দেখে এলাম শেকসপিয়রের বাড়ি
ভ্রমণ জাফর তালুকদার ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অ্যাভন নামের একটা সুগন্ধি ব্যবহার করেছিলাম ছাত্রজীবনে। স্নিগ্ধ ঘ্রাণের সেই সুগন্ধির ওপর মায়া জন্মেছিল অন্য একটা কারণে। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ উইলিয়াম শেকসপিয়রের জন্মস্থানের নাম। নামটা মনে গেঁথে থাকলেও সুগন্ধিটা হারিয়ে গেছে।
আগেরবার যখন ইংল্যান্ডে বেড়াতে যাই-লন্ডনের জাদুঘরগুলো দেখতে দেখতেই সময় ফুরিয়ে যায়। তখন শরীর-মন ছিল তরতাজা। দেখার আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূত হতাম কেবল। এখন ফের লন্ডনে এলাম বটে, কিন্তু সেই সবল মনের জোর গেছে হারিয়ে। কিন্তু দুই দুুইবার লন্ডন এসে শেকসপিয়রের স্মৃতিধন্য ঘরবাড়ি দেখা হবে না এটা কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না মনে। প্রিয় সজ্জন ব্যারিস্টার রফিউল করিম সুনু আর আসমা করিম মনা বোধ করি আমার মনের কথা পড়তে পেরেছিল। যে কারণে পূর্বনির্ধারিত বার্মিংহাম ভ্রমণের সঙ্গে ওরা যুক্ত করে নিল শেকসপিয়রের জন্মভূমি স্ট্রাটফোর্ডকে। এতে মনের খচখচানিটা দূর হলো বটে, দূরত্বের ভোগান্তিটা অবশ্য বাড়ল।
লন্ডন থেকে ১৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রফিউল তার আরামদায়ক ল্যান্ডরোভার গাড়িখানা প্রায় উড়িয়ে নিয়ে এলো স্ট্রাটফোর্ড অ্যাভনে শেকসপিয়রের জন্মভিটায়। দলে যথারীতি চারজন। শিখা, মনা আর সুনুর সঙ্গে আড়কাঠির মতো ঝুলে আছি আমি। দ্য শেকসপিয়র সেন্টারের সামনে এসে অভিভূত হলাম। এলিজাবেথীয় যুগের ইংরেজি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, জাতীয় কবি, বিশ্বের অগ্রণী নাট্যকার ও বার্ড অব অ্যাভন নামে খ্যাত উইলিয়াম শেকসপিয়রের বসতভিটার মুখোমুখি দাঁড়াতেই প্রবলভাবে শিহরিত হলাম। মনে হলো ইতিহাসের অতীত অধ্যায়ের একটা আলোর দুয়ার সহসা খুলে গেল চোখের সামনে।
এখানের বাড়িঘর পুরোটাই প্রায় পুরোনো ধাঁচের। তেমন নতুনত্ব কিছু নেই। কিন্তু পুরোনো ঐতিহ্যকেই তারা অতি যতনে সাজিয়ে রেখেছে আপন মহিমায়। এতটুকু ব্যত্যয় বা নড়চড়ের ন্যূনতম আঁচড় লাগেনি এর কোথাও। শেকসপিয়র সেন্টারের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে একটু খটকা লাগল। টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ২৫ পাউন্ড একটু বেশি বলে বিবেচিত হতে পারে। শেকসপিয়র সেন্টারটি কবির ছবি, সনেটের চুম্বক উদ্ধৃতিসহ মূল্যবান তথ্য ও ডকুমেন্টে মনোরম ডিসপ্লে করে সাজানো। শুরুতেই একটি ভিডিও ক্লিপি নিবেদিত হলো দর্শকের উদ্দেশে। পরে গ্যালারিতে এসে বড় স্ক্রিনে ভিন্ন আমেজে দেখা হলো নাটকের বহু স্মরণীয় ডায়ালগ। সেন্টারের নানা অধ্যায় দেখা শেষ করে পুরোনো আমলের শক্তপোক্ত সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এসে দেখা মিলল চমৎকার একখণ্ড বাগান। নানা রকম ফুল-ফলের গাছে ঠাসা বাগান পেরিয়ে উঁকি দিলাম শেকসপিয়ারের মূল বাড়িতে। এখানেই বাস করতেন বাবা জন শেকসপিয়র আর মা মেরি আর্ডেন। শেকসপিয়র এখানে জন্মগ্রহণ করেন ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ এপ্রিল। আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করেন তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের বড় অ্যানি হ্যাথাওয়েকে। তাদের ছিল তিন সন্তান। সুজানা, হ্যামলেট আর জুডিথ। বাবার ছিল চামড়া ও উলের ব্যবসা। হ্যান্ড গ্লবসও তৈরি হতো তাদের কারখানায়।
শেকসপিয়ারের অনেক নাটক ছিল মঞ্চ সফল। তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ৩৯টি নাটক। ১৫৪টি সনেট। ম্যাকবেথ, দ্য টেমপেস্ট, রোমিও জুলিয়েট, হ্যামলেট, দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস, ওথেলো, জুলিয়াস সিজার, কিং লিয়ার, কোরিওলেনাস, এ মিড সামার, নাইট ড্রিমসসহ বেশ কয়েকটি দীর্ঘ আখ্যান-কবিতাও সমৃদ্ধ করেছে তাঁর রচনার ঝুলি। কবির লেখা অনুদিত হয়েছে বিশ্বের সবগুলো সেরা ভাষায়। অন্য যেকোনো নাট্যকারের তুলনায় শেকসপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে অনেক বেশি। নাটকের কারণে লন্ডন বাসের সময় তিনি একটি নাট্য কোম্পানির অর্ধস্বত্ব মালিকানা ভোগ করেছেন। শেকসপিয়রের প্রায় শতাধিক জীবনী লেখা হলেও তার বেশির ভাগই রচিত হয়েছে সরকারি কাগজপত্র, মামলার রেকর্ড ও সত্তরটির মতো নথির ওপর ভিত্তি করে।
শেকসপিয়রের বসতবাড়ি ঘুরে দেখে সেই আমলে ব্যবহৃত তাঁর পড়ার টেবিল, পাণ্ডুলিপি, দলিল-দস্তাবেজ, লেখালিখির সরঞ্জাম, কাঠের বাক্স, শোবার ঘর, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, পোশাক-আশাক, খাবার টেবিলে সাজানো খাদ্য, ফলফলারি, তৈজসপত্র, রান্নাঘর, কাঠ, চামড়া, দস্তানা ইত্যাদি সবকিছুই ইতিহাস খুঁড়ে সাজানো হয়েছে নতুনের মতো। এমনকি চুলো আর ফায়ার প্লেসের কৃত্রিম আগুনের ভেল্কি দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যেতে পারে দর্শকের। মহান লেখক শেকসপিয়র মারা যান ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল মাত্র ৫২ বছর বয়সে। তাঁকে সমাহিত করা হয় স্ট্রাটফোর্ড আপঅন অ্যাভনের হোলি ট্রিনিটি চার্চের চ্যান্সেলে।
বাগানে ঘুরে সময় কাটালাম কিছু মুহূর্ত। বেশ কিছু পুরোনো গাছপালার পাশে পড়ে আছে লোহার তৈরি একটা জটিল ঘড়ি। বাগানের কোণের দিকে একটি গাছের ছায়ায় আবিষ্কার করলাম কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আবক্ষ পাথরের মূর্তি। পাশে শ্বেত পাথর কুঁদে লেখা কবিতাটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে। বিদেশবিভুঁইয়ের মাটিতে বিশ্বকবির উপস্থিতি দেখে ভালো লাগল।
শেকসপিয়রের বই ও গিফট শপ ঘুরে আমরা নেমে এলাম বাইরে। শীতের সকালের মতো হামলে পড়ল বাতাসের তেজ। শেকসপিয়রের সুউচ্চ কালো মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত কিছু চীনা তরুণ-তরুণী। মনা অনেক কসরত করে আমাদের ছবি তুলল কয়েকটা।
এবার ফেরার পালা। দুপুরের নেমন্তন্নে যোগ দিতে শেকসপিয়রের স্বপ্নভূমি ছেড়ে বার্মিংহামের পথে গাড়ি ঘোরাল সুনু।
আরও পড়ুন...