বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য

প্রবন্ধ নিবন্ধ মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম এপ্রিল ২০২৬

সময় ও কাল গণনা মানবজাতির আদিম কালের প্রবৃত্তি এবং মানুষের সহজাত সংস্কৃতির অংশ। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে নানা সন গণনার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, এর পেছনেও রয়েছে স্বয়ং আল্লাহ পাকের বিশ্বজনীন নিয়ম। পবিত্র কালামে পাক-এ আল্লাহ ঘোষণা করেন-‘আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই বছর গণনার মাস বারোটি।’ কুরআনের এই শাশ্বত ঘোষণার আলোকেই পৃথিবীর দেশে দেশে সন এবং বছর গণনার রীতি প্রবর্তিত হয়েছে।

আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে আরও ঘোষণা করেছেন-‘আমি প্রত্যেক কওম বা জাতির কাছে আমার রাসূল বা প্রতিনিধি প্রেরণ করেছি সেই কওমের ভাষা দিয়ে, যাতে তারা সহজে বুঝতে পারে, ফলে পৃথিবীর দেশে দেশে নানান ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ আমরা লক্ষ করি। ঠিক তেমনইভাবে পৃথিবীতে দেশে দেশে নানা সনের বিকাশ হয়েছে। তবে কুরআনের মূল নির্দেশের আলোকে দেখা যায়, পৃথিবীর সব সনেরই ১২ মাসে বছর। সৌরমাসভিত্তিক এবং চান্দ্রমাসভিত্তিক গণনার ভিন্নতায় এসব সনের পরিধিগত বেশকমও হয়ে থাকে। 

পৃথিবীর সনের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে আমাদের বাংলা ভাষাভাষীরা গৌরবের অধিকারী। সন গণনার বিশ্বজনীন সংস্কৃতির পথ ধরে আমাদের বাংলাদেশেও নানা যুগে নানা সন প্রবর্তিত হয়েছে। প্রাচীন শক সনের পথ ধরে এখানে প্রবর্তিত হয়েছে সম্বৎ, মঘী সন, নেপাল সম্বৎ, ত্রিপুরাব্দ, লক্ষণ সম্বৎ, পরগনাতি সন, শাহুর সন, হিজরি সন, ঈসায়ি সন, বাংলা সন, জালালী সন ইত্যাদি। এর কোনো কোনোটা সৌরবর্ষে আবার কোনোটা চান্দ্রবর্ষে গণনা করা হয়ে থাকে।

আমাদের বাংলাদেশে এবং পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সন হিসেবে বাংলা সন সর্বত্র পরিচিত। তবে এ সনটি প্রবর্তিত হয়েছে স¤্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে। আমরা জানি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের স্মারক সন হিসেবে হিজরি সনের গণনা শুরু হয়। স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ৯৬৩ হিজরি (১৫৫৬ ঈ.) সনকে শুরুর বছর ধরে ফসলি সন নামে যে সনটি প্রবর্তন করা হয়-পরে তা-ই বাংলাদেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মূলত জমির খাজনা বা ট্যাক্স আদায়ের সুবিধার্থে এ সন প্রবর্তন করা হয়। এর আগে এদেশের দেশীয় সন হিসেবে শকাব্দের প্রচলন থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি সন চালু ছিল। বাংলা সন প্রবর্তনের সময় হিজরি সনকে ভিত্তি বছর ধরেই বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু হিজরি সন চান্দ্রবর্ষেও হিসাবে অর্থাৎ ৩৫৪-৫৫ দিনে বছর এবং বাংলা সন ৩৬৫ দিনে বছর। গণনায় এ দুই সনের মধ্যে বছরে ১১ দিন হিসেবে পার্থক্য গড়ে উঠতে থাকে। এভাবে প্রতি তেত্রিশ হিজরি বছরের সাথে বাংলা সনের প্রায় এক বছর পার্থক্য গড়ে ওঠে। সে হিসেবে আগত ১৪৩৩ বাংলা সনে ১৪৪৭ হিজরি সন হয়। সন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি মনে রাখা দরকার ‘সন’ একটি আরবি শব্দ, ‘সাল’ একটি ফারসি শব্দ এবং ‘তারিখ’ আরবি শব্দ যা পুরোপুরি ইসলামী সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত। মনে রাখতে হবে খ্রিষ্টীয় সন যেহেতু আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম তারিখ থেকে গণনা করা হয়, তাই এ সনটিকে আমরা ঈসায়ি সন ডাকব। বাংলা সনকে বঙ্গাব্দ না বলে ‘বাংলা সন’ ডাকব। বাংলা সন হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে শুরু হলেও এর মাসের নামগুলো নেওয়া হয় শকাব্দ থেকে। এভাবে দেখা যায় সনটি প্রবর্তনে এখানকার প্রধান দুটি ধর্ম অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের একটি প্রভাব সনটির ওপর পড়েছে।

আমরা আগেই বলেছি যে, কৃষকের জমির খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়। ফলে সন প্রবর্তনের সময় থেকেই সাধারণ মানুষ তথা কৃষিজীবী মানুষের সাথে এ সনের পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আজও গ্রামের নিরক্ষর একজন কৃষকের কাছে কেউ যদি আজ কত তারিখ জানতে চায়; তাহলে সে নিরক্ষর কৃষকও হাতের আঙুলে গুনে বাংলা সনের কোন মাসের কত তারিখ তা বলে দেবে। গ্রামের মানুষের কাছে বাংলা সনের পর দ্বিতীয় গুরুত্ব হচ্ছে হিজরি সন বা চান্দ্র মাসের হিসাব। ইংরেজি সন নামে পরিচিত গ্রেগরীয় সন গ্রাম্য মানুষের কাছে আজও ব্যাপক হারে স্থান করে নিতে পারেনি। বাংলা সন প্রবর্তনের বছর থেকেই জমির খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে এ সনের হিসাবে এবং তা এখন পর্যন্ত টিকে আছে। 

প্রাচীন আরবে ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামক যে দুটি উৎসব ছিল এর প্রথমটি ছিল সনকেন্দ্রিক। এ দুটি উৎসবের পরিবর্তেই আল্লাহর রাসূল (সা) হিজরতের পর মুসলমানদের জন্য দুই ঈদ উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা প্রচলিত হয়। পৃথিবীর সকল দেশের মুসলিমদের প্রধান উৎসব হলো এ দুই ঈদ। উপমহাদেশে দীর্ঘদিন মুঘল শাসন থাকায় এখানেও নওরোজ উৎসব হতো। কিন্তু বাংলা সন প্রবর্তনের পর নওরোজ উৎসবের স্থলে স্থান করে নিয়েছে পহেলা বৈশাখের উৎসব। বাংলা সনের ১ম দিনটি অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হয়ে থাকে। বাংলা সনের ইসলামী ঐতিহ্য জানা না থাকার কারণে আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ এবং বাংলা সনকে কেন্দ্র করে এমন অনেক আজগুবি অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছে যার সাথে ইসলামী সংস্কৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলা নববর্ষের সাথে যে ইসলামী সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত সে বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। 

এবার আমরা পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে আবর্তিত সংস্কৃতির কিছু দিক নিয়ে কথা বলব।


১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং

    সুস্থ মনন চর্চা 

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের অংশ এটি। একজন মানুষ যাতে সারা বছর তার নিজের এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য পহেলা বৈশাখে নেওয়া হয় বিশেষ আয়োজন। কৃষক পরিবারের মেয়েরা ঘরের মাটির ভিটা এবং দুয়ার লেপে-পোঁছে সুন্দর করে রাখে। হিন্দু পরিবারে কাদামাটির সাথে গোবর মিশিয়ে লেপা-পোঁছা করা হয় এবং তুলসিগাছের গোড়ায় ফুল রাখা হয়। মুসলমান পরিবারের লোকেরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয় এবং ওজু সেরে নামাজ পড়ার পর কুরআন তেলাওয়াত করে। কৃষক তার কৃষির সরঞ্জাম লাঙ্গল-জোঁয়াল-মই ইত্যাদি ধোয়। গরুকে গোসল করায় এবং ভালো খাবার দেয়। গরুর গোশালা পরিষ্কার করে। ছেলেমেয়ে যাতে নিজ নিজ কাজ যথাসময়ে এবং যথানিয়মে করে সে দিকে অভিভাবকগণ একটু আলাদা নজর রাখে। ধূপ দূরস্ত পরিষ্কার পোশাক পরে অনেকে এদিক-সেদিক বেড়াতে যায়। মিথ্যা বলা বা কাউকে ঠকানো থেকে বিরত থাকে। মানুষ একে অন্যের সাথে আচার আচরণে সতর্কতা অবলম্বন করে যেন বছরের প্রথম দিনে কোনো অনাকাক্সিক্ষত কিছু না হয়।

এ উপলক্ষ্যে কোনো কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান মিছিল, শোভাযাত্রা, বর্ষবরণ ইত্যাদি অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। নিম্নবিত্ত শ্রেণির খেটে খাওয়া মানুষজনও কর্মছুটির সুযোগে এদিন নানা রঙের পোশাক পরে একটু বেড়াতে বেরোয়, মেলায় যায় বা পার্কগুলোতে ভিড় জমায়।


২. খাবারের আয়োজন

পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির একটি দিক হলো, এ দিনের খাওয়াদাওয়া। আমরা যারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করে নববর্ষের এ দিনটি বহুবার গ্রামে পালন করার সুযোগ পেয়েছি-তারা দেখেছি এ দিন প্রত্যেকে তার নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব ভালো খাবারের আয়োজন করে। পারতপক্ষে এদিন আগের দিনের বাসী খাবার যাতে ঘরে না থাকে সেদিকে সকলেই একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখে। এ জন্যই প্রত্যেক পরিবার সাধ্যমতো ভালো খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করে। সকাল সকাল গরম ভাতের সাথে বিশেষ করে নানা জাতের শাক এবং মাছ-গোশত খেয়ে থাকে। কিন্তু গ্রাম থেকে শহরে এসে এখন যা দেখছি তা কিন্তু মোটেও গ্রামের সংস্কৃতি নয়। শহরে বিশেষ করে রাজধানী শহর ঢাকার রমনা অশ্বত্থমূলে বা কোনো কোনো হোটেলে পান্তাভাত খাওয়ার যে দৃশ্য আমরা দেখি তা আমাদের সংস্কৃতি নয়। গ্রামে যেখানে ঐদিন খুব সতর্কতার সাথে পান্তাভাত পরিহার করে চলা হয় সেখানে শহুরে মেকী সংস্কৃতিজীবীরা ঐদিন পান্তাভাত খাওয়ার হেতুটি কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন বুঝা মুশকিল।

পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত খাওয়া কোনো কালেই আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ ছিল না এবং আজও নেই। এটি শহুরে ‘পেঁচক সংস্কৃতির’ একটি উদ্ভট আবিষ্কার।

 

৩. মেলা এবং বৈশাখী মেলা

বিভিন্ন বিষয়কে উপলক্ষ্য করে গ্রামে মেলা বসে থাকে। এসব উপলক্ষ্যের মধ্যে বৎসরের শুরুর দিন হিসেবে পহেলা বৈশাখ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে থাকে যাকে বলা হয় বৈশাখী মেলা। মেলায় বিশেষ করে হাতে তৈরি কুঠির শিল্পের নানা জিনিস যেমন : চেয়ার, টেবিল, চৌপায়া, বেলাইন, পিঁড়ি, রেহেল, লাঠি, ইঁদুর ধরার ফাঁদ, নারিকেল কুড়ানি, গাঁইল, চেগাইট, খড়ম, পাউডি, ডাল ঘুটনি, ঘুড়ির নাটাই, মাটির তৈরি রকমারি জিনিস, খেলনা, মুড়ি, খৈ, মণ্ডা, মিঠাই, জিলাপি, বাতাসা, তিল্লা, ইত্যাদি খাবার দ্রব্য; ঘুড়ি, বাঁশি ইত্যাদি বেচাকেনা হয়। এসব মেলার মাধ্যমে মূলত কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার হয় এবং লোকজ শিল্পা চেতনা জাগ্রত হয়।


৪. হালখাতা

আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম। আবার প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, “সেই লোকই ভালো যার লেনদেন ভালো।” ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার হিসাব রাখে খাতায়। ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেক সময় বাকিতে মালামাল বিক্রয় করতে হয়। কিন্তু এটি সকলেরই জানা যে, পহেলা বৈশাখের আগে যার কাছে যা পাওনা আছে তা পরিশোধ করে দিতে হবে। কেননা, ব্যবসায়ী পুরোনো খাতার বকেয়া নতুন খাতায় তুলতে চান না।

বছরের প্রথম দিন থেকে খোলা হয় নতুন খাতা যাকে বলে হালখাতা। আর এ খাতা খোলার দিনে আয়োজন করা হয় হালখাতা নামক অনুষ্ঠানের। এ ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত লোকজন সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়। যাদের বকেয়া আছে তারা বকেয়া পরিশোধ করেন আর যাদের বকেয়া নেই তারাও কুশল বিনিময় করতে আসেন। এ ধরনের অনুষ্ঠানে আগতদের মিষ্টিমুখ করা হয়।


৫. মিলাদ মাহফিল

বাংলাদেশে বাংলা মাসের হিসেবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চলার কারণে অনেক নতুন ব্যবসায়ী তার ব্যবসা শুরুর দিন হিসেবে বেছে নেয় পহেলা বৈশাখকে। মুসলিম ব্যবসায়ীদের যারা সেদিন নতুন ব্যবসা শুরু করে তারা দোকানে আয়োজন করে মিলাদ মাহফিলের। এ ধরনের অনুষ্ঠানে মিলাদের পর দোয়া ও মোনাজাত করে মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে শেষ হয়।


৬. বইমেলা, বই উপহার

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে গত কয়েক বছর যাবৎ যুক্ত হয়েছে একটি নতুন ধারা আর তা হলো বইমেলা। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে নানা স্থানে বিভিন্ন ক্লাব বা পাঠাগারের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বইমেলার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলা একাডেমি-এসব প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা নববর্ষে প্রিয়জনকে বই উপহার’ দেবার এ বিষয়টিকে প্রমোট করার ফলে ঐদিন বই কেনা এবং প্রিয়জনকে বই উপহার দেওয়া আস্তে আস্তে একটি রীতিতে পরিণত হতে চলেছে।


৭. নববর্ষের শুভেচ্ছা 

নববর্ষ আসার অনেক আগেই দোকান থেকে বিষয়ভিত্তিক শুভেচ্ছা কার্ড সংগ্রহ করে আপনজনের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠানো হয়। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে শুভেচ্ছা বাণী দিয়ে থাকে, যা পত্র-পত্রিকায় এবং রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। আধুনিক কালে মোবাইল ফোনে এসএমসের মাধ্যমে এবং ইন্টারনেটে ই-মেইলের মাধ্যমে ও ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এবং কেউ কেউ সরাসরি ফোন করেও নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়।


৮. জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলোর অনুষ্ঠান

পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঐদিন সরকারি ছুটি থাকে। ফলে লোকেরা ছুটির দিন কাটানোর আমেজ নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আবার রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশনে এবং বেসরকারি চ্যানেলগুলো ঐদিন নববর্ষ উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পত্র-পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশের সুবাদে লেখক-কবি-সাহিত্যিকগণ নানা নিবন্ধ, প্রবন্ধ, কবিতা ইত্যাদি রচনা করে থাকেন। বিশেষ সাময়িকপত্রও প্রকাশিত হয় এ উপলক্ষ্যে। বেতার-টিভিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্যে টকশো, আলোচনা, গান, আবৃত্তি, সরেজমিন প্রতিবেদন ইত্যাদি নানা মাত্রার আয়োজন থাকে।


৯. পুইনাহ

আমাদের প্রাচীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সরকার চলতো কৃষকের দেওয়া খাজনার টাকায়। আজকাল আয়কর, সম্পদ কর, নানা রকম শুল্ক, উন্নয়ন কর, শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদি নানা খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়ে থাকলেও জমির খাজনা কিন্তু এখনো জারি আছে। প্রাচীনকালে যেহেতু মোটামুটি জমির খাজনার ওপরই জমিদার, সুবাহদার, সরকার সবাইকে নির্ভর করতে হতো তাই খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বছরের প্রথম দিন আয়োজন করা হতো পুইনাহ নামক অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে রায়ত বা প্রজা রাজাকে তার প্রাপ্য খাজনা পরিশোধ করে দিত। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের এ পুইনাহ অনুষ্ঠানের রীতিও এখন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের পাওনা আদায়ের জন্যে হালখাতা অনুষ্ঠানের ন্যায় পুইনাহ অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। এ অনুষ্ঠানেও মিষ্টি বিতরণের এবং ক্ষেত্র বিশেষে আরও ভালো খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ইদানীং বাংলাদেশে সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে করমেলা এবং কৃষি ব্যাংকসহ আরও কিছু ব্যাংক তাদের বকেয়া আদায়ে হালখাতা অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য অনুসরণ করছে যা সচেতনতার পরিচয় বহন করে।


১০. গম্ভীরা

আমাদের লোকজ গানের এক বিশেষ ধারা গম্ভীরা। বাংলাদেশের রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় এক ধরনের গান পহেলা বৈশাখে এবং সারা বৈশাখ মাসজুড়ে গাওয়া হয় তারই নাম গম্ভীরা। বিশেষত রাত্রি বেলায় গাওয়া এ গানে নানা-নাতির চরিত্রে অথবা কোনো কোনো সময় মূল গায়েন এবং কয়েকজন দোহার নিয়ে অংশ নিয়ে থাকে। সারা বছরের ভালো কাজের প্রশংসা এবং মন্দ কাজের সমালোচনা অর্থাৎ সামাজিক আত্মসমালোচনার এক সুন্দর অনুষ্ঠান এটি। তা কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরও হতে পারে বা কোনো পরিবার বা প্রতিষ্ঠানেরও হতে পারে। অনেক সময় শাসকদের মন্দ কাজের সমালোচনা করার কারণে গম্ভীরা শিল্পীরা হেনস্তার শিকারও হয়ে থাকেন। কিন্তু একটি আত্মসচেতন জাতি হিসাবে নিজেদের গড়ে তোলার লক্ষ্যে গম্ভীরা গান সারাদেশেই প্রচলন হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে গোটা জাতি তার আত্মসমালোচনা করতে পারবে যা হবে সুস্থ জাতি গঠনে সহায়ক।


১১. বলীখেলা

শৌর্য-বীর্য বা শক্তিমত্তা পরীক্ষার জন্য কুস্তিখেলা একটি প্রাচীন সংস্কৃতি। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ খেলা আছে। আমাদের দেশেও কুস্তি খেলা হয়। কিন্তু পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে একধরনের কুস্তি খেলা হয় যাকে বলে বলীখেলা। প্রধানত বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে এটি হয়ে থাকলেও খেলাটি সারা বৈশাখ মাসের যেকোনো দিনও হতে পারে। চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে আয়োজিত এ বলী খেলা পরবর্তীতে ‘জব্বারের বলীখেলা’ নামে নামকরণ হয়। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে এ খেলাও জাতীয় পর্যায়ে একটি আলোড়ন তুলে থাকে। এ ছাড়াও পহেলা বৈশাখে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডি, চারঘর‌্যা, ছি ইত্যাদি খেলাও হয়ে থাকে।


১২. মইদৌড় ও লাঙল দৌড়

গরু দিয়ে হাল চাষ করা কৃষকের কাজ। কৃষিভিত্তিক সমাজে তাই গরু এবং কৃষকের মধ্যে রয়েছে একটি সখ্যতা। আর এর ওপর ভিত্তি করেই কৃষিভিত্তিক কৌমে গড়ে উঠেছে এক ধরনের খেলা, যার মাধ্যমে কৃষক তার লাঙল ও মই নিয়ে অংশ নেয়। একজন ভালো কৃষক ভালো হাল চাষ করবে এটাই স্বাভাবিক। আবার জমি চাষ করার পর জমিতে মই দেওয়াও একটি কাজ। এই চাষ করা এবং মই দেওয়ার দক্ষতা কে কতটা রপ্ত করল তারও একটা প্রতিযোগিতা থাকলে কৃষিভিত্তিক সমাজের চাষারা চাষাবাদে আরও দক্ষ হবে। এ আশাকে সামনে রেখেই মইদৌড় এবং হালদৌড়ের প্রবর্তন। একজোড়া গরুকে সুন্দর করে সাজিয়ে লাঙল বা মইজুড়ে দিয়ে লাঙল দৌড় এবং মই দৌড় খেলা হয়ে থাকে। এটি পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলার পার্শ্ববর্তী কোনো মাঠে বা বৈশাখ মাসের অন্য কোনো দিন কোনো বড় জমিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 

চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কোনো কোনো অংশ পহেলা বৈশাখে বৈশাবী উৎসব নামক একটি অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে থাকে।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অধিবাসী হিসেবে আমরা এখন আমাদের আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিকে জানা ও চর্চা করা দরকার। বাংলা সন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে জাগরণের এক মন্ত্র। একে নিয়ে ইদানীং ষড়যন্ত্র চলছে। কতিপয় লোক নববর্ষ পালনের নামে এমন সব উদ্ভট জীব-জন্তুর ছবি নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে যা আমাদের দেশের সংস্কৃতির কোনো পরিচয় বহন করে না। এগুলো সম্বন্ধে আমাদের আরও জানতে হবে এবং সজাগ সতর্ক হতে হবে। সরকারের উচিত হবে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে ভালো অনুষ্ঠানগুলো পালনে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে যারা ভালো করে, ভালো অবদান রাখে তাদেরকে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করা যায়। বাংলাদেশে জমির খাজনা বাংলা মাসের হিসাবে পরিশোধ করার রেওয়াজ সন প্রবর্তনের সময় থেকেই চালু আছে।

গত সরকারের আমলে ব্যাংকের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ভিনদেশি সনের হিসাবে খাজনা আদায়ের পদক্ষেপ নেওয়ায় বাঙালির জাতীয়তার পরিচয়বাহী একটি সংস্কৃতির অপমৃত্যু ঘটতে চলেছে যা খুবই দুঃখজনক। অন্যদিকে জমির খাজনা আদায়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে অবস্থিত তহসিল অফিসের নাম পরিবর্তন এবং তহসিলদারের পদবি পরিবর্তন আমাদের সনকেন্দ্রিক ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটিও পুনর্বিবেচনার অবকাশ রাখে। এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ হতে হবে আরও সতর্ক এবং আরও ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ