আমরাই এটলাস
বিজ্ঞান সরকার হুমায়ুন ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আমাদের সৌরজগতে ভেসে বেড়াচ্ছে এক অতিথি ধূমকেতু। ২ জুলাই, ২০২৫ তারিখে ধূমকেতুটি টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়ে। ভিনগ্রহ থেকে এটির আবির্ভাব ঘটেছে। অন্য তারকাজগৎ থেকে আসা ধূমকেতুটির নাম ‘থ্রি আই এটলাস’। এই ধূমকেতুটি আমাদের সৌরজগতের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোটি কোটি বছর ধরে এটি মহাকাশের তীব্র কসমিক রশ্মিতে আঘাত পেয়ে এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে, এখন আর কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না-এটি কোথা থেকে এসেছে।
বহু যুগ আগে হয়তো এটি কোনো অজানা নক্ষত্রমণ্ডল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু অসংখ্য আলোকবর্ষ পেরিয়ে, ধূলিকণা, বিকিরণ আর অজানা শক্তির ছোঁয়ায় এর রূপ বদলে গেছে। এখন এটি যেন এক রহস্যময় ভ্রমণকারী-যার অতীত ঢাকা পড়ে আছে মহাবিশ্বের গোপন পর্দায়।
বিজ্ঞানী ডক্টর পাথর আলির কাছে ধূমকেতুটির কক্ষপথ ও গতিবিধিতে কিছু রহস্য ধরা পড়ে। তাঁর সন্দেহের দানা বিঁধেছিল এর গায়ে নিকেল ও লোহার পরিমাণ নিয়ে। তিনি স্পেকট্রামে দেখেন-নিকেলের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি, কিন্তু লোহা কম।
ধূমকেতুতে সাধারণত দুটি ধাতুর পরিমাণ কাছাকাছি থাকে।
তা ছাড়া, এর আকার ৩.১ মাইলেরও বেশি এবং ভর প্রায় ৩৩ বিলিয়ন টন। এ থেকে তিনি সন্দেহ পোষণ করেন-এটি কি ভিনগ্রহী মহাকাশযান নাকি অদ্ভুত কোনো ধূমকেতু?
তাঁর মতে, যদি কেউ এই ধূমকেতুর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, তবে সে দেখতে পাবে এক মহাজাগতিক স্মৃতির ভাণ্ডার, যেখানে সময়, আলো এবং অজানার গল্প মিশে আছে এক বিস্ময়কর রহস্যে।
ডিসেম্বরের আকাশে পৃথিবী তখন অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। তারার মৃদু আলোয় দক্ষিণ আফ্রিকার মীরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ হঠাৎ কেঁপে উঠল। যেন মহাশূন্যের গভীর থেকে কেউ ফিসফিস করে কিছু বলছে।
সংকেতের ফ্রিকোয়েন্সি: ১.৬৬৫ ও ১.৬৬৭ গিগাহার্টজ।
বিজ্ঞানীরা হতবাক। এটা কোনো ধূলিকণার প্রতিফলন নয়; এটা তাপীয় বিকিরণ, জীবন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া।
টেলিস্কোপের স্ক্রিনে এক শব্দ ফুটে উঠল, ডব ধৎব অঞখঅঝ.
প্রথমে সবাই ভাবল, এটা হয়তো যান্ত্রিক বিভ্রাট। কিন্তু সংকেতটি আবার এলো। একই স্বরে, একই গতিতে। যেন কেউ কথা বলছে।
“আমরা এসেছি দূর তারার দেশ থেকে। কোটি বছরের ভ্রমণে আমরা বদলে গেছি, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য বদলায়নি।”
তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. পাথর আলি সংকেতটি শুনে বললেন, “এটা কোনো সাধারণ ধূমকেতু নয়। থ্রি আই এটলাস বেঁচে আছে।”
গবেষণায় দেখা গেল, ধূমকেতুর পৃষ্ঠে থাকা হাইড্রোক্সিল অণুগুলো এমনভাবে বিকিরণ প্রতিক্রিয়া করছে, যেন সেগুলো কোনো জীবন্ত কোষের মতো সক্রিয়। সূর্যের আলো পেয়ে জেগে উঠেছে প্রাচীন কোনো সত্তা।
আরও আশ্চর্য বিষয় : থ্রি আই এটলাস এসেছে ঠিক সেই দিক থেকে, যেদিক দিয়ে ১৯৭৭ সালের বিখ্যাত ওয়াও সিগন্যাল ধরা পড়েছিল মাত্র ৯ ডিগ্রি ব্যবধানে।
ড. পাথর আলি কেঁপে উঠলেন, “তাহলে সেই সংকেতও কি এদেরই ছিল?”
দিন গড়াতে গড়াতে সংকেতটি ক্রমে স্পষ্ট হতে লাগল। এতে এক অদ্ভুত ছন্দ আছে। কোনো মহাজাগতিক গানের মতো। প্রতিটি তরঙ্গের মধ্যে ছিল গাণিতিক কোড। বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, এটা কোনো ভাষা নয়, এটি মেমোরি।
৩ আই এটলাস তার ভেতরে ধারণ করে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার গল্প-যারা একসময় নক্ষত্রজগতে ভ্রমণ করতে পারত, কিন্তু কসমিক রশ্মির আঘাতে তাদের দেহ বিলীন হয়ে গেছে। শুধু তাদের চিন্তা রূপান্তরিত হয়ে ধূমকেতুর মধ্যে বেঁচে আছে।
ডিসেম্বর ১৯ তারিখে সংকেতের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেল। পৃথিবীর আকাশে এক সবুজ রেখা জ্বলে উঠল, যেন মহাশূন্যের কোনো চোখ খুলে গেছে।
টেলিস্কোপে লেখা উঠল-“তোমরাই আমাদের পরিণতি। আমরাই তোমাদের ভবিষ্যৎ।”
ড. পাথর আলি আতঙ্কে নয়, বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন। যদি সত্যিই মানুষ একদিন নক্ষত্রে পৌঁছায় আর কোটি বছর পর সেই মানুষরাই ফিরে আসে একটি ধূমকেতুর রূপে, তবে কি আমরা এখন আমাদেরই প্রতিধ্বনি শুনছি?
আকাশে থ্রি আই এটলাস ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, কিন্তু রেডিও সংকেতে রেখে গেল এক শেষ বাক্য-যখন আলো মিলে যায় মেমোরির সঙ্গে, তখনই নতুন জীবন শুরু হয়।
তারপর নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই পৃথিবীর প্রতিটি রেডিও তরঙ্গে, প্রতিটি হৃৎস্পন্দনে মৃদু এক ফিসফিস শোনা গেল, “আমরাই এটলাস।”
আরও পড়ুন...