আবদার

তোমাদের গল্প ইব্রাহিম জুয়েল জানুয়ারি ২০২৬

ভাবুক ও গম্ভীর স্বভাবের ছেলে অনিক। ক্লাসের টপার বয়। প্রতি পরীক্ষায় সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম হয় সে। একা একা কী নিয়ে ভীষণ মগ্ন হয়ে আছে। ঠিক তখনি তার বন্ধু রাফি কাঁধে হাত দিয়ে বলে উঠল, ‘কি অনিক, তুমি কি আমাদের সাথে শিক্ষাসফরে যাচ্ছ না?’

‘ঠিক বলতে পারছি না রে।’

‘কেন? কোনো সমস্যা নাকি?’

‘না, তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

এর মধ্যে পিয়ন ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দিলো। মিনিটখানেক পর ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন বাংলা স্যার। সকল ছাত্র-ছাত্রী বেশ আনন্দিত। তারা সবাই অবগত আছে, আর তিন দিন পরই তারা কুমিল্লার প্রাচীনতম নিদর্শন ময়নামতি ও শালবন বিহার পরিদর্শনে যাচ্ছে। বাংলা স্যার সকল কিছুর দায়িত্বে আছেন। ক্লাসরুমে সবাই বাংলা স্যারের নিকট যাবতীয় খরচ বাবদ টাকা জমা দিয়েছে। শুধু ক্লাসের সবার প্রিয় মেধাবী অনিক ব্যতীত। বাংলা স্যার অনিককে ছুটির পর দেখা করতে বললেন। অনিক হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে সায় দিলো।

অনিক কোনো বন্ধুকে ওর পরিবারের কথা শেয়ার করে না। তাই কোনো বন্ধু ওর পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয়। কিন্তু বাংলা স্যার সবই জানেন। অনিকের ছোট্ট পরিবার। দৈনিক আয় দিয়ে তাদের সংসার চলে। অনিকের পড়াশোনা আর সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যান ওর বাবা।

স্যারের কথামতো ছুটি শেষে বাংলা স্যারের নিকট গেল অনিক। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি যাবে না, অনিক?’

অনিক মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে। স্যার বুঝতে পেরেছে। ‘আমি প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলেছি, তুমি কোনো টাকা ছাড়াই আমাদের সাথে যাবে। তোমার খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করবে।’

‘স্যার, বাবা এভাবে যেতে দেবেন না। বাবা বলেছেন, যতদিন বেঁচে থাকবেন তিনিই আমার সব খরচ বহন করবেন। তা যেভাবে সম্ভব হয়।’

‘সবাই যাচ্ছে, তুমি না গেলে সেটি কেমন দেখায়? তার ওপর তুমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। আমি রিকুয়েস্ট করছি, তুমিও আমাদের সাথে চলো। তোমার বাবাকে আজই জানাবে এবং আগামী বৃহস্পতিবার আমাকে জানাবে তিনি কী বললেন।’

‘বলব, স্যার।’

অনিক ভীষণ চিন্তিত। কীভাবে বাবাকে বলবে শিক্ষাসফরে কথাটা। রাতে খাবারের পর বাবার রুমের সামনে বারবার পায়চারি করতে লাগল অনিক। বাবা বিষয়টি লক্ষ করলেন। তিনি অনিককে ডেকে বললেন, ‘তুমি কিছু বলবে?’

‘হ্যাঁ, বাবা। আজ বাংলা স্যার আমাকে বললেন, আমি ব্যতীত শিক্ষাসফরে যাচ্ছে সবাই। আমাকে সাথে নেওয়ার জন্য আপনার অনুমতি চাচ্ছেন।’

‘বাবা, তুমি তো জানো আমাদের অবস্থা। এসব সফর আমাদের জন্য না। ইনশাআল্লাহ, তুমি বড়ো হলে আমাদেরও সাথে নিয়ে যেয়ো। স্যারকে ‘না’ করে দিয়ো, বাবা।’

অনিক নিচুস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলে তার বিছানায় চলে গেল। তার ভাবতে খারাপ লাগছে, সবাই যাবে সে ব্যতীত; আবার তার পরিবারের কথাও মাথায় আসছে। একা একা কান্না করতে লাগল। স্যারের কথা রাখতে পারল না। বাবাকেও জোর করতে পারছে না। পরের দিন আর স্কুলে যায়নি অনিক। কিন্তু স্যার বলেছিলেন বৃহস্পতিবার উত্তর জানাতে। কী করবে অনিক বুঝতে পারছে না।

পরের দিন অনিকের বাবা যে মালিকের নিকট কাজ করেন, তার কাছে গিয়ে সন্তানের আবদারের কথা জানান। আজকের কাজের টাকার সাথে যাতে একটু বেশি টাকা দেয়। মালিক তখন কিছুই বলেননি। বেলা শেষে টাকা নিতে গেলে মালিক কাজের টাকা এবং আলাদাভাবে এক হাজার টাকা উপহার দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার ছেলের হাতে দেবে। সে যেন সবার সাথে শিক্ষাসফরে যেতে পারে।’

অনিকের বাবা অশ্রুসিক্ত চোখে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। তড়িঘড়ি করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় তার বাবা। বাড়িতে গিয়ে দেখেন অনিক তার পড়ার টেবিলে পড়ছে।

অনিককে ডেকে বলেন, ‘অনিক, এই নাও তোমার শিক্ষা সফরের টাকা। বাংলা স্যারকে বলবে, তুমিও যাচ্ছ। ছোটবেলা থেকে তো কোনো আবদার করোনি। তাই তোমার এই আবদারটুকু ফেলি কেমন করে?’

অনিক স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ