বড়াল নদী
তোমাদের গল্প জাকির সেতু জুলাই ২০২৬
বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে দাদু নদীতে গোসল করার জন্য বাড়ি থেকে বের হলেন। জুরাইন দাদুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “দাদু, আমিও গোসল করতে যাব।” দাদু বললেন, “ঠিক আছে, চলো।” দাদুর হাত ধরে সে বড়াল নদীর পাড়ে এলো।
বড়াল নদী এখন সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নদীর চারপাশ ভরাট হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় অনেক গাছপালা জন্মেছে। জুরাইন ও দাদুকে দেখে জুনায়েদ এগিয়ে এলো, সঙ্গে ফাহাদও নদীর ঘাটে এলো। জুনায়েদ দাদুকে বলল, “দাদু, তুমি অনেক দিন পর নদীতে গোসল করতে এলে। তুমি আগের মতো নদীতে গোসল করতে আসো না কেন?”
দাদু জুনায়েদের কথা শুনে এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, “বড়াল নদী আগের মতো নেই, দাদুভাই। এই নদীতে একসময় পালতোলা নৌকা চলাচল করত। বড় বড় বজরা নৌকাও চলত। খুব বেশি দিনের কথা নয়, দাদুভাই।”
জুরাইন ও ফাহাদ উৎসুক দৃষ্টিতে দাদুর দিকে তাকাল। দাদু বলতে শুরু করলেন, “প্রতিদিন এই বড়াল নদী দিয়ে অসংখ্য নৌকা চলাচল করত। নৌকাগুলো দূরদূরান্তে চলে যেত। পদ্মা নদীর শাখা বড়াল যমুনা নদীর সঙ্গে যুক্ত।
কিছু কিছু নৌকা এপার থেকে যাত্রী নিয়ে ডেমরা, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া চলে যেত। নদীর ওপারে হিন্দুদের বাড়ি ছিল। সেই বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পাথার ছিল। বর্ষার মৌসুমে সেখানে অথৈ পানি থাকত, তাই কিছু নৌকা পাথার দিয়েও যেত।
বড় বড় বজরাগুলোতে ধান, চাল, গম, মসুর, ভুট্টা প্রভৃতি খাদ্যশস্য বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে পৌঁছে দেওয়া হতো। আমাদের সময়ে নদীকেন্দ্রিক ছিল আমাদের সব কার্যক্রম।”
দাদু এবার থামলেন। জুনায়েদ দাদুকে প্রশ্ন করল, “দাদু, তুমি কতদূর পর্যন্ত এই নৌকা দিয়ে চলাচল করেছ?”
“অনেক দূর পর্যন্ত। প্রায় দু-তিন দিন লেগেছে।”
“কত কিলোমিটার হবে, দাদুভাই?”
“এখনকার হিসেবে প্রায় সত্তর থেকে আশি কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়েছি।” দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, “বড়াল নদীর পাড় ঘিরে কত আনন্দ, উল্লাস আর উদ্দীপনা ছিল! আহ, শৈশবের দিনগুলো! গ্রামের সবাই একসাথে একই ঘাটে গোসল করতাম। দুপুরবেলা গ্রামের প্রায় সব মানুষই নদীর ঘাটে আসত।
বর্ষার মৌসুমে এই নদীতে প্রচুর মাছ ধরা পড়ত। আমরা হাতজাল দিয়ে অনেক চিংড়ি মাছ ধরেছি। এ ছাড়া বেলে মাছ, টেংরা মাছ, বাইম মাছ, বাঁশপাতারি মাছ, ঘারিয়া মাছ, কাকিলা মাছ-এমন নানা ধরনের মাছ পাওয়া যেত। চাঁদা মাছ আমার কাছে খুবই ভালো লাগত, দাদুভাই।
এই নাগডেমরা গ্রামের মানুষ সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর বিকেলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরত।
বিকেলবেলা এবার নদীর ঘাটে মানুষ বসে গল্প করত ও মাছ ধরা দেখত। নদীর ধারে অসংখ্য ছেলেমেয়ে গোসল করতে ঝাঁপাঝাঁপি করত। নদীর পাড়ে ডুমুর গাছে বসে ডাকত অসংখ্য পাখি।”
দাদু গল্প বলতে বলতে হঠাৎ আকাশে মেঘের ডাকাডাকি শুরু হলো। দাদু জুনায়েদ ও জুরাইনকে বললেন, “তাড়াতাড়ি গোসল করে চলো, বাড়ি ফিরে যাই। অন্যদিন এই নদী সম্পর্কে আবার বলব তোমাদের।”
আরও পড়ুন...