একটি দোয়েল ও তপ্ত দুপুর
গল্প ওয়াহেদুজ্জামান আহমেদ জুন ২০২৬
সেদিন বিনোদপুরে প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। মাঝদুপুরে রিতার মনে হলো তার মাথা থেকে এক্ষুনি ঘিলু গলে পড়বে।
বাবা অফিসে। বড় আপা কলেজে। খাওয়ার পর মা রিতাকে বললেন, ‘একটু ঘুমিয়ে নাও, রিতা।’
সে শুনল কথাটা, কিন্তু আমলেই নিল না। তার ঘরে গিয়ে ছবি আঁকতে বসল। গাঢ় সবুজ আর লাল রং দিয়ে মস্ত একটা টিয়েপাখি আঁকল।
টিয়ে রিতার প্রিয় পাখি। তার পীড়াপীড়িতে বাবা ওকে একটা টিয়ে কিনে দিয়েছিলেন। বারান্দায় একটা বাঁশের খাঁচায় রেখে পালত। পাখিটা বাড়িতে আসার পর রিতার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় একেবারে। এমনকি পড়ালেখাও। সারাক্ষণ টিয়ে নিয়ে থাকত। তাকে খাওয়াত, গোসল করিয়ে দিত আর অনর্গল কথা বলত ওর সঙ্গে। রিতা টিয়েটার নাম দিয়েছিল রিংকু।
একদিন টিয়েটাকে বলল, ‘জানিস রিংকু, আমার মেয়েটাকে রুম্পার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবো। তুই কী বলিস?’ রিংকু খুব করে ডানা ঝাপটে বলল, টিই টিই টিই...
রিতা খুশি হয়ে ভাবল, ও রাজি আছে এ বিয়েতে। রিতা ওকে অনেক কথা বলতে শিখিয়েছিল। পাখিটা ওকে ডাকত ছোট আপু।
তার এই অতিশয় টিয়েপ্রীতি বাড়ির সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছিল। মা আর বড় আপা বকা দিলেন একটুখানি। তাতে কাজ না হওয়ায় বাবাও একটুখানি গালমন্দ করলেন; কিন্তু টিয়ে থেকে রিতাকে সরানো গেল না।
কী করবেন ভেবে না পেয়ে মা একদিন রেগেমেগে খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। স্কুল থেকে এসে রিতা যখন দেখল টিয়ে নেই, খুব কান্নাকাটি করল, তারপর একসময় সব ভুলে গেল...
আঁকা শেষ করে রিফা খাটের ওপর কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দিয়ে একটা গানের কটা লাইন গাইল-নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল, বসন্তে সৌরভে শিখা জাগল।
রিফার গলা ভালো, তবে গানের প্রতিযোগিতায় সব সময় থার্ড হয়। বন্ধুরা ওকে থাড্ডু বলে খেপায়। তার এই থার্ড হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ সম্ভবত সে কঠিন কঠিন সব গান করে। গত মাসে যে প্রতিযোগিতাটা ওদের স্কুলে হয়ে গেল সেখানে রিতা গেয়েছে-আমার ঘুর লেগেছে-তা ধিন্ তা ধিন্। তোমার পেছন পেছন নেচে নেচে ঘুর লেগেছে তা ধিন্ তা ধিন। রবীন্দ্রনাথের গান।
এইসব কঠিন গানের জন্যে রিতা অবশ্য দায়ী নয়, সে গায় তার সংগীত শিক্ষক খন্দকার স্যারের নির্দেশে। স্যার গুরুগম্ভীর আর কড়া ধাঁচের মানুষ। তাঁর কথার ওপর কথা বলতে পারে না কেউ।
গান শেষ করে রিতা ডাইনিং টেবিলে রাখা তেঁতুলের আচারের বয়াম থেকে একটুখানি আচার খেয়ে পায়চারি করতে লাগল, আর তখনই একটা পাখির কিচিমিচি কিচ কিচ শব্দ ভেসে এলো তার কানে। এ কোন পাখি ডাকে? রিতা বারান্দায় গেল, আশেপাশে তাকাল, কোনো পাখি তার চোখে পড়ল না। তবে শব্দ কানে আসছে-কিচিমিচি কিস কিস, কিচিমিচি কিস কিস।
কী পাখি? কোথায় বসে ডাকছে? রিতা কান পেতে শব্দটা শুনতে লাগল, তার চোখ দুটো উৎসুক হয়ে পাখিটা খুঁজে চলল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল-একটা ঘুড়ির সুতোর সঙ্গে একটা দোয়েলের পা আটকে গেছে ইলেকট্রিকের তারে।
রিতা ওদের বাসার আঁশ পরিষ্কার করার লম্বা লাঠিটা নিয়ে দোয়েলের পা থেকে সুতো ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবল, কিন্তু এতদূর পর্যন্ত তার হাত পৌঁছাল না। সে তখন আছিয়ার মাকে ডাকার কথা ভাবল। সে লম্বা মানুষ, তার হাত দুটোও লম্বা।
শিরীনা বেগম চিৎকার করে বলল, ‘শিগগির এসো আছিয়ার মা, ইলেকট্রিকের তারে একটা পাখি আটকা পড়েছে, লাঠি দিয়ে ছাড়িয়ে দাও।’ আছিয়ার মা তখন ঘুমে একেবারে কাদা। সে পাশ ফিরে শুয়ে বলল, ‘এলেকটারির লাইন আচে তো, ফ্যান ঘুরতে আচে।’
আরে ধ্যাত। রিতা জোরে একটা ধমকানির শব্দ করে মায়ের ঘরে গিয়ে বলল, ‘মা ওঠো তো শিগগির, একটা পাখি...’ মা তার কথা শেষ করতে না দিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘তুই এখনও জেগে আছিস? ঘুমাগে যা। জলদি।’
রিতা আবার বারান্দায় গেল। পাখিটা আরও জোরে জোরে চিৎকার করছে। নাটাই-ছেঁড়া ঘুড়ি, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া থাকে, পাখির পা কেটে নিশ্চয় খুব রক্ত বেরোচ্ছে।
রিতার মায়া হচ্ছিল খুব। কী করা যায় এখন? সে কি রাস্তায় নেমে চিৎকার করবে? কিন্তু তাতে কী হবে? এত ওপরে উঠে ইলেকট্রিকের তার থেকে পাখিটা নামাবে কী করে? এত বড় মই তো কারও কাছে নেই!
সে ঘরে গেল, জগ থেকে পানি খেল। আবার বারান্দায় এলো। একটুখানি পায়চারি করল; হঠাৎ তার মনে পড়ল ফায়ার সার্ভিসের কাছে লম্বা মই থাকে, তারা পাখিকে নামিয়ে আনতে পারবে।
সে তার মায়ের ফোনটা নিয়ে ফায়ার সার্ভিসে ফোন করে বলল, ‘আপনাদের লম্বা মইটা নিয়ে শিগ্িগর আসুন, একটা দোয়েল পাখি ইলেকট্রিকের তারে আটকে পড়েছে।’
ফোনটা ধরেছিলেন যে কর্মকর্তা, তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘মা-মণি তোমার নাম আর ঠিকানা বলো, আমরা আসছি।’
রিতা গালে হাত দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। রাস্তায় লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া নেই একেবারে। গরমে নাকাল শহরবাসী। জরুরি কাজ না থাকলে কেউ বাইরে বেরোচ্ছে না।
কিছুক্ষণের মধ্যে সাইরেন বাজাতে বাজাতে ফায়ার সার্ভিসের দুটো গাড়ি ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলো। ভাতঘুমের ভেতরে ছিল যারা তাদের ঘুম গেল টুটে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির শব্দ শুনে তারা ভাবল আগুন লেগেছে। সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলো।
রাস্তায় নেমে এলো রিতাও। ততক্ষণে মই বেয়ে ওপরে উঠে পাখিটা নিয়ে নিচে নেমে এসেছেন দুজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী। তারা দোয়েলের পায়ে পেঁচিয়ে থাকা অনেকখানি সুতো খুলে ফেললেন।
উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বিনোদপুরের ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলী হোসেন। জীবনে তিনি অনেক উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এ রকম ঘটনা তিনি এই প্রথম শুনলেন। ফলে খুব কৌতূহল নিয়ে উদ্ধার টিমের সঙ্গে চলে এসেছেন। তিনি ছাড়াও তার দলে ছিলেন দশজন দক্ষ অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা। দলনেতা রিতাকে খুঁজে বের করে দোয়েলটা তার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই নাও মা-মণি, তোমার পাখি।’
রিতা হেসে বলল, ‘আমার পাখি নয়, এটা সবার পাখি। এ তো জাতীয় পাখি দোয়েল। আমি তো ভয়ে ভয়ে ফোন করেছিলাম আগুন লাগলেও অনেক সময় ফোন করে পাওয়া যায় না আপনাদের, এটা তো সামান্য একটা দোয়েল পাখিকে বাঁচানোর অনুরোধ ছিল।’
এ কথা শুনে আলী হোসেন বললেন, ‘ফায়ার সার্ভিস এখন লাইফ সেভিং ফোর্স। শুধু মানুষ কেন, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জীবনের মূল্য আছে। তাদের জীবন রক্ষা করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ রকম মনোভাব নিয়েই এখন আমরা কাজ করি। ছোট্ট দোয়েল পাখিটার জীবন রক্ষা করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’
দোয়েল পাখি উদ্ধার অভিযানের খবর শুনে ওখানে এসে হাজির হয়েছিলেন স্থানীয় বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অনুপম রায়হান। তিনি বললেন, ‘পাখি মারার ঘটনায় পুলিশ ডাকলে লোকে হাসাহাসি করে। বলে, কী হয় পাখি মারলে? এজন্য পুলিশ ডাকতে হবে? এ রকম যখন অবস্থা, তখন পাখির প্রাণ রক্ষায় ফায়ার সার্ভিসের ছুটে আসা ও উদ্ধার অভিযান চালানোটা একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনা থেকে সবারই শেখার আছে-কারো জীবন বাঁচাতে সবারই ছুটে যাওয়া উচিত, ক্ষুদ্র একটা প্রাণী হলেও।’
বাড়ির সামনে হট্টগোলের শব্দ পেয়ে ভাতঘুম থেকে জেগে উঠলেন রিতার মা। কোথাও রিতাকে খুঁজে না পেয়ে দ্রুত নিচে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, পাড়ার কয়েকজন লোক রিতাকে মাথায় নিয়ে ধাঁই ধাঁই করে নাচছে। কিছু বুঝতে না পেরে তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
আরও পড়ুন...