বুকের ভেতর দারুণ ঝড়

উপন্যাস হারুন ইবনে শাহাদাত মে ২০২৫

[গত সংখ্যার পর]

৩. তিনি বাহিনীর শেষভাগে বেশ দূরত্বে একটি টিলার পেছনে রেখেছিলেন রিজার্ভ বাহিনী। সেখানে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে তাদের একমাত্র কাজ ছিল ধুলি ওড়ানো। যাতে রোমীয়রা মনে করে মুসলমানদের জন্য লাগাতার সাহায্য আসছেই। এই ভেবে তাদের মনে ত্রাস আরো ঘনীভূত হতে থাকবে।

৪. পরবর্তী দিন রণাঙ্গনে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে আস্তে আস্তে করে পিছিয়ে মরুভূমির গভীরে যেতে থাকেন। এ দেখে রোমানরা মনে করে খালিদ তাদের মরুভূমির মাঝে নিয়ে কোনো ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছে হয়তো। তাই মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনে দ্বিধাবোধ করতে থাকে। সেদিন মুসলিম বাহিনীকে পিছিয়ে যেতে দেখেও তারা পিছু হামলার দুঃসাহস করতে পারেনি। এমন কৌশলের কারণে সেই যুদ্ধে তারা বিজয়ী হয়েছিলেন।’

ফাহামের কথা শেষে স্যার বলেন : আমাদের এ আন্দোলনও কিন্তু যুদ্ধের চেয়ে কম নয়।

: ‘ অবশ্যই।’ সবাই এক সাথে সম্মতি দেয়।

: ‘আমাদের তুলনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার অবশ্যই আমাদের কাছে রোমান শক্তির মতোই।’ স্যার বলেন।

: ‘আমাদের মনে হয় একটি সিদ্ধান্তে আসা দরকার।’ হায়াত বলে।

: ‘আর দেরি নয়।’ হায়াতের কথায় সায় দেয় আবির ও সামি।

: ‘আমরা যা বুঝালাম। তা হলো কৌশলের বিকল্প নেই।’

: ‘মূল নেতৃত্বকে আমরা সিনে আনবো না।’ আতিক বলে।

: ‘আমরা একটি সমন্বয়কের তালিকা করবো। তবে সবার নাম এক সাথে ঘোষণা করা হবে না।’ স্যার বলেন।

: ‘ঠিক তাই। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আস্থাভাজন যেসব ছাত্র সংগঠন আছে, তাদের এবং সাধারণ প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের নিয়ে হবে সমন্বয়ক কমিটি।’ সামি প্রস্তাব করে।

: ‘তারপর?’ কাশেম প্রশ্ন করে।

: ‘তাদের নিয়ে স্টাডি গ্রুপ চলবে। এর মাধ্যমে তাদের মননের বিকাশ ঘটবে।’ সামি বলে।

: ‘সেই বিকশিত তারুণ্যের আগুন এক সাথে জ্বলে উঠবে।’ স্যার বলেন।

: ‘সেই আগুন লক্ষ্যে পৌঁছা না পর্যন্ত কেউ নেভাতে পারবে না।’ কাশেম দৃঢ়তার সাথে বলে।

: ‘ইনশাআল্লাহ দুই থেকে তিন বছর অর্থাৎ আগামী নির্বাচনের আগেই আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক একটি বাংলাদেশ জাতিকে উপহার দেবো।’ তাওহিদ দীপ্ত কণ্ঠে বলে।

: ‘এর মাধ্যমেই আমরা আবুবকর আর আবরারসহ হাজার হাজার শহীদের রক্তের বদলা নেবো ইনশাআল্লাহ। এই হোক আমাদের শপথ।’ স্যারের সাথে সবাই শপথবাক্যে কণ্ঠ মেলায়।


৩. ভেঙ্গে চলো কালের কপাট

আবু সাঈদ রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রতিও তার আগ্রহ কম নয়। আবু সাঈদ খুব তেজোদীপ্ত কণ্ঠে একটি কবিতা পড়ছিল-

‘পাতালের গুহা থেকে জেগে ওঠো সাহসের ঘোড়া

জেগে ওঠো জনপদ- হিমালয়, পর্বতের চূড়া

মানুষ তরঙ্গ হও, মুছে ফেলো শোকের ললাট

মানুষ সমুদ্র হও, ভেঙ্গে চলো কালের কপাট।’

কবিতাটি পড়া শেষ না হতেই মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ঢাকা থেকে শহিদ ভাইয়ের ফোন।

: আসসালামু আলাইকুম। শহিদ ভাই কেমন আছেন?

: আলহামদুলিল্লাহ। তোমাকে একটি জরুরি প্রয়োজনে ফোন করেছি। বিস্তারিত পরে আতিক ও কাশেম তোমাকে জানাবে। আমরা রংপুরে স্টাডি গ্রুপের নেতা হিসেবে তোমাকে মনোনীত করেছি।

: আতিক ভাই কবে আসবেন?

: তোমাকে টেক্সট করবেন। আল্লাহ হাফেজ। বলে শহিদ ফোন রেখে দেয়।

শহিদ ভাইয়ের ফোন পেয়ে তার মনের ভেতর ঝড় বইতে থাকে। নানান সাত পাঁচ ভাবনা ভাবতে থাকে।

নিশ্চয়ই বড়ো কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আতিক ভাইয়ের টেক্সটের জন্য অপেক্ষা করে আবু সাইদ।

তাকে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। কিছুক্ষণ পরেই তার মোবাইলে ম্যাসেজ টোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে : ‘ভাই আগামী সপ্তাহে আপনার সুবিধামতো সময়ে আমি রংপুর আসব। আপনার ক্লাস-পরীক্ষার কোনো ক্ষতি না হয়, এমন একটি তারিখ আমাকে জানানোর অনুরোধ করছি।’

আবু সাঈদ ক্লাস রুটিন খুব ভালো করে কয়েকবার পড়ে। নিশ্চয় বড়ো কোনো কাজের জন্য তাকে বাছাই করেছে। কালের কপাট ভাঙার আহ্বান আসার আগেই একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসা দরকার।


৪. বাপুই সোনার চান

বাড়ির কথা মনে পড়তেই আবু সাঈদের মনের ক্যানভাসে ছায়াঘেরা সবুজ শ্যামল গ্রাম বাবনপুরের কিছু ছবি জীবন্ত হয়ে ওঠে। দেশের পিছিয়ে পড়া জেলা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রাম। বয়স আর দরিদ্রতার কশাঘাতে শীর্ণদেহের বৃদ্ধ বাবা মকবুল হোসেন এবং মাতা মনোয়ারা বেগম, ৫ ভাই ও ৩ বোনের প্রত্যাশায় ভরা মুখ।

আবু সাঈদের আজ খুব মনে পড়ছে, সেই দিনটির কথা। যেদিন তার ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার ফল জানতে পারলো। জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সেদিন ছিল আনন্দের বন্যা। হেডস্যার যেদিন স্কুলের সবাইকে মিষ্টি মুখ করিয়েছিলেন। আবু সাঈদের বাড়ির জন্যও তিনি মিষ্টি পাঠিয়েছিলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ায় আবু সাঈদের স্কুলের নাম গোটা পীরগঞ্জ উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তাইতো শত অভাব অনটনের মধ্যেও তার বাবা-মা ও ভাইবোনেরা চেয়েছে আবু সাঈদের লেখা-পড়ায় যেন কোনো সমস্যা না হয়। ফাইভ পাস করে আবু সাঈদ ভর্তি হয় খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয় আবু সাঈদ শুধু লেখা পড়াতেই ভালো নয়, তার আচার-ব্যবহারও খুব সুন্দর। মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। স্কুলের সিনিয়র জুনিয়র সবাইকে নামাজ ও কুরআন হাদিস পড়ার কথা বলে। ভালো হয়ে চলতে বলে। আবু সাঈদ খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জি‌পিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এরপর ২০১৮ সালে রংপুর সরকা‌রি কলে‌জ থেকে জি‌পিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করে। পরে ২০২০ সালে বেগম রো‌কেয়া‌ বিশ্ববিদ্যাল‌য়ে ইং‌রে‌জি বিভাগে ভ‌র্তি হন। আবু সাঈদ এখন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বাবা-মা’র নয়নমণি। গ্রামবাসীর বাপুই সোনার চান।

বাবার দুঃখ কিছুটা হলেও কমেছে। লেখা-পড়ার ফাঁকে আবু সাঈদ টিউশনি করে। টিউশনির টাকায় নিজের খরচ চালানোর পর বাড়িতে টাকায় পাঠায়। তার পাঠানো টাকা গরিবের কষ্টের সংসারে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে।

আজ আবু সাঈদ বাড়ি যাচ্ছে। বাবা-মা, ভাই বোনদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে। বোন সুমী বেগমের জন্য কিনে একটি সুন্দর জামা। সব ভাই-বোনের জন্যই আবু সাঈদের হৃদয় জুড়ে আছে ভালোবাসা। কিন্তু সুমীর জন্য মনে হয় একটু বেশিই।

আবু সাঈদ বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময় বাংলা বিভাগের ছাত্র শামসুর রহমান সুমনের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। সে আবু সাঈদের রুমের দিকেই আসছে।

সুমন আবৃত্তি করছে : ‘সাড়ে তিন হাত হাড় কবরের ভুঁই/ফুল পাখি নদী নীড় দেবো না কিছুই/দেবো না যবের ছড়া/ফসলের শতকরা/সবুজে শ্যামলে আঁকা থোকা থোকা জুঁই/নাও নদী ঢেউ জল দেবো না কিছুই।/ গজনী কাবুল হিরা খাইবার পাস্‌/দেবো না পাহাড়ি গান লু-বহা বাতাস/ যে ভাষায় কথা কই/ ধার দিতে রাজি নই/ চাঁদের সুষমা আর ফুলের সুবাস

দেবো না গানের সুর সেতারা-আকাশ।/দেবো না পালিয়ে যেতে কোনো হানাদার/ রক্তের লোভে যারা আসে বার বার/ বারুদের উপহার/ যত চাই দেবো, আর/ উজাড় দু’হাত ভরে শোধ দেবো ঋণ/ যাবো না সীমানা ছেড়ে ইঞ্চি জমিন।/ খুন আর খুনিদের কালো ইতিহাস/ দেবো না দীর্ঘ হতে মায়ের নিঃশ্বাস/ গৃহ গ্রাম নদী জল/ উৎসব কোলাহল/ আশিশু লালিত ভূমি চকোরীর গান/ দেবো না উদাস হাওয়া প্রেমের উঠান।/ দেবো না বাপের ভিটে হ্রদ টলোমল/ পাহাড়ের চূড়া আর ঝর্ণার জল/ যতদিন অধিকার/ ফিরে পাবে নদী তার/ দেবো না কিছুই এর খোদার কসম/ ততদিন অসুখের নেই উপশম।...’

কবিতাটি আবু সাঈদেরও খুব ভালো লাগে। সুমন কাছাকাছি আসতেই বলে : চমৎকার।

সুমন হাসতে হাসতে বলে : ‘হুজুরের মতে অমত কার?’

: সত্যি একজনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অমত করলেই জেল, জুলুম, খুন, গুম।

: তারপরও আমরা চুপ থাকবো না।

: কেউ আমাদের মুখ বন্ধ করতে পারবে না।

সুমন প্রশ্ন করে : সাঈদ, ঐ ছাত্রলীগদের হাতে অস্ত্র কেন থাকে জানো?

: ‘আজ নয় ফ্যাসিবাদের জন্ম থেকেই ওরা সাথে অস্ত্র রাখে, এটা ওদের রাজনৈতিক দর্শনেরই শিক্ষা।’ ওদের আলোচনার মাঝে এসে যোগ দেয় অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদের বাল্যবন্ধু মাহিদ হাসান শাকিল। ওদের দু’জনের বাড়ি একই গ্রামে। শাকিল আবু সাঈদকে বলে : বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলতো?

: শোন আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল। ওরা ক্ষমতায় থাকুক কিংবা বিরোধী দলে ওদের রাজনৈতিক দর্শন মাইট ইজ রাইট অর্থাৎ জোর যার মুল্লুক তার। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে মানুষকে প্রতারিত করতে। পৃথিবীর অন্যতম নিকৃষ্ট স্বৈরাচার হিটলারও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তারপর তিনি কী করেছেন, তা সবারই জানা। আওয়ামী লীগও এ জাতির সাথে বেঈমানি করেছে। 

তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছো, ১৯২৫ সাল নাগাদ মুসোলিনি ইতালির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিয়েছিলেন এবং স্বৈরশাসকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ইল ডুস (‘দ্য লিডার’) উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

ফ্যাসিজম ইতালীয় শব্দ ভধংপরংসড় ভধংপরড় শব্দ থেকে এসেছে। অর্থ ‘লাঠির বান্ডিল’, যা লাতিন শব্দ ভধংপবং থেকে উদ্ভূত। ফ্যাসি বলতে গোষ্ঠী গিল্ড বা সিন্ডিকেট। ফ্যাসিস্টরা শব্দটি ব্যবহার করত প্রাচীন রোমান ফ্যাসেস বা ভধংপরড় ষরঃঃড়ৎরড় বুঝতে। এটি প্রাচীন রোমানদের মৃত্যুদণ্ডের ক্ষমতা প্রদানকারী বিচারকের প্রতীক বোঝায়। যার হাতে এমন একটি কুঠার ধরা। যেটির হাতল কাঠিতে তৈরি। তারা এমন প্রতীক ও নাম ব্যবহার করত এ বার্তা দেওয়ার জন্য, ‘তাদের মতবাদের বিরোধীদের তারা মৃত্যুদণ্ডের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। মুসোলিনি ১৯৩০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তার পার্টির তরুণ কর্মীদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘খড়াব ঃযব ৎরভষব, ধফড়ৎব ঃযব সধপযরহব-মঁহ, ধহফ রহ ঃযরং ংপধষব ড়ভ ংবহঃরসবহঃং, ফড় হড়ঃ ভড়ৎমবঃ ঃযব ফধমমবৎ.’ অর্থাৎ ‘রাইফেল ভালোবাস, মেশিনগানের উপাসনা করো এবং আবেগের এ মাপকাঠিতে, ছোরার কথা ভুলে যাবে না অর্থাৎ সবসময় সাথে রাখবে।’

: ‘বুঝতে পেরেছি। যেমন একালের ফ্যাসিস্ট নেতারা বলেন, আন্দোলন দমন করতে তাদের ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’ সুমন বলে।

এমন সময় আবু সাঈদের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। অচেনা একটি নম্বর।

: ‘আসসালামু আলাইকুম।’ আবু সাঈদ কল রিসিভ করে।

: ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমি ঢাকা থেকে আতিক বলছি।

: কেমন আছেন ভাই?

: একটা জরুরি প্রয়োজনে তোমাকে স্মরণ করলাম। 

: বলেন।

: আবার প্রতারণা করলো ফ্যাসিস্ট সরকার। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি তুলে দিয়ে পরিপত্র জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আজ আদালতকে ব্যবহার করে আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, এটা আমরা কিছুতেই মেনে নেবো না। তুমি সব সমন্বয়কদের এখনই ডাকো। সারা দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

: আপনি রায়ের কপি পাঠান। 

: আমি তোমার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করছি।

: ঠিক আছে, ধন্যবাদ। 


৫. নহে সমাপ্ত কর্ম মোদের অবসর কোথা বিশ্রামের

আপাতত আবু সাঈদের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। এমন চিন্তার সাথে সাথে তার মনে পড়ে আল্লামা ইকবালের কবিতার কয়েকটি চরণ, ‘নহে সমাপ্ত কর্ম মোদের, অবসর কোথা বিশ্রামের/ উজ্জ্বল হয়ে ফোটেনি আজও, সুবিমল জ্যোতি তাওহীদের/ এখনও অসংখ্য হায়েনা, রেখে যায় ধংসের নমুনা/ এখনও সমতা আসেনি সমতা সমাজের/ এখনও দুঃখের বিন ঘরে ঘরে বাজে/ তাই জাগতে জাগতে হবে আনতে আলো সমাজে।’

আবু সাঈদ ভাবে বাড়ি যেতে যেহেতু দেরি হবে একটু ফোন করা দরকার। সে বাড়িতে ফোন করে।

ফোন ধরে ওর বোন সুমি বেগম ‘আসসালামু আলাইকুম, ও ভাই, তুই কেমন আছিস।’ সুমি সালাম দিয়ে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় আবু সাঈদ কেমন আছে তা জানতে চায়।

: ‘ভালে আছং। তোমরা সগাই ভালে আছেন তো? মাক সুমি মা’র কাছোত ফোনটা দে।’ তার সাথে কথা বলে। মাকে ফোনটা দিতে বলে। সুমি মা’র কাছে ফোনটা দেয়।

: ‘ওরে মোর সোনার বাপরে, তুঁই বাড়িত আসপু কুনদিন?’ মা আদরের গলায় জানতে চায় তার প্রিয় ছেলে বাপুই সোনা কবে বাড়ি আসবে।

: ‘এক সপ্তাহ পরে মা।’ সাঈদ জানায়।

: ‘এদ্দিন পরে ক্যা বাবা?’ মায়ের মনটা ছেলেকে দেখার জন্য অস্থির।

: ‘মেলা ব্যস্ত আছং, ম্যালা কাম সেই জন্য।’ সাঈদ মাকে বুঝিয়ে বলে।

: ‘সাবধানে থাকিস বাপই? দ্যাশের অবস্থা ভালো নোয়ায়।’ মা নিজের কষ্ট চেপে রেখে নিজেকে সান্ত¡না দেয়।

: ‘দোয়া করিস মা, মুঁই যহন দ্যাশের মাইনষের ভালোর জন্য কাজ কইরব্যার পাং, জীবন গেইলেও যেন পাউছি না আইসোং।’ সাঈদ তার দৃঢ় ইচ্ছার কথা মাকে জানায়।

: ‘দোয়া করং বাপ, আল্লাহ তোর মনের ইচ্ছা পূরণ করুক, তুঁই ম্যালা বড়ো হ, মাইনষে যহন চিরদিন তোর কতা মনোত আখে।’ মা তার জন্য দোয়া করে চোখ মুছতে মুছতে ফোনটা রেখে দেন।

বুকের ভেতর দারুণ ঝড়


আবু সাঈদের বন্ধুরা সবাই তার রুমে এসেছে। রুমের সবাইকে সাথে নিয়ে সে বের হয়। সবাই বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মাঠে অপেক্ষা করছে।

ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা সবাই টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে জেনে গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

তাওহিদুল হক সিয়াম, শামসুর রহমান সুমন, সাবিনা ইয়াসমিন, মাহিদ হাসান শাকিল, মোঃ রহমত আলীসহ শত শত শত ছাত্র-ছাত্রী বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সমবেত হয়েছে। আবু সাঈদ আসছে। আবু সাঈদকে দেখে সবাই সেøাগান দেওয়া শুরু করে-

: কোটা না মেধা, মেধা মেধা...। আবু সাঈদ সবাইকে শান্ত হতে বলে। 

তারপর কথা শুরু করে : বন্ধুরা! এই সরকারের দুঃশাসনে আজ আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলো আজ সন্ত্রাসী, মাদককারবারি, ধর্ষক, খুনিদের দখলে। ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন দীর্ঘায়িত করতে তারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা নেই। জীবনের নিরাপত্তা নেই। আমরা ইতঃপূর্বে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করেছি। কোটা বাতিল আন্দোলন করেছি। সরকার ২০১৮ সালে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। আমরা সংসদে আইন পাস করতে বললে, তারা তা করেনি। কেন করেনি, আজ তা পরিষ্কার। হাসিনার গোলাম আইন-আদালত আর বিচারকরা। তাদের তার সরকার ব্যবহার করে আবার কোটা ফিরিয়ে এনেছে। আমরা দেড় দশক ধরে দেখছি, হাসিনার কথাই আইন। আদালত বা কোর্ট এখন আর জনগণের নেই, সব মুজিব কোর্টে পরিণত হয়েছে। এই আদালতকে ব্যবহার করে দেশের বরেণ্য আলেম, রাজনৈতিক নেতা ও অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, ফাঁসি দিয়েছে। ক্রসফায়ার নাটক, আয়নাঘর, খুন গুম এখন নিত্য দিনের ঘটনা।

আবু সাঈদের কথা শেষে বক্তব্য শুরু করে সুমন : ‘বন্ধুরা ঘুষ-দুর্নীতি মামা-দুলাভাই খালুর জোর ছাড়া চাকরি হয় না। তারপর আছে কোটা। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বৈষম্যহীন দেশ গড়ার দাবিতে। অথচ সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নামে একটি বিশেষ দলের লোকদের সুবিধা দিতে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও কোটার দেওয়াল তুলে জাতিকে বিভক্ত করা হচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা রাষ্ট্রের সব সুবিধা ভোগ করছে আরো করবে সেই আয়োজন করছে। অন্যদিকে কোটা ব্যবস্থার জালে গোটা জাতিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে রেখেছে, আজীবন রাখার ষড়যন্ত্র করছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে...। 

সুমনের পর আবার আবু সাঈদ বলে : কিন্তু সে যুদ্ধ হবে খালি হাতে। মানব ঢাল তৈরি করে।

: তা কি করে সম্ভব? সাবিনা ইয়াসমিন প্রশ্ন করে।

সাবিনার কথা শেষে আবু সাঈদ বলে : ‘হ্যাঁ সম্ভব। স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে এভাবে খালি হাতে সংগ্রামী জনতার রক্তরেখা ধরেই স্বৈরাচারের পতন হয়, বিপ্লব আসে। বরং অস্ত্র হাতে নিলে জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে ওরা খুনের নেশায় মেতে উঠবে। এদেশের সাধারণ নাগরিক ও বিশ্বকে দেখাবে তারা বিপ্লবী নয় সন্ত্রাসীদের নির্মূল করছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এরিকা চেনোওয়ে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কোনো জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যদি গণবিক্ষোভে যোগ দেন, তাতেই তারা সফল হতে পারেন। গণতান্ত্রিক দেশের মতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশে সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরানো যায় না। অহিংস আন্দোলনের ১৯৮ রকমের কৌশল উল্লেখ করে এরিকা চেনোওয়েথ এবং তার সহযোগী গবেষক মারিয়া স্টেফান ১৯০০ সাল হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে যেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করে শেষে তারা এমন উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, সহিংস আন্দোলনের চাইতে অহিংস গণ-আন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনা দ্বিগুণ।’

: ‘তাহলে আর দেরি নয়। এখনই বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হতে হবে।’ শাকিলের কথা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের নেতৃত্বে এসে ওদের সাথে যোগ দেন। 

অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদকে সবাই সালাম জানিয়ে তাকে কিছু বলতে অনুরোধ করে।

তিনি বলেন : খুব সাবধানে ধৈর্য ও সাহসের সাথে আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। তোমরা হয়তো খেয়াল করেছো, স্বৈরাচারের দোসর বেরোবির শিক্ষক আসাদ মন্ডল ও মশিয়ার রহমান, কর্মকর্তা আবুল কালাম, তাপস কুমার ঘোষ, কর্মচারী নুরুন্নবী, জনি ও নুর সামিসহ কয়েকজন সব খবর পুলিশ ও সরকারের পোষা সন্ত্রাসীদের জানাচ্ছে। ওরা অস্ত্র হাতে পাহারা বসিয়েছে।

: ধন্যবাদ স্যার, আপনি আমাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করায়। ও রিষষ ফরব ষরশব ধ ঃৎঁব-নষঁব ৎবনবষ. উড়হ’ঃ ধিংঃব ধহু ঃরসব রহ সড়ঁৎহরহমথড়ৎমধহরুব. (আমি সত্যিকারে অনুগত বিদ্রোহীর মতো মৃত্যুকেই করেছি আপন/শোকে সময় নষ্ট না করে করো সেই আয়োজন।)

: তুমি ঠিকই বলেছ, আবু সাঈদ। বৈষম্যের শিকার, বঞ্চিত মানুষের মন থেকে মৃত্যু ভয় চলে যায়। তখন তারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে দ্বিধা করে না। জন্মসূত্রে সুইডিশ আমেরিকার অভিবাসী বেতনবৈষম্যের শিকার শ্রমিক ও গীতিকার জো হিলের যে গানের কথাগুলো উচ্চারণ করলে তা যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা।

: স্যার, আমার বুকের ভেতর ঝড় তোলে আল্লাহর এই আদেশ, ‘আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা জালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।’ 

সবাই সেøাগান তোলে : কোটা না মেধা, মেধা মেধা...। স্বাধীন এ বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই। আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম...


৬. শহীদি রক্তে হেসে ওঠে জিন্দেগানী

মিছিল চলছে। কেউ কি জানতো এই মিছিল শহীদি মিছিল! শহীদি রক্তে আবু সাঈদের জীবন হেসে উঠবে! 

‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি/শহীদি রক্তে হেসে উঠে যবে জিন্দেগানী।’ এই কবিতার জীবন্ত পোস্টার হবে আবু সাঈদ! রংপুর শহরের মিছিলের স্রােত পৌঁছে যাবে প্রথমে শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরের বাবনপুর গ্রামে! তারপর ‘মোর সোনার বাবাটাক পুলিশ গুলি করিয়া মারল ক্যান। ও তো কাউকে মারতে যায় নাই। চাকরি চাওয়াটা কি অপরাধ? অই পুলিশ, তুই মোকে গুলি করিয়া মারলু না ক্যান?’ ভাই, তুই হামাক ভাসে থুইয়া কোনটে হারে গেলু। তুই তো কচলু, বইন, মুই চাকরি করলে অভাব থাইকপের নেয়। নেজে কামাই করিয়া কত কষ্ট করি পড়লু। তার ফল কি এইটা?’- আর্তনাদ বিপ্লবের আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়বে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলজুড়ে! স্বৈরাচার পালাবে দেশ ছেড়ে! ১৬ জুলাই ২০২৪-এর সাথে একাকার হবে ত্যাগ আর শোকের ১৪৪৫-এর ৯ মহররম। এ কথা মিছিল শুরু আগে কেউ কি জানতো? হয়তো আবু সাঈদ জানতো। জানতো বলেই কি সাহসভরা বুক চেতিয়ে আবু সাঈদ দাঁড়িয়ে ছিল ঘাতক বুলেটের সামনে। সিয়াম, রমজান, সুমন, সাবিনা কারো ডাকে আবু সাঈদ পিছিয়ে আসেনি। 

সবাই সেদিন ডেকেছিল : আবু সাঈদ পুলিশ গুলি করবে...সা-ঈ-দ...

: না। এরা তো ভিনদেশি হায়েনা না। এ তো আমার দেশের পুলিশ। এদেশেরই মানুষ। কেন গুলি করবে। আমরা নিরস্ত্র...। দেখো আমার হাতে একখণ্ড শুকনো গাছের ডাল ছাড়া কিছু নেই। আমার মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকা... পুলিশ ভাই দেখো তুমি আমি ওরা সবাই এদেশের লোক... আসো। শামিল হও বৈষম্যহীন দেশ গড়ার এ মুক্তির সংগ্রামে। কথাগুলো বলতে বলতে বুক চেতিয়ে দাঁড়ায় আবু সাঈদ।

ঘাতকের চোখে মুখে হিংসার আগুন। তার ফ্যাসিস্ট নেত্রীকে রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা : সাঈদের আহবান নয়, ওদের কানে বাজছে ঘাতক বাহিনী প্রধানের আদেশ : বন্দুক তোদের হাতে খেলা-ধুলা করার জন্য দেইনি...।

তারপর গুড়ম গুড়ম গুলির আওয়াজ। আবু সাঈদ বার বার হাত ইশারায় বোঝাতে চাচ্ছে, পুলিশ ভাই তুমি তো তোমার শপথ ভঙ্গ করছো... তারপর আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা।

কিন্তু না! আবু সাঈদের কানে ভেসে আসছে দূর আকাশ থেকে এক অনন্ত আহ্বান : “হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। শামিল হয়ে যাও আমার (নেক) বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে”। [সমাপ্ত]

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ