প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ
স্মরণ আবুল হোসেন আজাদ অক্টোবর ২০২৫
ছোটো ছোট ঢেউ তুলে তুলে বয়ে যাওয়া একটি নদী। সে নদীর নাম মধুমতি। এই নদীর পাড়ঘেঁষে ছায়া সুনিবিড় আম, জাম, কাঁঠাল, বাঁশঝাড়, নারকেল, তাল, সুপারি গাছে ভরা একটি গ্রাম মাঝাইল। বর্তমান মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার অন্তর্গত এই গ্রামটি। গ্রামের ছায়া সুনিবিড় গাছে গাছে পাখি ডাকে, ফুল ফোটে। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। মাথার ওপর সীমাহীন নীল আকাশ। মেঘহীন আকাশ মাটির ওপরে চকচকে রোদ বিছিয়ে দেয় দিনে। আর রাতে জোছনা ভরা চাঁদ ¯িœগ্ধ আলো ছড়ায়। এক অপরূপ দ্যুতি ছড়ানো সারা গ্রামজুড়ে।
এই মাঝাইল গ্রামে বাস করতেন এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবার। আশপাশের দশ গ্রামের লোকের মুখে মুখে তাদের নামডাক। সবার কাছে তাদের দারুণ পরিচিতি। এই সৈয়দ পরিবারেই এক ছেলে সৈয়দ হাতেম আলী। তিনি পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। সরকার কর্তৃক খান সাহেব উপাধিপ্রাপ্ত আবার। তাঁর ঘর আলো করে ১৯১৮ সালের ১০ জুন মা রওশন আখতারের কোলে জন্ম নিলেন ফুলের মতো একটি শিশু। এই শিশুটি ফররুখ। আমাদের কবিতার শাহজাদা কবি ফররুখ আহমদ।
তাঁর কবি প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ১৯৪৪ সালে যখন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি ঘুমন্ত বাঙালি মুসলমানকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন।
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্বস¤পন্ন মানুষ। নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকেছেন তিনি আমৃত্যু। তিনি তাঁর জীবনের দুঃসময়কে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে কাটিয়েছেন। কারো কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর এই আদর্শ আমাদের বাংলা সাহিত্য জগতে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
কবি ফররুখ আহমদ বড়োদের কবিতা দিয়ে শুরু করলেও ছোটদের কথা ভুলে থাকেননি। শিশুদের জন্য লিখেছেন সুন্দর সুন্দর মজার ছড়া-কবিতা। যেমন তার উপমা, ছন্দ, ভাষার কারুকাজ তেমনি নতুন চিন্তা। ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ ‘পাখীর বাসা’। এই গ্রন্থটিকে তিনি সাতটি ভাগে ভাগ করেছেন। তার মধ্যে তিনি প্রথম তিনটিতে পাখীর বাসা, পাখ-পাখালি ও পাঁচ মিশালীতে বাংলাদেশের নৈসর্গিক চিত্র এঁকেছেন তাঁর কলমের কালিতে। ‘পাখীর বাসা’ গ্রন্থের কবিতাগুলোর মধ্যে আছে ঘুঘু, বক, প্যাঁচা, গাঙশালিক, বাবুই, চড়–ই প্রভৃতি। পাখির জীবনধারা সহজ ভাষায় শিশুদের মনের মতো করে তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ‘পাখীর বাসা’ গ্রন্থের প্রথম কবিতাটিই হলো পাখীর বাসা। এসো কবিতাটি পড়ে নিই-
আয়গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া / দিনটাতে / পাখীর বাসা খুঁজতে যাবো / এক সাথে ॥ / কোন বাসাটা ঝিঙে মাচায় / ফিঙে থাকে কোন বাসাটায় / কোন বাসাতে দোয়েল ফেরে / সাঁঝ রাতে ॥ / ঝিলের ধারে ঝোপের মাঝে / কোন বাসাটা লুকিয়ে আছে / কোন বাসাটায় বাবুই পাখীর / মন মাতে ॥ / নদীর ধারে নিরালাতে / গাঙ শালিকের বাস যেটাতে / রাত্রিতে সে থাকে এখন / নেই যাতে ॥
কবি যে কত মিষ্টি করে ছড়া লিখতে পারেন তার অন্য একটি প্রমাণ ‘ঝুমকো জবা’ ছড়াটা। পড়ার সাথে সাথে ছোট্ট শিশুদের হৃদয়েও সুর তোলে ছড়াটার সাথে সাথে হৃদয়েও দোল দিয়ে যায়। বনবাদাড়ে কিংবা বাড়ির উঠোনে কোনো লাল টুকটুকে জবা ফুলকে মনোরম ছন্দের মালায় গেঁথেছেন তিনি- ঝুমকো জবা বনের দুল / উঠল ফুটে বনের ফুল। / সবুজ পাতার ঘোমটা তলে / ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে। / সেই দুলুনির তালে তালে / মন উড়ে যায় ডালে ডালে।
ঋতু বৈচিত্র্যে গ্রীষ্মের খরতাপের পরেই আসে বর্ষা। ঋতুবদলের পালায় আকাশে তখন ঘন কাল মেঘের ছুটোছুটি। কখনো জমাট মেঘের আঁধারে বৃষ্টি ঝরে অঝোরধারায়। জুঁই, চামেলি, কদম, কেয়া হয় ভিজে সারা। কবি লিখলেন ‘নতুন লেখা’ গ্রন্থে ‘শ্রাবণের বৃষ্টি’ নামে একটি অনবদ্য ছড়া- বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে / রিমঝিমিয়ে রিমঝিমিয়ে, / টিনের চালে, গাছের ডালে / বিষ্টি ঝরে হাওয়ার তালে / জুঁই চামেলী ফুলের বোঁটায় / বিষ্টি নামে ফোঁটায় ফোঁটায়, / বাদলা দিনে একটানা সুর, / বিষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর।
কবির চোখে ধরা পড়ে সবকিছুই। বনের পশু, মশা-মাছি, পাখি, ফুল নিয়ে তিনি অসাধারণ সব ছড়া কবিতা লিখে চলেন। যদিও সেই শৈশবে তিনি গ্রাম ছেড়েছেন, কিন্তু গ্রামের সেই মধুময় স্মৃতি, আদর-সোহাগ, মমতামাখা দিনগুলোকে ভুলতে পারেননি। তাইতো তাঁর কলমের ডগায় বেরিয়ে আসে আমাদের গ্রাম বাংলার সেই অতিথি পাখিদের চিরায়ত দৃশ্য।
নদী-নালার দেশে আমার আসে দূরের হাঁসগুলো / চমকে ওঠে তাল সুপারি নারকেল গাছ বাঁশগুলো। / নানান রঙের ঝিলিক দিয়ে পাখীরা সব যায় চলে, / হাজার সুরে দূর বিদেশের খবর তারা যায় বলে। / পাখনা নাড়া দিয়ে রঙিন পালক যায় রেখে, / ঝিল হাওরে নদীর তীরে পাখীরা সব যায় ডেকে।
কবি তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে শিশুদের জন্য লিখেছেন অসংখ্য ছড়া-কবিতা। আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন জীবজন্তু নিয়ে লিখেছেন ‘চিড়িয়াখানা’ ছড়া গ্রন্থখানি। এ ছাড়া তিনি ‘ফুলের ছড়া’ গ্রন্থ লিখেছেন বিভিন্ন ফুলের ওপর ভিত্তি করে। ‘পাখীর ছড়া’ গ্রন্থে তিনি আমাদের চারপাশের অতি পরিচিতি পাখিদের রং-বেরঙের মনকাড়া বর্ণনা দিয়েছেন।
কবি ফররুখ আহমদের মন ছিল সাগরের মতো বিশাল। তাঁর পাখীর বাসার মতো বড়ো বড়ো চোখ দুটোয় ছিল অপরিসীম মমত্বের দৃষ্টি। তিনি ছিলেন আর সকলের চেয়ে আলাদা। তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি। তাঁর কবিতায় আছে মুসলমানদের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতীয় স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষার কথা। তিনি আমাদের প্রাণের প্রিয় কবি। আদর্শের ওপর অবিচল থেকে নিজের জীবনকে তিনি নিঃশেষ করে দিয়েছেন। তবু তিনি মাথা নত করেননি।
কবি হিসেবে তিনি পেয়েছেন সম্মান ও বিভিন্ন পুরস্কার। তিনি ১৯৬৬ সালে পান ইউনেস্কো ও আদমজী পুরস্কার। ১৯৭৭ সালে পান একুশে পদক। ১৯৮০ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার ও ১৯৮৪ সালে পান ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার।
জীবনের শেষ দিনগুলি তিনি কাটিয়েছেন চরম দারিদ্র্য আর রোগ-শোকের মধ্যে। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি চলে যান পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে। তিনি আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অমর কীর্তি-সাহিত্যকর্ম। তিনি সকলের কবি। ছোটদের-বড়োদের। তিনি আমাদের কবিতার শাহজাদা। তিনি আমাদের শ্রদ্ধার, ভালোবাসার, কাছের ও মনের মানুষ।
তিনি নেই তাতে কি হয়েছে! তাঁর ডাক আজও আমরা শুনতে পাই তাঁর কবিতার ভেতরে। তিনি ছোটদের ডাক দিয়ে বলছেন- তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে / খোদার মদদ ছাড়া, / তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে / নিজের পায়ে দাঁড়া।
আরও পড়ুন...