বুড়িমা

গল্প আবদুল ওহাব আজাদ মার্চ ২০২৬

সবাই তাকে বুড়ি মা বলে ডাকে। আসল নাম খোদেজা বিবি। বয়স পঁচাশি বছর, বুড়িমা চার রাস্তার মোড়ে একটা ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে বসে চলতি পথের পথিককে ডেকে আর্থিক সাহায্য চায়। বুড়িমা কাউকে দেখলে ভাঙা গলায় সর্বশক্তি কণ্ঠে তুলে খোকা-খোকা ও খোকা বলে পথিককে থামিয়ে তার সাথে দুটো কথা বলতে চায়। কেউ আসে, কেউ আসে না। প্রায় সবাই জেনে ফেলেছে ওখানে গেলে কমপক্ষে একশত টাকার নিচে তার হাতে দেওয়া যাবে না। দশ-বিশ টাকা সাধারণত বুড়িমা নিতে চায় না। বিভিন্ন কারণে বুড়িমা এলাকায় পরিচিত। অভিনব কায়দায় মানুষের কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায় সে। সাধারণত একশত টাকার নিচে দিলে বুড়িমা তা গ্রহণ করে না। সে সময় বুড়িমা বলে, ‘একশত টাকার নিচে দিলে ওষুধ কিনব কী দিয়ে আর নাতনি মানুষ করব কী করে?’

বুড়িমার কারণে চার রাস্তার মোড়ের নামকরণ হয়েছে বুড়িমার মোড়। বুড়িমার ঘরের মধ্যে একটা ভাঙা চেয়ার আছে। যখন দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন চেয়ারে বসে হাঁপাতে থাকে। বুড়িমার অ্যাজমার দোষ আছে। যখন বেড়ে যায় তখন বুড়িমা ইনহেলার টানে। শরীফ ঐ মোড় দিয়েই স্কুলে যায়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে শরীফ। প্রতিদিনের মতো আজও শরীফকে ডাকল বুড়িমা। বুড়িমা হাঁপাচ্ছে। তাকে দেখে শরীফের মায়া হলো। খোকা-খোকা ডাকতেও খুব কষ্ট হলো বুড়িমার। অন্যদিন শরীফকে এভাবে ডেকেছে কিন্তু কোনো দিন তার ডাকে সাড়া দিতে পারেনি শরীফ। আজ বুড়িমার কাছে গেল সে, সামনে যেয়ে বলল-আমায় কিছু বলবেন বুড়িমা?

কষ্ট করে বুড়িমা বলল-খোকা ও খোকা আমায় এক হাজার টাকা দেবে?

-আমি ছাত্র মানুষ, অত টাকা আমি পাব কোথায়? আর তা ছাড়া টাকা নিয়ে আপনি কী করবেন? দুটো ডালভাত খেতে তো এত টাকা লাগে না।

-শুধু ডালভাতে কি মানুষের জীবন বাঁচে? মেলা টাকার ওষুধ-পথ্য লাগে আমার। হাঁপানি-ডায়াবেটিস, প্রেসার সব রোগ আছে আমার মধ্যে। তাইতো তোমাদের জ¦ালাতন করি। তা ছাড়া আমার একটি নাতনি আছে, সে এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে, সে সায়েন্সে পড়ে। তার পড়াশোনার জন্য মেলা টাকার দরকার পড়ে। তোমরা লেখাপড়া করতেছ, তোমরা তো সবকিছু জানো খোকা।

-আপনার সংসারে আর কেউ নেই? 

-না খোকা, আমি আর আমার নাতনি ছাড়া এ সংসারে আর কেউ নেই।

বুড়িমার কথা শুনে শরীফের মনটাও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, শরীফ বলল-বুড়িমা, আমার কাছে তো যাতায়াত আর টিফিন খরচ বাবদ একশ টাকার মতো হতে পারে, সে টাকাটাও যদি দিয়ে দেই, তাহলে...

বুড়িমা শরীফের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘না-না খোকা, এখন তোমার কোনো টাকা দিতে হবে না, তুমি অন্যদিন আমায় এক হাজার টাকা দিয়ো।

শরীফ ঘাড় নেড়ে একধরনের সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।

রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে আব্বা-আম্মাকে বুড়িমার সব ঘটনা খুলে বলল, তার ওয়াদাকৃত এক হাজার টাকার কথা বলতে ভুল করল না শরীফ। কিন্তু আব্বা-আম্মা কেউ এ টাকা দিতে রাজি হলেন না; বরং ভর্ৎসনা করে আব্বা বললেন-ছেলে আমার লেখাপড়া বাদ দিয়ে নেতাগিরি করে বেড়াচ্ছে। এ লক্ষণ ভালো না শরীফের মা। এই বয়সে এত দান খয়রাতের নেশা অতিরঞ্জিত। এইসব করতে করতে একসময় তোমার ছেলে লেখাপড়ার কথা ভুলেই যাবে।

শরীফের মন একধরনের ব্যথা-বেদনায় ভরে উঠল। স্কুল থেকে ফিরে এসে আগের মতো হইচই করে বেড়ায় না সে। অনেকটা চুপচাপ প্রকৃতির হয়ে গেল শরীফ। সে বুড়িমাকে কথা দিয়ে এসেছে যেমন করেই হোক তাকে কথা রাখতেই হবে। স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে বুড়িমার কথা শেয়ার করল শরীফ। গল্পটা সবাই লুফে নিল। কিন্তু কেউ সহযোগিতার হাত বাড়াতে চাইল না। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল সে। নিশ্চয় আল্লাহ একটা উপায় বাতলিয়ে দেবেন।

বেশ কিছুদিন হয়ে গেল স্কুলে যাওয়ার পথে বুড়িমাকে দেখতে না পেয়ে শরীফ চিন্তায় পড়ে গেল। সে ভাবল, বুড়িমা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ল কিনা? মনটা বিষণœতায় ভরে গেল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে বসে রইল শরীফ।

আম্মা বললেন, খেতে আয়।

শরীফ ঘাড় নেড়ে বলল, না।

-কেন খাবি না? কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ নাকি?

-না মন খারাপ।

-হঠাৎ মন খারাপের কারণটা জানতে পারি কি? 

-আম্মা, বুড়িমাকে আজ কয়েক দিন যাবৎ মোড়ের মাথায় দেখছি না, অসুস্থ হয়ে পড়ল কিনা, আমি যে তার কাছে এক হাজার টাকা দেবো বলে ওয়াদা করেছিলাম।

-অত চিন্তার দরকার নেই, টাকার ব্যবস্থা হবে। খাবার টেবিলে আয়।

শরীফ খেতে গেল।

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে শরীফের জামার পকেটে একখানা এক হাজার টাকার নোট ঢুকিয়ে দিয়ে আম্মা বললেন, যাও, আজ তুমি বুড়িমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে তোমার ওয়াদা পূরণ করে এসো। সেই সাথে বলে এসো, তার নাতনির পড়ার খরচও আমি যতটা পারি বহন করব।

শরীফ ভাবতেও পারেনি, আম্মা এত সদয় হতে পারেন।

শরীফ আজ ফুরফুরে মেজাজে স্কুলের পথে পা বাড়াল। সে তার বুড়িমাকে টাকাটা দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করবে। সাথে নাতনির পড়ার খরচও আম্মা কিছুটা হলেও বহন করবেন। এ কথা শুনে বুড়িমাও খুব খুশি হবেন।

বুড়িমার মোড়ের কাছে এসে বুড়িমাকে না পেয়ে খোঁজে খোঁজে তার বাড়িতে পৌঁছাল শরীফ। বাড়িতে অনেক লোকের ভিড় জমেছে। সবাই বলাবলি করছে, বুড়িমা আর নেই। গতরাত তিনটার সময় মেডিকেলে তার মৃত্যু হয়েছে। শরীফ দেখল, বুড়িমার নিথর দেহ পড়ে আছে, শরীফ কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে তার ওয়াদা রাখল ঠিকই, কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

শরীফ তার নাতনির সন্ধান পেল। সে শুধু নানির শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছে। একবার জ্ঞান ফিরে এলে শরীফ বলল, আপনার নানি আমার কাছে এক হাজার টাকা চেয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্য সময়মতো টাকা দিতে পারলাম না। টাকাটা আপনি রাখেন। আমার আম্মা বলেছেন, আপনার লেখাপড়ার খরচও তিনি বহন করবেন।

বুড়িমার নাতনি কোনো কথার উত্তর দিতে পারল না। শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে শরীফের দিকে তাকিয়ে থাকল।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ