পৌনে একশ বছর আগের কথা
পৌনে একশ বছর আগের কথা। তখন আমাদের গ্রামাঞ্চলে ঈদুল আজহাকে বলা হতো বকরা ঈদ। হয়তো এখনও বলা হয়। বকরা ঈদ বলতে আমরা বুঝতাম, ঈদে বকরি (ছাগল) কুরবানি হয়, তাই এটা বকরা ঈদ। ঈদের দিন এবং ঈদের পরের কয়েক দিন অঢেল গোশত খাওয়া যাবে। এটা ছিল মুখ্য আনন্দের বিষয়।
ঈদ ছাড়া অন্য সময় গ্রামে খাসি-গরুর গোশত পাওয়া ছিল দুর্লভ বিষয়। কোনো গরু-খাসি যখন চর্বি আটকে বা অন্য কোনো কারণে মরমর হতো তখন সেটা জবাই হতো। গ্রামে বা গ্রামের হাটে সেই গোশত ছোট ছোট ভাগ বানিয়ে বিক্রি হতো।
সবাই নয়, অপেক্ষাকৃত কিছুটা সৌভাগ্যবানরা এই গোশত কিনত।
গোশত পাওয়ার আরেকটা সুযোগ ছিল শীতের প্রারম্ভে। কার্তিক-অগ্রহায়ণেই আমাদের রাজশাহীতে, বিশেষ করে তার উত্তরের গ্রামগুলোতে শীত মোটামুটিভাবে জেঁকে বসতো। তখন গরু-মহিষ জবাই হতো। বছরের অনন্য সুযোগ হিসেবে সবাই এই গোশত কিনতে চাইত। কিন্তু সবার ভাগ্যে তা জুটত না।
তাই বকরা ঈদ ছিল সবার একান্ত অপেক্ষার বস্তু, যেদিন অঢেল গোশত খাওয়া যায়। তখন দেখেছি, গোশত খাওয়ার এই আনন্দও সবার ঘরে অমলিনভাবে আসত না।
তখন আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির খুবই খারাপ দশা। অকাল বন্যা, অতি বন্যা, ফ্ল্যাশ বন্যা বিলগুলোর ধান খেয়ে যেত। পড়ে থাকত শূন্য মাঠ, আর অথই পানি। যাদের জমি নেই, অল্প আছে বা অনেক আছে, তাদের সবার অবস্থা এক হয়ে দাঁড়াত। বিলের ওপরের প্রান্তে অল্প কিছু দিকের ধান এবং উঁচু মাঠে আউশ ধান হতো, যদি না অনাবৃষ্টিতে পুড়ে যেত। এতে গ্রামের দু-এক ঘরে কোনো রকমে বছর চালাবার মতো ধান উঠত। অবশিষ্টদের কারো ঘর শূন্য থাকত, কারো দু-চার মাস চলবার মতো ধান ঘরে উঠত।
এমন অবস্থাতেই আমাদের গ্রামজীবনে আসত বকরা ঈদ।
দু-একজন গোটা গরু কুরবানি দিতো, খাসি-বকরি কুরবানি করত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাত পরিবার থেকে শতভাগ গরু কুরবানি দেওয়া হতো। কিন্তু একটা বড়ো অংশের মানুষ কুরবানি দিতে পারতো না।
আমার পরিবার কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিল না। তবে আমরা দুধ খাওয়ার জন্য গাই (গাভী) ও বকরি পালতাম। আমি ও আমার বড়ো ভাই স্কুল সময়ের আগে ও পরে এদের খাওয়াতাম, পরিচর্যা করতাম। প্রায় প্রতি বছরই কুরবানির নিয়তে আমরা একটা খাসি বা বকরি পালতাম। সেটাই কুরবানি দেওয়া হতো। প্রায়ই গরুর একটা, দুটো ভাগ আমরা নিতাম।
কোনো দিন কোনো বকরা ঈদে আমরা নতুন জমা-কাপড় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। বলা হতো, এই ঈদ কুরবানির জন্য, জামা-কাপড় চাইতে নেই। এটা ছিল আমাদের তখনকার গ্রামীণ জীবনের চিত্র। তাই এই ঈদের দিনে গ্রামের বাড়িগুলোতে ঈদের নতুন পোশাকের কোনো সমারোহ দেখা যেত না। তখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক ভালো ছিল। তারা পিতা-মাতা ও গুরুজনদের আদেশ-নিষেধ বিনা বাক্যে মাথা পেতে নিত। তাই ঈদের আনন্দে আমাদের মনে না পাওয়ার কোনো দুঃখবোধ ছিল না। এই কারণে ঈদের দিন বাড়িতে, রাস্তা-ঘাটে, ঈদের মাঠে নির্মল আনন্দে ছোটাছুটি করতে পারতাম।
স্কুলের মাঠে ঈদের জামায়াত হতো। চারিদিকের গ্রামের মানুষ বাচ্চাদের নিয়ে দলবেঁধে ঈদের মাঠে আসত। হাতে থাকত বিছানা, যার ওপর তারা নামাজ পড়বে। তাকবিরে তাকবিরে রাস্তা-ঘাট, ঈদের মাঠ তখন মুখরিত হয়ে উঠত। সবার চোখে-মুখে দেখা যেত পবিত্র উজ্জ্বলতা। যে কুরবানি দিচ্ছে এবং যে দিচ্ছে না, যে দরিদ্র লোকটির ঘরে খাবার নেই এবং যার আছে, সবার মুখেই হাসি, সবাই একে অপরের সাথে কোলাকুলি করছে। সবাই পাশাপাশি নামাজে দাঁড়াচ্ছে, উচ্চকণ্ঠে একামাত হচ্ছে, সূরা-কেরাত পাঠ হচ্ছে, খুতবা হচ্ছে। সব শেষে মোনাজাত। ছেলেমেয়েসহ সবার হাত ঊর্ধ্বমুখী। ইমামের অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দোয়া। সুউচ্চ ‘আমিন’-এর সাথে সবার মন প্রভুমুখী। গ্রামের অল্পে তুষ্ট সহজ-সরল মানুষের এই অখণ্ড-সম প্রার্থনার মধ্যে মানুষের সমস্যা-সংকট দারিদ্র্য-কোনো কিছুই ছায়া ফেলে না। এখানেই গ্রামীণ ঈদের সার্থকতা।
ঈদের নামাজ-পরবর্তী একে অপরের সাথে কোলাকুলির মধ্যে দিয়ে এই সার্থকতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
তারপর শুরু হতো কুরবানি দেখা, কুরবানির গোশত বাড়িতে নিয়ে আসা, কুরবানি না করা প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে কুরবানির গোশত পৌঁছানোর আনন্দ। অবশেষে আসত বহুল প্রতীক্ষিত কুরবানির গোশত খাওয়ার আনন্দ।
সব শেষেও গ্রামীণ জীবনে তখন আমরা দেখেছি কুরবানির দিনে আনন্দের আরও কিছু অনুষঙ্গ।
কুরবানি ঈদ যদি আষাঢ় থেকে কার্তিকের মধ্যে হতো-নৌকা বাইচের আয়োজন থাকত। আর যদি ঈদ শুকনোর সময়ে হতো, তাহলে ছেলেদের মাঠে খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হতো।
এই সুযোগ ছিল আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য মহা আনন্দের। ছুটির দিন বা অন্যান্য দিনে আমাদের কঠিনভাবে টাইম ফলো করতে হতো। গ্রামের ছেলেদের সাথে মিশে খেলাধুলার সুযোগ এবং অনুমতিও ছিল না। সকালে উঠে পড়তে বসা, নয়টায় গোসল করে খেয়েদেয়ে দশটার মধ্যে স্কুলে পৌঁছা। বিকেল পাঁচটায় স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে নিজের কাজকর্ম বা বিশ্রাম। সন্ধ্যার পর রাতের খাবার খেয়ে পড়তে বসা এবং রাত নয়টার মধ্যে শুয়ে পড়া। এর অন্যথা হবার সুযোগ ছিল না। আমি এবং আমার বড়ো ভাই কয়েকবার ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা দেখতে গিয়ে বিপদে পড়েছি। ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা কিংবা তারও বেশি বেজে যেত। ফিরে দেখতাম, বড়ো মা (বড়ো ভাইয়ের মা, যিনি আমাকে লালন-পালন করেছেন, শিশু বয়সে আমার মা মারা যান) গেটের বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে আমাদের অপেক্ষা করছেন। গেট যাতে আমরা নক করে শব্দ না করি, এজন্যে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকা। তিনি নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে আমাদের ভেতরে নিয়ে যেতেন। তারপর অন্ধকারেই অজু ও খাওয়াদাওয়া সারতে হতো। আলো জ¦ালানো হতো না। কারণ আব্বা টের পাবেন।
আমাদের এই রুটিন জীবনের মধ্যে ঈদের দিন ছিল ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রমী হতো মায়েদের সাহায্যের। যুক্তি দিয়ে আব্বাকে বোঝানো হতো, গোশত-টোশত অনেক খেয়েছে। একটু খেলাধুলা করে আসুক, তাতে ওরা ভালো থাকবে। যাই হোক, ঈদের দিন আমাদের স্বাধীনতা দিতো খেলাধুলার জন্যে।
নৌকা বাইচের প্রতিই আমাদের আকর্ষণ ছিল। ছেলেরা বিভিন্ন গ্রামীণ নৌকায় (বাইচের পানশি নৌকা নয়) উঠত। তারপর শুরু হতো পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা-কে কাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। নৌকা ডুবিও কখনো কখনো হতো, কিন্তু তাতে ক্ষতি হতো না। সবাই সাঁতার জানত। তার ওপর বিভিন্ন নৌকায় তাদের তুলে নিত। তারপর আবার শুরু হতো প্রতিযোগিতা।
সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতাম। তখন আপাদমস্তক ভেজা। ভেজা কাপড় থেকে পানি ঝরছে। বকুনি আসত-তাড়াতাড়ি গোসল করে শুকনো কাপড় পরতে।
তারপর খেতে বসা। কখনো ভাত, কখনো পোলাও, কখনো পিঠা দিয়ে সেই বহুল প্রতীক্ষিত গোশত খাওয়া।
অতঃপর ক্লান্ত শরীরে শান্তির শয়ন দিয়ে ঈদের দিনের ইতি।
আরও পড়ুন...