লাল জুলাইয়ে স্বপ্ন হাসে

গল্প ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ জুলাই ২০২৫

পানি লাগবে পানি! গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড গরমে বাসে কিংবা ট্রেনে কোনো পানি বিক্রেতার মুখে উচ্চারিত হলেই বুকের ভেতরে খচ করে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শহীদ মীর মুগ্ধের হাসিমুখ। মীর মুগ্ধ মানে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। মুগ্ধ এখন মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। মুগ্ধ এখন আর্তমানবতার পাশে দাঁড়িয়ে যাওয়া নতুন কোনো অনুপ্রেরণার নাম। মুগ্ধ মানে নতুন মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নফুল।

শুরুটা হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মাধ্যমে। একসাথে একই আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা। একই সাথে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। একই ধরনের সনদ কিংবা তার চেয়েও ভালো ফলাফল অর্জন। তবুও কোটার দৌড়ে সে বিজয়ী আর আমি পরাজিত এবং বঞ্চিত। কোটাকে আরও ত্বরান্বিত করা হলো ক্রমশ। কোটা হয়ে উঠল ফ্যাসিবাদের স্বার্থ হাসিলের রাজনৈতিক হাতিয়ার। এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। তাই শুরু হলো কোটাবিরোধী আন্দোলন। ন্যায়সংগত এই আন্দোলনকে পাত্তাই দিলো না শাসকগোষ্ঠী। ভাবল, মোবাইলে আসক্ত এই জেনারেশনকে সহজেই কুপোকাত করা যাবে। তাই ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করার কৌশল বেছে নেয়।

আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও কম যায়নি। তারা আন্দোলনের গতিপথ আরও তীব্রতর করল। কোটা থেকে শুরু হলো নয় দফার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। রাজপথে নেমে এলো সবাই। স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় সবখানে শুরু হলো বিক্ষোভ। এ বিক্ষোভ বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এ বিক্ষোভ অন্যায়ের প্রতিবাদে। এই বিক্ষোভ অধিকার আদায়ের জন্য। আওয়ামী সরকার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। হয়ে উঠল মারমুখী। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিংস্র করে তুলল। দলের ছাত্র-যুব সংগঠনকে লাঠিয়াল বাহিনী থেকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করল। সারা দেশে শুরু হলো দমনপীড়ন। খুন, গুম, গণগ্রেফতার। 

কষ্টের দাগ মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলল শিক্ষার্থীরা। ওরা দাবির বাস্তবায়ন ছাড়া ঘরে ফিরবে না। বুকের রক্তের চেয়ে দাবি আদায়কেই মুক্তির পথ মনে করল। পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে গেলেন আবু সাঈদ। শহীদ হলেন তিনি। আবু সাঈদের রক্ত মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে, সারা বিশ্বে। আন্দোলনে নতুন জোয়ার এলো। সারা দেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে স্লোগান উঠল। স্লোগান উঠল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে। মুক্তির স্লোগান। বৈষম্যবিরোধী স্লোগান। সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্র পালটানোর স্লোগান। আবু সাঈদ হয়ে উঠলেন আন্দোলনের প্রতীক। ফ্যাসিবাদের আতঙ্ক।

বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে নারকীয় তাণ্ডব চালাল ছাত্রলীগ। কিন্তু টিকতে পারল না সাহসী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কাছে। লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। ছাত্রলীগ শূন্য হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আন্দোলনকে থামিয়ে দেবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ ঘোষণা করল প্রশাসন। কিন্তু তারা বোঝেনি যে, বালির বাঁধে প্রখর স্রােত থামানো যায় না। নেমে এলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় বেঁধে তারা রাস্তায় নেমে এলো। তাদের চোখে মুখে কবি ফররুখ আহমদের পঙক্তির প্রতিচ্ছবি ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদি রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী’। 

সারা দেশে রক্ত আর রক্ত। লাশ আর লাশ। সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে আহত-নিহত মানুষের রক্তাক্ত ছবি। প্রশাসন সেখানেও হাত দেয়। বন্ধ করে দেয় নেট সার্ভিস। হায়রে পাগলামন্ত্রী! এটাও বোঝার ক্ষমতা নেই যে আমাদের শিক্ষার্থীরা আর বোকা নেই। ওরা মোবাইল টেকনোলজিতে মন্ত্রীর কৌশলের চেয়ে বেশি প্রাজ্ঞ! নানা উপায় বের করে ছড়িয়ে দেয় বিদ্রোহের সকল খবরাখবর। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনার উদ্দীপ্ত পঙক্তি মালা।

আন্দোলন যতই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আওয়ামী প্রশাসন ততই নেকড়ে থেকে হায়েনা হয়ে উঠল। স্বৈারাচার থেকে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠল। হাসিনা হয়ে উঠল রক্তখেকো ডাইনি। ভাবল, ডাইনি-ভূতের ভয়ে শিক্ষার্থীরা মায়ের আঁচলের নিচে গিয়ে লুকিয়ে আশ্রয় নেবে। কিন্তু আমাদের সন্তানেরা এখন ডাইনি-ভূতকে ভয় পায় না। ডাইনি তাড়ানো ডালিম কুমারে রূপান্তরিত হয়েছে তারা। মায়েরাও আঁচলে ঠাঁই দেওয়ার পরিবর্তে সন্তানকে সাথে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে শিখেছে।

ডাইনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। এবার শুরু করে আকাশ পথে হামলা। রক্তখেকো হায়েনারা হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঝরে পড়ে অসংখ্য স্বপ্নকুসুম। আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস দেখে থেমে থাকেনি সাধারণ মানুষ। সকলেই নেমে আসে রাস্তায়। কৃষাণ, মজুর, রিকশাওয়ালা, শিক্ষক অফিসার কর্মচারী সকলের মুখেই স্লোগান। সকলের চোখেই মুক্তির আগুন। মুদি দোকানিরা নিজেদের দোকান থেকে বিনা পয়সায় খাবার পানি বিতরণ শুরু করে। মায়েরা খাবার রান্না করে নিয়ে এসে রাজপথের লড়াকুদের পাশে দাঁড়ায়। শিশু-কিশোর-যুবা-প্রৌঢ়-বৃদ্ধ সকলেই জীবনবাজি রেখে রাস্তায় নেমে আসে। এ যেন জনস্রােত। নতুন স্বাধীনতা সংগ্রাম।

হেলিকপ্টার-জলকামান-গুলি-টিয়ারশেল কোনো কিছুতেই থামে না মিছিলের স্রােত। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হবে না। ৩১ জুলাই, ৩২ জুলাই, ৩৩ জুলাই, এভাবেই ক্যালেন্ডারে নতুন তারিখ স্থাপন করতে থাকল। ইতিহাসে তৈরি হতে থাকল নতুন ক্যালেন্ডার। নতুন তারিখ। ৩৩ জুলাই ২০২৪ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে নয় দফা নামিয়ে এক দফার আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হলো। বলা হলো, ‘এই খুনি সরকারকে কোনোভাবেই আর সমর্থন দেবেন না। যদি কোনোভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, কোনোভাবে কারফিউ কিংবা জরুরি অবস্থা দেওয়া হয়, আমরা বলে দিচ্ছি প্রয়োজনে গণভবন ঘেরাও করে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা হবে।’ 

নতুন জনকম্পনে প্রকম্পিত হয়ে উঠল বাংলাদেশ। প্রবল জনস্রােতে সবকিছু তছনছ হবার উপক্রম। তবুও অনড় ডাইনি। রক্ত চাই। রক্ত চাই। রক্ত ঝরিয়ে জনস্রােত বন্ধ করো। 

রক্তের বন্যায় কালো রাজপথ, সবুজ মেঠোপথ লালে লাল হয়ে উঠল। তবুও আন্দোলন থেকে একচুলও নড়ানো সম্ভব হয় না। ‘গুলি করি। মরে একটা। একটাই যায়, স্যার। বাকিডি যায় না। এটাই স্যার বড়ো আতঙ্কের।’ পুলিশের এমন বর্ণনায় অবশেষে ভয় পেয়ে যায় প্রশাসন। ডাইনির সাঙ্গোপাঙ্গরা।

আরও বিপ্লবী হয়ে ওঠে দেশবাসী। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ৩৭ জুলাই। সরকারের কারসাজি ঠেকাতে সুকৌশলে একদিন এগিয়ে ৩৬ জুলাই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করা হলো। সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখার পরেও কোটি মানুষের ভিড়ে ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়ে। কতজনকে গুলি করবে! কত মানুষ মারবে। সারা দেশের শহর নগর গ্রাম সর্বত্র মিছিল স্লোগান। সারা বাংলাদেশজুড়ে শুধুই মিছিল, শুধুই স্লোগান। খুনের নেশায় মেতে উঠেও সরকারি-বেসরকারি বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের রেহাই হলো না। ৩৬ জুলাই নামে নতুন তারিখে নতুন ইতিহাস তৈরি হলো। জনস্রােতের বিপরীতে দাঁড়াতে না পেরে পালিয়ে আত্মরক্ষা করল ডাইনি পরিবার। মুক্তির উল্লাসে মেতে উঠল সারা দেশ। ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা লুকিয়ে গেল গর্তের গহিনে। নতুন স্বপ্নে উদ্ভাসিত হলো লাল-সবুজের পতাকা। নির্মিত হলো নতুন বিপ্লবের ইতিহাস। নতুন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ থেকে নৌকা নিয়ে পালিয়েছে মাঝি-মাল্লা। আমরা বললাম, কুচক্রী মাঝির চেয়ে নৌকাশূন্য খেয়াঘাটই ভালো। সাঁতার কেটে পার হব আমরা। বানাব সাঁকো। নতুন সেতু। নিজেরাই কাজ করব। বাঁশ কাটব। রশি বানাব। সাঁকো তৈরি করব। তাই করা হলো। ট্র্যাফিক থেকে শুরু করে সবকিছুই সামাল দিয়েছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। ওরা হয়ে উঠল তারুণ্যের অহংকার। স্বপ্নতরুণ।

৮ আগস্ট নতুন বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস। তাঁর হাতে হাত রেখে এগিয়ে গেছে আমাদের তারুণ্য; আমাদের যুবস্বপ্ন। বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্নে চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রা। ফ্যাসিবাদের প্রধান কলাকৌশলী পালিয়ে গেলেও তাদের বংশধরেরা নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করে। বারবার নানা অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়। এগিয়ে যাবার পরিকল্পনায় আগুন জ¦ালিয়ে দেয়। তবুও থেমে নেই। এগিয়ে যাবার এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হবার প্রত্যয়ে দৃঢ়তার সাথে পথচলা।

নতুন বাংলাদেশে নতুন স্বপ্ন। আর কোনো ফ্যাসিবাদ নয়; গণমানুষের সরকার তৈরি করব নিজের ভোট নিজে দিয়ে। লুটপাট, পেশিশক্তি এবং দুর্নীতির সকল দরজা বন্ধ করা হবে। কলমের স্বাধীনতা চাই, চাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে দৃঢ় পদক্ষেপ চাই। ‘আমার সোনার বাংলাদেশে, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।’ জীবনমুখী আদর্শভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণীত হবে। পড়ব, শিখব, ক্যারিয়ার গড়ব। যোগ্যতার মাপকাঠিতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। ইনসাফের ভিত্তিতে মানবতা বিকশিত হবে। কৃষক-শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষেরা ন্যায্যতার ভিত্তিতে অধিকার ফিরে পাবে। শ্রেণিবৈষম্যসহ সকল ধরনের বৈষম্য দূর করা হবে। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, খুন, ধর্ষণসহ সকল অপকর্মের বিলোপ সাধন করা হবে। ফ্যাসিবাদের সকল স্তরের অপরাধের সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। মানবতার কল্যাণে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালানো হবে।

বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নগুলোর অনেক বিষয়ই এখনো অধরা। এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে আমার জুলাইযোদ্ধা। আমার সন্তান। আমার ভাই। এখনো মায়ের বুকের শূন্যতায় সন্তানের রক্তগন্ধ। এখনো হামাগুড়ি দিচ্ছে গণতন্ত্রের অবুঝ শিশু। তাইতো অনেক কাজ বাকি। এখনো আমাদের অনেক দায়িত্ব। নিজেদের লেখাপড়ায় আরও বেশি মনোযোগী হওয়া সময়ের দাবি। বাংলাদেশকে সত্যিকারের স্বপ্নের কল্যাণমুখী দেশ হিসেবে গড়তে হলে চাই সোনার মানুষ। প্রয়োজন নৈতিকতাসম্পন্ন যোগ্য নাগরিক। তার জন্য চাই অধ্যয়ন। চাই মানবিকতার চর্চা। চাই আদর্শিক অনুশীলন। আজকের কিশোর মানে তোমরাই আমাদের স্বপ্নসেনা। লাল জুলাইয়ের স্বপ্নহাসি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ