বাংলাদেশে ঈদ সংস্কৃতি

ফিচার মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম মার্চ ২০২৬

আমাদের প্রিয় দেশ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধ শতাব্দী পার হয়েছে আরও চার বছর আগে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। আমাদের ঈদ সংস্কৃতির ইতিহাস অনেক পুরোনো। আজ আমি তোমাদের সে পুরোনো হিরন্ময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথাই বলব।

ইতিহাস শব্দটি সংস্কৃত ইতিহঃ শব্দ থেকে সৃষ্ট। যার অর্থ হলো, ইতি বা কোনো কিছু শেষ হয়ে যাওয়া। আর ঐতিহ্য হলো, পরষ্পরাগত ধারা। ঐতিহ্য আলোচনা করতে গেলে আমাদের নির্ভর করতে হয় ইতিহাসের ওপর।

আমরা জানি, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ৬২২ ঈসায়ি সালে পবিত্র মক্কা নগরী থেকে মদীনায় হিজরত করার পরের বছর ৬২৩ সালে সেখানে প্রচলিত ‘মিহিরজান’ এবং ‘নৌরোজ’ উৎসবের পরিবর্তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নামে দুটি ঈদ উদ্যাপনের নির্দেশ দেন। সেই থেকেই ঈদ উৎসব পালন শুরু।

বাংলাদেশে মুসলিমদের আগমন সপ্তম শতাব্দী থেকে। মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ের রীতিনীতি ইসলামের আলোকেই পালন করতে হয়। নবী পাক (সা)-এর সময় থেকেই মুসলিমরা বৎসরে দুই ঈদ পালন করে আসছে। ফলে এদেশে মুসলিমদের আগমনের সময় থেকেই বৎসরে দুটি ঈদ পালন করা এখানকার মুসলিমদের মৌলিক ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এভাবেই ঈদ আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

আমরা জানি, ঈদ এমন একটি উৎসব যেটি সবাইকে নিয়ে পালন করা হয়। ঈদের নামাজ আদায় করার মাঠকে বলে ঈদগাহ। ১২০৪ ঈসায়ী সনে মোহাম্মদ বখতিয়ার কর্তৃক বঙ্গজয়ের পর এ দেশে মুসলিম রাজ্য ও শাসন প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত হয়। বখতিয়ার ছিলেন দিল্লি­র সুলতান মুয়িজ-উদ-দুনিয়া ওয়াদদীন আবুল মুজাফফর বিন সামের একজন সেনাপতি। মোহাম্মদ বখতিয়ার কর্তৃক ১২০৪ সালে বাংলার তৎকালীন রাজধানী গৌড় অধিকৃত হয়। বখতিয়ারের গৌড় বিজয়ের স্মারকে সুলতান মুয়িজ-উদ-দুনিয়া ওয়াদদীন আবুল মুজাফফর বিন সাম একটি স্মারক মুদ্রা প্রবর্তন করেন। মুদ্রাটিতে ৬০১ হিজরি সনের ১৯ রমজান উল্লে­খ রয়েছে। এতে বোঝা যায় বখতিয়ারের বঙ্গবিজয় ছিল রমজান মাসে আর বিজয়ের দশ দিনের মাথায় বাংলাদেশে প্রথম রাজকীয়ভাবে ঈদ উদ্যাপিত হয়। এভাবে আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এদেশে প্রথম ঈদ উদ্যাপনের কাল নির্ণয় করতে পারি ৬০১ হিজরি সনে বা ঈসায়ী ১২০৪ সালে।

মুসলিম বিজয়ের চল্লিশ বছর পর ৬৪১ হিজরি সালে (১২৪৩ ঈ.) মিনহাজ-ই-সিরাজ আফিফ নামক প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ নামক একটি ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। সেটিতে মোহাম্মদ বখতিয়ারের বাংলা জয়ের কথাসহ সমকালীন ইতিহাস লেখা হয়েছে। সে ইতিহাসগ্রন্থে সুলতানগণ যে ঈদ উৎসব পালন করতেন এর একাধিক উল্লে­খ রয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম খণ্ডে ‘উৎসবাদী ও রীতিনীতি’ অধ্যায়ে সুলতানি আমলে ঈদ পালন সংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকটি ঘটনার উল্লে­খ রয়েছে। সে সময় রমজান, ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আজহা, ইত্যাদি উপলক্ষ্যে জেল থেকে বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ঐ সময়ে সুলতানগণ ‘রমজান মাসে দৈনন্দিন ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করতেন এবং এ উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রচারক নিযুক্ত করতেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১২০৪ থেকে ১৩৩৮ পর্যন্ত আমাদের এ দেশটি দিল্লির মুসলিম সালতানাতের অধীনে শাসিত হতো যাকে বলা হতো সুলতানি আমল। সুলতান নিজে ঈদ অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে সে সময় থেকেই রাজকীয়ভাবে ঈদ উদ্যাপনের তথ্য পাওয়া যায়।

১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত সমান ২০০ বছর সময়কালকে বলা হয় বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল। বাংলার সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রমুখের হাত ধরে বাংলা অঞ্চল দিল্লির অধীনতা থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেন। সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোকে একত্রিত করে গোটা বাংলাদেশের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং তাঁর উপাধি গ্রহণ করেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ শাহ ই বাঙ্গালা। এ সময়কালের সুলতানগণ রাজকীয়ভাবে ঈদ উদ্যাপন করতেন এবং সে সময় দেশে বিভিন্ন স্থানে মসজিদ স্থাপনের পাশাপাশি ঈদগাহ স্থাপনের ভৌত কাঠামো গড়ে ওঠে। 

স্বাধীন সুলতানি বাংলার সময়কালের ইলিয়াসশাহী বংশের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময়ে (১৪৩৫-১৪৫৯) তাঁহার বিচক্ষণ সেনাপতি ছিলেন ‘খান উল আযম উলুগ খান, খান ই জাহান’ (১৩৬৯-১৪৫৯) যিনি খান জাহান আলী (রহ) নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর সময়ে স্থাপিত একটি ঈদগাহর কথা ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। ড. মোহর আলী রচিত ও ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত ইতিহাসগ্রন্থ History of the Muslims of Bengal Vol. I A. ও অ তে খুলনা জেলার বাগেরহাটের সর্বপশ্চিমে খান জাহানের কিছু কীর্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে একটি ঈদগাহের কথা উল্লেখ করেন। আমার গবেষণামতে এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্যে এটিই বাংলাদেশের প্রথম ঈদগাহ। ড. মোহর আলী শুভদিয়া নামক একটি গ্রামের কিছু প্রত্নকীর্তির বর্ণনা দিয়ে এর কিছু দূরে এ ঈদগাহটির অবস্থান নির্দেশ করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে নিজে এলাকায় ভ্রমণ করে এসব তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর বর্ণনামতে, “About a furlong to the north, in the same village, lie the ruins of an `Id-gah, also erected at the instance of the same Khan Jahan. The `Id-gah’ is, however completely in ruins and overed by trees and bushes.” এ অংশটুকু পড়তে একটু কঠিন মনে হলেও এ লেখা পড়ে তোমরা জানতে পারলে বাংলাদেশের প্রথম ঈদগাহটি কোথায় ছিল?

মোগল আমলে (১৫২৬-১৭০৭) বাংলাদেশে বহু ঈদগাহ স্থাপিত হয়। এর মধ্যে প্রথম ঈদগাহটি হলো বর্তমানে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ নামে পরিচিত ঈদগাহটি। বাংলাদেশে একমাত্র কিশোরগঞ্জেই ঈদগাহ পরগনা নামে ভূমির পরিমাপ ও এলাকা বিভাজনে ‘পরগনার’ সন্ধান পাওয়া যায়।

মোগল আমলে কামানের আওয়াজ বা তোপ দাগিয়ে রমজানের চাঁদকে এবং ঈদ উৎসবকে বরণ করে নেওয়ার কথা ১৬০৮ থেকে ১৬১৩ সময়কালে সেনাপতি মির্জা নাথান রচিত ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ নামক একটি ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ আছে। এ রীতি এখনো শোলাকিয়া ঈদগাহটিতে পালন করা হয়। কামানের স্থলে পরবর্তীতে বন্দুক এবং এখন রাইফেলের ফাঁকা গুলির আওয়াজ দিয়ে ঈদের নামাজের জামায়াত শুরু সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বহু পূর্ব থেকে চলে আসা এ ঈদগাহ এলাকার জমিজমা ১৯৫০ সালে ঈসাখানের ১৩ তম অধস্থন হয়বৎনগরের দেওয়ান মান্নান দাদ খান জনসাধারণের জন্য ওয়াকফ করে দেন।

দিল্লির স¤্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ পর্যন্ত ঢাকার সুবাহদান ছিলেন। তাঁর সময়ে ঢাকায় রাজকীয় ঈদগাহ নির্মিত হয়। ধানমন্ডি এলাকায় ১০৫০ হিজরি তথা ১৬৪০ ঈসায়ী সালে স্থাপিত সে ঈদগাহটি আজও চালু আছে। তিনি তাঁর মীর ই ইমারত বা চিপ ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাসেম আত তাবা তাবাই আস সিমনানিকে দিয়ে এ ঈদগাহটি নির্মাণ করান। মোগল আমল পরবর্তী কোম্পানি আমলে (১৭৬৩-১৮৫৭) ঢাকার নায়েব নাজিমগণ এ ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন। এখনো এ ঈদগাহে দুই ঈদের নামাজ আদায় হয়ে থাকে।

ঢাকার মোগল সুবাহদার শায়েস্তা খানের সময় তাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খান প্রধান সেনাপতি, মনোযার খান দ্বিতীয় সেনাপতি এবং হায়বৎখান তৃতীয় সেনাপতি হিসেবে ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামের মগদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা ও বিজয় করে এর নামকরণ করে ইসলামাবাদ। সে সময় মগদের দুর্গ দখল করে সে দুর্গের ভেতর মসজিদ স্থাপন করা হয় যেটি আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ নামে পরিচিত। সে মসজিদ চত্বরেও সে সময় থেকে ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থ অবস্থায় সিংহাসন নিয়ে ভ্রাতৃদ্বন্দ্বে জড়িয়ে শাহসুজা ১৬৫৯ সালে ঢাকা ত্যাগ করে আরাকানে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের যে স্থানটিতে অবস্থান করে ঈদ উদ্যাপন করেছিলেন, সে এলাকাটি ঐ সময় থেকেই ঈদগাহ নামে পরিচিত হয়। 

শাহ সুজার ভাই সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের সময় সিলেটে তাঁর নিযুক্ত মোগল ফৌজদার ফরহাদ খাঁ ১৭০০ সালের দিকে একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন যেটি বর্তমানে সিলেট কেন্দ্রীয় শাহী ঈদগাহ নামে পরিচিত।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে এবং ইংরেজ আমলে দেশে ইসলামী জাগরণ স্তিমিত হয়ে আসে। সে সময় নতুন ঈদগাহ খুব একটা স্থাপিত হয়নি। পাকিস্তান আমলে সারা দেশে ব্যাপকভাবে ঈদগাহ স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই ঈদগাহ স্থাপিত হয়েছে। 

১৯৮১-৮২ সালের দিকে হাইকোর্ট সংলগ্ন এলাকার ঝোপঝাড় সাফ করে একটি ঈদগাহ তৈরির উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। ১৯৮৫ সালে এখানকার একটি পরিত্যক্ত পুকুর ভরাট করে একটি মাঠে রূপ দেওয়া হয় এবং সীমিত পরিসরে ঈদ জামায়াত শুরু হয়। ১৯৮৮-৮৯ সালে এ মাঠটিকেই জাতীয় ঈদগাহ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় ঈদগাহতে সর্বসাধারণের সাথে দেশের সরকার প্রধান ও আমলাগণ অংশগ্রহণ করে থাকেন।

ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে শোলাকিয়া ঈদগাহসহ দেশের অনেক স্থানেই ঈদ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি ঈদ ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সকল পত্র-পত্রিকা ঈদসংখ্যা প্রকাশ, বেতার টেলিভিশনে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালা এগুলো এখন ঈদ সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ লেখায় স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশের ঈদ সংস্কৃতির ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি এই লেখা থেকে আমাদের ঈদ সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সামান্য কিছু হলেও তোমরা জানতে পারবে। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ