চার নভোচারী
ফিচার মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জুন ২০২৬
পৃথিবীর বাইরে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়েছেন নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। তারা এই মিশনের মহাকাশযান ওরিয়নে চড়ে ১ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ১০ দিনের এক ঐতিহাসিক মহাকাশ ভ্রমণ সম্পন্ন করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরেছেন।
চাঁদকে প্রদক্ষিণ শেষে বাংলাদেশ সময় ১০ এপ্রিল ভোর ৬টা ৭ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে ওরিয়ন। পুরো যাত্রায় তারা প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার মাইল পথ পাড়ি দেন-যা আগের রেকর্ডধারী অ্যাপোলো-১৩-এর দূরত্বকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অবতরণের রোমাঞ্চ
অবতরণকালে ওরিয়ন নভোযানটি সান ডিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে ঘণ্টায় প্রায় ২০ মাইল গতিতে আছড়ে পড়ে। শুনতে কম মনে হলেও, সেই ধাক্কা অনেকটা শক্ত দেয়ালে আঘাত করার মতো। এরপর ঢেউয়ের মধ্যে দুলতে থাকে ক্যাপসুলটি। ১০ দিন মাইক্রোগ্রাভিটিতে থাকার পর এই দুলুনি নভোচারীদের কাছে বেশ তীব্র মনে হয়।
অবতরণকালে ক্যাপসুলের নিচের অংশে থাকা পাঁচটি কমলা রঙের এয়ারব্যাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়, যা ওরিয়নকে সোজা ও স্থিতিশীল রাখে। ওই এলাকা ঘিরে রাখা নৌবাহিনীর ডুবুরিরা তখন এগিয়ে আসে। আর উপরে চক্কর দিতে থাকে এমএইচ-৬০ সিহক হেলিকপ্টার।
ক্যাপসুলের হ্যাচ বা বহিরাবরণ খোলার আগে ডুবুরিরা ক্যাপসুলের চারপাশের বাতাস ও পানি পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে একজন মেডিকেল অফিসার নিশ্চিত করেন, নভোচারীরা ভালো আছেন। এর কিছুক্ষণ পরই ওরিয়ন নভোযান থেকে নভোচারীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। তিনজন নভোচারী বেরিয়ে আসার পর অভিযানের দলনেতা বা কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান বেরিয়ে আসেন। এরপর তাদের হেলিকপ্টারে করে জন পি. মুর্থা যুদ্ধজাহাজে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের পালস, ব্লাড প্রেসার, মস্তিষ্ক ও নার্ভ সিস্টেম এবং ভারসাম্য পরীক্ষা করা হয়।
নতুন রেকর্ড
গত ৬ এপ্রিল সোমবার গ্রিনিচ মান সময় বিকেল ৩টা ৫৮ মিনিটে চার নভোচারী চাঁদের পেছন দিকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় পৌঁছান। তখন পৃথিবী থেকে তারা প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলেন। এর আগে মহাকাশে এত দূরে কোনো মানুষ যেতে পারেনি। নতুন এই রেকর্ড গড়ার সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নভোচারীরা। প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর পুনরায় সংযোগটি স্থাপিত হয়। এ সময় নভোচারীদের অভিনন্দন জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুনরায় সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পর নভোচারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। জানতে চান, হঠাৎ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর আপনাদের কেমন লাগছিল? জবাবে চার নভোচারীর একজন ভিক্টর গ্লোভার বলেন, সংযোগ চলে যাওয়ার পর তিনি কিছুক্ষণ প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু তখনও চাঁদের দূরবর্তী অংশের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করতে হয়েছিল। ট্রাম্পকে গ্লোভার বলেন, আমরা এখানে বেশ ব্যস্ত ছিলাম এবং কঠোর পরিশ্রম করছিলাম। আর বলতেই হয়, ব্যাপারটা আসলে বেশ ভালোই ছিল।
ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন
আর্টেমিস-টু অভিযানের পাইলট পৃথিবীতে থাকা দলের সদস্যদের বলেন, চারজন মহাকাশচারী যা দেখছেন, তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি জানি, এই পর্যবেক্ষণের কোনো বৈজ্ঞানিক মূল্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু আমি সত্যিই আনন্দিত যে আমরা পহেলা এপ্রিল উৎক্ষেপণ করেছি। কারণ মানুষ সম্ভবত এখনো এমন কিছু দেখার জন্য বিবর্তিত হয়নি, যা আমরা দেখছি। কমান্ডার রিড উইসম্যান তখন নিজের পর্যবেক্ষণের কথা যোগ করেন। তিনি বলেন, এটা একেবারেই বর্ণনাতীত। আমরা যতক্ষণই এর দিকে তাকিয়ে থাকি না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক সামনে থাকা এই দৃশ্যটি ঠিকমতো প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে না। এটি একেবারেই বিস্ময়কর, পরাবাস্তব; এর বর্ণনায় কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়। নতুন কিছু বিশেষণ তৈরি করতে হবে-এই জানালার বাইরে যা দেখছি, তা বোঝানোর মতো কোনো শব্দই নেই।
ওখানে পৃথিবী অসাধারণ উজ্জ্বল
নাসার মহাকাশচারী ভিক্টর গ্লোভার সূর্যগ্রহণের সময়ে যা দেখছিলেন, তা “সাই-ফাই” এবং “অবাস্তব” বলে বর্ণনা করেন। তিনি সূর্যের করোনা বা বায়ুমণ্ডলের বাইরের দৃশ্যও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটি এখনো অবাস্তবই মনে হচ্ছে। সূর্যটি চাঁদের আড়ালে চলে গেছে, কিন্তু করোনাটি এখনো দৃশ্যমান-এটি উজ্জ্বল এবং প্রায় পুরো চাঁদের চারপাশে একটি বলয়ের মতো তৈরি করেছে। কিন্তু যখন পৃথিবীর দিকটি সামনে আসে, তখন আগেই পৃথিবীর আলো দেখা যায়। মানে, সূর্য চাঁদের আড়ালে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর আলো দেখা যায়। ওখানে পৃথিবী এত উজ্জ্বল, আর চাঁদটি যেন আমাদের সামনে ঝুলে আছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের সামনে যে কালো গোলকটি রয়েছে-পুরো কালো নয়, বরং ধূসর রঙ ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। এর পেছনে আমরা তারা এবং গ্রহ দেখতে পাচ্ছি।
দৃশ্যটি অত্যন্ত চমকপ্রদ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, চাঁদের যে পাশে সূর্য অস্ত গেছে, সেই দিকের দিগন্ত এখনো কিছুটা উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর আলো খুবই স্পষ্ট, যা একটি অসাধারণ দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করছে। ওয়াও, এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।
চাঁদে নামা হয়নি
অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২৪ জন নাসা মহাকাশচারী চাঁদে ভ্রমণ করেছেন। তবে, ১৯৭২ সালের পর আর কেউ এই প্রাকৃতিক ভূ-উপগ্রহে পা রাখেনি। এবার আর্টেমিস নামের নভোযানটির চারজন মহাকাশচারীর কেউই চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখেননি। চাঁদে আবার কোনো মানুষের পা পড়তে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আর্টেমিস-৪-এর জন্য, যা ২০২৮ সালে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কচ, ভিক্টর জে. গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন ওরিয়ন মহাকাশযানে তাদের ১০ দিনের যাত্রাকালে ভবিষ্যতে অবতরণের প্রস্তুতিস্বরূপ চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেন এবং বিভিন্ন রণকৌশল সম্পাদন করেন। আগামী বছর আর্টেমিস-৩ মিশনের উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্যে এটি করা হয়।
অসাধারণ অর্জনের নেপথ্য
১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই আর্মস্ট্রং ও এডউইন “বাজ” অলড্রিনের পক্ষে চাঁদে পা রাখা সম্ভব হয়েছিল-এই তারিখটি সকলের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে। কর্মসূচিটি ১৯৭২ সালে যখন বাতিল করা হয়, তখন খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল এবং এর অগ্রাধিকার বদলে গিয়েছিল।
ফলে, মনোযোগ সরে আসে আরও সাশ্রয়ী একটি গন্তব্যের দিকে, যা হলো পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ। এই নতুন লক্ষ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ সম্ভবত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন।
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং-এর চাঁদে পা রাখার পর মানবজাতির মহাকাশযাত্রা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। আর আজ আর্টেমিস কর্মসূচি সেই স্বপ্নকেই নতুন করে এগিয়ে নিচ্ছে।
আরও পড়ুন...