আসহাবে সুফফা হযরত আবু হুরায়রা (রা)

গল্প সাইদুল ইসলাম মে ২০২৬

ইসলামের ইতিহাসে আসহাবে সুফফা এক অনন্য অধ্যায়। তারা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সান্নিধ্যে থাকা দরিদ্র সাহাবীগণ, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছিলেন। এই সম্মানিত দলের অন্যতম বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন হযরত আবু হুরায়রা (রা), যিনি সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে নবুয়ত লাভ করেন এবং ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের পর মসজিদে নববীর পেছনে একটি ছায়াময় স্থান তৈরি হয়, যা ‘সুফফা’ নামে পরিচিত। এখানেই আশ্রয় নিতেন সেইসব দরিদ্র মুহাজির সাহাবীগণ, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ও সম্পদ ত্যাগ করে মদিনায় এসেছিলেন। তাদের সংখ্যা প্রায় সত্তরেরও বেশি ছিল। 

হযরত আবু হুরায়রা (রা) ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানপিপাসু সাহাবী। তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ, ধৈর্য ও জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি সর্বদা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করতেন, যেন বেশি বেশি হাদিস শিখতে পারেন। জীবিকা অর্জনের চিন্তার চেয়ে তিনি জ্ঞান অর্জনকেই অধিক গুরুত্ব দিতেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে-ক্ষুধার তীব্রতায় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন, তবুও জ্ঞানচর্চায় তাঁর আন্তরিকতা ও চেষ্টা কমেনি।

একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে নিজের ভুলে যাওয়ার দুর্বলতার কথা প্রকাশ করে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার কাছ থেকে অনেক হাদিস শুনি, কিন্তু ভুলে যাই।”

তখন রাসূল (সা) তাঁকে চাদর মেলে ধরতে বলেন এবং তা বুকের সঙ্গে চেপে ধরতে নির্দেশ দেন। এর পর থেকে তিনি আর কোনো হাদিস ভুলে যাননি। এটি তাঁর জীবনের এক বিশেষ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর জীবনের আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তিনি যখন যুবক বয়সে ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখনও তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেননি। মাকে ইসলামের পথে আহ্বান করতে গিয়ে তিনি অনেক তিরস্কার ও কষ্ট সহ্য করেছেন। তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি; বরং তিনি সর্বদা মায়ের প্রতি সদয় ছিলেন। তিনি মায়ের হেদায়াতের জন্য উদ্বিগ্ন থাকতেন। কারণ হযরত আবু হুরায়রা (রা) মাকে অনেক ভালোবাসতেন এবং তিনি জানতেন মাকে কষ্ট দেওয়া খুবই খারাপ কাজ। মাকে ইসলাম গ্রহণ করাতে না পারায় সার্বক্ষণিক পেরেশানিতে থাকতেন। অবশেষে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। রাসূল (সা) দোয়া করলেন। আল্লাহর রহমতে তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করলেন। এটি তাঁর জীবনের বড় এক প্রাপ্তি ছিল।


যেহেতু হযরত আবু হুরায়রা (রা) ছিলেন আসহাবে সুফফার একজন সদস্য, তাই সব সময় তিনি খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটাতেন। দারিদ্র্য তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হলেও মায়ের প্রতি ভালোবাসা কখনো কমেনি। একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে দুটি খেজুর দিলেন। তিনি একটি খেজুর খেলেন, আরেকটি রেখে দিলেন। এ দৃশ্য দেখে রাসূল (সা) বললেন, একটি খেজুর রেখে দিয়েছ কেন? হযরত আবু হুরায়রা (রা) জানালেন, বাড়িতে মা আছে, মায়ের জন্য রেখে দিয়েছেন। তখন রাসূল (সা) বললেন, “দুটোই তুমি খাও, আমি তোমাকে আরও দেবো, যা তুমি তোমার মাকে দেবে।” এ ঘটনা তাঁর মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) যখনই বাইরে যেতেন, তখনই প্রথমে এসে মায়ের দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, আম্মাজান! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। তারপর তিনি বলতেন, শৈশবে আপনি যেভাবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, আল্লাহ যেন আপনাকে সেভাবেই রহম করেন।” মা জবাবে বলতেন, “প্রিয় পুত্র! আমার এ বৃদ্ধ বয়সে তুমি যে ধরনের সুন্দর আচরণ করেছ এবং আরাম দিয়েছ আল্লাহও যেন তোমার প্রতি সে ধরনের রহমত দান করেন।” তাদের এই পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) মায়ের মর্যাদা সম্পর্কিত বহু গুরুত্বপূর্ণ হাদিসও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক লোক রাসূল (সা)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার? নবীজি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? নবীজি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? নবীজি বললেন, তোমার মা। সে বলল তারপর কে? নবীজি বললেন, তারপর তোমার বাবা। (সহিহ বুখারি : ৫৯৭১)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিস হলো-রাসূল (সা) বলেন, “ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি।” জিজ্ঞেস করা হলো, সে কে, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, “যে তার পিতা-মাতাকে-তাদের একজন বা উভয়কে বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।”

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস হলো-মুহাম্মাদ (সা) বলেন, “তিনজনের দোয়া কবুল হয়-মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।”

হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য শিক্ষার উৎস। তাঁর জীবন থেকে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারি-প্রথমত, জ্ঞান অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা; দ্বিতীয়ত, মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা। এই শিক্ষাগুলো একজন মানুষের আদর্শ পথনির্দেশক হতে পারে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ