বর্ষার ফুল
গ্রীষ্মের পর প্রকৃতির হঠাৎ পরিবর্তন আর দৃষ্টিনন্দন বৈচিত্র্যতা এবং শীতল পরশ নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির হয় রূপময় বর্ষা। তার ডালাভরা থাকে গাঢ় সবুজ, মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি খেলা, টিনের চালে রুমঝুম ঝুম শব্দ আর ডালা উপচে পড়া হরেক রকম ফুলে ফুলে। এসব ফুলের মধ্যে কদম, কেয়া, কামিনি, কলাবতী, বেলী, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, বকুল, দোলনচাঁপা, স্পাইডার লিলি, জুঁই, মালতিলতা, দোপাটি, অলকানন্দা, মোরুগঝুঁটি, পর্তুলিতা, গুল নার্গিস, ঝুমকোলতা, কাঠমল্লিকা, কৃষ্ণচূড়া, কুচুরিপানা ফুল, কলমি ফুল, ঝিঙ্গেফুল, কুমড়াফুল, হেলেঞ্চা ফুল, বনতুলসী, নয়নতাঁরা, কেশরদাম, আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা ও রঙিন পদ্ম। বর্ণিল এসব ফুলগুলো বর্ষার উপহার বৃষ্টির পানিতে সতেজ ও সুঠামো হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দারুণভাবে বাড়িয়ে তোলে। ছড়িয়ে দেয় লোভনীয় মোহনীয় মিষ্টি সুবাস, সুঘ্রাণ স্বার্থহীনভাবে দ্বিগি¦দিক চারিদিক সারা বিশ্বময়।
আমাদের মনকে মাতাল করে তোলে। উদাস করে তোলে, পাগল করে তোলে কবি মন। গল্পকার ও উপন্যাসিকের মন। কবি নির্মাণ করেন এসব ফুলের বিষয় আশয় নিয়ে কবিতা, ছড়া ও গান। গল্পকার উপন্যাসিক লেখেন সুখপাঠ্য গল্প-উপন্যাস-রম্য আরও কত কী!
যাহোক, বর্ষার তাৎপর্যপূর্ণ ফুলগুলো কী কী সেগুলো আমরা জানলাম। এখন প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফুল নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।
কদম
কদমফুলগুলোকে বর্ষার দূত বলা হয়। অর্থ্যাৎ কদম ফুল প্রকৃতি ও প্রকৃতির পাখিকূল ও মানুষকে জানান দেয় এখন বর্ষা এসেছে। কদমফুল দেখতে বলের মতো গোল। বলের চারিদিকে অজ¯্র ফুলের বিন্যাস। এ ফুলের বৃক্ষটি অনেক বড় এবং বহু শাখা প্রশাখা যুক্ত হয়। শীতে কদমের পাতা ঝরে যায়। বসন্তে কচি পাতা গজায়। কদম ফুলকে বর্ষার দূতের পাশাপাশি বর্ষার রানীও বলা হয়। হলুদ এবং সাদা মিশ্রিত রং ফুলটিকে করে তোলে দৃষ্টিনন্দন। কদমের মিষ্টি গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বর্ষাকে করে তোলে অতুলনীয়। এ ফুলটি বাংলাদেশের আনাচে কানাচে প্রচুর দেখা যায়। তবে আদি নিবাস ভারত ও চীন।
কেয়া
বর্ষার অনন্য আরেকটি সুন্দর ফুল হলো কেয়া। এ ফুলের পাপড়িগুলো সাদা এবং অনেক সুগন্ধিযুক্ত। বাংলাদেশের সমতল ভূমি এলাকায় কেয়া ফুল দেখা যায়। তবে সুন্দরবন ও সেন্টমার্টিনে এ ফুল প্রচুর দেখা যায়। কেয়া ফুলের আদি নিবাস মালয়েশিয়া, পূর্ব অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় উদ্ভিদ।
বেলী
বেলি ফুল গাঢ় সুগন্ধিযুক্ত সাদা ফুল। ফুলে ফুলে নেয়ে ওঠে বেলী ফুলের গাছ ও গাছের শরীর। বর্ষার ফুল হলেও শীতেও এটি ফোটে। বেলি ফুল দিয়ে তৈরি মালা আমাদের সবার অনেক পছন্দের। এ ফুলটি সুগন্ধি শীল্পে প্রচুর ব্যবহার হয়। ফুলগুলো ছোট ও ধবধবে সাদা। এটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের একটি। এটি ফিলিপাইনের ও ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ফুল। বেলী ফুলের আদি নিবাস ভারত ও চীন।
রজনিগন্ধা
জনপ্রিয় ফুলগুলোর তালিকায় রজনিগন্ধা নাম অন্যতম। এ ফুলের নির্যাস হতে সুগন্ধি তৈরি হয়। এটিকে নাইট কুইনও বলা হয়। এ ফুলটির আদি নিবাস মেক্সিকো হলেও এখন প্রধানত দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়– এবং কর্ণাটক রাজ্যে চাষ করা হয়।
গন্ধরাজ
রাজকীয় গন্ধযুক্ত এ ফুলটি বাংলাদেশ ও ভারতে খুবই জনপ্রিয় একটি ফুল। এ ফুলটির আদি নিবাস এশিয়ায়। ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন, কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপান, মিয়ানমার ইত্যাদি দেশেও এ ফুলটির বিস্তার রয়েছে।
শাপলা ও পদ্ম
শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। খাল-বিল, ডোবা-নালা, পুকুর ও জলাশয়ে শাপলা ফুটে থাকার অপরূপ দৃশ্য সবার মন হরণ করে। আমাদের দেশে সাধারণত সাদা, গাঢ়, লাল, নীল ও গোলাপি রঙের শাপলা বেশি চোখে পড়ে। শাপলা ও পদ্ম বিলের ঝিলের সৌন্দর্য ছোট বড় সবাইকে নিমোহিত করে। এ দেশে অনেক স্থানে শাপলা ও পদ্মর বিল রয়েছে। শাপলার সঙ্গে পদ্মকে অনেকেই এক করে ফেলে। অথচ শাপলা ও পদ্ম দুটিই ভিন্ন ফুল। আকারগত অনেক পার্থক্য রয়েছে এদের মধ্যে। শাপলার চেয়ে পদ্মর সুবাস বেশি। এ দুটোরই ফুল ও পাতা পৃথক। পদ্মফুলের পাঁপড়িগুলো চিকন ও লালচে হয়।
দোলনচাঁপা
এ ফুলটি কিউবার জাতীয় ফুল। চার পাপড়ি বিশিষ্ট প্রতিটি সাদা ফুল দেখতে অনেকটাই প্রজাপতির মতো। তাই একে ইংরেজিতে বাটারফ্লাই জিঞ্জার লিলি বলে। দোলনচাঁপা তার তীব্র সুগন্ধের মাধ্যমে তার নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। এ ফুল আদিতে ভারতবর্ষের ফুল হলেও পৃথিবীর বহু জায়গায় বিস্তার লাভ করেছে।
এ ছাড়া বাগানের সতেজ ফুল নয়নতারা, দোপাটি, হলুদ রঙের লতানো ফুল অলকানন্দা, সাদা ও হলুদ রঙের কাঠগোলাপ ইত্যাদি ফুলগুলো দেখলেই বর্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের মন ও মগজের রাজ্যকে রাঙিয়ে দেয় বর্ষার এসব ফুলগুলো। মনে করিয়ে দেয় সৃষ্টিকর্তার কথা। তিনি কত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন এ পৃথিবী ও পৃথিবীর নিরীহ অন্তর।
আরও পড়ুন...