বিশ্বকাপের সোনালি তা র কা রা
খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ মে ২০২৬
পেলে
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি পেলে-যিনি তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০। ফুটবল বিশ^কাপের গত ৯৮ বছরের ইতিহাসে এই রেকর্ড দ্বিতীয় কেউ গড়তে পারেননি।
পেলে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন ১৯৫৮ সালের সুইডেন আসরে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পাওয়া সহজ কথা নয়। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিরুদ্ধে পেলের একমাত্র গোলে ব্রাজিল সেমিফাইনালে পৌঁছায়। সেদিন বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৩৯ দিন) গোলদাতা হিসেবে রেকর্ডবুকে নাম লেখান পেলে। এরপর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৪৪ দিন) হ্যাটট্রিককারী হয়ে যান। ফাইনালেও স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে দুই গোল করেন। সেই বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার জেতেন।
১৯৬২ সালে চিলিতে যখন দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ খেলতে যান, পেলে তখন ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই ইনজুরিতে পড়ে দেশে ফিরতে হয়। সেই আসরে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হলেও দর্শকরা বঞ্চিত হয় পেলের খেলা দেখা থেকে। ইংল্যান্ডে ১৯৬৬ সালের বিশ^কাপে রীতিমতো মহাতারকা হিসেবে খেলতে যান পেলে। এবারও ইনজুরিতে পড়েন। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল।
১৯৭০-এ মেক্সিকো বিশ্বকাপে আগের বারের আক্ষেপ ঘোচান পেলে। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে গোল করে দলকে এনে দেন তৃতীয় বিশ^কাপ। তিনবার জেতার ফলে স্থায়ীভাবে জুলেরিমে কাপটি নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল।
ম্যারাডোনা
কম বয়সের অজুহাতে ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের দলে নেওয়া হয়নি তাকে। যদিও ঘরোয়া ফুটবলে সাড়া ফেলেছিলেন। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ডিয়াগো ম্যারাডোনা পরিণত হয়েই খেলতে নামেন আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে। তবে সেবার দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল ও ইতালির কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
১৯৮৬ সালে বলতে গেলে একাই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত সে আসরের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে পরাস্ত করে ম্যারাডোনার দল। এস্তাদিও অ্যাজটেকার সেই ফাইনালে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরে জার্মানরা। তবে ৮৫ মিনিটে ম্যারাডোনা ইতিহাস সৃষ্টিকারী গোলটি করিয়ে নেন সতীর্থ বুরুচাগাকে গিয়ে। সেন্টার সার্কেলের মধ্যে বল পেয়ে ওয়ান টাচে বাড়িয়ে দেন ফাঁকায় দাঁড়ানো বুরুচাগার উদ্দেশ্যে। অনেকটা দৌড়ে সেই বল জার্মানদের জালে পাঠানা বুরুচাগা। ম্যারাডোনার হাতে ওঠে বিশ্বকাপ।
তবে ফাইনালের চেয়েও ওই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঘা তখনও শুকায়নি আর্জেন্টাইনদের মন থেকে। ম্যাচের আগের দিন সতীর্থদের ডেকে ম্যারাডোনা বললেন, ফুটবলই হতে পারে আমাদের প্রতিশোধের হাতিয়ার।
সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার করা দুটি গোল ফুটবল ইতিহাসে দুই রকমভাবে বিখ্যাত হয়ে আছে। ৫১ মিনিটে আলোচিত-সমালোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। এর মাত্র ৪ মিনিট পর দেখান সেরা জাদুটি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দৌড়ে যাওয়ার পথে ৫ ফুটবলার এবং শেষ পর্যন্ত গোলরক্ষককেও কাটিয়ে বলটি ঠেলে দেন জালে। এই গোলটি গত শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায় ফুটবল দুনিয়ায়।
পুরো আসরেই ম্যারাডোনা ছিলেন দুর্দান্ত। অনেক বিশ্লেষক সেবার তার পারফরম্যান্সকে বিশ^কাপ ইতিহাসের সেরা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে আবারো আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন ম্যারাডোনা। যদিও দলটি ছিল ইনজুরি আক্রান্ত। ম্যারাডোনা নিজেও গোড়ালির ইনজুরি থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেননি। ফাইনালে জার্মানির কাছে বিতর্কিত পেনাল্টিতে ১-০ গোলে হেরে যায় তার দল। ১৯৯৪ ছিল মেরাডোনার শেষ বিশ^কাপ। সেবার নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার কারণে টুর্নামেন্টের মাঝপথে তাকে নিষিদ্ধ করে ফিফা।
রোনালদো নাজারিও
ব্রাজিলের হয়ে তিনটি বিশ^কাপ ফাইনাল খেলে দুটি শিরোপা জিতেছেন ‘দ্যা ফেনোমেনোন’ খ্যাত রোনালদো লুইস নাজারিও। বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের তালিকায় তাকে রাখা হয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ী স্কোয়াডে ছিলেন। তবে তার পায়ের আসল জাদু দর্শকরা দেখতে পায় ১৯৯৮ বিশ্বকাপে।
নয় নম্বর জার্সিধারী এই স্ট্রাইকার গোল করায় ছিলেন দারুণ দক্ষ। মাঠে খুব বেশি পরিশ্রম করতে তাকে দেখা যেত না, কিন্তু প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনের কাছে ওত পেতে থাকতেন গোল করার জন্য। চার গোল আর তিনটি অ্যাসিস্টে ব্রাজিলকে ফাইনালে তোলেন। তবে ফাইনালের আগে দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেল রুমে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যেতে হয় হাসপাতালে। শুরুতে তাকে বাদ দিয়েই মূল একাদশের তালিকা জমা দেন কোচ মারিও জাগালো। তবে ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিট আগে তিনি সুস্থ বোধ করেন এবং ফিফার কাছে অনুরোধ করে একাদশ পরিবর্তন এনে রোনালদোকে মাঠে নামায় ব্রাজিল। এটা নিয়ে তখন বিশ^ মিডিয়ায় তুমুল হইচই হয়।
সেদিন মাঠে রোনালদো ছিলেন ছন্দহীন। তারকায় ভরা ব্রাজিল দলও সেদিন ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। প্যারিসের সেই ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল। রোনালদোর অসুস্থতা নিয়ে অনেক আলোচনা আছে। কেউ অভিযোগ করেন, ফিক্সিং করে ব্রাজিল সেই ম্যাচে ইচ্ছে করে হেরে যায়। আরও একটি গুঞ্জন হচ্ছে, স্পন্সর প্রতিষ্ঠান নাইকির চাপে অসুস্থ থাকার পরেও সেই ম্যাচে মাঠে নামতে হয় রোনালদোকে।
পরের আসরে (২০০২) আবারো তারকায় ভরা দল নিয়ে কোরিয়া-জাপান পৌঁছায় ব্রাজিল। যথারীতি সে বছরও দুর্দান্ত খেলেন এবং ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা এনে দিতে সক্ষম হন রোনালদো। পুরো আসরে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। সেমিফাইনালে তুরস্কের বিরুদ্ধে বুটের ডগার খোঁচায় করা তার গোলটি ছিল বহুল আলোচিত। ফাইনালে অলিভার কানের জার্মানির বিরুদ্ধে করেন জোড়া গোল।
২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে ব্রাজিল বিদায় নিলে রোনালদোর বিশ^কাপ যাত্রা শেষ হয়। ওই বিশ^কাপে ৫ ম্যাচ খেলে তিন গোল করেন। তবে সেবার ওজন বেড়ে যাওয়ায় তাকে নিয়ে সমালোচনা ছিল।
জিনেদিনে জিদান
১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সেদিন নিজের যোগ্যতাতেই হিরো হয়ে উঠেছিলেন ফরাসি প্লেমেকার জিনেদিনে জিদান। দেশের মাটিতে সেই ফাইনালে হেডে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন।
আসরের শুরু থেকেই ফ্রান্স দলের আক্রমণভাগের ভরসা ছিলেন জিদান। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ডেনমার্কের বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ায় দ্বিতীয় রাউন্ডে তাকে ছাড়াই খেলতে হয় ফ্রান্সকে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি ও সেমিতে ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে ফাইনালে উঠলেও জিদান বিশ^কাপে কোনো গোল পাননি। অবশেষে ফাইনালে জোড়া গোল করে সেই আক্ষেপ দূর করেন। হাফ টাইমের আগে দুটি কর্নার কিক থেকে দুটি গোল করেন ‘জিজু’। সেদিন ম্যাচের শুরু থেকেই দাপটের সাথে খেলতে থাকে ফ্রান্স। হাফ টাইমের পর ইমানুয়েল পিটিটের তৃতীয় গোলের সুবাদে ৩-০ ব্যবধানে শিরোপা জেতে ফ্রান্স।
২০০২ বিশ^কাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন জিদান। তাকে ছাড়া ফ্রান্স দল প্রথম ম্যাচেই সেনেগালের কাছে হেরে যায়, দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের সাথে করে গোলশূন্য ড্র। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ার পরেও তৃতীয় ম্যাচে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে জিদানকে মাঠে নামানো হয়; কিন্তু নিজের সেরাটা দিতে পারেননি এই তারকা। যে কারণে আরও একটি পরাজয় নিয়ে ফ্রান্স প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়।
২০০৬ বিশ^কাপে জিদান ফেরেন নিজের চেনা রূপে। ওই বিশ^কাপের আগে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন; কিন্তু আরও কয়েকজন সিনিয়র তারকার অবসরের কারণে দলটি অনেক কষ্টে বিশ^কাপে সুযোগ পায়। তাই কোচের অনুরোধে বিশ^কাপের আগে আবার দলে ফেরেন। বেশির ভাগ অনভিজ্ঞ খেলোয়াড় নিয়ে সেবার ফ্রান্সকে গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় হয়ে নকআউট পর্বে যেতে হয়। তবে পরের তিন রাউন্ডে স্পেন, ব্রাজিল ও পর্তুগালকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। প্রতিটি ম্যাচে দলের হয়ে দারুণ পারফর্ম করেন জিদান। ফাইনালের ৭ম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে নেন। ১-১ গোলে ড্র অবস্থায় সেই ম্যাচের ১১০ মিনিটে ইতালির এক খেলোয়াড়কে মাথা দিয়ে আঘাত করায় লালকার্ড দেখে শেষ হয় জিদানের ফুটবল ক্যারিয়ার। পরে জানা যায়, ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি জিদানের পরিবার নিয়ে অশ্লীল গালি দেওয়ায় তিনি মেজাজ ধরে রাখতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা বঞ্চিত হয় ফ্রান্স।
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার
অনেকের মতে, জার্মান তারকা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ইতিহাসের সেরা ডিফেন্ডার। ১৯৭৪ সালে তার নেতৃত্বেই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে তখনকার পশ্চিম জার্মানি। ফাইনালে ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডসকে দারুণভাবে আটকে রাখেন বেকেনবাওয়ার ও তার সতীর্থ ডিফেন্ডাররা। পুরো আসরে ‘টোটাল ফুটবলের’ জাদু দেখিয়ে শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠেছিল নেদারল্যান্ডস। ডাচদের ঠেকাতে সেদিন বেকেবাওয়ারের দেওয়া ফরমুলা প্রয়োগ করেন কোচ, যার ফলে আসে সফলতা।
বেকেনবাওয়ার ও তার সতীর্থ তিন ডিফেন্ডার ডাচ ফরোয়ার্ডদের এমন কঠিন পাহারায় রাখেন যে, তারা ঠিকমতো খেলতে পারেনি। ২-১ গোলে শিরোপা জেতে জার্মানরা। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচগুলোতেও বেকেনবাওয়ার দারুণভাবে দলের রক্ষণভাগ সামলিয়েছেন।
এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপেও দারুণ খেলেছেন। সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তার হাত ভেঙে যায়। তারপরও মাঠ ছাড়েননি, ভাঙা হাত গলায় ঝুলিয়ে খেলেছেন। টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচটি ইতিহাসে ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে পরিচিত। সেদিন ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় জার্মানি। এর আগে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে রানারআপ হয়েছিল বেকেনবাওয়ারের জার্মানি। সেবার পুরো টুর্নামেন্ট দারুণ খেলেও ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায় তারা। ’৬৬ আসরে সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন বেকেবাওয়ার।
আরও পড়ুন...