আতঙ্কের কিসান উপত্যকা

গল্প আতাউল হক মাসুম মে ২০২৬

ছুটির পর স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় আহমেদ দেখল, ওর ছোট কাকা আমের কয়েকজন বন্ধুসহ ওদের স্কুলের দিকেই আসছেন। ওকে দেখে ছোট কাকা থামলেন। সালাম দিয়ে আহমেদ জিজ্ঞেস করল, ‘ছোট কাকা, কোথায় যাচ্ছেন?’

‘তোমাদের স্কুলে আমাদের একটা মিটিং আছে।’

‘আমিও যাব আপনার সাথে।’

‘না-না, আমাদের অনেক দেরি হবে, তুমি বন্ধুদের সাথে বাড়ি চলে যাও।’ 

আহমেদের ছোট কাকা আমের আবদুল্লাহ হামাসের একজন কমান্ডার। প্রয়োজনের তাগিদে এবং নিরাপত্তার খাতিরে বেশির ভাগ সময় তাকে বাড়ির বাইরেই থাকতে হয়। 

বেথলেহেম শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম তীরে অবস্থিত কিসান গ্রামের অদূরে আল ফারুক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র আহমেদ আবদুল্লাহ। ওদের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ইহুদিদের একটি সিনাগগ পাওয়া যায়। সিনাগগ ইহুদিদের উপাসনালয় হলেও এই এলাকায় যাবতীয় সামরিক তৎপরতা এখান থেকেই পরিচালনা করা হয়। কয়েক বছর যাবৎ এই এলাকায় জোরপূর্বক বসতি স্থাপন করে নিজেদের ইচ্ছেমতো সীমানা নির্ধারণ করেছে ইসরাইলিরা। জমির প্রকৃত মালিকেরা আদালতের দ্বারস্থ হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। উলটো তাদেরই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। কেউ বেশি আপত্তি বা প্রতিবাদ জানালে তার ঠাঁই হয় বন্দিখানায়। বিচারবহির্ভূত কাউকে হত্যা করলেও কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না ইসরাইলি সৈন্যদের; বরং জায়নবাদী সরকার কর্তৃক তারা আরও পুরস্কৃত হয়।

সিনাগগের কাছাকাছি আসতেই আহমেদরা দেখতে পেল দুটি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ট্রাক আল ফারুক স্কুলের দিকে যাচ্ছে। চমকে উঠল আহমেদ। এতক্ষণে তো হামাস যোদ্ধাদের মিটিং শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। ওর এখন কী করা উচিত! দৌড়ে গেলেও তো গাড়ির আগে পৌঁছাতে পারবে না। 

আহমেদের বন্ধু উমায়ের খুবই সাহসী। সিনাগগের সামনে প্রহরারত একজন ইসরাইলি সেনাকে সে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘সেনাবাহিনীর গাড়ি কোথায় যাচ্ছে?’

ইসরাইলিরা নিজেদের মধ্যে হিব্রু ভাষায় কথা বললেও ফিলিস্তিনিদের সাথে আরবি ভাষায় কথা বলে। সৈন্যটি উমায়েরের কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে চলে যেতে বলল। উমায়েরও নাছোড়বান্দা, সে আরেকবার প্রশ্ন করতেই সৈন্যটি আচানক তাকে চড় মেরে বসল। আহমেদ উমায়েরকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাড়ির দিকে নিয়ে চলল। সে জানে আর একটা কথা বললেই অশ্লীল গালি শুনতে হবে। গালির চেয়ে চড় হজম করা নিশ্চয়ই সহজ। নিরস্ত্র এই অবস্থায় তাদের আর কীই-বা করার আছে! তা ছাড়া আহমেদের আরেক বন্ধু জুবায়েরের সাথে একদিন কথা কাটাকাটি হয়েছিল ইসরাইলি সৈন্যদের। পরদিন তারা গিয়ে জুবায়েরদের ভেড়ার খামার থেকে কয়েকটা ভেড়া ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

সেদিন আহমেদের কাকা আমেরসহ চারজন হামাস যোদ্ধাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় ইসরাইলি সেনারা। গ্রেফতারের আগে তারা পরিকল্পিতভাবে একটি টেবিলে বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও হামাসের বিভিন্ন সাংগঠনিক বই রেখে ফটোসেশন করে ‘হামাস জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে আমেরিকার সিএনএন টিভিতে পাঠিয়ে দেয়। হামাস যোদ্ধারা শুরুতে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও অস্ত্রের অপ্রতুলতায় তারা হার মানতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে তাদের সিনাগগ সংলগ্ন সেনাঘাঁটিতে নিয়ে যায় ইসরাইলি সেনারা। 

রাতের বেলা। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও আহমেদের চোখে ঘুম নেই। একটা দৃঢ়সংকল্প করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল সে। সে জানে শোকেসের গোপন ড্রয়ারে ছোট কাকার প্রিয় একটা রিভলভার রাখা আছে। বই খুঁজতে গিয়ে একদিন দেখেছিল। দু-রাকাত নফল নামাজ পড়ে রিভলভার জ্যাকেটে পুরে সন্তর্পণে বের হলো সে। গ্রামের দিকে নিশুতি রাত হলেও বড় রাস্তায় কিছুক্ষণ পরপর হঠাৎ দু-একটা গাড়ি তিরবেগে একদিক থেকে এসে আরেক দিকে ছুটে চলেছে।

পুলিশের টহল গাড়ি ও বড় বড় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে ইঁদুর-বিড়াল খেলে অবশেষে ইসরাইলি সেনাঘাঁটিতে এসে পৌঁছাল আহমেদ। পেছনের ঝোপঝাড়ের দিকের দেওয়াল টপকে বিনা বাধায় ভেতরে প্রবেশ করল সে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অন্ধকার গা সওয়া হওয়ার পর ভবনের দিকে এগোতেই হঠাৎ কোথা থেকে একটা মাঝারি আকৃতির কুকুর ছুটে এলো। শেষ মুহূর্তে আহমেদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল প্রশিক্ষিত শিকারি কুকুরটি, কিন্তু তার ঘেউ শব্দ করার আগেই পরপর তিনবার ট্রিগার টিপল আহমেদ। সাইলেন্সারযুক্ত রিভলভারের নিঃশব্দ গুলি গিয়ে বিদ্ধ হলো কুকুরটির মাথা ও শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল কুকুরটি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আর একটু এগিয়ে আহমেদ দেখল, একজন প্রহরী চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। আচমকা আহমেদকে দেখতে পেয়েই স্টেনগান হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল লোকটি, কিন্তু তার আগেই আহমেদ গুলি করে বসল। অভ্যস্ত না হওয়ায় প্রথম গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও পরের দুটি গুলিতে লোকটিকে ধরাশায়ী করে ফেলল সে। 

পা টিপে টিপে ভেতরে প্রবেশ করে দেখল প্রথম তিনটি রুমই বাইরে থেকে লক করা। শেষের রুম থেকে মিটিমিটি আলো আসছে অর্থাৎ সেখানে লোক আছে। আহমেদ এক হাতে রিভলবার উদ্যত রেখে আরেক হাত দিয়ে ভেজানো দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে তাকাতেই বিস্ময়াভিভূত হয়ে দেখল, টেবিলে কম্পিউটারের সামনে একজন লোক বসে হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

লোকটি ছিল দুর্ধর্ষ ইহুদি গোয়েন্দা আইজ্যাক। ক্রুর হেসে সে বলল, ‘তোমার সাহসের প্রশংসা করতে হয় খোকা! নাম কী তোমার?’

গম্ভীর কঠিন স্বরে আহমেদ বলল, ‘আমার ছোট কাকাকে কোথায় আটকে রেখেছ বলো, না হলে গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো।’ 

‘আফসোস হচ্ছে বাছা! কিন্তু তোমার রিভলভারে আর কোনো গুলি অবশিষ্ট নেই। সিসি টিভিতে আমি দেখেছি প্রথমে তিনটি গুলি খরচ করেছ আমাদের কুকুরকে মারতে, তারপর নিরাপত্তাকর্মীকে মারতে বাকি তিনটা। ইচ্ছে করলে তখনই তোমাকে শেষ করে দিতে পারতাম, কিন্তু কেন যেন তোমাকে মারতে ইচ্ছে করছে না। আরবদের মধ্যে তোমার মতো সাহসী কিশোর দ্বিতীয়টি আমি দেখিনি।’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল আইজ্যাক।

এই প্রথম ভয় পেল আহমেদ। একটু আগেই তার হাতের যে রিভলভার দিয়ে একটা কুকুর ও একজন মানুষকে হত্যা করেছে, তা এখন খেলনার মতো মনে হচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ্য করল, এতক্ষণ পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ মনে হলেও এখন আশেপাশে মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে। 

আইজ্যাক চেয়ার থেকে উঠে এসে আহমেদের হাত থেকে রিভলভার নিয়ে খেলাচ্ছলে তার কপালে নল রেখে মুখে ‘বুম’ বলে ট্রিগার টিপল। আহমেদ চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু কোনো গুলি বের হলো না। ভয়ে এবং লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে। কেন যে সে কুকুরকে মারতে তিনটা গুলি নষ্ট করল ভেবে পাচ্ছে না। কিন্তু এখন আর কী! মৃত্যুর জন্য সে প্রস্তুত হয়েই এখানে এসেছিল, কিন্তু কাকার জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল। 

আইজ্যাক একজন কর্মীকে আহমেদের কাকা আমেরকে নিয়ে আসতে বলল। পিছমোড়া করে হাত বাঁধা অবস্থায় আমের এসে আহমেদকে দেখে হতবাক হয়ে গেল। বলার কোনো ভাষাই খুঁজে পেল না সে।

আইজ্যাক হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার ভাতিজা তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছে। আমার গোটা সামরিক জীবনে এমন ঘটনা এই প্রথম। কী করা যায় বলো তো শ্যারন, দুজনকেই ছেড়ে দেবো নাকি দুজনকেই পরপারে পাঠিয়ে দেবো?’ সহকর্মীর উদ্দেশ্যে কথাটা বলে পুনরায় হাসতে লাগল ইহুদি জেনারেল। 

‘আমাকে যা খুশি করো, কিন্তু এই অবুঝ কিশোরকে ছেড়ে দাও, জেনারেল বরিস। আমাদের মাটি দখল করার শাস্তি তোমাদের একদিন না একদিন পেতেই হবে।’ চেঁচিয়ে বলল আমের।

‘তুমি না বললেও তোমার ভাতিজাকে আমি ছেড়ে দিতাম। প্রতিপক্ষ সমান না হলে আমি খেলে আনন্দ পাই না। তোমার দুরন্ত সাহসী ভাতিজা বড় হয়ে হামাসে যোগ দিয়ে তারপর তো আমাদের হাতেই মরবে। আজ ওকে আমি ছেড়ে দেবো কিন্তু ওর অপরাধে মরতে হবে তোকে।’ বলেই পকেট থেকে মেশিন রিভলভার বের করে আমেরের কপাল লক্ষ্য করে গুলি করল জেনারেল। শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল হামাস কমান্ডার আমের আবদুল্লাহ। 

আহমেদ ছুটে গিয়ে কাকার দেহ আঁকড়ে ধরল। আর বারবার বলতে লাগল, ‘আমার ভুলের কারণে আপনাকে প্রাণ দিতে হলো ছোট কাকা, আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন।’

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ