ছোটবেলার ঈদ অভিজ্ঞতা

স্মৃতিকথা ড. আব্দুস সাত্তার মার্চ ২০২৬

ঈদ মানে উৎসব। যেনতেন উৎসব নয়, প্রধান উৎসব। অর্থাৎ মুসলমানদের যতগুলো উৎসব আছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎসব হচ্ছে এই ঈদ। সুতরাং ঈদের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রকৃত অর্থে যেকোনো উৎসবেরই অনেকগুলো দিক থাকে। যেমন : উৎসবের আনন্দ, সৌন্দর্য, প্রাচুর্য এবং মিলনের শৈল্পিক রূপ। যা সমাজের নানা দুঃখ, বেদনা, বৈষম্য সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। উৎসবের দিন মানুষ গান, ফুল, আলো, দান এবং কৃপণতাহীনতার মাধ্যমে দিনটাকে উপভোগ্য করে তোলে। মানবসমাজের প্রতিটি উৎসবই জাতি ও সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটায়। উৎসব যেমন সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে, তেমনি আবার হৃদয়ের শান্তি ও সৃজনশীলতাকেও উদ্দীপ্ত করে।

ছোটবেলায় উৎসবের অন্তর্নিহিত যে সকল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে তার কিছুই বুঝতাম না। বোঝার আকাক্সক্ষাও ছিল না। শুধুই ছিল আনন্দ। ঈদের এই আনন্দের দিনে যে বাড়িতে বাড়িতে পরিবর্তন ঘটত সেটা লক্ষ্য করেছি। লক্ষ্য করেছি, যে সকল পরিবর্তন ঘটে, তার সবই ঘটে আনন্দ প্রকাশের জন্য। রুচি অনুযায়ী অনেকেই বাড়ি এবং বাড়ির আঙিনা সাজাতো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রামে নানা রঙের কাগজ কেটে পতাকা এবং ঝালট কেটে রশির সাথে আঠা দিয়ে লাগিয়ে টাঙিয়ে দিত। নতুন পোশাক পরে, রঙিন কাগজের গোল টুপি মাথায় পরে পাড়ার বন্ধুদের সাথে মিশে আনন্দ প্রকাশ করত। এসব আনন্দঘন পরিবেশে শামিল হতাম আমিও। সকলে মিলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। তখন আমরা এ বিষয়ে কিছু না বুঝলেও এখন বুঝি। এগুলোকে বলা হয় উৎসবের নান্দনিক দিক।

ঈদের দিন সকলেই সাধ্য অনুসারে নানা ধরনের খাবার তৈরি করতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দলবেঁধে খাওয়াও ছিল ঈদ আনন্দের অন্যতম দিক। এই যে, সবাই মিলে বাড়ি বাড়ি ঘোরা এটা যেমন ঈদের আনন্দ প্রকাশের অন্যতম অংশ ছিল, তেমনি এই অংশ ছিল বন্ধুত্বকে সুদৃঢ় করার সুযোগ। শুধু ছোটদের নয়, ছোটদের মাধ্যমে বড়দের মধ্যেও বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব এবং সৌহার্দ্য জোরদার হতো। এক দিনের জন্য হলেও ঈদের উৎসব মানুষকে দৈনন্দিন জীবনের নানামুখী চাপ থেকে কিংবা দুঃখ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। মানুষ সবকিছু ভুলে আনন্দে মেতে ওঠে।

ছোটবেলা বলতে অপ্রাপ্ত বয়সকে বোঝায়। অর্থাৎ ১৬ বছরের নিচের বয়স। এই বয়সে গ্রামের বাড়িতে যেভাবে ঈদ এবং ঈদের উৎসব পালন করেছি, পাড়ার বন্ধুদের সাথে আনন্দে মেতে উঠেছি, তা আজ আর স্পষ্টভাবে মনে পড়ে না। কারণ ছোটবেলার অনেক কিছুই অবচেতন মনের অন্ধকার কুঠরিতে স্থান করে নিয়েছে। ফলে সেদিনের বিষয়গুলোকে চেতনার রাজ্যে বা চেতনার আলোয় নিয়ে আসতে অতীত স্মৃতির ওপর ভর করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সময় নিয়ে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে উদ্‌ঘাটন করতে হচ্ছে। মনে পড়ছে, ঈদের মাঠে বিছানোর মাদুর, চট, কাপড়সহ যাবতীয় কিছু আমাদের বাড়ির তিন তলায় সংরক্ষণ করে রাখা হতো। ঈদের আগের দিনই সেগুলো ঘর থেকে নামিয়ে মাঠে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হতো। ফলে আমাদের বাড়িতে একদিন আগে থেকেই ঈদের আমেজ তৈরি হতো। আমাদের বাড়ির পাশে ঈদের মাঠ। মাঠের পশ্চিম এবং দক্ষিণ পাশের আম-কাঁঠালের বাগানও আমাদের। সুতরাং সকাল থেকেই আমরা সেই বাগানে উপস্থিত থাকতাম পাড়ার সকলে মিলে। যখন মাঠে মাদুর, চট ও কাপড় বিছানো হতো, তখন আমরাও তাতে আনন্দের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতাম। লম্বা লম্বা চট ও কাপড় টেনে ধরে সোজা করে নামাজের কাতার অনুযায়ী বিছাতে হতো। হইচই দৌড়াদৌড়ির কারণে অনেক সময় ঠিকমতো বিছানো হতো না বলে মুরুব্বিদের বকুনি খেতে হতো। তবুও যেন আনন্দে ভাটা পড়ত না। বিছানা বিছাতেই যেন আনন্দ। কারণ দূর দূরান্ত থেকে মানুষ নামাজ পড়তে আসবেন। সুতরাং তারা যেন সুন্দরভাবে আরাম করে বসতে পারেন সেটাই চট-কাপড় বিছানোর উদ্দেশ্য এবং এই বিছানোতেই যত আনন্দ। আনন্দ এজন্য যে, এলাকার মানুষদের উপস্থিতিতে খুশি, ভালোবাসা এবং ঈদ উৎসবের এক অনাবিল আনন্দের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হবে এই ঈদগাহ। সেদিনের সে অনুভূতিই ছিল ভিন্ন। আজ মনে হয়, ঈদের যত আনন্দ তা ঐ কিশোর বয়সেই উপভোগ করেছি। তা ছাড়া গ্রামের মানুষদের আনন্দ আর শহরের মানুষদের আনন্দ এক নয়। শহরের মানুষের আনন্দ বা ঈদ পালনকে আর্টিফিশিয়াল মনে হয়। কিন্তু গ্রামের মানুষদের আনন্দে আছে আন্তরিকতা। কারণ গ্রামের সবাই সবাইকে চেনে এবং যোগাযোগ থাকে সব সময়। হাট-বাজারে, মাঠে-ঘাটে দেখা হলেই একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে। কিন্তু শহরে এটা লক্ষ্য করা যায় না। শুধু তাই নয়, একই ফ্ল্যাটে বাস করেও কেউ কারোর খবর রাখে না। ফলে আমি কিশোর বয়সে ঈদ আনন্দের যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সেই আনন্দ শহরের কিশোর-কিশোরীরা উপভোগ করতে পারে না। শহরে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ও জৌলুস আছে, কিন্তু গ্রামের মতো আন্তরিকতা নেই। 

এক মাস রোজা রাখার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদকে একটি নিয়ামত মনে করা হয়। যা মানুষকে একটি বেহেশতি আনন্দ দান করে। কুরবানির ঈদও ভিন্ন আনন্দ দান করে। যার সঙ্গে ধর্মীয় আদর্শের সম্পর্ক থাকে। কুরবানির ঈদে পশুকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠে সবাই। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের পালিত গরুগুলোর মধ্য থেকেই একটি গরু কুরবানি দেওয়া হতো। গ্রামের কুরবানি শহরের কুরবানি থেকে আলাদা। গ্রামের কুরবানির পশুর সাথে কুরবানিদাতা ও পরিবারের সকলের থাকে আন্তরিক যোগ। তারা পশুর যত্ন নেন নিজেরাই। জবাই থেকে শুরু করে মাংস বানানো সবকিছুই করেন নিজেরা। এ এক স্মরণীয় আত্মিক সংযোগ। কিন্তু শহরে এই আন্তরিকতা নেই বললেই চলে। গরু জবাই থেকে শুরু করে সব করে কসাইরা। এখানে মাংস বানানো, পশু ক্রয়, আদরে লালন-পালন-কোনো কিছুই নেই। শহরে সবই হয় অর্থের বিনিময়ে। সুতরাং কিশোর বয়সে গ্রামে যে ঈদ আনন্দ উপভোগ করেছি সেই আনন্দের ছিটেফোঁটাও এখন আর অনুভব করি না। গ্রামে বিশাল বিশাল মাঠে খোলামেলাভাবে ঈদ পালিত হয়। আর শহরে ঘরোয়াভাবে মসজিদে পালিত হয় ঈদ। গ্রাম আর শহরের ঈদ আয়োজনে এবং পালনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এজন্য আনন্দও ভিন্ন।

ঈদের উৎসব যে কত বিচিত্র ধরনের তা কিশোর বয়সে গ্রামে থেকে বুঝতাম না। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নে এবং পড়াশোনার কারণে এখন অনেকটাই জানতে পেরেছি। মুঘল আমলে মুঘল স¤্রাটদের উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদ আয়োজন করা হতো। শুধু তাই নয়, ঈদের দিন সর্বস্তরের মানুষদের নিয়ে ঈদ আনন্দের বিশাল বিশাল মিছিলেরও আয়োজন করা হতো। বৈচিত্র্যপূর্ণ ঈদ মিছিলের সেসকল দৃশ্য শিল্পীরা ক্যানভাসে রঙে-রসে আবদ্ধ করে রাখতেন। এমন বেশ কিছু চিত্র নানা গ্রন্থে সুন্দরভাবে ছাপা রয়েছে। তৎকালে ঢাকাতেও যে ঈদের বর্ণাঢ্য মিছিল বের করা হতো, তারও চিত্র ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এ সকল চিত্রের মাধ্যমে তৎকালের ঈদ আনন্দের বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি গ্রামে ঈদের মিছিল দেখিনি।

ঈদের আয়োজন এবং মিছিল সবকিছুর সঙ্গেই ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করে থাকে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু কিশোর বয়সের বালক-বালিকাদের উৎসবের আনন্দকেই বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। কিশোর বয়সের সেদিনের বিষয়গুলো এখন অতীত স্মৃতি। প্রয়োজনে কিংবা প্রসঙ্গক্রমে সেই স্মৃতিকে বিস্মৃত মনের অন্ধকার কুটির থেকে চেতনার রাজ্যে কিংবা হৃদয়ের আলোকিত পর্দায় স্থাপন করে তবেই অনুভব করতে হয় সেইসব ফেলে আসা দিনগুলোর ঈদ আনন্দকে। সেভাবেই ঈদ আনন্দের অতীতস্মৃতির কিছু কিছু এই লেখায় তুলে ধরা হলো। যা আমাকে এই বৃদ্ধ বয়সে কিশোর বয়সে ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। এও একধরনের আনন্দ। ফেলে আসা কিশোর বয়সের ঈদ আনন্দ!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ