বিশ্বকাপ রকমারি
প্রচ্ছদ রচনা আহমেদ বায়েজীদ জুন ২০২৬
সেই সোনালি ট্রফি
বহু আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নের এক ট্রফি। যার অফিশিয়াল নাম ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। তাবৎ বিশ্বের সব ফুটবলারেরই স্বপ্ন থাকে এই ট্রফি জেতার, কিন্তু অল্পসংখ্যকই সেই সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপের আসর থেকে বর্তমান সোনালি রঙের ট্রফিটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ওই বছর ফিফার আহ্বানে সাত দেশের ৫৩ জন শিল্পীর প্রস্তাবিত ডিজাইনের ভেতর থেকে নির্বাচিত হন ইতালির সিলভিও গাজানিগা। তার তৈরি ট্রফিটি ৩৬.৫ সেন্টিমিটার উঁচু। ১৮ ক্যারেটের ৫ কেজি সোনা দিয়ে বানানো। গোড়ার দিকে আছে দুই স্তর মালাকাইট পাথর, যার ওজন ১ কেজি ১৭৫ গ্রাম। তবে ট্রফিটির ভেতরে ফাঁপা। এটি যদি পুরোটা খাঁটি সোনার তৈরি হতো, তাহলে ওজন হতো ৭০-৮০ কেজি-যা কেউ হাতে তুলতেই পারত না।
তবে বিশ্বকাপ জয়ী দলকেও এই ট্রফিটি দিয়ে দেওয়া হয় না। দেশে ফিরে শিরোপা উৎসব করার পর ফিফা আসল ট্রফিটি ফিরিয়ে নেয়। চ্যাম্পিয়ন দলকে একই রকম দেখতে ব্রোঞ্জের তৈরি, সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি রেপ্লিকা দেওয়া হয়। একসময় নিয়ম ছিল বিশ্বকাপজয়ী দেশ পরবর্তী আসরের ড্র পর্যন্ত আসল ট্রফিটি নিজেদের কাছে রাখবে। নিরাপত্তার কারণে সেই নিয়ম বদলানো হয়েছে। আসল ট্রফিটি এখন সারা বছর থাকে ফিফার জুরিখ সদর দপ্তরে। এই ট্রফি চাইলেই যে কেউ ছুঁতে পারে না। শুধু বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার, ফিফা সভাপতি ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এটি স্পর্শ করার অনুমতি আছে।
এর আগে ১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে যে ট্রফিটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটির নাম ছিল ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফরাসি ভাস্কর অ্যাবেল লাফ্ল্যুর সেটির ডিজাইন করেছিলেন। ডিজাইনে ছিল গ্রিক বিজয়দেবী নাইকির সোনালি মূর্তি, মাথার ওপর অষ্টভুজাকৃতির একটি কাপ ধরে আছেন তিনি। গলায় বিজয়ের মালা। ৩ কেজি ৮০০ গ্রাম ওজনের সেই ট্রফিটি তৈরি হয়েছিল সোনালি প্রলেপ দেওয়া স্টার্লিং সিলভার দিয়ে। উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ভিক্টরি’, তবে লোকমুখে পরিচিত ছিল ‘কাপ দ্যু মঁদ’ বা বিশ্বকাপ নামে। ১৯৪৬ সালে ফিফার সভাপতি হিসেবে জুলে রিমের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তার সম্মানে ট্রফিটির নাম বদলে রাখা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’।
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে ট্রফিটি চুরি হয় লন্ডনের এক প্রদর্শনী থেকে। পরে পিকলস নামের একটি কুকুর নাটকীয়ভাবে ট্রফিটি খুঁজে পায়। ওই সময়ে নিয়ম ছিল কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে পেয়ে যাবে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার জয়ের পর সেটি নিয়ে যায়। ১৯৮৩ সালে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায় তাদের অফিস থেকে এবং চিরতরে হারিয়ে যায় জুলে রিমে ট্রফি। চুরির দায়ে কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হলেও ট্রফিটি আর পাওয়া যায়নি। চোরেরা সেটি গলিয়ে সোনার বার বানিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে। পরে ব্রাজিলকে জুলে রিমে ট্রফির একটি রেপ্লিকা তৈরি করে দেওয়া হয়।
পরে আরেকটি আইন করা হয়, তিনবার জিতলেও কোনো দেশ আর বর্তমান ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিতে পারবে না, তাদেরকেও একটি রেপ্লিকা দেওয়া হবে।
ব্রাজিলের অনন্য রেকর্ড
ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি (পাঁচবার) বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে। পাশাপাশি ব্রাজিলের আরেকটি রেকর্ড রয়েছে যেটি আর কোনো দেশের পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়। এবারেরটিসহ বিশ্বকাপের ২৩ আসরের সবগুলোতে অংশ নেওয়া একমাত্র দেশ ব্রাজিল। পেলের উত্তরসূরিরা এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে রেকর্ডটি কারো পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়। জার্মানি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১তম বিশ্বকাপ খেলছে এবার, তাদের শিরোপা চারটি। আর্জেন্টাইনদের এটি ১৯তম বিশ্বকাপ, শিরোপা জিতেছে তিনবার। ১৮টি আসরে অংশ নেওয়া ইতালি পরপর তিন আসরে বাছাইপর্বে ব্যর্থ হয়েছে। তাদেরও শিরোপা চারটি।
বাকিদের মধ্যে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন এবার ১৭তম বিশ্বকাপ খেলছে। এই তিন সাবেক চ্যাম্পিয়নের চেয়ে এগিয়ে থাকা মেক্সিকো এবার ১৮তম বিশ্বকাপ খেলছে।
ভেঙে যাওয়া-জোড়া লাগা দল
এমন কিছু দল আছে, যারা অতীতে বিশ্বকাপে খেলেছে; কিন্তু এখন আর সেই নামে কোনো দেশই নেই বিশ্ব মানচিত্রে। চেকেস্লোভাকিয়া নামের দেশটি ১৯৩৪ থেকে ১৯৯০ আসর পর্যন্ত ৮টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। চেক ও স্লোভাকদের জাতিগত দ্বন্দ্বের জের ধরে ১৯৯২ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেশটি ভেঙে যায়। নতুন নামে গঠিত চেক রিপাবলিক ২০০৬ সালে ও স্লোভাকিয়া ২০১০ সালে বিশ্বকাপ খেলেছে।
জার্মানি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ বিশ্বকাপে খেলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ভেঙে পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানি নামের দুটি দেশ গঠিত হয়। পশ্চিম জার্মানি ১০টি বিশ্বকাপ খেলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। ওই বছর দুই জার্মানি একত্রিত হলে আবার জার্মানি নামে দেশটি এখন বিশ্বকাপে খেলছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ৭টি বিশ্বকাপে খেলেছে। বিশাল এই দেশটি ভেঙে যাওয়ার পর এর প্রধান অংশ এখন রাশিয়া নামে খেলছে। রাশিয়া কয়েকটি বিশ্বকাপে খেললেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় এ বছর খেলতে পারছে না। সোভিয়েত ভেঙে গঠিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইউক্রেন একবার বিশ্বকাপে খেলেছে।
নব্বইয়ের দশকে ভেঙে যাওয়া আরেক রাষ্ট্র যুগোস্লাভিয়া ৮টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। এই দেশটি ভেঙে গঠিত সাতটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি অংশ ১৯৯৮ বিশ্বকাপে এফআর যুগোস্লাভিয়া নামে খেলেছে। ২০০৬ সালে খেলেছে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো নামে। পরে এই সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো ভেঙে আলাদা দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর সার্বিয়া অংশটি ২০১০ থেকে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছে।
১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপ খেলেছিল আফ্রিকার দেশ জায়ার। এরপর দেশটির নাম বদলে করা হয় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গো। এবার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর তারা আবার বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে।
ইউরোপ-আমেরিকা লড়াই
বিশ^কাপে একটা সময় ইউরোপ-আমেরিকার মহাদেশীয় লড়াই নিয়ে খুব উত্তেজনা ছিল। শিরোপা সংখ্যায় কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে তা নিয়ে ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। তবে ২০০২ সালে ব্রাজিলের পর অনেক দিন লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ শিরোপা জেতেনি। এই সময় এগিয়ে যায় ইউরোপ। পরপর চারটি বিশ^কাপ জেতে ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্স। তবে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা আবার আমেরিকা মহাদেশে বিশ্বকাপে ফিরিয়ে নেয়।
তবে সর্বমোট শিরোপা সংখ্যায় (জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১ ও স্পেন ১) ইউরোপ ১২ বার জিতে এগিয়ে রয়েছে এখনো। অন্যদিকে আমেরিকা মহাদেশের ব্রাজিল (৫), আর্জেন্টিনা (৩) ও উরুগুয়ে (২) মিলে জিতেছে ১০ বার। উরুগুয়ে অনেক দিন ধরেই দুর্বল হয়ে গেছে। ব্রাজিলেরও শিরোপা খরা যাচ্ছে। তাই একমাত্র আর্জেন্টিনাই আছে আমেরিকার হয়ে ইউরোপের সাথে লড়াই করার মতো। এবার যদি আমেরিকার কোনো দেশ জিততে পারে তবে ব্যবধান আরেকটু কমবে। আর ইউরোপের কোনো দেশ জিতলে তারা আরও এগিয়ে যাবে।
আছে টাকা-পয়সার হিসাবও
বিশ্বকাপ জেতা এবং সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরাটাই যেকোনো দল বা খেলোয়াড়ের জন্য সবচেয়ে বড় গৌরব। তবে এই সম্মানের পাশাপাশি এই বৈশ্বিক আসরে অর্থের যোগও রয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের বিজয়ী দল প্রাইজমানি হিসেবে পাবে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়াবে ৬১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকারও কিছু বেশি।
ফিফা জানিয়েছে, এবারের বিশ্বকাপের মোট তহবিল ৭২৭ মিলিয়ন বা ৭২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। যার মধ্যে ৬৫ কোটি ডলার অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে দেওয়া হবে প্রাইজমানি হিসেবে।
পারফরম্যান্স অনুযায়ী প্রতিটি দল এই অর্থের ভাগ পাবে। রানার আপ দল পাবে ৩৩ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান লাভকারী দল যথাক্রমে ২৯ মিলিয়ন ও ২৭ মিলিয়ন ডলার পাবে। এভাবে নকআউট পর্বে বিদায় নেওয়া প্রতিটি দল তাদের ফলাফল অনুযায়ী প্রাইজমানি পাবে। প্রথম রাউন্ড বা গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেবে ১৬টি দল। তারা পাবে ৯ মিলিয়ন বা ৯০ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে যা ১১০ কোটির কিছু বেশি।
আরও পড়ুন...