আমার শহীদ ছেলে আহনাফ আহমেদ

জুলাই-গল্প জারতাজ পারভীন আগস্ট ২০২৬

১৩ অক্টোবর ২০০৭ সালে আহনাফের জন্ম। সেদিন আমারও জন্মদিন ছিল। মহান আল্লাহ আমার জন্মদিনে সবচেয়ে দামি উপহারটিই দিয়েছিলেন। মা হওয়ার অনুভূতি আহনাফ হওয়ার পরই জেনেছি। আহনাফ পরিবারের সবার আদর-যত্নে বেড়ে উঠেছিল। ছোট থেকেই সে ছিল অনেক মেধাবী। মাত্র চার বছর বয়সেই কম্পিউটারের ব্যবহার শিখে ফেলেছিল। আহনাফ কখনো বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করত না, কিন্তু যতটুকু সময় পড়ত, তাতেই খুব ভালো ফলাফল করত।

এলাকার সবাই আমার আহনাফকে অনেক ভালোবাসত। ছোট থেকেই সে ছিল খুব ডানপিটে। ওর একমাত্র ভাই আরভীনকে খুব ভালোবাসত। বাইরে কোনো কিছু খেলে তার অর্ধেক আরভীনের জন্য নিয়ে আসত। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধন। আরভীন শুধু তার বড় ভাইকেই হারায়নি, হারিয়েছে তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, খেলার সাথী ও শিক্ষককেও।

আহনাফের স্বপ্ন ছিল ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়ার। আলহামদুলিল্লাহ, সে সেখানে চান্সও পেয়েছিল। তার আরেকটি স্বপ্ন ছিল এইচএসসি পরীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু আমার বাচ্চাটার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

আমাদের ছিল চারজনের ছোট্ট একটি পরিবার। দুই ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা! আহনাফ আমার প্রথম সন্তান হওয়ায় ওকে ঘিরেই ছিল আমার সবচেয়ে বেশি আশা-আকাক্সক্ষা। কিন্তু এক গুলিতেই সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

আহনাফ প্রথম থেকেই চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কলেজ থেকে আন্দোলনে যেত, কিন্তু আমি তা জানতাম না। যেদিন ওর পায়ে রাবার বুলেট লাগে, সেদিন জানতে পারি। এরপর আমি অনেক বাধা দেওয়ার পরও সে আন্দোলনে যেত। তবে সময়মতো বাসায় ফিরত, কোচিংয়ে যেত, নিয়মিত পড়াশোনাও করত। তাই আমি আর কিছু বলতাম না।

৪ আগস্ট সকাল থেকেই আমার কেমন যেন অস্থির লাগছিল। আমার বোন ও ভাগনি আমাকে ফোনে আহনাফকে বাইরে যেতে দিতে নিষেধ করেছিল। বেলা ১টার দিকে আহনাফ ঘুম থেকে উঠে মোবাইল খুঁজতে থাকে। আমি আগেই ওর ফোনটা আমার রুমে রেখে দিয়েছিলাম। ও অনেক রাগ করে বলল, ‘আমার ফোন কোথায়?’ পরে ফোন নিয়ে অনেকক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে। এরপর দুই ভাই মোবাইলে গেম খেলতে গিয়ে ঝগড়া শুরু করে। আমি দুজনকে বকা দিয়ে আলাদা রুমে থাকতে বলি।

বেলা আড়াইটার দিকে আমি আহনাফকে বললাম, ‘বাবা, ভাত দেবো?’ ও বলল, ‘হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি দাও।’ আমি বললাম, ‘এত তাড়াহুড়া কেন? আজ কিন্তু ঘর থেকে নিচেও যাবে না।’ তখন সে শুধু মুচকি হেসে বলল, ‘ভাত খাওয়াও।’

আহনাফ যখন থেকে খেতে শিখেছে, আমার হাতে ছাড়া সাধারণত ভাত খেত না। ১৭ বছর বয়স হলেও আমার হাতেই ভাত খেত। সেদিনও আমি ওকে নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দিয়েছিলাম। কে জানত, এটাই হবে আমার সন্তানের জীবনের শেষ খাওয়া!

বেলা ৩টার দিকে আহনাফ আন্দোলনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। আমি অনেক বাধা দিই, বুঝিয়ে বলি-আজ যেন কোথাও না যায়। কিন্তু কোনো বাধাই সে মানল না। তখন আমি বললাম, ‘দাঁড়াও, আমিও যাব।’ আমি বোরখা আনতে যেতেই সে গেট খুলে বের হয়ে গেল। আমি নিষেধ করলে বলল, ‘আমি নিচে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা আসছে, ওদের সঙ্গে কথা বলে চলে আসব।’

এরপর সে আমাকে বলল, ‘২০টা টাকা দাও।’ আমি রাগ করে বললাম, ‘আমার কাছে কোনো টাকা নেই। তুমি যখন আমার কোনো কথা শুনবে না, তখন আমি তোমাকে কোনো টাকা দেবো না।’ তখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে ফিরে তাকিয়ে বলেছিল, ‘২০ টাকা দিলে না, এটা মনে রাইখো।’ সেই কথাটাই আমার জীবনের শেষ পর্যন্ত মনে রাখার মতো স্মৃতি হয়ে রইল। আজও ভাবি, কেন শেষবারের মতো ২০ টাকাটা দিলাম না!

আহনাফ বের হওয়ার পর আমি ১০-১৫ মিনিট পরপর ওকে ফোন দিচ্ছিলাম। দুইবার কথা হয়েছিল। তখনও সে এলাকায় ছিল। তৃতীয়বার ফোন দিলে বলল, ‘আম্মু, আমি মিরপুর ১০ নম্বরে আছি। টেনশন কোরো না, আমি চলে আসব।’

আহনাফের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে। সে বলেছিল, ‘আম্মু, টেনশন কোরো না। আমি আসতেছি। আম্মু জানো, এখানে কত আর্মির গাড়ি! আমি এসে তোমাকে দেখাব। আমি অনেক ভিডিও করেছি।’

এরপর বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে আমি আবার ফোন দিই। রিং হলেও সে ফোন ধরল না। সাড়ে ৫টায় আবার ফোন দিলাম, তখনও ধরল না। তখন আমার কেমন যেন আশঙ্কা হতে লাগল। আমি ওর বাবাকে ফোন দিলাম। তিনিও বারবার ফোন করলেন, কিন্তু আহনাফ আর ফোন ধরল না।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে কোচিং থেকে ফোন এলো। তারা জানাল, সবাই এসেছে, কিন্তু আহনাফ ও ধ্রুব আসেনি। আমি তখন আশপাশে ওর বন্ধুদের বাসায় খুঁজতে বের হই। পরে যখন মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে রওনা হই, তখন আবার কোচিং থেকে ফোন আসে। তারা জানায়, ধ্রুব এসেছে, কিন্তু আহনাফ আসেনি। ধ্রুবকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, আন্দোলনের মধ্যে তারা আহনাফকে হারিয়ে ফেলেছিল।

এরপর আমরা মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যেতে থাকলে একটি ফোন আসে। বলা হয়, আহনাফকে পাওয়া গেছে। আমাদের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে আমরা আহনাফকে পাইনি। হাসপাতালের লোকজন জানান, আমার আহনাফকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত সেখানে যেতে বলেন। কারণ, ওর ফোন ও আইডি কার্ড কিছুই পাওয়া যায়নি, তাই সে অজ্ঞাতনামা হিসেবে ছিল। পরে আমরা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে আমার আহনাফকে খুঁজে পাই।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শুধু আমার আহনাফের জীবনের আলোই নিভে যায়নি, আমাদের পুরো পরিবারের জীবনও অন্ধকার হয়ে গেছে। খুনি হাসিনার কারণে আমার কলিজার টুকরোর সব স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে। আহনাফ শুধু পড়াশোনায় নয়, সব ক্ষেত্রেই অনেক মেধাবী ছিল। গিটার বাজাতে খুব ভালোবাসত। ইউটিউব দেখে নিজে নিজেই গিটার বাজানো শিখেছিল। গিটারে অনেক সুন্দর সুন্দর গান তুলত। ফুটবল ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। কলেজের ফুটবল ক্লাবে খেলে বাসায় ফেরার পথে যদি দেখত বন্ধুরা মাঠে খেলছে, তাহলে আবার তাদের সঙ্গে খেলতে নেমে পড়ত। ফুটবলের প্রতি ছিল ওর অসীম ভালোবাসা।

আজও প্রতিটি সকাল আমার কাছে ৪ আগস্টের সেই বিকেলের স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে। আহনাফের ঘর, গিটার, বই আর প্রিয় জিনিসগুলো যেন আজও ওর জন্য অপেক্ষা করে। একজন মা হিসেবে আমার বুকের এই শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হবে না। তবু আমি বিশ্বাস করি, আমার সন্তানের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। যে স্বপ্ন, যে ন্যায়বোধ আর যে সাহস বুকে নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, সেই স্বপ্ন একদিন অবশ্যই পূর্ণতা পাবে।

আমি মহান আল্লাহর কাছে শুধু এই দোয়া করি, তিনি যেন আমার আহনাফ আহমেদকে শহীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন, জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন। আর এ দেশের মানুষ যেন কখনো আহনাফদের কুরবানির কথা ভুলে না যায়।

[চব্বিশের জুলাইয়ে কিশোর 
শহীদ আহনাফ আহমেদের মা]

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ