ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির মার্চ ২০২৬
কল্পনা করো, তুমি কী-বোর্ড, স্ক্রিন, মাউস স্পর্শ না করেই একটি টেক্সট মেসেজ লিখছ। তুমি কল্পনা করছ আর টেক্সট মেসেজ লিখে চলছে স্ক্রিনে। আবার হয়তো হাত নেড়ে গেম খেলছ, তুমি যা-ই ভাবছ তাই হচ্ছে গেমে। অর্থাৎ তোমার মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনাগুলো কম্পিউটারে ফুটে উঠছে। এটি কোনো জাদু কিংবা সায়েন্স ফিকশন নয়; এটি এক বাস্তব প্রযুক্তি, যাকে বলা হচ্ছে ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’।
ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই হলো এমন প্রযুক্তি যা মানব মস্তিষ্কের সাথে বাহ্যিক ডিভাইসের সাথে যোগাযোগ বা নিয়ন্ত্রণ করে। বলা যায় এ প্রযুক্তি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সাথে বাহ্যিক ডিভাইসের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। এমন প্রযুক্তি সায়েন্স ফিকশন মনে হলেও বর্তমানে বাস্তবে রূপ নিয়েছে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসে। তোমরা হয়তো বিভিন্ন সময় শুনে থাকবে, মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসানোর পরিকল্পনা চলছে কিংবা চিপ বসিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এই চিপ দিয়ে মানুষের কল্পনাকে বাস্তব কর্মে রূপান্তর করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই ব্রেন-কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, অক্ষম, পেশি হারানো ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চিন্তা করছেন।
চলো এই প্রযুক্তির বাস্তব উদাহরণের আগে এটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার চেষ্টা করি।
যেভাবে কাজ করে
যখনই তুমি কোনো কিছু চিন্তা করো, কল্পনা করো কিংবা নড়াচড়া করো, তখনই তোমার মস্তিষ্ক নিউরন ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত করে। যেমন : যখন তুমি তোমার ডান হাত নাড়ানোর কল্পনা করো, তখন মস্তিষ্কে একটি অনন্য প্যাটার্ন দেখা যায়। ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তি মস্তিষ্কের এই বৈদ্যুতিক সংকেত বা ইকেট্রোফিজিওলজির ওপর কাজ করে। মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ধরার জন্য বা সংকেত বোঝার জন্য সেন্সর ব্যবহার করে। এটি দুই ধরনের হতে পারে। এর একটি হলো, মস্তিষ্কের ত্বকে স্থাপন করা সেন্সর। যেটি সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যুর সাথে যুক্ত থাকে না। একে নন-ইনভেসিভ বিসিআই বলা হয়। আবার মস্তিষ্কের ভেতরে স্থাপন করা সেন্সরকে ইনভেসিভ সেন্সর বলা হয়। এই ধরনের সেন্সর সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যুর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে। যাহোক, এসব সেন্সর মস্তিষ্কের সংকেতগুলো কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরবরাহ করে। যেখানে সংকেতগুলো নিউরাল ডিকোডিং নামে একটি প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করা হয়। এখানেই বিভিন্ন ধরনের মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম এবং অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টরা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ থেকে সংগৃহীত জটিল ডেটা সেটগুলিকে মস্তিষ্কের উদ্দেশ্য কী হতে পারে তার একটি প্রোগ্রামেবল বোঝাপড়ায় রূপান্তরিত করে।
এই প্রযুক্তি নতুন নয়। মানুষের ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের প্রথম সফল প্রদর্শন ১৯৭৩ সালে ঘটেছিল, যখন ইউসিএলএ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ইইজি সংকেতের ওপর ভিত্তি করে তাদের কল্পনা দিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে একটি কার্সার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এলন মাস্কের নিউরালিংকের বদৌলতে। ২০১৬ সালে খোলা এলন মাস্কের বিসিআই কোম্পানি নিউরালিংক রোগীদের মস্তিষ্কে বিসিআই বসিয়েছে। এলন মাস্কের নেতৃত্বে নিউরালিংক একটি মুদ্রার আকারের অস্ত্রোপচার ইমপ্লান্ট তৈরি করেছে। এর বর্তমান লক্ষ্য হলো এর ইমপ্লান্ট ব্যবহার করে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের তাদের চিন্তাভাবনা দিয়ে বাহ্যিক ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম করা এবং ভবিষ্যতে রোগীদের জন্য কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং উন্নত করার জন্য গবেষণাটি ব্যবহার করা। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত মোট তিনজন রোগীর মস্তিষ্কে নিউরালিংক চিপ স্থাপন করেছে। নিউরালিংক ব্যবহারকারী রোগী কম্পিউটারের কার্সার সরানো, বার্তা টাইপ করা, ওয়েব ব্রাউজ করার মতো কাজ করতে পারে। বিসিআই প্রযুক্তির আরেকটি কার্যক্রম চালিয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তারা একটি বিসিআই তৈরি করেছেন যা দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিরা হাতের লেখা কল্পনা করে টাইপ করতে পারে। যেটি দিয়ে প্রতি মিনিটে ৯০টির মতো অক্ষর লেখা যায় ৯৫ শতাংশ নির্ভুলতার সাথে। বিসিআই প্রযুক্তি আরও বিভিন্ন সংস্থা ব্যবহার করছে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য। বিসিআই ব্যবহার করে মস্তিষ্কে স্পর্শ প্রতিক্রিয়া ফেরত পাঠানো যায়। এই সিস্টেম ব্যবহার করে রোবোটিক হাত-পা ব্যবহার করতে পারবেন রোগীরা। যা হাতে ও পায়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে পারবে। বিসিআই ব্যবহার করে মন নিয়ন্ত্রিত গেম, ড্রোন, ওয়্যারলেস হেডসেটের প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে।
মানুষের মনের কল্পনাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তরের এই প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে। বিজ্ঞানীদের মতে হয়তো আমরা মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন, মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে বার্তা পাঠানোর মতো প্রযুক্তি দেখতে পাব। কিন্তু এই প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্কে বাহ্যিক চিপ বসানো কী ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকবে কিংবা বর্তমানেও কী নিরাপদ, এই ঝুঁকি ও নীতিগত প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও পড়ুন...