এআই দ্যা চেঞ্জ মেকার

আইটি কর্নার ইঞ্জিনিয়ার নাঈম হোসেন অক্টোবর ২০২৫

স্যার ক্লাসে কিছু অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন। ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী অনেক চেষ্টা করেও অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে পারেনি কিন্তু রায়হান বেশ অল্প সময়ে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেছে। পরের ক্লাসে স্যার বললেন, রায়হান পারল কিন্তু তোমরা কেউ পারলে না কেন? ব্যাপারটা কী? চলো রায়হানের কাছেই জেনে নিই। রায়হান দাঁড়িয়ে বলল, আমি নিজের মেধার সাথে চ্যাটজিপিটি ও জিমিনির সাহায্যে নিয়েছি। সবাই বেশি চমৎকৃত হলো। তবে একটা প্রশ্ন, এআইয়ের সাহায্য নেওয়া কি কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি? এতে আমরা কী কী ক্ষতির সম্মুখীন হব? 


এআই কী?

এআই বা Artificial Intelligence হলো এমন মেশিন, যা মানুষের মতো শিখতে পারে, চিন্তা করতে পারে, এমনকি সিদ্ধান্তও নিতে পারে। চ্যাটজিপিটি, জিমিনি, গুগল ট্রান্সলেট খুব সহজেই একটি ভাষাকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে পারে। ধরো, তুমি ইংরেজি গল্প বা প্যাসেজ পড়ার সময় কোনো একটা বাক্য বুঝতে পারছ না, তখন তুমি সাধারণত কোনো একজন শিক্ষক বা কোনো বন্ধুর কাছে যাও, তাই না? কিন্তু এখন আর তার দরকার হয় না। সেকেন্ডের মধ্যে চ্যাটজিপিটির মতো সফটওয়্যারগুলো তোমাকে ভাষা অনুবাদ করে দিতে পারে। এই যে সফটওয়্যার বা মেশিনের মাধ্যমে অনুবাদ-এটাই হলো এআই।

 

এআই কীভাবে এলো?

মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই বুদ্ধিদীপ্ত মেশিনের স্বপ্ন দেখেছে। গ্রিক পুরাণে রোবট-সদৃশ চরিত্র পাওয়া যায়। মুসলিম বিজ্ঞানী আল-জাজারি তাঁর The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices বইয়ে রোবট-সদৃশ যন্ত্রের নকশা দিয়েছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে কিছু বিজ্ঞানী রাত জেগে ভাবছিলেন-‘যদি মেশিনকে মানুষের মতো চিন্তা করতে শেখাই, কেমন হয়?’ তখনই John McCarthy নামের এক গবেষক প্রথমবার Artificial Intelligence শব্দটি ব্যবহার করেন।

এরপর ধাপে ধাপে এগিয়েছে। ১৯৯৭ সালে IBM-এর কম্পিউটার Deep Blue বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে সবাইকে অবাক করল। ২০১১ সালে Watson নামের এআই টিভি শো Jeopard জিতে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ChatGPT, Bard, Claude-র মতো এআই আমাদের হাতে। এটা অনেকটা ছোট নদীর মতো, যা সময়ের সাথে সাথে সমুদ্র হয়ে গেছে। বর্তমানে এআই বিভিন্নভাবে আমাদের সহযোগিতা করছে।


শিক্ষাক্ষেত্র

আজকের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় এআইয়ের সাহায্যে অনেক সহজে শিখতে পারছে। ধরো, তুমি তোমার ক্লাসের কোনো একাডেমিক বিষয় শিখতে চাইছ। যেমন : Physics, Chemistry, Math, English ইত্যাদি। চাইলে তুমি এআইকে শিক্ষকের মতো ব্যবহার করে সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা, উদাহরণ বা সমাধান জানতে পারবে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের এআইভিত্তিক টিউটর ও সফটওয়্যার ডেভেলপ করা হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে যে-কোনো একাডেমিক বিষয়ে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। যেমন-ChatGPT, Khan Academy AI, Google Socratic ইত্যাদি টুলস শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা আরও সহজ করে তুলছে।


চাকরি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন

আজকের দিনে ক্যারিয়ার গঠন ও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে। টেকনিক্যাল যে-কোনো স্কিল ডেভেলপ করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধরো, তুমি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন বা ভিডিও এডিটিং শিখতে চাও-এআই তোমাকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দারুণভাবে সহযোগিতা করবে। চাইলে তুমি এআই-কে ব্যক্তিগত ট্রেইনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারো।

এ ছাড়া এআইয়ের ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে ওয়েবসাইট তৈরি, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। বর্তমানে অনেকেই শুধু এআই ব্যবহার করে ডিজাইনার বা ডেভেলপার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করে ভালো আয় করছে। Fiverr, Upwork-সহ বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে এআইএক্সপার্টদের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। গ্রাফিক ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিং-এ এআই ব্যবহার করা ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, আগে অনেক দক্ষ ব্যক্তি ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে পারতেন না। কিন্তু এখন ChatGPT, Gemini-এর মতো এআই টুল ব্যবহার করে সহজেই ভিন্ন ভাষায় ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে এগিয়ে যেতে আগামীতে এআইয়ের কোনো বিকল্প থাকবে না।


ভাষা শিক্ষা

এআইয়ের আরেকটি ব্যবহারিক দিক হলো ভাষা শিক্ষা। এআই-কে তুমি এমনভাবে ট্রেইন করতে পারবে-সে তোমার ইংরেজি শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। প্রতিদিন ইংরেজি বলা চর্চা করতে চাইলেও এআই সাহায্য করবে। কথা বলতে গিয়ে গ্রামার বা শব্দ ভুল হলে সে সেটা কারেকশন করে দেবে। যেমন : Duolingo, Hello Talk, Lingo, CHatGPT, Speak (AI) tutor, GrammarlyGO, Engoo.

এ ছাড়া চিকিৎসাক্ষেত্রে ও স্মার্ট হোম তৈরিতে এআই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দিনদিন এআইয়ের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, একাডেমিক, প্রফেশনাল সকল ক্ষেত্রেই এআই আমাদের কাজকে সহজ করে দিচ্ছে, সময় বাঁচাচ্ছে। আগামীতে এআইয়ের সাহায্য ছাড়া দৈনন্দিন কাজ, প্রফেশনাল কাজ, সামাজিক, একাডেমিক কাজ করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

এত সব সুবিধা থাকলেও এআইয়ের কিছু ক্ষতির দিক আছে। এআইয়ের কারণে গতানুগতিক অনেক চাকরি হারিয়ে যাচ্ছে। Linkedin.in-এর জরিপে দেখা গেছে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকনোলজি ও এআইনির্ভর জবের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে ৪০-৬০ শতাংশ মানুষের যে গতানুগতিক যোগ্যতা আছে তারা চাকরি হারাবে। একই সাথে টেকনোলজি ও এআইয়ের যে ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, সেখানে ৪০ শতাংশ দক্ষ লোকের অভাব সৃষ্টি হবে। সুতরাং এআই আসার কারণে যেমন চাকরির সংকট তৈরি হবে একই সাথে নতুন চাকরিও সৃষ্টি হবে। তবে চাকরির সংকট সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো দ্রুত মার্কেট পরিবর্তন হওয়া। 

এআই যে কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। যারা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তারা এআই-কে সেভাবেই ট্রেইন করে কাজ করবে।

এআইয়ের আরেকটি অসুবিধা হলো, এটি ব্যবহার করে যে-কোনো জায়গায় যে-কোনো ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা যায়। এর ফলে ব্যক্তির নিরাপত্তা, পার্সোনাল লাইফ বিঘিœত হয়। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও অনেকে এভাবে নজরদারি করে। এতে করে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গোপনীয়তা বিঘ্ণিত হয়। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা ড্রোন ব্যবহার করে যেকোনো মানুষকে হত্যা করা যায়। যেটি আমরা ইজরাইল-ইরান-গাজা যুদ্ধে দেখেছি। সার্বিকভাবে এআইয়ের মাধ্যমে তৈরিকৃত টুল বা সফটওয়্যার মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীনতার বিঘ্ণ ঘটাচ্ছে। 

এআইয়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো-মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা, নতুন কিছু সৃষ্টির ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এআইয়ের মাধ্যমে যে কেউ ইংরেজিতে একটি দারুণ প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সে হয়তো বেসিক গ্রামারও ভালো জানে না। এতে করে তার যে মেধা বিকাশ হওয়ার কথা ছিল সেটি হচ্ছে না। সকল বিষয়েই শুরুতে এআইয়ের সাহায্য নেওয়ার কারণে তার নিজের যে চিন্তা করার দক্ষতা, সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, সেটি বিকশিত হতে পারছে না। যদি কখনো এআইয়ের সাপোর্ট না থাকে সে হয়তো কোনো সমস্যার সমাধানই করতে পারবে না।

এআই নিঃসন্দেহে আমাদের কাজগুলো সহজ করছে। কিন্তু এটিকে শুধু টুল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। আমরা যদি এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠি, তাহলে সেটিই আমাদের জীবনের অবনতির কারণ হয়ে উঠবে। এআই নিঃসন্দেহে মানুষে জ্ঞানকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, তবে এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করলে মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ