাস থেকে নেমে গেছে। চিন্টুর পাশের যাত্রীও তড়িঘড়ি করে নেমে গেলেন। যাবার সময় চিন্টুকে বললেন, আসবে নাকি? এসো বাবা, দেখে আসি ব্যাপারটা কী? অমন বয়স্ক এক ভদ্রলোক অনুরোধ করায় চিন্টুও ভদ্রলোকের পেছন পেছন নেমে গেল। আর রাস্তায় নেমে দেখতে পেল এক নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো দৃশ্য। চিন্টু দেখল, ওর সমবয়সি এক ছেলে বাসের সামনে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তার চারপাশে আলু-পটোল-পিঁয়াজ আর মাছ ছড়িয়ে আছে। লোকজন সেসব ঘিরে দাঁড়িয়ে হইচই করছে। কেউ কেউ ড্রাইভার কোথায়, ড্রাইভার কোথায় বলে বাসের ভেতর উঁকি দিয়ে ড্রাইভারকে খুঁজছে। কিন্তু কেউ ছেলেটিকে উঠে বসতে সাহায্য করছে না! মানুষজনকে এমন নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিন্টু শুধু অবাকই হলো না, রীতিমতো বিচলিত বোধ করল। সে ভাবল, একটা ছেলে রাস্তায় পড়ে থেকে ব্যথায় কাতরাবে আর কেউ তাকে সাহায্য করবে না-এ কেমন কথা? ছেলেটিকে সাহায্য করার চেয়ে ড্রাইভারকে পিটানোটাই কি বড় হলো এদের কাছে?
না, চিন্টুর পক্ষে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। ওকে কিছু করতে হবে। জনতার জটলা থেকে সরে এসে চিন্টু ছেলেটির দিকে হাত বাড়িয়ে ধরল। সেই হাত ধরে পড়ে থাকা ছেলেটি ধীরে ধীরে উঠে বসল। এর পরপরই ওদের সামনে বাসের কন্ডাক্টর এসে দাঁড়াল। কাঁদতে থাকা ছেলেটির কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে সে বলল, এই বদমাশ! ফুটপাত ছাইড়া রাস্তার মাঝখানে আইছিসি ক্যান? বাসের নিচে পড়লে সব দোষ তো আমাগো ঘাড়ে পড়ত। ভাগ্য ভালা যে ওস্তাদ ব্রেক করছিল।
কন্ডাক্টরের ঝাঁকুনি খেয়ে ছেলেটি ভয় পেয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। কিন্তু ওকে কাঁদতে দেখেও কন্ডাক্টর লোকটির মায়া হলো না; বরং চোখ পাকিয়ে সে আবার চেঁচিয়ে উঠল-বল, মাজখান দিয়া হাঁটছিলি ক্যান? রাস্তাটারে শিশুপার্ক মনে করছিলিনি?
ছেলেটি এবার চোখ মুছতে মুছতে বলল, আমি ফুটপাত দিয়েই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা লোক এসে আমার বাজারের ব্যাগ কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। আমি ওর কাছ থেকে ব্যাগ কেড়ে এপাশে চলে আসছিলাম। সে সময় আমার সামনে বাস এসে পড়ে। আমি দুঃখিত, আঙ্কেল।
সে সময় দু-চারটা কিল-ঘুসি খেয়ে ড্রাইভারও কন্ডাক্টরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, দুঃখিত কইলেই সব মিট্টা গ্যালো, না? যত্তসব চ্যাংরার দল। যা, ভাগ এইখান থিকা। বান্দর পোলাপান।
বাসের পেছনে নানা ধরনের গাড়ির লাইন বেঁধে গিয়েছিল। অধৈর্য হয়ে ড্রাইভাররা হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল। চিন্টুর বাস থেকে যে যাত্রীরা নেমে এসেছিল তারা তাড়াতাড়ি বাসে উঠে বসল। কৌতূহলী পথচারীরাও একজন-দুজন করে সরে পড়ল। শুধু পথের ওপর চিন্টু আর সেই আহত ছেলেটি দাঁড়িয়ে রইল। ততক্ষণে ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়েছিল। চিন্টু জিজ্ঞেস করল, ব্যথা হচ্ছে? একা একা যেতে পারবে?
: একা একা? আমার বাসায়?
: হ্যাঁ, যেতে পারবে?
ছেলেটি বলল, না ভাই, মনে হচ্ছে একা যেতে পারব না। হাঁটুতে ব্যথা লাগছে। পা ভেঙে ভেঙে আসছে। দাঁড়াতে পারছি না। অসহায় কণ্ঠে ছেলেটি নিজের অবস্থা জানাল।
ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে চিন্টুও দেখতে পেল সত্যিই ছেলেটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। তাই চিন্টু বলল, দাঁড়াতে না পারলে তো সমস্যা। তোমাদের বাড়ি কি এখান থেকে অনেক দূরে?
ছেলেটি বলল, ওই যে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে, ওটার শেষ মাথায়। খুব দূরে নয়। কিন্তু আমি যাব কেমন করে! দেখছ তো ভাই, আমি দাঁড়াতে পারছি না।
একটু ভেবে নিয়ে চিন্টু বলল, মন খারাপ করো না। আল্লাহ একটা ব্যবস্থা করে দেবেনই। আচ্ছা এক কাজ করো। একটু চেষ্টা করে আমার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াও। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে চলো। এভাবে হেঁটে হেঁটে একসময় বাড়িতে পৌঁছে যাবে। ততক্ষণ আমি তোমার পাশে থাকব।
এক অসহায় ছেলেকে সাহায্য করার দায়িত্ববোধটা চিন্টুর মাঝে এতটাই প্রবল হয়ে উঠল যে, সেই মুহূর্তে চিন্টুর মন থেকে পিন্টুর কথা মুছে গেল। চিন্টু খুব সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাতের কিনার ধরে হেঁটে হেঁটে একতলা এক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল-এটিই ছেলেটির বাড়ি।
চার.
বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে একটা বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। সেই দরজার ফ্রেমের ওপর কলিংবেলের সুইচ ছিল। চিন্টু পরপর দুবার সেই সুইচে চাপ দিলো। এর একটু পর মধ্যবয়সি এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে উঁকি দিলেন। চিন্টুর কাঁধে হাত রেখে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির ওপর চোখ পড়তেই তিনি আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠলেন, হায় আল্লাহ! কী হয়েছে তোর, কলি?
কলি নামের ছেলেটি কোনো জবাব দেওয়ার আগেই ভদ্রমহিলা চিন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে বাবা? কলির কী হয়েছে?
বিরক্ত কণ্ঠে কলি বলল, আহ্ মা, আগে ঘরে ঢুকতে দেবে তো। এসো ভাই আমরা ভেতরে যাই।
এবার কলির মা এগিয়ে এসে কলিকে ধরলেন। তার সহযোগিতায় চিন্টু কলিকে নিয়ে খাটের ওপর বসাল। নিজেও তার পাশে বসল। তখন কলির মা কলির মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোর কী হয়েছে বাবা?
: পায়ে ব্যথা পেয়েছি। কলি হাত দিয়ে কেটে যাওয়া হাঁটু ঢেকে জবাব দিলো।
মা বললেন, পায়ে ব্যথা পেয়েছিস কেমন করে? মারামারি করেছিস, তাই না? আর বাজারের ব্যাগ, ওটা কোথায়? ব্যাগ কোথায় রে?
মাথার ওপর থেকে মায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে কলি বলল, আহ্ মা! তুমি একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছ! একসঙ্গে এত প্রশ্ন করলে আমি জবাব দেবো কেমন করে! আমাকে একটু জিরোতে দাও, তার পর সব বলছি।
কলি নয়, শেষমেশ চিন্টুই কলির মায়ের কাছে দুর্ঘটনার কথা খুলে বলল।
সব শুনে কলির মা বললেন, আল্লাহ সহায় ছিলেন বলেই আমার ছেলে বেঁচে এসেছে। আর তুমিও ওকে অনেক সাহায্য করেছ। তোমার নাম কী বাবা?
: চিন্টু-চয়ন চৌধুরী চিন্টু।
: খুব সুন্দর নাম। আল্লাহই কলির এই বিপদের সময় তোমার সঙ্গে ওর দেখা করিয়ে দিয়েছেন। কৃতজ্ঞ কণ্ঠে কলির মা কথাগুলো বললেন।
চিন্টু বলল, বাসে করে কমলাপুর যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বাস থেমে যাওয়ায় নেমে দেখি এই ঘটনা। কলির পক্ষে এতটা পথ একা আসা সম্ভব হতো না, তাই ওকে নিয়ে এসেছি। (চলবে)
আরও পড়ুন...